X
মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
১১ আশ্বিন ১৪২৯
শ্যামল দেশে শ্যামলা রমণীদের

কবি ওমর আলী

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
২০ নভেম্বর ২০২১, ১১:৩১আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২১, ১১:৩৫

ক.

কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সে গ্রামীণ জীবনে প্রথম যে দুটি আধুনিক কবিতা পড়ে মুগ্ধ হই, তাঁর একটি হলো—সৈয়দ আলী আহসানের ‘আমার পূর্ব বাংলা’ এবং ওমর আলীর 'এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি'। শেষোক্ত কবিতাটির নামকরণের মধ্যে আবহমান বাংলার বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা, ব্যঞ্জনা, অর্থ এবং চিত্র চিত্তকে প্রশান্তি দেয়।

পরে ঢাকায় এসে বাংলা বাজার থেকে সংগ্রহ ওমর আলীর দুটি বই—‘বিয়েতে অনিচ্ছুক একজন’ আর ‘তেমাথার শেষে নদী’। কি অদ্ভুত চিত্রকল্প! যেন আমার কাব্যগ্রন্থ ‘সঙ্গমের ভঙ্গিগুলো’ আগের চিত্র। বই কিনে বাসায় ফিরতে ফিরতে বাসে বসেই দ্বিতীয় বইটি পড়া শেষ করি। পরে রাতে শেষ করি ‘বিয়েতে অনিচ্ছুক একজন’। যেহেতু আমি গ্রামের ছেলে, সে কারণেই মনে হচ্ছিল—প্রতিটি কবিতাই যেন আমার আশপাশের পরিবেশ থেকে নেওয়া; চেনাজানা মানুষের কথা কবি ওমর আলী কবিতায় সাজিয়েছেন। এই ছিলো সেই সময়ের পাঠের প্রতিক্রিয়া।

আরো একটি বিষয় আমার কাছে মনে হয়েছে, আল মাহমুদের ‘কালের কলস’ আর ‘সোনালী কাবিন’ এর মতোই ওমর আলীর 'এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি' এবং ‘বিয়েতে অনিচ্ছুক একজন’ যুগল ও সাদৃশ্য। তবে দুজনের কবিতার ধরন, উপস্থাপন, বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এমন কি পল্লিকবি জসীমউদদীন থেকেও স্বতন্ত্র-সুন্দর।

কবি ওমর আলীর কবিতা পড়ে কবি আল মাহমুদ তাঁকে জানিয়ে ছিলেন—‘তোমার কবিতায় বাংলাদেশের প্রকৃতির যে গন্ধ পাওয়া যায় তাতে আমার মত মানুষ বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি’। [দ্রঃ কবি ওমর আলী এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ/ দৈনিক সংগ্রাম, ০২ নবেম্বর ২০১৮, ঢাকা।] এই একটি বাক্যের মাধ্যমেই ওমর আলীর যথার্থ মূল্যায়নের ইঙ্গিত স্পষ্ট!

নারী-পুরুষের গভীর রোম্যান্টিকতা আর অফুরন্ত প্রকৃতি সৌন্দর্য তাঁর কাব্য বাঙময় হয়ে আছে। যাতে গ্রামবাংলার মানুষের হৃদয়ে চিত্র আর মাটির অকৃত্রিম সোঁদা গন্ধ মেলে। কিষানির কামনা, কৃষকের স্বপ্ন তাঁর কবিতায় মিলেমিশে একাকার।

 

খ.

