ছোট, মিষ্টি, সূক্ষ্ম ও নাজুক গয়নাই যেন বেশিরভাগ নারীর পছন্দের তালিকার শীর্ষে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের বেশিরভাগের পরা গয়নার একেবারে বিপরীত গয়না স্বাভাবিক পছন্দ হয়ে উঠেছে। এই গ্রীষ্মে এমন গয়না চাই, যা একটু আওয়াজ তোলে। সত্যিকারের আওয়াজ যেমন দুলের দুলুনির শব্দ, চুড়ির ঝনঝনানি আর চোখে পড়ার মতো দৃশ্যমান প্রভাবও। এমন গয়না, যা পরলে মানুষ আপনাকে দেখবে, আপনার উপস্থিতি টের পাবে।
জেস কার্টনার-মরলি একজন ব্রিটিশ ফ্যাশন সাংবাদিক, লেখক ও ফ্যাশন সমালোচক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দ্যা গার্ডিয়ানে ফ্যাশন বিষয়ক লেখক হিসেবে কাজ করছেন। ফ্যাশন ট্রেন্ড, পোশাকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত স্টাইল এবং সমকালীন ফ্যাশন-ভাবনা নিয়ে তার লেখা বিশেষভাবে পরিচিত। সম্প্রতি তিনি দ্যা গার্ডিয়ানে সূক্ষ্ম, মিনিমাল গয়নার বিপরীতে বড়, সাহসী ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ গয়নার ফিরে আসার প্রবণতা তুলে ধরেছেন।
জেস কার্টনার-মরলি বলেন, ‘‘সূক্ষ্ম ছোট চেইন ভুলে যান। এই গ্রীষ্মে আপনার গয়না হোক বড়, সাহসী ও নজরকাড়া।’’ তার মতে-
গ্রীষ্মের সাজে গয়না হয়ে উঠুক ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম
এই গ্রীষ্মে গয়না শুধু সাজের অনুষঙ্গ নয়, বরং হয়ে উঠুক ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম। এমন গয়না, যা শুধু চোখে পড়বে না, অনুভবও করাবে নিজের উপস্থিতি। দুলের দোলায়, চুড়ির ঝনঝনানিতে কিংবা বড় কোনও পেনড্যান্টের দৃশ্যমানতায় থাকুক এক ধরনের আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা।
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যে ধরনের গয়নায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি, তার সম্পূর্ণ বিপরীত এই প্রবণতা। মৃদু, সূক্ষ্ম ও নাজুক গয়নাই যেন এত দিন ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। পাতলা চেইনে ভিন্ন দৈর্ঘ্যের দুটি নেকলেস—একটিতে হৃদয় আকৃতির পেনড্যান্ট, অন্যটিতে নামের আদ্যক্ষর বা জন্মপাথর। কিংবা কানে ছোট ছোট, একে অপরের সঙ্গে না মেলা হীরের হুপ—সব মিলিয়ে ছিল পরিমিত রুচির প্রতীক।
এই সাজে কোনও ভুল নেই। বরং এটি সুন্দর। আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে সমস্যাটি।
যে নান্দনিকতা এতটাই নিখুঁত যে তাতে কোনও ঝুঁকি নেই, তা একসময় কিছুটা একঘেয়ে হয়ে ওঠে। একসময় যেসব গয়না ছিল ব্যক্তিগত স্মৃতি ও আবেগের অংশ—মায়ের বা প্রিয় বন্ধুর দেওয়া ছোট্ট পেনড্যান্ট, ভ্রমণে হঠাৎ কেনা রোজ কোয়ার্টজ বা মিঠা পানির মুক্তোর গয়না—সেগুলো এখন অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হয়েছে সবার জন্য একই ধরনের সাজে।
গয়নার জগতে আবার ফিরছে সাহসী প্রকাশভঙ্গি
হাই স্ট্রিটের দোকানগুলোতে পাওয়া দুই-তিনটি নেকলেসের তৈরি প্রস্তুত সেটগুলো কি ব্যক্তিগত স্টাইলের বদলে সাজানো-গোছানো এক ধরনের কৃত্রিম ব্যক্তিত্ব তৈরি করছে না? যেন নিজের পছন্দ নয়, বরং সহজে তৈরি করে নেওয়া কোনও ফ্যাশন।
তাই গয়নার জগতে আবার ফিরছে সাহসী প্রকাশভঙ্গি। ফিরে এসেছে ব্রোচ, সিগনেট রিং, বড় পাথরের মতো দেখতে পেনড্যান্ট এবং এমন ফুলের নকশার দুল, যা ছোট ফুলদানিকেও হার মানাতে পারে।
‘কোয়ায়েট লাক্সারি’ বা নীরব বিলাসিতার যুগ কি তবে শেষ
এটি এক ধরনের পাল্টা স্রোত—‘স্টেলথ ওয়েলথ’ বা নীরবে সম্পদের সংকেত দেওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে। এমন এক ফ্যাশনের বিরুদ্ধে, যা মর্যাদা দেখায় কিন্তু এমনভাবে যেন কিছুই দেখাচ্ছে না।
এখন যখন ইনফ্লুয়েন্সার থেকে শুরু করে ফাইন্যান্স জগতের তরুণরা এমন পোশাক পরছেন, যেন তারা উত্তরাধিকার সূত্রে টাসকানির কোনও আঙুরবাগানের মালিক, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—‘কোয়ায়েট লাক্সারি’ বা নীরব বিলাসিতার যুগ কি তবে শেষ?
