সুকান্ত ভট্টাচার্য: জন্মশতবর্ষ

সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

মুহম্মদ অবেদুল্লাহ
১৫ আগস্ট ২০২৬, ২০:২৬আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ২০:৩৮

১.
১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় জন্ম নেওয়া সুকান্ত ভট্টাচার্য মাত্র একুশ বছরের জীবন নিয়ে বাংলা কবিতায় তার সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজস্ব স্বর তৈরি করেছিলেন। তার পৈতৃক নিবাস ছিল ফরিদপুরের কোটালিপাড়ায়। ছাত্রজীবনেই তিনি সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪৪ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। একই সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের সঙ্গে যুক্ত থেকে ‘আকাল’ সংকলন সম্পাদনা করেন। পরে কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘দৈনিক স্বাধীনতা’-এর ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন। তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কবিতা ছিল একই সত্তা। সভা, মিছিল, সংগঠন, শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অংশ যা তার কবিতার মূল অনুষঙ্গ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ, ফ্যাসিবাদ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ঔপনিবেশিক শাসন এবং শ্রেণিবৈষম্যের বাস্তবতা তার কবিসত্তাকে তৈরি করেছে। ১৯৪৭ সালের ১৩ মে যক্ষ্মায় তার জীবনাবসান ঘটে। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২)। সময়ের দিক থেকে তার কবিজীবন সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার কবিতার বিষয় ও চিন্তার পরিসর বিস্তৃত। সুকান্তের কবিতায় প্রকৃতি, প্রেম কিংবা ব্যক্তিমানুষের অনুভূতি অনুপস্থিত নয়, কিন্তু তার কবিতার প্রধান শক্তি মানুষের জীবনসংগ্রাম। তার কবিতায় ক্ষুধা আছে, কারণ তার সময় ক্ষুধার সময়; যুদ্ধ আছে, কারণ তার সময় যুদ্ধের সময়; বিদ্রোহ আছে, কারণ তার সময় মানুষের মধ্যে প্রতিরোধের শক্তি তৈরি হচ্ছিল।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার গভীরে যে সময়চেতনা কাজ করে, তা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের আন্তঃসম্পর্কিত গতির মধ্য দিয়ে পাঠ করা প্রয়োজন। কারণ সুকান্তের কাছে অতীত যেমন মৃত সময় নয়, বর্তমানও কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ভোগের মুহূর্ত নয় এবং ভবিষ্যৎও কোনো বিমূর্ত স্বপ্ন নয়। অতীতের শোষণ ও পরাধীনতা বর্তমানের ক্ষুধা, মৃত্যু ও বৈষম্যকে নির্মাণ করেছে; বর্তমানের ক্ষুধা ও বঞ্চনা মানুষের মধ্যে ক্রোধ ও বিদ্রোহের জন্ম দিয়েছে। সেই বিদ্রোহের মধ্য দিয়েই কবি ভবিষ্যতের একটি নতুন পৃথিবী নির্মাণের সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছেন। ফলে সুকান্তের কবিতার সময়রেখা সরল নয়; তা ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের গতি; অতীত থেকে বর্তমান, বর্তমান থেকে ভবিষ্যৎ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তার ছাড়পত্র কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পাঠ করলে বোঝা যায়, তিনি একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত সময়ের কবি হয়েও ধ্বংসের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি ধ্বংসের ভেতর থেকেই নির্মাণের সম্ভাবনা আবিষ্কার করেছেন।

২.
সুকান্তের অতীতচেতনার কেন্দ্রে রয়েছে পরাধীনতা, যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ, দুর্ভিক্ষ ও সামাজিক শোষণের ইতিহাস। ‘অনুভব’ কবিতার ১৯৪০ অংশে তিনি লিখেছেন, “অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি/জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।” ক্ষুব্ধ, পরাধীন ও ক্ষুধার্ত দেশের বাস্তবতার মধ্যে তার জন্ম। “অবাক পৃথিবী! আমরা যে পরাধীন”—এই উচ্চারণে ব্যক্তিগত জীবন ও জাতীয় ইতিহাস একাকার হয়ে যায়। আবার “দেখি এই দেশে অন্ন নেইকো কারো” এবং “দেখি এই দেশে মৃত্যুরই কারবার”—এই পঙ্‌ক্তিগুলোতে দেখা যায়, তার কাছে অতীতের রাজনৈতিক পরাধীনতা কেবল রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার অভাব নয়; তার প্রত্যক্ষ পরিণতি মানুষের খাদ্যাভাব ও মৃত্যুর মধ্যে প্রতিফলিত। এখানে একটি প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে যাওয়া জরুরি। সুকান্তকে যদি কেবল রাজনৈতিক কবি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে মনে হতে পারে তার কবিতায় স্বাধীনতার প্রশ্নই প্রধান। কিন্তু তার কবিতায় রাজনৈতিক স্বাধীনতা কখনোই একা দাঁড়িয়ে নেই; স্বাধীনতার প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত খাদ্য, মর্যাদা ও মানবিক অস্তিত্বের প্রশ্নে গিয়ে পৌঁছেছে। যে দেশে মানুষ অন্ন পায় না, সেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতাও অসম্পূর্ণ, সুকান্তের কবিতার অন্তর্নিহিত যুক্তি অনেকটা এই রকম। তাই তার ইতিহাসচেতনা শুধু রাষ্ট্রের ইতিহাস নয়, ক্ষুধার্ত মানুষের ইতিহাস।

