X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯
শওকত আলীর সৃষ্টিকর্ম

সমাজ-সংসারের গভীর বাস্তবতা

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৫:০৪

'দিনের শোভা সুরুয রে, আতের শোভা চান,/ হালুয়ার শোভা হালকৃষি,/ জমিনের শোভা ধান।'—পঙক্তিগুলো শওকত আলীর ‘নাঢ়াই’ উপন্যাসে বিধৃত। পঙক্তিগুলোতে কবিতার সংগীতময়তা থাকলেও এবং তিনি কবিতা লিখলেও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো : শওকত আলী কখনো চাইতেন না তাঁর কবিতা কোথাও প্রকাশিত হোক। কবিতা লিখতেন তিনি মূলত অন্তরের প্রশান্তির জন্য। এক সাক্ষাৎকারে এও বলেছেন, যে, প্রত্যেক কথাশিল্পীর উচিত মাঝে মাঝে কবিতা লেখা। ফলত, তাঁর কথাসাহিত্যেও কবিতার সংগীতময়তা আমরা অনুভব করি।

বাংলা কথাসাহিত্যে ষাটের দশকে প্রায় সমসাময়িক সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনজন মায়েস্ত্রো কথাশিল্পী—শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং  হাসান আজিজুল হক।  তিনজনই বাংলা সাহিত্যে রেখেছেন অপরিসীম অবদান। বাংলা কথাসাহিত্যকে তাদের সৃষ্টিকর্ম দ্বারা তাঁরা শুধু সমৃদ্ধই যে করেছেন তাই নয়, জীবনের শেষ পর্যন্ত নিরলসভাবে সাহিত্যের সাধনা করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটিও পালন করে গেছেন।
শওকত আলী বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য কথাসাহিত্যিক, এই ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এই শওকত আলীই ছিলেন তৎকালীন তথাকথিত পত্রিকাগুলোর কাছে ব্রাত্য। এর পেছনে যে কারণটি নিহিত, সেটিও মর্মাহত করার মতো। তিনি যে শ্রেণির মানুষদের মধ্যে বাস করতেন, যাদের সবচেয়ে ভালো চিনতেন, সেই মানুষদের নিয়ে লেখালিখি করতেন বলেই তাঁর সাহিত্যকে এড়িয়ে যেত পত্রিকাগুলো। কিন্তু তাঁর লেখাজোকা না-হয় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল, তাঁর সাহিত্যের চিরন্তনতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কি আছে!
জেমস জয়েসের ইউলিসিসের ব্যাপারে এলিয়ট মন্তব্য করেছিলেন, যে, ইউলিসিস থেকে কারো পালিয়ে বাঁচার কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণী চোখ দ্বারা সমাজ-রাষ্ট্রের বিকাশের ধারা এবং মানুষের জীবনসংগ্রামকে অনন্য বয়ানরীতি দিয়ে চিত্রিত করে শওকত আলী শক্তিশালী কথাসাহিত্য রচনা করার পাশাপাশি জন্ম দিয়েছেন ভিন্ন কাঠামোর। শিল্প প্রকরণের ওপর শওকত আলীর প্রবল দখল ছিল, বাংলা ভাষাভাষী সাহিত্যের পাঠকমাত্রই জ্ঞাত। এছাড়া, তিনি এমন একজন সাহিত্যিক যিনি আখ্যান রচনার বদলে সমাজ-সংসারের গভীর বাস্তবতাকে তুলে এনেছেন কথাসাহিত্যে। ফলে, এটা বলতে দ্বিধা নেই, শওকত আলীর সাহিত্যের চিরন্তনতা থেকে পালিয়ে বাঁচার কোনো সুযোগই আমাদের নেই। বিশেষ করে প্রদোষে প্রাকৃতজন  শওকত আলীর এমন একটি সাহিত্যকর্ম যার থেকে নিস্তার না-মেলাটাই স্বাভাবিক।

যদিও তাঁর ত্রয়ী উপন্যাস দক্ষিণায়নের দিন, কুলায় কালস্রোত ও পূর্বদিন পূর্বরাত্রি-র জন্য তিনি সমধিক পরিচিতি অর্জন করেন, তবে প্রদোষে প্রাকৃতজন-ই তাঁর বহুল আলোচিত উপন্যাস। ১৯৮৩ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদ সংখ্যায় প্রদোষে প্রাকৃতজন প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর ১৯৮৪ সালে দুষ্কালের দিবানিশি প্রকাশিত হলে ইউপিএল দুটি খণ্ডকে একত্রিত করে ১৯৮৪ সালে প্রদোষে প্রাকৃতজন  শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে। তুর্কিদের আক্রমণ ও সেন রাজাদের সময়ের প্রাকৃতজনদের কাহিনি মূলত বিধৃত হয়েছে ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাসটিতে। সেনদের শাসনকালে সামন্ত এবং মহাসামন্তদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাধারণ জনগণ কীভাবে দ্রোহী হয়ে ওঠে, সেই সময়কালটির কয়েকজন প্রাকৃতজনের জীবন-সংগ্রামের প্রতিবিপ্লব প্রতিবিম্বিত করেছেন শওকত আলী তাঁর প্রাকৃতজনদের দ্বারা। তবে, এটা আমাদের খেয়াল রাখা জরুরি, যে, শওকত আলীর প্রাকৃতজন তৎকালীন হিন্দু, বৌদ্ধ ভিক্ষুরা শুধু শাসকদের অত্যাচারের প্রতিবাদই করে না, অত্যাচারী সামন্ত-মহাসামন্তদের অত্যাচার থেকে তাঁরা দেশকে বাঁচাতে চায়। শওকত আলীর বয়ানের ঢঙ, জীবনঘনিষ্ঠতা, মানুষের প্রতি গভীর দরদ থেকে চিত্রিত আত্রেয়ী নদী পাড়ের মৃৎশিল্পী শ্যামাঙ্গ এবং তার গুরু বসুদেবের মধ্যকার সম্পর্ক; অন্যায়, অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্ফুলিঙ্গ মানুষের ভিতরে দাবদাহ সৃষ্টি করলে মানুষের অবস্থা কেমন খিটখিটে হয়ে যায়—এই সবকিছু শওকত আলী আমাদের অনুধাবন করিয়ে দেন শ্যামাঙ্গের প্রতি বসুদেবের অজানা রাগের মাধ্যমে। এছাড়া, প্রেম-অপ্রেম, নর-নারীর আদিম আকর্ষণ প্রভৃতি বিষয় ও বস্তু মায়াবতী, বসন্তদাস, লীলাবতী প্রমুখ প্রাকৃতজন চরিত্রগুলোর মধ্যকার অন্তর্দাহ তুলে ধরে অনন্য এক ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে পাঠককে অন্য এক আবেশে নিমজ্জিত রাখেন শওকত আলী।

শওকত আলীর বয়স তখন ১১। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যায় ভারতভূমি। নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকেও। এক সাক্ষাৎকারে জীবনের গভীর দীর্ঘশ্বাসটি ঠিকই ঠিকরে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর। বলেছিলেন তিনি, 'জন্মস্থান হারানোর এ বেদনা তো অপরিসীম। সেটা ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না।' ইতিহাস এবং কথাসাহিত্যের মধ্যকার যে ওতপ্রোত এক সম্পর্ক বিদ্যমান, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের বিভিন্ন প্রবণতাসহ তাঁর সাহিত্যের পটভূমি এবং চরিত্রগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিলে আমাদের বুঝতে বেগ পেতে হয় না, যে, শওকত আলীর মধ্যে ইতিহাস খুঁড়ে নিজের শেকড়ের সন্ধানে যাওয়ার গভীর এক প্রবণতা ছিল, যা আমরা লক্ষ করি তাঁর উপন্যাস প্রদোষে প্রাকৃতজন ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধকে আশ্রয় করে লেখা সাহিত্যকর্ম যাত্রায়। এছাড়া, অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর থানার তালপুকুর গ্রামে ১৯৪৭ সালের ৪ঠা জানুয়ারি কৃষকের অধিকার অর্জন করতে গিয়ে কৃষক সমিরুদ্দিন, শিবরাম মাঝিসহ অগুনতি মানুষ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনাটি তাকে বিশেষভাবে আন্দোলিত করেছিল৷ ভারতভূমির ভাগ হওয়াকে কেন্দ্র করে তিনি লিখেন ওয়ারিশ

পাশাপাশি আমরা তাঁর আরেকটি শক্তিমান সাহিত্যকর্ম নাঢ়াই-এ দেখতে পাই তিনি বাংলাদেশের জনপদের ভূমিহীন মানুষের জীবনের করুণ সংগ্রাম কতটা গভীর মমতায় চিত্রিত করেছেন। চিরকাল বঞ্চিত হওয়ার আক্রোশের দ্রোহ তুমুল আন্দোলনে পরিণত হলে পরে তৎকালীন সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করলে, ১৯৪৬ সালে সংঘটিত হওয়া কৃষক আন্দোলনে অবিভক্ত বাংলার ৬০ লাখের বেশি কৃষক অংশ নিয়েছিলেন। পুলিশ, জমিদার ও জোতদারদের গুলিতে সেই আন্দোলনে শহিদ হয়েছিল প্রায় ৮৬ হাজার কৃষক। শওকত আলী জীবনের গভীরের জীবন তুলে ধরতেই স্বচ্ছন্দবোধ করতেন। নাঢ়াই উপন্যাসটিতে আমরা দেখতে পাই, ব্রিটিশ আমলের পিছিয়ে পড়া সাধারণ মানুষের জীবন, রাষ্ট্র ও সমাজ ভাবনা, অল্প বয়সেই বিধবা ফুলমতির টিকে থাকার সংগ্রাম এবং ভূমির অধিকার বঞ্চিত মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম ধরে ঘনীভূত হওয়া ১৯টি জেলায় বিস্তৃতি লাভ করা তেভাগা আন্দোলন।

