কীটসের প্রেমিকা

মিলন আশরাফ
৩১ অক্টোবর ২০১৮, ১২:০০আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০১৮, ১২:০০

কীটসের প্রেমিকা নভেম্বর মাস। ১৮১৮ সাল। হাম্পস্টেডের এক বাড়ি। ১৮ বছরের এক সুন্দরী তরুণী। আয়ত চোখের ২২ বছরের টগবগে যুবক। তাদের প্রথম পরিচয় ঘটে উল্লিখিত বাড়িটিতে। শুরুর দিকে লজ্জায় কুকড়ে গেলেও দুই একদিন পরে আড়মোড় ভেঙে বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়। যুবকটি শেক্সপিয়র, স্পেনসার, মলিয়ের পড়ে শোনান তরুণটিকে। ভাবুক বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেটির মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে নিমগ্ন চিত্তে তরুণীটি সেইসব অমৃত হৃদয়ে পুরে নেয়। ছেলেটির শরীর ছিল একটু শুকনা। ইংরেজ পুরুষদের তুলনায় উচ্চতা ছিল একটু কম। কোনো পার্টিতে সে মেয়েদের সঙ্গে নাচতো না। কারণটা ওই উচ্চতা। তবে কোকড়ানো লাল-খয়েরি চুল ও আয়ত চোখে তাকে দেখাতো ভীষণ মায়াময়। এই মায়াময় ছেলেটিই সারাবিশ্বের সৌন্দর্যের কবি জন কীটস। ‘এ থিং অব বিউটি ইজ এ জয় ফরেভার’ এই লাইনটি শোনেনি এমন পাঠক মেলা ভার। লাইনটি কীটসের গ্রিক পুরাণের এক চরিত্রকে নিয়ে লেখা ‘এন্ডিমিয়ন’ পাণ্ডুলিপি। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, চার হাজার লাইনের ‘এন্ডিমিয়ন’ সেই সময়ের বিখ্যাত ম্যাগাজিন ‘ব্ল্যাকউডস এডিনবরা’ কোনো পাত্তাই দেয়নি। উল্টো সমালোচক বলেছিলেন, ‘কীটস এর উচিত কবিতা লেখা ছেড়ে দেওয়া।’ কড়া সমালোচক জন গিবসন লকহার্ট কীটসকে আক্রমণ করে বলেন, ‘কীটসের ভাষা আঞ্চলিকতাদুষ্ট, শব্দচয়ন অতি নিম্নমানের।’ সঙ্গে একটি উপদেশনামাও দেয় কীটসের জন্য। সেটি হল, ‘সে যেন চিকিৎসাশাস্ত্রে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করে।’

সমালোচকদের এসব কথাবার্তার কারণে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাকে পরিবার থেকে শল্যচিকিৎসকের সহকারি হিসেবে পাঠানো হয়। কিন্তু কবিতা তাকে এমন আষ্টেপিষ্টে ধরে যে, চিকিৎসাশাস্ত্র ছেড়ে আবার মনোনিবেশ করেন কবিতায়। সেই সময় তার পাশে ছিলেন পরমবন্ধু আরেক বিশ্বখ্যাত কবি পি.বি. শেলি। পরবর্তীতে শেলি জানান, ‘সমালোচকদের কড়া মন্তব্য কীটসকে ভেতর থেকে এতোটাই দুমড়েমুচড়ে দিয়েছিল যে, যক্ষ্মাও তাকে এতোটা দেয়নি হয়তো।’

কিন্তু সবকিছু বদলে যেতে থাকে তরুণী ফ্যানি ব্রাউনের সঙ্গে পরিচয় ঘটার পর থেকেই। একে একে লিখে ফেলেন বিশ্বখ্যাত সব কবিতা। ‘ব্রাইট স্টার’ নামের কবিতা ও পত্রাবলি সংকলন পড়লে যে কেউ ব্যাপারটি অনুধাবন করতে পারবেন। তাদের প্রেম কাহিনি নিয়ে হলিউডে ‘ব্রাইট স্টার’ নামে একটি সিনেমাও তৈরি হয়েছে। তিনি যে শুধু সৌন্দর্যের কবি তা নয়, প্রেমেরও। তার কথায়, ‘প্রেম আমার ধর্ম, এটার জন্য আমি মরতেও পারি।’

