X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতা

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২১, ০৯:৩৪

একজন কবি একজন সাধারণ মানুষ। তিনি বিপন্ন হলে তার চোখ দিয়ে জল পড়ে। রাজা রানি কিংবা রূপকথার রাজকুমার নয়। রাষ্ট্রপতি হলেও তিনি থাকেন সাধারণ। কবি ও রাষ্ট্রপতি এরকম অনেক উদাহরণ আছে। কিন্তু তারা মানুষের প্রতি নিবেদিত ছিলেন। সেনেগালের লিউপোল্ড সেদর সেঙ্গরের কথা আমরা জানি। ভারতের রাষ্ট্রপতি অটলবিহারী বাজপেয়ী। বসনিয়ার প্রেসিডেন্ট আলিয়া ইয়াজ তোবেগোভিচ। আর পৃথিবীর বড় বড় রাষ্ট্রনায়ক, চিন্তকেরাও অল্পবিস্তর কবিতা লিখেছেন। কার্ল মার্কস, মাও সেতুং, স্টালিন। বাপরে—যার নামে নাম রেজাউদ্দিনের। আসলে আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, এটা একটা নিঃসঙ্গতার সময়। কিন্তু মানুষ নিঃসঙ্গ থাকতে চায় না। আজকে এমন একটা অনুশাসন এসে আমাদের ভয় দেখাচ্ছে, যেন সমাজ, রাষ্ট্র,  সভ্যতা বলছে একা হও।

এই কথা মানবেতিহাসের চারিত্র্যবিরোধী। দুটো মহামারি আজ বিশ্বে একদিকে করোনা পোকায় মৃত্যু অন্যদিকে ক্ষুধায় মৃত্যু—প্রতি এক মিনিটে ১৫ জন মানুষের মৃত্যু। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ যাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ভারতবর্ষ, বাংলাদেশের মতো কত দেশ।

আমেরিকাতে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু পুঁজিবাদী বিশ্বের অন্তঃসার শূন্যতা দেখিয়ে দিয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্রের রেসিজমের ভ্যাকসিন হয়তো পাব না, কিন্তু করোনার ভ্যাকসিন ঠিকই এলো। এই বিশ্বময় মানবিক বিপর্যয় নিয়ে আমি যেমন ভাবি তেমন রেজাউদ্দিন স্টালিনও ভাবে। ওঁর কবিতা, ওঁর উচ্চারণ সেকথাটা মনে করিয়ে দেয়। রেজাউদ্দিন স্টালিনের সঙ্গে আমার পরিচয় আশির দশকে। মল্লিকা সেনগুপ্তের সাথে ওর সখ্য ছিলো। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যখন কিছু ঘটে কিংবা বাংলাদেশে যখন ঘটে সে ঘটনা আমাদের দুজনকেই অস্থির করে। এই ঘটনার অভিঘাত থেকে কবিতা তৈরি হয়, ছবি আঁকা হয়, গান হয়। আজকের সময় সবকিছু গ্লোবালাইজেশন নিরিখে দেখা হচ্ছে। টাইম এন্ড স্পেস। সূর্যের পরিবারের ছোটো অংশ পৃথিবী। আর মানুষ হচ্ছে পরিবারের কেন্দ্রে। তিব্বতে, দিল্লিতে, কলকাতায়, ন্যুয়র্কে, ফ্রান্সে কোনো ঘটনা ঘটলে আমি স্পন্দিত যেমন হই, স্টালিনও হয়। আমার এক  অভিব্যক্তি হয়, রেজাউদ্দিনে আরেক। স্টালিনের একটা কবিতা এরকম অভিব্যক্তি খুঁজে পাই, কবিতাটির নাম ‘সূচনাপর্ব’। কবিতারটা ওঁর মুখে আগেও শুনেছি প্যারিসের জানলায়ও শুনেছি।

আমার সময় গো-ক্ষুরের মতো বিভাজিত
মুহূর্তগুলো কালো কৃষকের পায়ের মতো ফাটা
আমার জন্ম কোনো সময়কে ইঙ্গিত করে না
এমন কি ঘটনাগুলো মুহূর্তের শৃঙ্খলমুক্ত
যখন পৃথিবীতে কিছুই ঘটছে না
তখন সময় কি জিজ্ঞাসাচিহ্নের মতো
থিতু
আমি কি শুধু মৃত্যুর ভয়ে সময়কে
শনাক্ত করতে চাই

এটা একটা একটা মৌলিক জিজ্ঞাসা। রেজাউদ্দিন এরকম অনেক মৌলিক জিজ্ঞাসা তৈরি করেছে, যা বাংলা কবিতার জন্য দরকারি। শুধু বাংলাদেশ না ভারতের পশ্চমবঙ্গেও খ্যাতি আছে স্টালিনের।

যতদূর জানি প্রায় ৫০টির মতো কাব্যগ্রন্থ। কবি না হলে কবিতাকে ভালো না বাসলে এতদূর আসা যায় না। রেজাউদ্দিনের এরিজোনা রাজ্যের বিষ্ময় গ্রান্ড ক্যানিয়ন নিয়ে একটা লেখা শুনেছি, খুব ভালো লেগেছিলো। রেড ইন্ডয়ানদের নিয়ে কি হোলি খেলেছিলো মার্কিনিরা। স্টালিনের কবিতাটির নাম—যারা তাদের হত্যা করেছিল ভালোবাসার সুযোগে—। কিংবা দুঃখ শিরোনামের কবিতাটি, যেখানে একজন কবির কবিতা প্রকাশ না হওয়ার বেদনা।

