অনেকের ধারণা, প্রতি দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর কিছু না কিছু খেলে শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাক ক্রিয়া বাড়ে। আর মেটাবলিজম বাড়লে বেশি ক্যালোরি পোড়ে, ওজনও নিয়ন্ত্রণে থাকে। ওজন কমানো বা ফিট থাকার নানা পরামর্শে এই ধারণা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে কি সত্যিই এমনটা ঘটে?
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বাথের মেটাবলিক ফিজিওলজির অধ্যাপক জেমস বেটস বলছেন, বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
মেটাবলিজম বলতে আসলে কী বোঝায়?
মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়া হলো শরীরের এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে খাবারের পুষ্টি উপাদান শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। সহজভাবে বলতে গেলে, শরীরের সব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সমষ্টিই হলো মেটাবলিজম। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সচল রাখে, শরীরের গঠন বজায় রাখে এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করে।
জেমস বেটসের মতে, মানুষ যখন ‘মেটাবলিজম’ বাড়ানোর কথা বলে, তখন আসলে তারা শরীরের মেটাবলিক রেট বা নির্দিষ্ট সময়ে শরীর কতটুকু শক্তি খরচ করে, সেটিকেই বোঝায়।
এই হার মূলত নির্ভর করে একজন মানুষের বয়স, শরীরের ওজন, লিঙ্গ, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং শরীরের গঠনের ওপর। অর্থাৎ এটি এমন কোনো বিষয় নয়, যা শুধু খাবারের সময়সূচি বদলালেই উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়।
শরীর শক্তি খরচ করে কীভাবে?
একজন মানুষের দৈনিক শক্তি ব্যয়ের তিনটি প্রধান উৎস রয়েছে। সেগুলো হলো— বিশ্রাম অবস্থায় শরীরের শক্তি ব্যয় (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও টিস্যুর স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে যে শক্তি লাগে); খাবার হজম ও শোষণের সময় ব্যবহৃত শক্তি এবং শারীরিক পরিশ্রম ও চলাফেরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আসে শারীরিক কার্যকলাপের কারণে।
জেমস বেটস বলেন, ‘মানুষ যখন বলে তারা মেটাবলিজম বাড়াতে চায়, তখন আসলে তারা বেশি শক্তি খরচ করতে চায়। কিন্তু বিশ্রাম অবস্থায় শরীর যে শক্তি খরচ করে, তা বেশ পূর্বানুমানযোগ্য এবং সাধারণত শরীরের ওজন, বয়স ও লিঙ্গের মতো বিষয় দিয়েই তা অনুমান করা যায়।’
বারবার খেলে কী হয়?
খাবার হজম করতেও শরীরের কিছু শক্তি লাগে। এটিকে বলা হয় থার্মিক ইফেক্ট অব ফুড।
গড়ে একজন মানুষ যে ক্যালোরি গ্রহণ করেন, তার প্রায় ১০ শতাংশ খাবার চিবানো, হজম করা এবং পুষ্টি উপাদান শোষণের কাজে ব্যয় হয়।
তবে এই কারণেই বারবার খেলে মেটাবলিজম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়—এমন ধারণা ঠিক নয়।
করের সঙ্গে তুলনা
বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে কর বা ট্যাক্সের উদাহরণ দিয়েছেন জেমস বেটস। তিনি বলেন, যেমন একজন কর্মীর মোট বেতন থেকে কর কেটে নেওয়ার পর হাতে কম অর্থ আসে, তেমনি ১০০ ক্যালোরির খাবার খেলে তার সবটুকু শরীরের জন্য নিট শক্তি হিসেবে থাকে না। প্রায় ১০ ক্যালোরি খাবারটি হজম ও শোষণ করতেই ব্যয় হয়ে যায়। ফলে শরীরের প্রকৃত শক্তি অর্জন হয় প্রায় ৯০ ক্যালোরি।
অর্থাৎ, খাওয়ার ফলে কিছু শক্তি অবশ্যই ব্যয় হয়, কিন্তু সেই ব্যয় কখনোই খাওয়া ক্যালোরির সমান বা বেশি নয়।
মেটাবলিজম কী কী বিষয়ের ওপর নির্ভর করে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেটাবলিজমের গতি একেক মানুষের ক্ষেত্রে একেক রকম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি ধীর হতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত মাংসপেশির পরিমাণ বেশি হওয়ায় তাদের ক্যালোরি খরচের হারও তুলনামূলক বেশি হয়।
এ ছাড়া শরীরে মাংসপেশির পরিমাণ যত বেশি, ক্যালোরি পোড়ানোর হারও তত বেশি হয়। অন্যদিকে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি থাকলে তুলনামূলক কম শক্তি ব্যয় হয়। নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম ও শরীরচর্চা মেটাবলিজমের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক।
তাহলে কী করলে বেশি ক্যালোরি পোড়াবে শরীর?
বিশেষজ্ঞের মতে, যদি লক্ষ্য হয় শরীরের শক্তি ব্যয় বা ক্যালোরি পোড়ানো বাড়ানো, তাহলে বারবার খাবার খাওয়ার চেয়ে শারীরিকভাবে বেশি সক্রিয় হওয়াই অনেক বেশি কার্যকর।
জেমস বেটসের ভাষায়, ‘শক্তি ব্যয় বাড়াতে চাইলে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো—আরও বেশি নড়াচড়া করুন।’
অর্থাৎ, শুধু প্রতি দুই-তিন ঘণ্টা পরপর কিছু খেলে মেটাবলিজম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে—এমন ধারণার পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং নিয়মিত শরীরচর্চা, সক্রিয় জীবনযাপন এবং শরীরের গঠন অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসই বেশি ক্যালোরি পোড়ানো ও সুস্থ থাকার কার্যকর উপায়।