কীটসের প্রেমিকা ফ্যানি ব্রাউন জন্মগ্রহণ করেন ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের ৯ আগস্ট। কীটসের কাব্য সাধনায় এই মেয়েটির গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। কিন্তু ভিক্টোরীয় যুগের সমালোচকরা ফ্যানির উপর অবিচার করেছেন। কীটসের অকাল মৃত্যুর পেছনে অন্যান্য কারণ ছাড়াও ফ্যানির হৃদয়হীনতার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সেই সময়ের সমালোচকরা। সেই হৃদয়হীনতার ভার কিছুটা লাঘব হয়ে আসে ১৯৩৭ সালে কীটসের বোনের কাছে লেখা ফ্যানির চিঠি প্রকাশিত হবার পর। চিঠিগুলো কীটস ইতালি যাবার পর লিখে পাঠিয়েছিলেন ফ্যানি ব্রাউন। এক চিঠিতে ফ্যানি লেখেন, ‘অন্য সকলে তোমার দাদার কথা ভুলে যাক, শুধু আমার বেদনাটা বেঁচে থাক।’ জোয়ানা রিচার্ডসন কর্তৃক লিখিত ফ্যানি ব্রাউনের জীবনী পাঠে আমরা বুঝতে পারি, কীটসকে সত্যিই ভালোবাসতো ফ্যানি এবং কোনো অন্যায় আচারণও করেনি সে কবির প্রতি।

ফ্যানির সঙ্গে পরিচয়ের দেড় মাসের মাথায় তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন জন কীটস। সে প্রস্তাবে রাজিও হয় ফ্যানি। কীটসের বৈষয়িক অবস্থা জেনে বুঝেও এরকম সিদ্ধান্ত বোকামির নামান্তর বটে! অল্প বয়সে বাবাকে হারান কবি। স্কুলে পড়াকালীন সময় মা মারা যান যক্ষ্মায়। ছোট ভাই টমের মৃত্যুও ঘটে ওই একই রোগে। সেই সময়ে কবির নিজের স্বাস্থ্যও ভালো যাচ্ছিল না। তার উপর আবার লাভের ব্যবসা ডাক্তারি ছেড়ে আরম্ভ করেছেন কবিতা লেখা। নিজের খরচ সে নিজেই চালাতে পারেন না। ফ্যানি যদি সত্যিই ভালো না বাসবে তাহলে এমন বোকামি কেন করবে? তাদের বাগদানের কথা জানলো দু’একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন। তারাই ঠিক করলেন উপার্জনের একটা পথ বের করে তারপর বিয়ে হবে। কিন্তু ভাগ্যদেবতা মুখ তুলে তাকালেন না। যক্ষ্মা প্রকাশ পেল কীটসের। তার সকল আশা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। শরীর ভেঙে পড়ল। ফ্যানি রোজ দেখতে আসতেন তাকে। কিন্তু কীটসের প্রেম ছিল সর্বগ্রাসী। তিনি চাইতেন, ফ্যানি সারাক্ষণই তার পাশে পাশে থাকুক। কীটসকে অসুস্থ অবস্থায় ফেলে সে অন্য কারও সঙ্গে নাচবে, গল্প করবে, হাসবে, এসব সহ্য করা তার জন্যে কঠিন ছিল। এসব সন্দেহে ফ্যানিকে অনেক অপমানও করেছেন কবি। কিন্তু ফ্যানি সব মুখ বুজে সহ্য করেছেন। ওই সময়টাতে কীটসের সব কবিতাতেই ফুটে উঠেছে ব্যর্থ প্রেমের হাহাকার। চিঠিগুলোতেও তাই। চরম এক হতাশা পেয়ে বসে তাকে। ফ্যানির চরিত্রের উপর সন্দেহের তীর নিক্ষেপ করেন তিনি। এসব অভিযোগের পরেও হতাশাগ্রস্ত কবিকে ছেড়ে চলে যাননি প্রেমিকা ফ্যানি ব্রাউন।

এমন করে করে বাগদানের প্রায় এক বছর দশ মাস পার হল। সুস্থতার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। ডাক্তার পরামর্শ দিলেন, শীতের আগেই তাকে ইতালি নিয়ে যেতে হবে। ফ্যানির ইচ্ছা ছিল কীটস ইতালি যাবার আগেই বিয়েটা হোক। আপত্তিটা আসলো কীটসের কাছ থেকে। এই শরীরে তার মন সায় দিল না। তাছাড়া ফ্যানি তখনো অপ্রাপ্ত বয়স্ক। বিয়েতে তার মা’র মত লাগবে, তিনি মত দিলেন না। অবশেষে ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ১৩ সেপ্টেম্বর কীটস বিদায় নিলেন ফ্যানির কাছ থেকে। রওয়া হলেন ইতালির পথে। যাবার আগে ফ্যানি কবির কাপড়চোপড় গুছিয়ে বাক্সে ভরে সঙ্গে কিছু উপহারও দিয়েছিলেন। কীটস দিয়ে গিয়েছিলেন সেভার্নের আঁকা তার নিজের ছবি ও প্রিয় বইগুলো। ইতালি যাবার আগে ফ্যানিদের বাড়িতে কয়েকদিন ছিলেন কীটস। এই কয়েকটি দিন ও ফ্যানির অশ্রুসিক্ত বিদায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত বারবার মনে পড়তো তার। ফ্যানির নাম শুনলেই দেহ টালমাতাল হয়ে যেত কীটসের। ইতালি এসে তিনি আর চিঠি লিখতেন না ফ্যানির কাছে। বন্ধুরা কীটসের চিঠি পেত নিয়মিত। তাদের কাছ থেকে কীটসের খবর নিতেন ফ্যানি। একবার ফ্যানির লেখা চিঠি এলে বন্ধু সেভার্নকে ডেকে বললেন, ‘এ চিঠি আমি পড়তে পারবো না। আমি মারা গেলে বুকের উপর রেখে কবর দিও আমাকে।’ কীটসের এই নির্দেশ পালন করা হয়েছিল। এই নির্দেশ পালন করার ফলে ফ্যানির শেষ চিঠিতে কী লেখাছিল তা অজানায় থেকে যায় চিরদিনের মতো।