‘কনভয়’ কবিতায় এই ইতিহাসচেতনা আরও গভীর হয়ে ওঠে। যুদ্ধফেরত কনভয় দেখে কবি জানালা থেকে চোখ সরিয়ে নেন, কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখেন “উন্মত্ত এক কনভয়”। সেই কনভয়ের সামনে কামান, পেছনে খাদ্যশস্য আঁকড়ে ধরা মানুষ। অর্থাৎ প্রচলিত ইতিহাস যেখানে যুদ্ধ, কামান ও সামরিক শক্তিকে কেন্দ্র করে ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে, সুকান্ত সেখানে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন খাদ্যের জন্য সংগ্রামরত মানুষকে। তার ইতিহাসের প্রকৃত নায়ক সম্রাট নয়, সেনাপতি নয়, ক্ষমতাবান নয়; সেই মানুষ, যে “ফসলের প্রতি তাদের পুরুষানুক্রমিক মমতা” নিয়ে যুগযুগান্তর ধরে এগিয়ে চলেছে। এখানেই সুকান্তের ইতিহাসদৃষ্টি জনকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। তবে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, সুকান্ত কি তাহলে অতীতকে কেবল অন্ধকার হিসেবেই দেখেছেন? তিনি অতীতের মধ্যে মানুষের সংগ্রামের ধারাবাহিকতাও দেখতে পেয়েছেন। অতীত ইতিহাসের ভেতরেই বর্তমানের বিদ্রোহের বীজ নিহিত। ‘সিঁড়ি’ কবিতায় এই ঐতিহাসিক শোষণের চিত্র অত্যন্ত তীব্রভাবে ফুটে ওঠে। “আমরা সিঁড়ি,/তোমরা আমাদের মাড়িয়ে/প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যাও”— এই ‘সিঁড়ি’ শোষিত মানুষের দীর্ঘ ইতিহাসের রূপক। এক শ্রেণি অন্য শ্রেণির শ্রম, দেহ ও অস্তিত্বের ওপর দাঁড়িয়ে উপরে উঠে যায়। কিন্তু সুকান্তের কবিতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সিঁড়ি নীরব থাকে না। সে জানে তার শরীরের ক্ষত একদিন প্রকাশিত হবে। তাই তার সতর্কবাণী— “একদিন তোমাদেরও হতে পারে পদস্খলন।” এখানে ইতিহাসের একটি মৌলিক ধারণা কাজ করছে: ক্ষমতা স্থায়ী নয়। যে মানুষ আজ পদানত, ইতিহাসের অন্য মুহূর্তে সে-ই প্রতিরোধের শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

