সুখী জীবনের ৯ মন্ত্র, যা বদলে দিতে পারে মন

জীবনযাপন ডেস্ক
১৫ আগস্ট ২০২৬, ২০:০০আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ২০:০০

সুখ কি শুধু ভালো চাকরি, বেশি টাকা, পছন্দের জীবন বা আরাম-আয়েশের সঙ্গে জড়িত? নাকি সুখ আসলে মনের এমন এক অভ্যাস, যা চর্চার মাধ্যমে তৈরি করা যায়? বৌদ্ধ ভিক্ষু ইয়োংগে মিংগিউর রিনপোছে’র জীবন ও দর্শন যেন দ্বিতীয় কথাটিকেই সমর্থন করে। তাঁর মস্তিষ্কের কার্যকলাপ নিয়ে গবেষণায় ইতিবাচক আবেগের সঙ্গে যুক্ত বাম প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে উল্লেখযোগ্য সক্রিয়তার কথা উঠে এসেছে। এমনকি এক পরীক্ষায় ৪১ বছর বয়সে তার মস্তিষ্কের বয়স ৩৩ বছর বয়সি মানুষের মতো বলে রিপোর্ট করা হয়েছিল।

‘রিনপোছে’ একটি সম্মানসূচক উপাধি, যার অর্থ মোটামুটি ‘মূল্যবান ব্যক্তি’। সুখী থাকার রহস্য জানতে তার সঙ্গে কথা বললে উঠে আসে জীবনের ছোট ছোট অভ্যাস, পরিবর্তনকে গ্রহণ করা, নিজের আবেগকে বুঝতে শেখা এবং অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক। মিংগিউরের মতে, সুখ কোনও একদিনে পাওয়া চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং প্রতিদিনের অনুশীলনে তৈরি হওয়া এক মানসিক অভ্যাস।

কম সুবিধায়ও খুঁজে নিন বেশি তৃপ্তি

আধুনিক জীবনে হাতের মুঠোয় প্রায় সবকিছু চলে এসেছে। একাকিত্ব লাগছে? ফোন হাতে তুলে নেওয়া যায়। একঘেয়ে লাগছে? খাবার, বিনোদন বা সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্য নেওয়া যায়। কিন্তু মিংগিউরের মতে, অস্বস্তিকর অনুভূতি থেকে বারবার পালিয়ে বেড়ানো সমস্যার সমাধান নয়।

তার কথায়, একাকিত্ব, অপূর্ণতা বা বিরক্তির মতো অনুভূতিগুলিকে এড়িয়ে যাওয়ার বদলে কিছুটা সময় সেগুলির সঙ্গে থাকা দরকার। কারণ, নিজের অনুভূতিকে বুঝতে শেখার মধ্যেও এক ধরনের জ্ঞান রয়েছে।

ধরা যাক, নেটফ্লিক্সে সিনেমা দেখার পাশাপাশি ফোনে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করছেন, তবু একঘেয়ে লাগছে। আরও বেশি বিনোদন যোগ করলেই যে সেই বিরক্তি দূর হবে, এমন নয়। বরং সবকিছু কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে নিজের মনের দিকে তাকানো যেতে পারে। সাময়িক শূন্যতাকে সবসময় বাহ্যিক উদ্দীপনায় ভরাট করার প্রয়োজন নেই।

ভয় লাগলেও পরিবর্তনকে স্বাগত জানান

২০১১ সালে এক গভীর রাতে মঠ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন মিংগিউর। সঙ্গে ছিল শুধু পরনের পোশাক। উদ্দেশ্য ছিল গৃহহীন এক যোগীর মতো জীবনযাপন করা। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গুরুতর খাদ্যে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন তিনি। তীব্র ক্লান্তি ও যন্ত্রণায় কয়েক দিন প্রায় নড়াচড়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিলেন।

পরে এই কঠিন অভিজ্ঞতাকেই জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসাবে দেখেছেন তিনি। সেই সময়ই তিব্বতি বৌদ্ধ দর্শনের ‘নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়া’র অর্থ গভীরভাবে বুঝতে শুরু করেন। সবকিছুকে নিজের ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করে পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তাকে মেনে নেওয়ার মধ্যেও যে মুক্তি রয়েছে, তা উপলব্ধি করেন।

তবে এমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতেই হবে, তা নয়। মিংগিউরের মতে, নতুন চাকরি, নতুন সম্পর্ক, নতুন জায়গা কিংবা নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় জীবনের প্রতিটি পরিবর্তনই নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ।

