যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণার উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ ঘোষণা করেছেন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। এর আওতায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) অধীনে নারীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক নতুন বিভাগ এবং হোয়াইট হাউসে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। তবে নতুন উদ্যোগে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। গবেষকদের মতে, পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক অর্থায়ন ছাড়া এ উদ্যোগের কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে এ ঘোষণা দেন মেলানিয়া ট্রাম্প। তিনি বলেন, নারীদের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে শৈশব থেকে মাতৃত্ব, এমনকি পরিণত বয়সেও স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে নতুন বিভাগ গঠনের কথা বলা হয়েছে। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে বিভাগটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নারীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক নীতিমালা ও উদ্যোগ সমন্বয়ের জন্য হোয়াইট হাউসে একটি টাস্কফোর্স কাজ করবে। এর নেতৃত্বে থাকবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস।
তবে নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিষয় নয়। এনআইএইচের অধীনে ১৯৯০ সাল থেকেই নারীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণার জন্য একটি দপ্তর রয়েছে। নতুন বিভাগটি ওই দপ্তরের বিকল্প হবে না; বরং তার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
গবেষণায় অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন
নারীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরেই অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন সংগঠন। ২০২৪ সালে ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিস অব সায়েন্সেস, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেডিসিনের এক প্রতিবেদনে এনআইএইচের বিদ্যমান গবেষণা দফতরকে পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউটের মর্যাদা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এতে নারীদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ে গবেষণা ও অর্থায়ন বাড়ানো সহজ হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এনআইএইচের মোট গবেষণা ব্যয়ের মাত্র ৯ শতাংশ নারীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণায় ব্যয় করা হয়েছে। একই সময়ে সংস্থাটির সামগ্রিক বাজেট বাড়লেও মোট ব্যয়ের তুলনায় এ খাতের বরাদ্দের হার কমেছে।
নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংগঠন নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তাদের মতে, গবেষণায় অর্থবহ অগ্রগতি আনতে পর্যাপ্ত ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন জরুরি। সংশ্লিষ্ট একটি জোট আগামী ১০ বছরে গবেষণা, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে নারীদের স্বাস্থ্যের উন্নয়নে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের প্রতিবেদন প্রণয়নকারী কমিটির সহসভাপতি এবং স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থা কেএফএফের উইমেনস হেলথ পলিসি প্রোগ্রামের পরিচালক আলিনা সালগানিকফ প্রশ্ন তুলেছেন, নতুন বিভাগটি কীভাবে গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে। তাঁর আশঙ্কা, সীমিত অর্থায়নের মধ্যে নতুন গবেষণায় গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের বরাদ্দ কমে যেতে পারে। তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন, নতুন বিভাগটি ‘মেক আমেরিকা হেলদি এগেইন’ আন্দোলনের অগ্রাধিকারগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেবে কি না।
শুধু প্রজননস্বাস্থ্য নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের স্বাস্থ্য বলতে অনেকেই মূলত প্রজননস্বাস্থ্য ও মাতৃস্বাস্থ্যকে বোঝেন। কিন্তু নারীদের জীবনে স্বাস্থ্যসমস্যার পরিধি আরও বিস্তৃত।
নারীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়, তাঁদের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে কিংবা শুধু তাঁদেরই আক্রান্ত করে এমন রোগ নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা উইমেনস হেলথ অ্যাকসেস ম্যাটার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ক্যারোলি লি বলেন, নারীদের স্বাস্থ্যসমস্যার মাত্র ৫ শতাংশ প্রজননস্বাস্থ্য ও মাতৃস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাকি ৯৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে অটোইমিউন রোগ, আলঝেইমারস ও হৃদ্রোগসহ নানা সমস্যা।
নারীদের স্বাস্থ্য গবেষণায় নতুন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, এর সাফল্য নির্ভর করবে গবেষণার পরিধি, অর্থায়ন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও নারীদের স্বাস্থ্য গবেষণায় অর্থায়ন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেন। পরের বছর তাঁর উদ্যোগের জন্য ১২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাবও কংগ্রেসের কাছে তুলে ধরা হয়। তবে ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশে বাইডেনের আগের নির্বাহী আদেশ ও সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে ‘উইমেনস হেলথ ইনিশিয়েটিভ’ নামের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা কর্মসূচির অর্থায়ন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। জনসমালোচনার মুখে পরে সেই অর্থায়ন পুনর্বহাল করা হয়। এ ঘটনা নারীদের স্বাস্থ্য গবেষণায় ধারাবাহিক অর্থায়নের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
নতুন বিভাগ ও টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে নারীদের স্বাস্থ্যকে নীতিনির্ধারণের আরও কেন্দ্রে নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়েছে হোয়াইট হাউস। তবে গবেষণার অগ্রাধিকার কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং এ উদ্যোগে কত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট হওয়ার পরই এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।