এক সময় বিটিভিতে শিল্প-সাহিত্যবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘দৃষ্টি ও সৃষ্টি’ উপস্থাপনা করছি। ‘দৃষ্টি ও সৃষ্টি’র প্রজোযক ছিলেন বন্ধু সৈয়দ জামান। আমরা দুজনে মিলে প্রায় প্রতি প্রান্তিকে বিটিভিতে নাটকও করেছি। আমার রচনা আর প্রজোযনায় জামান ভাই। শামসুর রাহমানের ‘সাযযাদ আমিনের কথা’ গল্পটি পাগলদের নিয়ে। নাটকটি পাগল চরিত্র ধারণের কথা ভেবে আমরা দুজন হেমায়েরপুর যাই। এক ফাঁকে পাবনার বুলবুল কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক কবি ওমর আলীর সাথে দেখা করি। কলেজের পাশে একটি ছোট্ট ভাড়াটে ঘরে তিনি দিনে অবস্থান করতেন, দুপুরে খেতেন, বিশ্রাম করতেন, প্রাইভেট পড়াতেন, ছাত্র-শিক্ষকদের নিয়ে আড্ডা দিতেন। এটা তাঁর দ্বিতীয় সংসার। ওখানে পড়তেন, পড়াতেন এবং লিখতেন। রাতে চলে যেতেন বাড়িতে। বাড়ি একটু দূরে।

আমরা খুঁজতে খুঁজতে তাঁর কুটিরে হাজির হই। কিন্তু কবি বাড়িতে নেই। পাশের এক জন কবির সন্ধানে বের হলেন। কোন চায়ের দোকান কবিকে থেকে ধরে আনলেন। নির্ভেজাল, নিরহঙ্কার, সরল-সহজ মানুষটি কাঠের নড়বড়ে দরজার তালা খুলে আমাদের আপ্যায়ন করলেন। ভেতরে একটি চকি, চেয়ার-টেবিল, ভাঙ্গা বেঞ্চ আর চারদিকে ছড়ানো ছিটানো এলোমেলো বই আর বই, বইয়ের বসার জায়গা পাহাড়ে বসার জায়গা সংকট। বই সরিয়ে বসতে দিলেন।

চলল আমাদের আড্ডা। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে ছাত্র আর সৈয়দ জামান বাংলা সাহিত্যের। ফলে আড্ডাটা জমে উঠল। ফাঁকে ফাঁকে জানলাম ওমর আলীকে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি’ বের হয়েছিলো ১৯৬০ সালে। দীর্ঘকাল সাহিত্যচর্চা করেও জীবনে কোনো দিন বাংলাদেশ টেলিভিশনের কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। শুনে অবাক হলাম। সাথে সাথে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আগামী কোনো এক অনুষ্ঠানে তাঁকে আমরা ডাকব। প্রস্তুত থাকার জন্য বলে বিদায় নিলাম। তিনি তাঁর আসল বাড়িতে যাবার জন্য নিমন্ত্রণ করলেন। গাছের লাউ, খোঁপের মুরগি, গোয়ালের গাভির দুধের লোভ দেখালেন। জামান ভাই আবৃত্তি করলেন—‘আমার বাড়ি যাইও ভোমর, বসতে দেব পিঁড়ে, জলপান যে করতে দেব শালি ধানের চিঁড়ে। শালি ধানের চিঁড়ে দেব, বিন্নি ধানের খই, বাড়ির গাছের কবরী কলা, গামছা-বাঁধা দই।’

ওমর আলীর নিমন্ত্রণে তাঁর গ্রামের বাড়ির চিত্র পাওয়া গেল। মজিদ মাহমুদের এক লেখা সাথে তাঁর বাড়ির বর্ণনার নিজের ভাবনার সাথে মেলাতে থাকি। কবির মৃত্যুর পর বাংলা ট্রিবিউনে ১০ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে ‘একান্ত অনুভবে কবি ওমর আলী’ শীর্ষক স্মৃতিচারণে করে মজিদ লিখেছেন—

‘লেবুগাছে বসা টুনটুনিকে তিনি কিভাবে আদর করেন; ধরতে গেলে একটি ফিঙেপাখি কিভাবে পালিয়ে যায়, আক্ষরিক অর্থে তিনি তা অভিনয় করে দেখালেন। তার বাড়িতে তখন পর্যন্ত দুটি মাত্র টিনের ঘর, খুবই গরিব দশা, সাধারণ টিন ও খড়ের বেড়া; খাট বলে তেমন কিছু নেই; এমনকি কোনো গ্রন্থাগারও নয়; বাঁশের মাচা ও চৌকির ওপর তিনি শয়ন করেন; বইপত্র যা আছে পাটের বস্তায় বন্দি করে চাতালের ওপর রেখে দেওয়া আছে। দুটি ঘরের দক্ষিণ দুয়ারে একটি চাপকল, তারপাশে দুধেল গাইয়ের জন্য ঘর, আর সম্ভবত বাতাবি লেবু গাছ রয়েছে; বাইরে একটি খড়ের গাদা, আর উঠানে ধান শুকাতে দেওয়া আছে। বললেন, মজিদ, থেকে যাও একটি মোরগ কাটি, তোমরা তো আর শহরে দেশি মুরগি খেতে পার না।