শান্তির জন্য নিরিবিলি জায়গা নয়, দরকার মনোযোগ

মেডিটেশন শেখার প্রথম দিকে মিংগিউরেরও একঘেয়ে লাগতো। প্রতিদিন শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মন দেওয়া তার কাছে তখন বেশ বিরক্তিকর মনে হয়েছিল। পরে অবশ্য মেডিটেশন সম্পর্কে তার ধারণা বদলায়।

তার মতে, ধ্যানের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা বা নিস্তব্ধ পরিবেশের প্রয়োজন নেই। চারপাশের পরিস্থিতিকেও মেডিটেশনের অংশ করে তোলা যায়। বাইরে গাড়ির শব্দ হচ্ছে, পাশের কেউ ফোনে ভিডিও দেখছে, এসবকে বিরক্তির কারণ না ভেবে মনঃসংযোগের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

দৃষ্টিভঙ্গি, ধ্যান ও অভ্যাস—এই তিনকে একসঙ্গে রাখুন

তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে মিংগিউর তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেন—দৃষ্টিভঙ্গি, ধ্যান এবং প্রয়োগ। তার মতে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই সচেতনতা, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও প্রজ্ঞার মতো ইতিবাচক গুণের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু শুধু সেই গুণের কথা জানলেই হবে না, নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সেগুলিকে জীবনের অংশ করে তুলতে হবে।

অর্থাৎ, ইতিবাচক চিন্তাকে শুধু ভাবনা হিসেবে নয়, অভ্যাস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

কৃতজ্ঞতা হোক ছোট ও নির্দিষ্ট

কৃতজ্ঞ থাকার জন্য বড় কোনও ঘটনা ঘটার অপেক্ষা করতে হবে না। বরং মিংগিউরের পরামর্শ, জীবনের একেবারে সাধারণ বিষয়গুলির দিকেও মন দেওয়া উচিত। যেমন, চোখে দেখতে পারছেন, নিজের মাথার উপর একটি ছাদ রয়েছে, বন্ধু বা পরিবারের কেউ পাশে আছেন এসবও কৃতজ্ঞ হওয়ার কারণ হতে পারে।

এর জন্য প্রতিদিন কৃতজ্ঞতার ডায়েরি লেখার প্রয়োজন নেই। বরং দিনের ছোট ছোট বিরতিতে চারপাশের কোনও নির্দিষ্ট মুহূর্ত উপভোগ করার চেষ্টা করুন। বড় কোনও সুখের অপেক্ষা না করে সাধারণ মুহূর্তের মূল্য বুঝতে শেখাই এখানে আসল শিক্ষা।

রাগকে দমন নয়, আগে চিনে নিন

ছোটবেলায় মিংগিউরের প্যানিক অ্যাটাক হতো। বাবার কাছে মেডিটেশন শেখার সময় তিনি জানতে চেয়েছিলেন, কী ভাবে এই আতঙ্কের সঙ্গে লড়াই করবেন। উত্তর এসেছিল, ‘লড়াই করো না।’

কারণ, কোনও অনুভূতিকে জোর করে দূরে সরিয়ে দিতে চাইলে সেটিই আরও বেশি মনে জায়গা করে নিতে পারে। যেমন, কাউকে যদি বলা হয় ‘কমলা রঙের কথা ভাববেন না’, তখন অজান্তেই বারবার কমলা রঙের কথাই মনে পড়বে।

মিংগিউর রাগের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতির কথা বলেন। তার মতে, রাগ উঠলে সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে দমন করার চেষ্টা না করে প্রথমে বুঝতে হবে, ‘আমি রেগে আছি।’ কয়েক মুহূর্ত সেই অনুভূতির দিকে মন দেওয়া যেতে পারে।

এই ধারণাটিকে তিনি ভোরের ঘাসের উপর জমে থাকা শিশিরের সঙ্গে তুলনা করেন। সচেতনতা যেন সূর্যের আলো, আর রাগ বা অন্য আবেগ যেন শিশির। সূর্যের আলো পড়লে শিশির যেমন ধীরে ধীরে গলে যায়, তেমনই আবেগকে সচেতনভাবে লক্ষ্য করতে পারলে তার তীব্রতাও কমে আসতে পারে।