৩.
সুকান্তের কবিতার বর্তমান হলো দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধা, যুদ্ধ, মৃত্যু, শ্রেণিবৈষম্য ও মানুষের অপমানের সময়। কিন্তু বর্তমানকে তিনি নিছক ব্যক্তিগত বেদনার ভাষায় প্রকাশ করেননি; তাকে একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্থাপন করেছেন। ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতায় তার বিখ্যাত ঘোষণা— “আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি।” এই আত্মপরিচয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বুঝতে পারছেন, তার কবিসত্তা যে সময়ের মধ্যে গড়ে উঠেছে, সেই সময়ের সবচেয়ে বড় সত্য সৌন্দর্য নয়, ক্ষুধা। রবীন্দ্রনাথের গান তাকে এখনো উদ্বেল করে, তার সৃষ্টির প্রভাব তার মধ্যে জীবিত; কিন্তু সেই নন্দনজগতের পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুর্ভিক্ষের নির্মম বাস্তবতা। ফলে এখানে সুকান্ত রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করেন না; রবীন্দ্রীয় সৌন্দর্যবোধকে নিজের সময়ের ক্ষুধার বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে নিয়ে আসেন। তিনি ক্ষুধার্ত মানুষের বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে কেবল সৌন্দর্যকে আঁকড়ে ধরতে পারেন না। এ কারণেই তিনি বলেন, “আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়।” বসন্ত এখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক হওয়ার বদলে খাদ্যের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষায় পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষুধা শুধু মানুষের শরীরকে নয় তার সৌন্দর্যবোধকেও বদলে দেয়। এই নন্দনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ ‘হে মহাজীবন’ কবিতায়: “হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়/এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো।” কবি যেন কবিতার অলংকারের বিরুদ্ধে বাস্তবতার কঠোরতাকে দাঁড় করান। কিন্তু এখানেও আপত্তি উঠতে পারে, সুকান্ত কি তবে কবিতার সৌন্দর্যকে প্রত্যাখ্যান করছেন? তিনি কি নন্দনবোধবিরোধী? আসলে তা নয়। তিনি সৌন্দর্যকে অস্বীকার করছেন না; সৌন্দর্যের সামাজিক ভিত্তি সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছেন। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে “পূর্ণিমা-চাঁদ” যদি “ঝল্‌সানো রুটি” বলে মনে হয়, তবে কবির কাজ শুধু চাঁদের সৌন্দর্য বর্ণনা করা নয়; সেই ক্ষুধার কারণটিকেও দৃশ্যমান করা। সুতরাং সুকান্তের গদ্যময় পৃথিবী নন্দনবোধের মৃত্যু নয়, নতুন নন্দনবোধের জন্ম। তার নন্দনবোধ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যে সৌন্দর্য ক্ষুধার্ত মানুষের চোখের জলকে আড়াল করে তিনি তার বিপক্ষে। এই কারণেই ‘একটি মোরগের কাহিনী’ কবিতাটি সুকান্তের বর্তমানকে বোঝার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ। একটি মোরগ প্রাসাদের কোণে আশ্রয় পায়, কিন্তু আহার পায় না। পরে আঁস্তাকুড়ে খাবার খুঁজে পায়, কিন্তু সেখানে “ময়লা ছেড়া ন্যাকড়া পরা দু’তিনটে মানুষ” এসে অংশীদার হয়। মোরগ ও মানুষের এই খাদ্যসংগ্রাম একই সামাজিক বাস্তবতার প্রকাশ। শেষ পর্যন্ত মোরগটি প্রাসাদে প্রবেশের সুযোগ পায়, “অবশ্য খাবার খেতে নয়/খাবার হিসেবে।” এই সমাপ্তি সুকান্তের ব্যঙ্গের অসাধারণ উদাহরণ। যে প্রাণীটি প্রাসাদের খাদ্যের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই প্রাসাদের ভোগের বস্তু হয়ে যায়। এখানে মোরগটি শোষিত সত্তার প্রতীক, যার জীবন ও শ্রম ক্ষমতাবানদের ভোগের কাঠামোর মধ্যে গ্রাস হয়ে যায়। একই সঙ্গে কবিতাটি আমাদের সামনে আরেকটি নির্মম সত্য হাজির করে—ক্ষুধার্ত মানুষও সেই একই আঁস্তাকুড়ের অংশীদার। ফলে সুকান্তের বর্তমান খাদ্যের অভাবের সঙ্গে সম্পদের অসম বণ্টনের সংঘর্ষে লিপ্ত।

কিন্তু সুকান্ত এখানেই থেমে যাননি। তার বর্তমান ক্রমশ প্রতিরোধের দিকে অগ্রসর হয়। ‘অনুভব’ কবিতার ১৯৪৭ অংশে এসে “বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে” উচ্চারণটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪০-এর কবি দেখেছিলেন পরাধীনতা, ক্ষুধা ও মৃত্যু; ১৯৪৭-এর কবি দেখছেন “অবাধ্যতার ঢেউ”। “প্রত্যহ যারা ঘৃণিত ও পদানত,/দেখ আজ তারা সবেগে সমুদ্যত”—এই পরিবর্তন সুকান্তের ইতিহাসচেতনার গতি। শোষিত মানুষ চিরকাল শোষিত থাকবে, এমন কোনো নিয়তিবাদ তার কবিতায় নেই। বরং যে মানুষ গতকাল পদানত ছিল, আজ সে উঠে দাঁড়াচ্ছে। এখানেই তার কবিতা অতীতের বেদনা থেকে বর্তমানের রাজনৈতিক ক্রোধে রূপান্তরিত হয়।