ওমর আলী জীবনের শুরুতে ঢাকায় ছিলেন, দৈনিক সংবাদের সাব-এডিটর হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন, ভালো অনুবাদ করতে পারতেন না বলে বকাঝকা শুনেছেন; কেরানিগঞ্জে একটি বাসায় ছেলেমেয়ে পড়ানোর বিনিময়ে থাকার বন্দোবস্ত করেছিলেন, সাপ-খোপের ভয়ে বেশিদিন থাকতে পারেননি। কবি আহসান হাবীবও তাকে থাকার জায়গা দিয়েছিলেন; সেখানেও বেশি দিন থাকা হয়নি’। এই খানে এসে থেমে যাই।

‘কবি আহসান হাবীবও তাঁকে থাকার জায়গা (জায়গির) দিয়েছিলেন; সেখানেও বেশি দিন থাকা হয়নি’ এই প্রশ্নের জবাব আজো ঘোলাটে। ঢাকায় এলে আমি কবিকে এই প্রশ্ন করেছিলাম—আপনি কি এমন ঘটনা ঘটিয়ে ছিলেন যে, হাবীব ভাই আপনাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং আর কোনো দিন দৈনিক বাংলায় লিখেননি?

জবাবে বলেছিলেন, লিখেছি তো। লিখি।
—তাহলে বাসা থেকে বের করে দিলো কেনো?

তিনি চুপচাপ ছিলেন। একটু বিব্রত মনে হলো। আমি নাছোড়বান্দার মতো তৃতীয়বার প্রশ্ন ছাড়াই জবাবটা তুলে ধরি— ‘আপনি কি কেয়াকে প্রেম নিবেদন করেছিলেন?’
—আসলে বিষয়টা তা না। একটা ভুল বোঝাবুঝি থেকে...

গ.

পাবনা থেকে ফিরে আসার কিছু দিন পর ‘দৃষ্টি ও সৃষ্টি’র একটি পর্ব ঢাকার বাইরের লেখকদের নিয়ে প্রস্তাব পাস করে নিমন্ত্রণ করি হাসান আজিজুল হক, যতীন সরকার, ওমর আলী, ময়ূখ চৌধুরী এবং এ কে শেরামকে। হাসান আজিজুল হক ছাড়া বাকি সবাই চলে আসেন। মজার ব্যাপার, রেকর্ডিংয়ের দিনে ময়মনসিং থেকে দুপুরের ট্রেনে আজিজ মার্কেটে আমার অফিসে যতীন দা লুঙ্গি পরেই হাজির হলেন। চাটগাঁ থেকে বাসে এলেন ময়ূখ চৌধুরী আর এক একটা মাইক্রো ভাড়া করে নাতনীসহ সঙ্গী-সাথি নিয়ে পাবনা থেকে এলেন ওমর আলী।

সেই স্মৃতি নিয়ে রিটন লিখেছেন, ‘১৯৯৭/৯৮ সালের এক বিকেলে তিনি এসেছিলেন শাহবাগের আজিজ মার্কেটে, আমার 'ছোটদের কাগজ' পত্রিকার অফিসে। দুলালের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতেই তাঁর ঢাকা আগমন, পাবনা থেকে।