সুখের জন্য ছুটবেন না, শ্বাসের দিকে ফিরুন

মিংগিউরের মতে, সত্যিকারের সুখ আসে নিজের ভিতরের ‘কিছু একটা নেই’—এই অপূর্ণতার অনুভূতি ছেড়ে দিতে পারলে। বেশি টাকা, নতুন চাকরি, নতুন দেশ কিংবা লটারিতে জেতা—এসব সাময়িক আনন্দ দিতে পারে। কিন্তু কিছুদিন পর মানুষ আবার নিজের স্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় ফিরে যায়।

তাই সুখের পিছনে ছুটে বেড়ানোর বদলে মনের সেই স্বাভাবিক অবস্থাকেই ধীরে ধীরে বদলানোর অনুশীলন করা যেতে পারে। তার পরামর্শ, নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, নিজের প্রতি ভালোবাসা এবং অন্যের প্রতি সহমর্মিতা এই কাজে সহায়ক হতে পারে।

অন্যকে সাহায্য করার মধ্যেও রয়েছে গভীর আনন্দ

নিজের জন্য কিছু করার আনন্দের সঙ্গে অন্যের উপকার করার আনন্দের তুলনা হয় না—এমনটাই মনে করেন মিংগিউর। তার কথায়, কাউকে সত্যিই সাহায্য করতে পারলে যে তৃপ্তি পাওয়া যায়, তা আইসক্রিম খাওয়া বা এক কাপ কফি পান করার আনন্দের থেকেও আলাদা।

ব্যস্ত জীবনে নিজের কাজ ও সমস্যার মধ্যেই আটকে থেকে অনেক সময় আশপাশের মানুষের প্রয়োজনের কথা ভুলে যাই। অথচ অন্যকে সাহায্য করার জন্য বড় কোনও উদ্যোগের প্রয়োজন নেই। কোনও অসুবিধায় থাকা প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো, কাউকে মন দিয়ে কয়েক মিনিট কথা শোনা—ছোট কাজও বড় হয়ে উঠতে পারে।

মিংগিউরের জীবনদর্শনের সারকথা যেন এখানেই—সুখ বাইরে থেকে পাওয়া কোনও স্থায়ী বস্তু নয়। নিজের মন, অভ্যাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণকে প্রতিদিন একটু একটু করে বদলানোর মধ্যেই তার সন্ধান মিলতে পারে। পরিবর্তনকে ভয় না পাওয়া, অস্বস্তিকর অনুভূতি থেকে পালিয়ে না যাওয়া, ছোট মুহূর্তের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা এবং অন্যের পাশে দাঁড়ানো—এই সাধারণ অভ্যাসগুলিই হয়তো আরও তৃপ্ত ও অর্থপূর্ণ জীবনের দিকে এগিয়ে দিতে পারে।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গাড়িতে হামলা-ভাঙচুর, এমপি আমির হামজা আহত
গাড়িতে হামলা-ভাঙচুর, এমপি আমির হামজা আহত
৪২ স্বর্ণপদক জেতা আর্চারিতে শিগগিরই নির্বাচন
৪২ স্বর্ণপদক জেতা আর্চারিতে শিগগিরই নির্বাচন
ইইউর পোশাক বাজারে ধস, ছয় মাসে বাংলাদেশের রফতানি কমলো ১৬.৪৩ শতাংশ
ইইউর পোশাক বাজারে ধস, ছয় মাসে বাংলাদেশের রফতানি কমলো ১৬.৪৩ শতাংশ
সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
সুকান্ত ভট্টাচার্য: জন্মশতবর্ষসুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
সর্বাধিক পঠিত
বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য কে এই ফরহাদ হালিম ডোনার
বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য কে এই ফরহাদ হালিম ডোনার
আবার খোলা হলো শাহজালাল মাজারের দানবাক্স
আবার খোলা হলো শাহজালাল মাজারের দানবাক্স
গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে চেকিং পয়েন্ট পার হয়েছেন আশিয়ানের এমডি, শাস্তি পাচ্ছেন ২ অপারেটর
গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে চেকিং পয়েন্ট পার হয়েছেন আশিয়ানের এমডি, শাস্তি পাচ্ছেন ২ অপারেটর
ঋণের চাপে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়াও কঠিন হতে পারে: বিদ্যুৎমন্ত্রী
ঋণের চাপে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়াও কঠিন হতে পারে: বিদ্যুৎমন্ত্রী
আবার বন্ধ এক্সিলারেটের এলএনজি টার্মিনাল
আবার বন্ধ এক্সিলারেটের এলএনজি টার্মিনাল