৪.
‘দেশলাই কাঠি’ এই রূপান্তরের আরেকটি শক্তিশালী রূপক। একটি দেশলাই কাঠি ক্ষুদ্র, নগণ্য; কিন্তু তার মুখে বারুদ, বুকে জ্বলে ওঠার আকাঙ্ক্ষা। কবি বলেন, “আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে,/আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব/শহরে, গঞ্জে, গ্রামে-দিগন্ত থেকে দিগন্তে।” এখানে ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’-তে উত্তরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তিমানুষের ক্ষুদ্র শক্তি সমষ্টির মধ্যে এসে বিস্ফোরক শক্তিতে পরিণত হয়। সুতরাং সুকান্তের বিপ্লবী চেতনা কেবল ধ্বংসের আকাঙ্ক্ষা নয়, সংগঠিত মানুষের আত্মসচেতনতার প্রকাশ। আবার ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতায় এই সমষ্টিগত ভবিষ্যৎশক্তির আরেকটি প্রতীক পাওয়া যায়। “আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ/স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি”। এখানে আঠারো নতুন প্রজন্মের প্রতীক হয়ে ওঠে। তবে তরুণ বয়সকে শুধু বীরত্বের রোমান্টিক প্রতীক হিসেবে পড়লে কবিতাটির গভীরতা কমে যায়। সুকান্ত আঠারো বছরের মধ্যে শুধু সাহস দেখেননি; দেখেছেন “সহস্র প্রাণ”-এর ক্ষত, “কালো লক্ষ দীর্ঘশ্বাস” এবং দুর্যোগের বাস্তবতা। অর্থাৎ তার তারুণ্যচেতনা আবেগনির্ভর হলেও অন্ধ নয়। সে বিপ্লব চায়, কিন্তু বিপ্লবের মূল্যও জানে। এখানেই সুকান্তের ভবিষ্যৎচেতনার সূত্রপাত। তার কাছে ভবিষ্যৎ কোনো কল্পলোক নয়; বর্তমানের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাকে তৈরি করতে হবে। ‘যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে’ কবিতাটি এই ভবিষ্যৎচেতনার সবচেয়ে পূর্ণ প্রকাশ। নবজাতক এখানে নতুন যুগের আগমন। “এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান”—এই উচ্চারণে বর্তমান প্রজন্মের আত্মবিসর্জনের নৈতিকতা নিহিত। নতুন পৃথিবীর জন্য পুরোনো পৃথিবীকে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু কবি কেবল জায়গা ছেড়ে দেওয়ার কথা না বলে দায়িত্ব গ্রহণ করেন— “প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি।” এই ‘জঞ্জাল’ কেবল রাস্তার আবর্জনা নয়; এটি শোষণ, যুদ্ধ, ক্ষুধা, বৈষম্য ও অন্যায়ের সমগ্র কাঠামোর প্রতীক। ফলে ভবিষ্যৎ তার কাছে অপেক্ষা করে পাওয়া কোনো অনিবার্য সময় নয়; ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হয়। এখানেই সুকান্তের কবিতার ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি নতুন পৃথিবীর অধিকারী হতে চান না; তিনি নতুন পৃথিবীর নির্মাতা হতে চান। তার নিজের প্রজন্ম হয়তো সেই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে না, কিন্তু তাতে তার আপত্তি নেই— “অবশেষে সব কাজ সেরে/আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে/করে যাব আশীর্বাদ,/তারপর হব ইতিহাস।” এই “তারপর হব ইতিহাস” পঙ্‌ক্তিটি সুকান্তের সমগ্র কবিতার আদর্শকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এখানে কবির ব্যক্তিসত্তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। নিজের অস্তিত্বের চূড়ান্ত সার্থকতা তিনি নিজের প্রতিষ্ঠায় নয়, ভবিষ্যতের মানুষের জন্য রেখে যাওয়া পৃথিবীতে খুঁজে পান। তাই সুকান্তের কবিতায় ভবিষ্যৎ ইউটোপিয়ান কল্পনা হলেও তা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বর্তমানের সংগ্রামের যৌক্তিক পরিণতি। কেউ যদি বলেন, সুকান্তের ভবিষ্যৎ আসলে রাজনৈতিক আদর্শের একটি রোমান্টিক স্বপ্ন, তাহলে তার জবাব পাওয়া যায় তার কবিতার ভেতরেই। কারণ তিনি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি বর্তমানের জঞ্জাল সরানোর দায়িত্বও গ্রহণ করেছেন। তার স্বপ্ন পালানোর পথ নয়, দায়িত্বের আহ্বান।