১৮২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মাত্র ২৫ বছর ৪ মাস বয়সে রোমে মারা যান কীটস। তার মৃত্যু সংবাদ খুব শান্তভাবেই গ্রহণ করেন ফ্যানি। ধারণা করা হয় ফ্যানি চাপা স্বভাবের মেয়ে হওয়ায় কোনোরকম উচ্চবাচ্য করেননি। তার প্রেম অন্য কেউ বুঝতে পারতো না। প্রকাশ ক্ষমতা কম ছিল। জীবনীকার রিচার্ডসন জানান, ‘কীটসের মৃত্যুর ৬ বছর পর্যন্ত ফ্যানি বিধবার কালো পোশাক পরেছিল, চুল ছেটেছিল ছোট করে।’ ফ্যানি খুব রুপবতী ছিলেন। কীটস তার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘The richness, the bloom, the full form, the enchantment of love after my own heart.

কীটস মারা যাবার পর ফ্যানিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে অনেকে। সুন্দরী তরুণীর জন্য এটাই স্বাভাবিক। তাদেরকে ফেরাতেও বেশ বেগ পেতে হয়েছে তার। বেশিরভাগ সময়ই তিনি থেকেছেন শীতল। অবশেষে জন কীটসের মৃত্যুর বারো বছর পর বিয়েতে বসেন ফ্যানি ব্রাউন। বিয়ে করেন লুই লিন্ডোকে। ধারণা করা হয়, লুই লিন্ডোর ভেতর হয়তো তিনি কীটসের ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন ফ্যানি। কীটসের দেওয়া উপহার ও চিঠিগুলো সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন আমরণ। তা না হলে বিশ্ব সাহিত্য থেকে এই অমূল্য সম্পদগুলো হারিয়ে যেত চিরতরে। কীটসকে আজীবন ভুলতে পারেননি ফ্যানি। একবার কবি ফ্যানিকে বলেছিলেন, ‘তোমার যদি ছেলে হয়, তবে তার নাম জন রেখো না। এই নামটি বড়ই অপয়া। আমার নাম জন দেখেই সেটা অনুমান করতে পারছো নিশ্চয়। তারচেয়ে বরং তোমার ছেলের নাম রেখো এডমান্ড। এটা বেশ ভালো নাম।’ ফ্যানি কবিকে আজীবন মনে রাখার আরেকটি প্রমাণ দিলেন। নিজ ছেলের নাম রেখেছিলেন কীটসের দেওয়া ‘এডমান্ড’ (অর্থ-ঐশ্বর্যের সুরক্ষা)

কীটসের প্রায় সব বন্ধুই তখন মারা গেছে। ইতালিতে কীটসের কবরের কাছাকাছি থাকতো সেভার্ন। ফ্যানি শেষ বয়সে হাম্পস্টেডে ফিরে আসেন। অর্থাৎ যেখানে তাদের প্রথম পরিচয় ঘটে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে দারিদ্র্য ফ্যানিকে আকড়ে ধরে। অভাবে পড়েন। শেষ সম্বল বলতে কীটসের দেওয়া বন্ধু সেভার্নের আঁকা ছবি। বাঁচার শেষ অবলম্বন হিসেবে ছবিটি বিক্রির জন্য স্বামীর হাতের দিয়ে এক বন্ধুর কাছে পাঠালেন। ছবির সঙ্গে লিখে দিলেন একটি চিরকুট: ‘ÔIt would not be a light motive that would make me part with it.’

ছবিটি বিক্রির পর বেশিদিন বাঁচেননি তিনি। দারিদ্র্যের কাছে নিজের প্রেমের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে ১৮৬৫ সালে ডিসেম্বর মাসে ৬৫ বছর বয়সে ফ্যানি ব্রাউন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

 

তথ্য সহায়তা : 

ফ্যানি ব্রাউন : এ বায়োগ্রাফি” জোয়ানা রিচার্ডসন 

//জেডএস//
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদায়ন, ৩১ শিক্ষককে বদলি
শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদায়ন, ৩১ শিক্ষককে বদলি
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী