বিদেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের বাসিন্দা হতে হবে এমনটাই মনে করেন অনেকে। কিন্তু বাস্তবে সব দেশে নিয়ম এক নয়। নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করলে বেশ কয়েকটি দেশে বিদেশি নাগরিক, এমনকি পর্যটকরাও স্থানীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ পান।
তবে প্রক্রিয়াটি সবসময় সহজ বা দ্রুত নয়। সাধারণত পাসপোর্ট, নিজ দেশের ঠিকানার প্রমাণ, কর-সংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন নথি প্রয়োজন হয়। কোনও কোনও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার কারণও জানতে চাইতে পারে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকলে অবশ্য অনেক ভ্রমণকারীর ধারণার চেয়ে প্রক্রিয়াটি সহজ হতে পারে।
কেন বিদেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলবেন?
ছুটি কাটাতে গিয়ে বিদেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন কেন হবে প্রশ্নটি স্বাভাবিক। তবে নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণকারীদের জন্য এর বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাড়তি ফি এড়াতে অনেক ঘন ঘন ভ্রমণকারী স্থানীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। আবার কেউ বিদেশে হলিডে হোমের মালিক। ডিজিটাল নোম্যাড, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও রিমোট কর্মীদের অনেকেই নিয়মিত এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করেন। তাদের জন্য স্থানীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বেশ সুবিধাজনক হতে পারে।
এ ধরনের অ্যাকাউন্ট থাকলে স্থানীয়ভাবে অর্থ রাখা, নগদ টাকা তোলা, অর্থ স্থানান্তর এবং দৈনন্দিন লেনদেন করা তুলনামূলক সহজ হয়।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, কোন কোন দেশে পর্যটকসহ অনাবাসী বিদেশিরা নির্দিষ্ট শর্তে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন।
সুইজারল্যান্ড
আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের কথা উঠলেই প্রথম সারিতে আসে সুইজারল্যান্ডের নাম। দীর্ঘদিন ধরেই দেশটি স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা ও বিশ্বমানের ব্যাংকিং সেবার জন্য পরিচিত।
তবে আগের তুলনায় এখন সুইজারল্যান্ডে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়া বেশ কঠোর। তারপরও দেশটির বেশ কিছু ব্যাংক নির্দিষ্ট শর্তে অনাবাসী বিদেশিদের অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেয়।
অ্যাকাউন্ট খোলার আগে গ্রাহকের পরিচয় ও আর্থিক অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত যাচাই করা হয়। কোনো কোনো ব্যাংক তুলনামূলক বড় অঙ্কের প্রাথমিক জমা চাইতে পারে। অনাবাসী গ্রাহকদের কাছ থেকে বাড়তি ফিও নেওয়া হতে পারে।
জর্জিয়া
ডিজিটাল নোম্যাড ও দীর্ঘমেয়াদি ভ্রমণকারীদের কাছে জনপ্রিয় গন্তব্য জর্জিয়া। বিদেশিদের জন্য তুলনামূলক সহজ ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে।
জর্জিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংক অনাবাসী বিদেশিদের অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই বৈধ পাসপোর্টই প্রধান প্রয়োজনীয় নথি হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে নাগরিকত্ব ও ব্যাংকভেদে অতিরিক্ত কিছু কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারও নিতে পারে।
পর্তুগাল
পর্যটক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, রিমোট কর্মী এবং দ্বিতীয় বাড়ির মালিকদের কাছে ইউরোপের জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোর একটি পর্তুগাল। নিয়মিত যাতায়াত করা অনেক বিদেশি তাই দেশটিতে স্থানীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার কথা ভাবেন।
পর্তুগালে অনাবাসী বিদেশিদের অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ রয়েছে। তবে এজন্য তুলনামূলক বেশি কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
পাসপোর্টের পাশাপাশি সাধারণত পর্তুগালের কর শনাক্তকরণ নম্বর এনআইএফ, নিজ দেশের ঠিকানার প্রমাণ এবং আয় বা চাকরি সংক্রান্ত নথি জমা দিতে হয়।
পর্তুগালে নিয়মিত যাতায়াত করেন এমন ভ্রমণকারীদের জন্য স্থানীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সময় ও অর্থ সাশ্রয়ে সহায়ক হতে পারে।
সিঙ্গাপুর
নিরাপদ ও শক্তিশালী আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত সিঙ্গাপুর। দেশটিতে বসবাস না করলেও কিছু ব্যাংক অনাবাসী বিদেশিদের অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেয়।
তবে ব্যাংকভেদে নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আলাদা। সাধারণত পাসপোর্ট, অতিরিক্ত পরিচয়পত্র এবং অ্যাকাউন্ট খোলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তথ্য দিতে হয়।
কোনও কোনও ব্যাংক ন্যূনতম প্রাথমিক জমার শর্ত রাখতে পারে। আবার আবেদন অনুমোদনের আগে গ্রাহককে সরাসরি ব্যাংক শাখায় উপস্থিত হতে হতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত
প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক ভ্রমণ করেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই)। তাদের মধ্যে অনেকেই ব্যবসায়িক কাজে নিয়মিত দেশটিতে যাতায়াত করেন কিংবা সেখানে সম্পত্তির মালিক। ফলে অনেকে স্থানীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার আগ্রহ দেখান।
ইউএইর বেশ কয়েকটি ব্যাংক অনাবাসী বিদেশিদের সেভিংস অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেয়। সাধারণত পাসপোর্ট, বৈধ ট্যুরিস্ট ভিসা বা এন্ট্রি স্ট্যাম্প এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক নথি জমা দিতে হয়।
তবে অনাবাসী গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে স্থানীয় বাসিন্দাদের তুলনায় কিছু বিধিনিষেধ থাকতে পারে। এরপরও স্থানীয়ভাবে অর্থ রাখা এবং বিভিন্ন দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাওয়া যায়।
পানামা
লাতিন আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পানামা। দেশটির বেশ কয়েকটি ব্যাংক বিদেশি পর্যটকসহ অনাবাসীদের অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেয়।
তবে পানামায় অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হয়। সাধারণত পাসপোর্টের পাশাপাশি আয়ের প্রমাণ, ব্যাংকিং রেফারেন্স লেটার, পেশাগত রেফারেন্স এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে নথি জমা দিতে হতে পারে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক বিধিনিষেধ মেনে চলার কারণে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের পরিচয় ও আর্থিক তথ্য বিস্তারিতভাবে যাচাই করে। ফলে অন্যান্য কিছু দেশের তুলনায় পানামায় অনাবাসীদের অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়া তুলনামূলক জটিল হতে পারে।
যাওয়ার আগে যা মনে রাখবেন
কোনো দেশ অনাবাসী বা পর্যটকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দিলেই যে দেশটির প্রতিটি ব্যাংক আপনার আবেদন গ্রহণ করবে, এমন নয়। ব্যাংকভেদে শর্ত, প্রয়োজনীয় নথি, ন্যূনতম জমা এবং ফি ভিন্ন হতে পারে। এসব নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনও হতে পারে।
তাই বিদেশে যাওয়ার আগে যে ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার পরিকল্পনা করছেন, তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে সর্বশেষ নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে জেনে নিন। এতে ভ্রমণের সময় অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা এড়ানো সম্ভব হবে।
সূত্র: এনডিটিভি