সম্পাদক প্রতিবারই বললেন—

আপনার দুঃখ প্রসেসে আছে। আসলে প্রতিটি মানবের দুঃখ প্রসেসে থাকে। রেজাউদ্দিনের আছে মানবিক মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সামাজিক দায়বদ্ধতা। সে তার চারপাশের অসংগতি, অবিচার অন্যায় দেখে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হয়। প্রতিবাদ করে। তবে স্টালিনের প্রতিবাদ শৈল্পিক, আধুনিক। আমি মনে করি কোনো ইজম দিয়ে  উৎকৃষ্ট কবিতা তৈরি হতে পারে না। যদি কবির বিশ্বাস থাকে কবিতা মানুষের জন্য তাহলে তিনি তার সময়ের প্রতিনিধি হয়ে উঠবেন। আমি লক্ষ করেছি কবিতা নিয়ে কোথাও গুরুত্বপূর্ণ কথা হলে রেজাউদ্দিনের কথা আসে। আমি আনন্দিত হই আমার অত্যন্ত প্রিয় স্টালিনের কথা যখন কেউ বলে। সত্যিকার অর্থে ওর কাব্যিক দায়বদ্ধতা আমাকে আনন্দ দেয়। একবার আমি ফ্রান্সের এক গ্রামের রেস্টুরেন্টে ছিলাম। পাহাড়িগুহার মতো হোটেলটি ছিলো

বিনোদনের কেন্দ্র। সেখানে আমি কলকাতার এবং কবিতা লিখি জেনে এক ওয়েটার আমাকে জিজ্ঞেস করল আপনি কি রেজাউদ্দিন স্টালিনকে চেনেন। ভদ্রলোক ঢাকা থেকে এসে গ্রিসের গ্রামে ওয়েটারের কাজ করে—দেশে টাকা পাঠন। হাজার মাইল দূরে স্টালিন আছে মানুষের মনে দেখে ভালো লাগল। ভালো লাগল সে পাঠকের মনে জায়গা করে নিতে পেরেছে। ওর একটা কবিতা শুনেছি—জিজ্ঞেস করো না। একটা লাইন—সময় কিভাবে থকথকে হলো ঘৃণায়। সত্যি ঘৃণাটাকে এভাবে তুলে আনা যায় ভাবতে অবাক লাগে। সমকালীনতা এবং তাকে শিল্পীতস্বরে অতিক্রম করে যাওয়া কঠিন কাজ। সে কাজটিই করছে রেজাউদ্দিন স্টালিন। আমি কবিতা থেকে অলংকার বাহুল্য ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। আমি কবিতাকে গয়না পরাই না। আমি দেখেছি রেজাউদ্দিনের কবিতা নির্ভার, অলঙ্কার বাহুল্য বর্জিত। কবিতাকে কেন্দ্র করে মাঝে মাঝে অনলাইনে কলকাতা, ঢাকা, প্যারিস, টরেন্টোতে স্টালিনের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এটা আনন্দের। কবিতার নানা বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে সত্যি খুব ভালো লাগে। স্টালিনের কবিতা দিয়েই বলি—প্রতিটি পরিবর্তন খুলে দেয় জীবনের অলৌকিক স্বর। তখন একটা জীবনদর্শন আমাদের চেতনায় আলো দেয়। আমি একজন সচেতন পাঠক হিসেবে বলব—রেজাউদ্দিন মানুষের জন্য লেখেন। কোনো ফন্দিফিকির নেই, সোজাসাপটা, মানুষের মুখের ভাষাকে কবিতা করে তোলা। একেবারে অন্তর্মূলে বিঁধে যাওয়ার মতো অনেক লাইন আছে স্টালিনের। পৃথিবীর নানা ভাষাতে ওঁর কবিতা অনুবাদ হয়ে ছাপা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের কলকাতার মধ্যে কবিতার সেতুবন্ধন তৈরিতেও ওর ভূমিকা আছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সাথেও ওর ভালো যোগাযোগ দেখেছি। রেজাউদ্দিন আমাদের কালের একজন জাগরুক কবিতা সৈনিক। ওঁর মঙ্গল চাইছি। জয় হোক বাংলা কবিতার। বাংলা ভাষার।

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সহ-সভাপতিকে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা
মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সহ-সভাপতিকে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা
ডিম ছাড়ছে না হালদার মা মাছ, ভারী বৃষ্টির অপেক্ষা
ডিম ছাড়ছে না হালদার মা মাছ, ভারী বৃষ্টির অপেক্ষা
সুপ্রিয়া সরকারের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক
সুপ্রিয়া সরকারের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক
ইউরোপে মাংকিপক্সে আক্রান্তের সংখ্যা ১০০ ছাড়ালো
ইউরোপে মাংকিপক্সে আক্রান্তের সংখ্যা ১০০ ছাড়ালো
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত