ঘরের কিছু কাজ করার সময় ছোট সন্তানকে ব্যস্ত রাখতে আইপ্যাড হাতে দিয়েছিলেন এক অভিভাবক। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তার মনে হলো, সন্তান কতক্ষণ ধরে যন্ত্রটি ব্যবহার করছে কিংবা কী দেখছে, সেদিকে তিনি ঠিকমতো নজর রাখছেন না। তাই আইপ্যাড বন্ধ করতে বলতেই শুরু হলো তুমুল কান্না, চিৎকার ও জেদ।
শিশুটির এমন তীব্র প্রতিক্রিয়ায় অভিভাবক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তবে পরে তার মনে হয়, স্ক্রিন ছাড়া অন্য অনেক ক্ষেত্রেও শিশু একই রকম আচরণ করেছে। যেমন, ভাইদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলার পর ঘুমাতে যেতে না চাইলেও তার মধ্যে একই ধরনের রাগ ও কান্না দেখা গিয়েছিল।
ঘটনাটি একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে, শিশুদের এমন আচরণের জন্য কি সত্যিই শুধু স্ক্রিন টাইম দায়ী?
বর্তমানে শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম, ভার্চ্যুয়াল বাস্তবতা, স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট সবকিছুই যেন শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুদের মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে।
এমনকি অ্যাপলপ্রধান স্টিভ জবস ও মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসও নিজেদের সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা রেখেছিলেন বলে জানা যায়।
তবে স্ক্রিন টাইমের প্রভাব নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার চিত্র এতটা সরল নয়। কিছু গবেষণায় ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও অন্য গবেষণায় সেই সম্পর্ক এতটা স্পষ্ট নয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহার নিয়ে আমরা কি অতিরিক্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়ছি?
স্ক্রিন টাইম কি সত্যিই এতটা ক্ষতিকর
বাথ স্পা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক পিট এটচেলস স্ক্রিন টাইম ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে শত শত গবেষণা বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, স্ক্রিন ব্যবহারের ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে যেসব শিরোনাম প্রায়ই দেখা যায়, সেগুলোর পেছনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সবসময় শক্তিশালী নয়।
তাঁর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক গবেষণার ফলাফল পরস্পরের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। কোথাও আবার গবেষণার পদ্ধতি ও তথ্য সংগ্রহ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায়ও প্রায় একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায়। বিভিন্ন দেশের ১৪ জন গবেষক ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রকাশিত ৩৩টি গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখেন, স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও গেমসহ বিভিন্ন ধরনের স্ক্রিন ব্যবহার তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যায় তুলনামূলকভাবে সামান্য ভূমিকা রাখে।
স্ক্রিনের নীল আলো ঘুমের সমস্যা তৈরি করে, এমন ধারণাও বেশ প্রচলিত। কারণ, নীল আলো ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোন মেলাটোনিনের নিঃসরণ কমাতে পারে বলে মনে করা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালে ১১টি গবেষণা পর্যালোচনা করে করা একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘুমানোর আগের এক ঘণ্টায় স্ক্রিনের আলো দেখলেই যে সামগ্রিকভাবে ঘুমাতে বেশি সমস্যা হবে, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।
গবেষণার তথ্য নিয়ে কেন প্রশ্ন রয়েছে
স্ক্রিন টাইম নিয়ে গবেষণার বড় একটি সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই তথ্য সংগ্রহ করা হয় শিশু-কিশোরদের নিজেদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।
তাদের জিজ্ঞেস করা হয়, তারা কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করেছে কিংবা স্ক্রিন ব্যবহারের পর তাদের কেমন লেগেছে। কিন্তু নিজের ব্যবহারের সময় বা অনুভূতি সঠিকভাবে মনে রাখা সবসময় সম্ভব নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহসম্পর্ক ও কারণ-ফলের পার্থক্য। ধরা যাক, গরমের সময়ে আইসক্রিম বিক্রি বাড়লো এবং একই সময়ে ত্বকের ক্যানসারের কিছু উপসর্গের ঘটনাও বাড়লো। দুটি বিষয় একই সময়ে বাড়ছে বলে একটির কারণে অন্যটি হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। কারণ দুটির পেছনে তৃতীয় একটি কারণ, অর্থাৎ গরম আবহাওয়া, কাজ করতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, তরুণদের ফোন ব্যবহার ও বিষণ্নতা-উদ্বেগের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু আরও বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই তরুণেরা কতটা সময় একা কাটাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অর্থাৎ, ফোন ব্যবহারই সরাসরি মানসিক সমস্যার কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। বরং একাকিত্ব অনেক ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সব স্ক্রিন টাইম এক নয়
‘স্ক্রিন টাইম’ কথাটিও আসলে অনেক বিস্তৃত। একজন শিশু স্ক্রিনে বসে নতুন কিছু শিখছে, শিক্ষামূলক ভিডিও দেখছে কিংবা দূরে থাকা বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছে। অন্যদিকে আরেকজন ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেতিবাচক কনটেন্ট দেখছে বা উদ্বেগ তৈরি করা বিষয় স্ক্রল করছে। দুটিকে একই ধরনের স্ক্রিন টাইম বলা যায় না।