বড় ও ভারী গয়নার সৌন্দর্য এখানেই—এখানে কেউ হলমার্ক খুঁজে দেখে না, গয়নাটি আসল কি না তা যাচাই করে না, কিংবা কত ক্যারেট তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর ব্যক্তিত্ব, এর আবহ; দাম নয়।
ঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দুল হয়তো হতে পারে ফ্লি মার্কেট থেকে কেনা পুরোনো প্লাস্টিকের তৈরি কোনও গয়না। সেরা নেকলেস হতে পারে রেজিন, র্যাফিয়া, কাচের পুঁতি বা রঙ করা কাঠের তৈরি। এর মূল্য লুকিয়ে নেই দুষ্প্রাপ্যতায়, বরং এর উপস্থিতিতে।
হতে পারে ছোট মুঠোর আকারের কোনও ভাস্কর্যধর্মী পেনড্যান্ট, প্রবাল রঙের এমন নেকলেস যা গলার কাছে নড়াচড়ায় প্রাণ পায়, কিংবা বিটল পোকার আকৃতির ব্রোচ, আঙুরের থোকার মতো নকশা অথবা কোনও অসাধারণ বিমূর্ত শিল্পকর্মের মতো গয়না।
সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের জন্য গয়না
এমন গয়না সামাজিক মর্যাদা দেখানোর চেষ্টা করে না। এটি মুক্ত—শুধু আনন্দ, সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের জন্য।
বড় ও অস্বাভাবিক দুল আত্মবিশ্বাস, কৌতূহল এবং প্রয়োজনে সবাইকে খুশি করার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত থাকার ইঙ্গিত দেয়। কারণ গয়না থাকে মানুষের চোখের সামনে—তাই এটি সহজেই কথোপকথনের সূচনা করতে পারে।
এখানেই আকারের গুরুত্ব। বিশাল ফুলের মতো দুলে থাকে এক ধরনের দুষ্টু প্রাণবন্ততা, যেখানে ছোট্ট হীরের দুল অনেক বেশি প্রচলিত ও গম্ভীর মনে হতে পারে।
ফ্যাশন আইকন আইরিস অ্যাপফেল কিংবা ডিজাইনার আলেসান্দ্রো মিকেলের কথা ভাবুন। দুজনেরই ছিল অসাধারণ রুচি। কিন্তু তারা ভালোবাসতেন প্রাচুর্য, রং ও বাড়তি প্রকাশভঙ্গি। তারা জানতেন কোথায় থামতে হয়—তবু ইচ্ছা করেই আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতেন। এ যেন জীবনকে উদযাপনের এক আনন্দময় উপায়।
পুরোনো ধারনায় পরিবর্তন
ব্যক্তিত্ব প্রকাশের গয়না শুধু বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য নয়। বড় দুল কেবল গাউন বা নিখুঁত খোঁপার সঙ্গে মানাবে—এমন ধারণাও বদলে গেছে। এলোমেলো চুল, সাধারণ টি-শার্টের সঙ্গেও বড় দুল তৈরি করতে পারে আকর্ষণীয় বৈপরীত্য।
নেকলেসের ক্ষেত্রেও রং মিলিয়ে নেওয়ার পুরোনো অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। সবুজ লিনেন শার্টের সঙ্গে সবুজ পাথরের গয়না বা ছুটির পোশাকের সঙ্গে প্রবাল রঙের গয়না বেছে নেওয়ার বদলে চেষ্টা করুন অপ্রত্যাশিত কিছু।
হালকা ক্রিম রঙের পোশাকের সঙ্গে গাঢ় কোবাল্ট নীল, কিংবা ধূসর পোশাকের সঙ্গে উজ্জ্বল সাইট্রাস হলুদ—এমন বৈপরীত্যই তৈরি করে নতুন আকর্ষণ।
কারণ গয়নাই শেষ পর্যন্ত আপনার পোশাকের শেষ কথা। তাই তাকে শুধু নীরব অনুষঙ্গ হতে দেবেন না। পোশাককে শুধু সম্পূর্ণ করার বদলে, একটি সাহসী গয়না তৈরি করতে পারে আলাদা এক মুহূর্ত।
বড়সড়, নজরকাড়া গয়না এখন ফ্যাশনের কেন্দ্রে। আর একটি সাধারণ সূক্ষ্ম সোনার চেইনের চেয়ে তার বলার মতো গল্পও অনেক বেশি।