‘দেশলাই কাঠি’র আগুন, ‘সিঁড়ি’র ক্ষত, ‘একটি মোরগের’ ক্ষুধা, ‘হে মহাজীবন’-এর রুটি এবং ‘আঠারো বছর বয়স’-এর বিদ্রোহ; সবকিছু শেষ পর্যন্ত এসে মিশেছে নবজাতকের বাসযোগ্য পৃথিবীর স্বপ্নে। ফলে সুকান্তের কবিতায় অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আলাদা নয়। অতীত বর্তমানের ভিত তৈরি করেছে, বর্তমান সেই অতীতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে এবং সেই বিদ্রোহ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তার কবিতার অন্তর্গত গতিটি তাই—পরাধীনতা থেকে ক্ষুধা, ক্ষুধা থেকে ক্রোধ, ক্রোধ থেকে বিদ্রোহ, বিদ্রোহ থেকে নির্মাণ এবং নির্মাণ থেকে নতুন মানুষের পৃথিবী। সুকান্ত দুর্ভিক্ষ দেখেছেন, কিন্তু দুর্ভিক্ষের মধ্যে ভবিষ্যৎ দেখেছেন; তিনি মৃত্যু দেখেছেন, কিন্তু নবজাতকের চোখে ইতিহাসের নতুন পরিচয় পড়েছেন; তিনি শোষণ দেখেছেন, কিন্তু শোষিত মানুষের মধ্যে বিদ্রোহের শক্তি আবিষ্কার করেছেন। তার কবিতায় অতীত তাই স্মৃতির ভার, বর্তমান যন্ত্রণার বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ দায়িত্বের আহ্বান। এই তিনের সমন্বয়েই সুকান্তের কবিতা সময়ের দলিল থেকে ইতিহাসের দর্শনে উন্নীত হয়েছে। তার কবিতার শেষ প্রশ্ন তাই কেবল এই নয় যে পৃথিবী কেমন আছে। তিনি প্রশ্ন করতে চান, পৃথিবীকে আমরা কেমন করে রেখে যাব? সেই প্রশ্নের উত্তরই তিনি নবজাতকের কাছে নিজের অঙ্গীকারে দিয়েছেন— “এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি।” এই অঙ্গীকারের কারণেই সুকান্তের কবিতা তার সময় অতিক্রম করে আজও ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকে।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
‘গ্যাস না থাকায় ডে-কেয়ারের রান্না বন্ধ, শিশুদের খাওয়াচ্ছি হোটেল থেকে’
‘গ্যাস না থাকায় ডে-কেয়ারের রান্না বন্ধ, শিশুদের খাওয়াচ্ছি হোটেল থেকে’
প্রধানমন্ত্রীর খালাতো ভাইয়ের পাম্পের টাকা ছিনতাই, ২ জন কারাগারে
প্রধানমন্ত্রীর খালাতো ভাইয়ের পাম্পের টাকা ছিনতাই, ২ জন কারাগারে
জ্যোতিষীদের আপত্তিতে যেভাবে মাঝরাতে স্বাধীন হয়েছিল ভারত
জ্যোতিষীদের আপত্তিতে যেভাবে মাঝরাতে স্বাধীন হয়েছিল ভারত
এবার শাহজালালের মাজারের দানবাক্সে পাওয়া গেলো ৭০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা
এবার শাহজালালের মাজারের দানবাক্সে পাওয়া গেলো ৭০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা
সর্বাধিক পঠিত
বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য কে এই ফরহাদ হালিম ডোনার
বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য কে এই ফরহাদ হালিম ডোনার
আবার খোলা হলো শাহজালাল মাজারের দানবাক্স
আবার খোলা হলো শাহজালাল মাজারের দানবাক্স
গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে চেকিং পয়েন্ট পার হয়েছেন আশিয়ানের এমডি, শাস্তি পাচ্ছেন ২ অপারেটর
গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে চেকিং পয়েন্ট পার হয়েছেন আশিয়ানের এমডি, শাস্তি পাচ্ছেন ২ অপারেটর
ঋণের চাপে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়াও কঠিন হতে পারে: বিদ্যুৎমন্ত্রী
ঋণের চাপে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়াও কঠিন হতে পারে: বিদ্যুৎমন্ত্রী
আবার বন্ধ এক্সিলারেটের এলএনজি টার্মিনাল
আবার বন্ধ এক্সিলারেটের এলএনজি টার্মিনাল