এত বিখ্যাত একজন কবি কিন্তু কী সরল আর সহজ একজন মানুষ! পান খাওয়া লাল মুখে শিশুর সারল্যভরা হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে আমাকে জানিয়েছিলেন, পাবনার যে কলেজের তিনি অধ্যাপক সেই কলেজের ছাত্ররাই গাড়ি ভাড়া করে সদলবলে তাঁকে নিয়ে এসেছে ঢাকায়। ডেকেছে দুলাল কিন্তু তাঁর ধারণা তাঁকে ডেকেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন! শাদাসিধে কথা আর আচরণে আমাকে মুগ্ধ করে ফেললেন কয়েক মিনিটেই। খুব আগ্রহ নিয়ে আমার সঙ্গে ছবিও তুললেন কয়েকটা’। দুর্ভাগ্য আমি সেই ছবি থেকে বাদ পড়ে গেছি। [দ্রঃ ভ্রমর যেথা হয় বিবাগী—১০/ লুৎফর রহমান রিটন, ফেইসবুকের স্ট্যাটাস, ৪ ডিসেম্বর ২০১৫]

অনুষ্ঠান রেকর্ডিং হলো বিকেলে। যেহেতু আগে চুক্তিপত্রে সই করা হয়নি; তাই চেক পাঠানো হবে ডাক মারফত। সেজন্য  চেক পেতে ক’দিন সময় লাগবে। একটি নয় শ’ টাকার সম্মানির চেক দিয়ে তো মাইক্রো ভাড়াই হবে না। তাই সৈয়দ জামানকে নিয়েও জি এম নওয়াজেশ আলী খানের সাথে পরামর্শ করে শিক্ষক হিসেবে তাঁকে শিক্ষাবিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার ব্যবস্থা করলাম। সেদিনই সন্ধ্যায় বিটিভির বারান্দায় অগ্রিম রেকর্ডিং হলো। যাতে তিনি দুটি চেক পেতে পারেন।

ঢাকায় বিটিভির অনুষ্ঠানে এলে লুৎফর রহমান রিটনের ছোটদের কাগজ কার্যালয়ে (বা থেকে) আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুন, কবি মাহবুব হাসান, কবি ময়ূখ চৌধুরী, ওমর আলী, লুৎফর রহমান রিটন এবং সাংবাদিক মাহমুদ শামসুল হক।

তাঁকে বিটিভিতে আমন্ত্রণ করে আমি কিছুটা বিপদে পড়লাম। ডাইভারসহ পাঁচ জনের খাওয়া এবং রাতে থাকার ব্যবস্থা করতে হলো। আজিজের অন্তরে খাওয়া-দাওয়া আর থাকার জন্য এলিফ্যান্ড রোডে একটি হোটেলে ব্যবস্থা করলাম।

যাই হোক। বিটিভির চেক যেতে দেরি হচ্ছিল। আর ওমর আলী অস্থির হয়ে ক’দিন পরপর চিঠি দিচ্ছিলেন। সেই তিক্ত চিঠিগুলো এখন মনে হয় মধুর স্মৃতি। তাঁর রাগে মেশানো চিঠিগুলো এখন অনুরাগে জড়ানো অমূল্য সম্পদ।

/জেডএস/
সম্পর্কিত
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
আদিতির হত্যাকারীর বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ
আদিতির হত্যাকারীর বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পিবিআই’র চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পিবিআই’র চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার
শিল্পকলায় নাট্যকেন্দ্রের ১৫তম প্রযোজনা
শিল্পকলায় নাট্যকেন্দ্রের ১৫তম প্রযোজনা
সীতাকুণ্ডের অগ্নিদগ্ধরা এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে ক্ষত
সীতাকুণ্ডের অগ্নিদগ্ধরা এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে ক্ষত
এ বিভাগের সর্বশেষ
হিলারি মেন্টেলের মৃত্যু
হিলারি মেন্টেলের মৃত্যু
চন্দ্র সূর্যের আকর্ষণে সমুদ্রের সাহসআশ্রিত মানুষ 
চন্দ্র সূর্যের আকর্ষণে সমুদ্রের সাহসআশ্রিত মানুষ 
‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ ও আহমদ ছফা : এক ক্ষ্যাপা বাউলের প্রাণ ।। পর্ব—সাত
পথে নেমে পথ খোঁজাআহমদ ছফা : এক ক্ষ্যাপা বাউলের প্রাণ
সাড়ে তিন আনা
সাদত হাসান মান্টোর ‘শিকারি আওরত’ থেকেসাড়ে তিন আনা
আকাশটা জুম করে দেখি
আকাশটা জুম করে দেখি