উত্তর জনপদে নাঢ়াই শব্দটি দ্বারা মূলত লড়াই বোঝানো হয়। এই লড়াই যেমন-তেমন লড়াই নয়। জয়ের লড়াই। বিপ্লবের লড়াই। বিদ্রোহের লড়াই। অধিকারের লড়াই। ব্রিটিশদের বিদায় হলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্য যে পরিবির্তন হবার নয়, দেশীয় রাজনীতিবাজরা তাদের জীবন নিয়ে খেলবে,  ব্যাপারটা সাধারণ মানুষ যে ভালোভাবে জ্ঞাত, শওকত আলী তার চিত্রন ঘটিয়েছেন এভাবে :

'হাটত সভা করে কী যে নেকচার দেয় শালার ব্যাটারা, অরাই জানে—আংরেজ রাজা নাকিন হটে যাবে, তো যাউক, হামার সাহেব বাবুরা রাজা হইলে হামার কি? তাতে হামার কি? হামার কি নয়া বাল গজাবে?'

ব্রিটিশরা চলে গেলে নতুন রাজা কে হবে ভায়া মাঝি জানতে চাইলে মাস্টার যখন বলে, 'রাজা তোমরাই হবে', কুতুবালি নয় মূলত শওকত আলীই হেসে ওঠেন মাস্টারের কথা শুনে, 'স্যার ইসব পাগলা পাগলি কথা কহে ক্যানে হামার সাথে মাজাক করেন। আংরেজ বাদশা চলে গেলে কে বাদশা হোবে, কনেক বুঝায় দেন মাস্টার বাবু।'

মাদারগঞ্জের হাটে ওয়াজ হয়। মওলানা মুসলমানের জন্য নতুন একটা মুলুক হওয়ায় খুশিতে আত্মহারা হয়। হিন্দু পুরুতঠাকুরও আত্মহারা হয় তাদের আলাদা ভূমি পেয়ে। দুঃখ পায় মহিন্দর বর্মন, সুবল দাসরা। আর দুঃখ পান শওকত আলী।  মহিন্দর বর্মন দোসরা মুলুক শব্দ দুটোর অর্থ বুঝতে না-পারলে, সুবল দাস বুঝিয়ে দেয়, 'আরে ভিন্ন দেশ চাহে অরা, উমার কথা মাউরাগের লাহান, তমরা বুঝেন না? গজুয়া নাকি?'

ভারত ভাগ হলো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৫০ বছর পার করলো। রাজা যায় রাজা আসে কিন্তু শওকত আলীর মানুষের ভাগ্যের আর পরিবর্তন বিশেষ হয় না।

গতকাল ছিল শওকত আলীর জন্মদিন; তিনি ১৯৩৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার  রায়গঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন।

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
আবার ব্যাংকক গেলেন রওশন
আবার ব্যাংকক গেলেন রওশন
ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুণ কুমারের মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে: কমিশন
ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুণ কুমারের মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে: কমিশন
স্নাতক ও এইচএসসি পাসে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষে চাকরি
স্নাতক ও এইচএসসি পাসে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষে চাকরি
ইভিএম ব্যবহারের কোনও যৌক্তিকতা নেই: সুজন সম্পাদক
ইভিএম ব্যবহারের কোনও যৌক্তিকতা নেই: সুজন সম্পাদক
এ বিভাগের সর্বশেষ
খোঁপায় গমখেতের মায়া
খোঁপায় গমখেতের মায়া
বুভুক্ষাই জন্ম দিয়েছে ইরোটিকার
বুভুক্ষাই জন্ম দিয়েছে ইরোটিকার
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার মঙ্গলবার
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার মঙ্গলবার
কুসতুনতুনিয়ায় কয়েকদিন
পর্ব—চারকুসতুনতুনিয়ায় কয়েকদিন
মানববাদী মধুসূদনের নারীপ্রগতিভাবনা
মানববাদী মধুসূদনের নারীপ্রগতিভাবনা