শিশু একা স্ক্রিন ব্যবহার করছে, নাকি বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু কত ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহার করেছে তা নয়, বরং কী করছে, কী দেখছে এবং কার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
মস্তিষ্কের ওপর কি স্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গবেষকেরা ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ১১ হাজার ৫০০টি মস্তিষ্কের স্ক্যান, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য এবং তাদের নিজেদের দেওয়া স্ক্রিন ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করেছিলেন।
গবেষণায় স্ক্রিন ব্যবহারের ধরন এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের পারস্পরিক সংযোগে কিছু পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেলেও, স্ক্রিন টাইমের সঙ্গে খারাপ মানসিক সুস্থতা বা জ্ঞানীয় সমস্যার সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। এমনকি দিনে কয়েক ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহার করা শিশুদের ক্ষেত্রেও এমন সম্পর্ক দেখা যায়নি।
গবেষণাটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু প্রজিবিলস্কি।
অধ্যাপক পিট এটচেলসের মতে, স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে যদি শিশুদের মস্তিষ্ক ধারাবাহিকভাবে খারাপের দিকে পরিবর্তিত হতো, তাহলে এত বড় তথ্যভান্ডারে তার স্পষ্ট প্রমাণ দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু গবেষণায় এমন ধারাবাহিক ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস চেম্বার্সও মনে করেন, মানুষের মস্তিষ্ক পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। মানুষের জ্ঞানীয় ব্যবস্থা যদি পরিবেশের সামান্য পরিবর্তনেই সহজে ভেঙে পড়তো, তাহলে মানুষ বিবর্তনের ধারায় এতদূর আসতে পারতো না।
তবে এর অর্থ স্ক্রিন সম্পূর্ণ নিরাপদ, এমনটিও নয়। স্ক্রিন ব্যবহারের ধরন, সময় এবং এর কারণে ঘুম, পড়াশোনা, শরীরচর্চা ও সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
‘মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ংকর সমীকরণ’
অধ্যাপক প্রজিবিলস্কি ও পিট এটচেলস দুজনেই স্বীকার করেন, অনলাইনে শিশুদের গ্রুমিং, যৌন হয়রানি এবং ক্ষতিকর বা অশালীন কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার মতো গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে। তবে তাঁদের আশঙ্কা, শুধু ‘স্ক্রিন টাইম’কে কেন্দ্র করে বিতর্ক চলতে থাকলে অনলাইনের প্রকৃত ক্ষতিকর দিকগুলো আড়ালে পড়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়েগো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক জিন টুয়েঙ্গে শিশুদের স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষে।
তাঁর মতে, অনলাইনে বেশি সময় কাটানো, একা স্ক্রিনের সামনে থাকা, কম ঘুমানো এবং বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি কম সময় কাটানো এই বিষয়গুলো একসঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তিনি শিশুদের যতটা সম্ভব দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন থেকে দূরে রাখার পক্ষে।
স্ক্রিন ব্যবহারে সীমা কি উপকারী?
২০২৪ সালে ডেনমার্কে ৮৯টি পরিবারের ১৮১ শিশুকে নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়। দুই সপ্তাহের জন্য অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশের স্ক্রিন ব্যবহার সপ্তাহে সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টায় সীমিত করা হয় এবং তাদের ট্যাবলেট ও স্মার্টফোন জমা দিতে বলা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, স্ক্রিন ব্যবহার কমানোর ফলে শিশু ও কিশোরদের কিছু মানসিক উপসর্গে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে এবং অন্যের প্রতি সহযোগিতামূলক আচরণও বাড়ে। তবে গবেষকেরা আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করবে শিশু
এ বিষয়ে সব প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ এক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস এবং যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব পেডিয়াট্রিকস অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ বর্তমানে সব শিশুর জন্য একই ধরনের নির্দিষ্ট স্ক্রিন টাইম সীমা নির্ধারণ করে না।
অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম না রাখার পরামর্শ দেয়। চার বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে এসব নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুদের শারীরিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা ও সক্রিয় জীবনযাপনকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
স্ক্রিন এখন ধীরে ধীরে চশমার মতো পরিধানযোগ্য প্রযুক্তিতে পরিণত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ছোট ছোট সম্প্রদায় ও আগ্রহভিত্তিক গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে গড়ে উঠছে।
অর্থাৎ, শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে দেওয়া হোক বা না হোক, আমাদের চারপাশের প্রযুক্তি দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
তাই শিশুদের সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার চেয়ে তাদের নিরাপদ, ভারসাম্যপূর্ণ ও সচেতনভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া হয়তো ভবিষ্যতের জন্য বেশি কার্যকর পথ হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি









