যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে এক ব্যক্তির মৃত্যু নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এইচ৫এন১ ভাইরাসের সংক্রমণ শুধু পাখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, গবাদি পশু ও বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরেও ছড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রাণীর শরীরে ভাইরাসের ক্রমাগত সংক্রমণ ও জিনগত পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে আরও বিপজ্জনক কোনও ধরন তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়াকিমা কাউন্টিতে এই মৃত্যু চলতি বছরে দেশটিতে বার্ড ফ্লুতে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা। ২০২৪ সালের পর থেকে সেখানে এই ভাইরাসে মোট তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। গত এক মাসে দেশটির কয়েক ডজন দুগ্ধ খামারের গবাদি পশুর শরীরেও ভাইরাসের উপস্থিতি মিলেছে। ইউটাহর একটি মিঙ্ক খামারেও কয়েক সপ্তাহ ধরে ছড়িয়েছে সংক্রমণ। খামারের কর্মীদের পরীক্ষা ও প্রাণীদের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, একই খামারে ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে বহু প্রাণীর মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে থাকলে তার জিনগত পরিবর্তনের সুযোগ বাড়ে। ইংল্যান্ডের পিরব্রাইট ইনস্টিটিউটের ভাইরাস বিশেষজ্ঞ থমাস পিককের মতে, এভাবে সংক্রমণ চলতে থাকলে এমন নতুন ভাইরাসের জন্ম হতে পারে, যার মহামারি সৃষ্টির ক্ষমতা থাকবে। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্রিস্টেন কোলম্যান বলেন, মিঙ্কের শ্বাসযন্ত্রের গঠন মানুষের সঙ্গে অনেকটাই মেলে। ফলে এই প্রাণীর শরীরে বিভিন্ন ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের জিনের মিশ্রণ ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঘটনা ঘটলেও বার্ড ফ্লু ভাইরাসের স্থায়ীভাবে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর প্রমাণ মেলেনি। সংক্রমণের প্রধান ঝুঁকি তাদের, যারা আক্রান্ত বা মৃত পাখি কিংবা অন্য সংক্রমিত প্রাণীর সংস্পর্শে আসেন। আক্রান্ত প্রাণী ধরা, জবাই করা বা প্রক্রিয়াকরণের সময়ও সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি উপেক্ষা করার মতো নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে এইচ৫এন১ সংক্রমণে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার খবর নথিভুক্ত হয়েছে। এ বছর দেশে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কয়েকটি ঘটনায় আক্রান্ত শিশুরা অসুস্থ বা মৃত গৃহপালিত মুরগির সংস্পর্শে এসেছিল বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশে ঝুঁকির অন্যতম জায়গা হল বাড়িতে বা খামারে পোলট্রি পালনের সময় অসুস্থ পাখির সংস্পর্শ।
বার্ড ফ্লু থেকে সতর্ক থাকতে হলে অসুস্থ বা মৃত মুরগি, হাঁস কিংবা বন্য পাখি খালি হাতে ধরা যাবে না। বাড়ির আশপাশে বা খামারে একাধিক পাখির অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে দ্রুত স্থানীয় প্রাণিসম্পদ দফতরকে জানানো জরুরি। পাখি বা কাঁচা মাংস ধরার পরে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুতে হবে। মুরগির মাংস ও ডিম যথেষ্ট তাপমাত্রায় সম্পূর্ণ রান্না করে খেতে হবে। আধসেদ্ধ মাংস বা কাঁচা ডিম খাওয়া এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
আক্রান্ত পাখির সংস্পর্শে আসার পরে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট বা চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসককে পাখির সংস্পর্শে আসার বিষয়টিও জানানো প্রয়োজন। বিশেষ করে পোলট্রি খামারের কর্মী, পশুচিকিৎসক, পাখি পালনকারী এবং যারা নিয়মিত পাখি বা পশুর সংস্পর্শে থাকেন, তাদের বাড়তি সতর্ক থাকা দরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বার্ড ফ্লু নিয়ন্ত্রণে শুধু মানুষের চিকিৎসা নয়, প্রাণীর সংক্রমণ নজরদারি, আক্রান্ত খামারে দ্রুত ব্যবস্থা এবং মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ সবই জরুরি। মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিয়েই এই ভাইরাসের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে।
সূত্র: দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস