X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯
রফিক আজাদের কবিতা

স্বতন্ত্র ও যোজিত স্বর

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৩:৪৭

বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে রফিক আজাদ (১৯৪১-২০১৬) এক অনিবার্য কবিপ্রতিভা। ছয়ের দশকের অবরুদ্ধ সময়ের আবর্তে সৃজনোন্মুখ কবিদের সমবেত আড্ডা ও লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনার পুরোধা ব্যক্তি হিসেবে তিনি প্রথমেই চিহ্নিত হন। প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশের কাব্যচর্চা ও কাব্যবিষয়ক বিবিধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মহৎ কবি ও কবিকৃতি দ্বারা প্রভাবিত হলেও, শুরুতেই ব্যক্তিক অনুভবের স্বাতন্ত্র্যে তিনি নিজস্ব কাব্যসৌধ গড়ে তোলেন, যার যথার্থ সাক্ষ্য বহন করে তাঁর প্রকাশিত অজস্র কবিতা। ছয়ের দশকের অবক্ষয়ের সংশ্রবে তাঁর মানসলোক পীড়িত, তবে তাঁর কবিতার এটিই একমাত্র প্রবণতা নয়। কবিতায় আমু-পদনখ অবক্ষয় ও নেতিবাচকতায় নিমজ্জিত হলেও, তাঁর কবিস্বভাবে অন্তর্লীন ‘স্বপ্নের বাস্তবে’ যাবার ইতিবাচকতা। সেকারণেই তাঁর কবিতায় এক অভিযাত্রিক সৃজন ও মননের প্রতিফলন ঘটে। সময়পীড়িত শৈল্পিকযন্ত্রণায় তাঁর কবিমানস বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলেও, জীবনের প্রতি পক্ষপাত সেখানে পরিদৃষ্ট। আপোষহীন এক কবিস্বভাবের সংস্পর্শে শানিত তাঁর কবিতাসমূহ। শিল্পের দায়ের সঙ্গে সামাজিক দায়কে ঐক্যবদ্ধ করে কবিতার শক্ত বুনটঅভীপ্সা তাঁর কবিতায় ভিন্ন মেজাজের প্রকাশ ঘটায় এবং সর্বজনবোধ্য এক যোজিতস্বরের আভাস যোগায়।

কবিমাত্রেরই কবিজীবনে দেখা যায় কাব্যবোধের বহুমাত্রিক রূপান্তর, রফিক আজাদের কবিজীবনেও এ এক সাধারণ সত্য। সে সত্যের সন্ধানসূত্রে দেখা যায় কবির দায়মূলক ব্যক্তিকএষণা। প্রকৃতপক্ষে, শিল্প কেমন হবে? শিল্পের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি হবে—এ সনাতন তর্কে কবি রফিক আজাদ তাঁর ইপ্সিত অবস্থান সুদৃঢ় করেন, সচেতন হন প্রাথমিক পর্বে। তাঁর শিল্পসংবেদে সংযুক্ত সচেতনতা প্রসঙ্গে তিনি কোনো খেদ নেই (২০০৯) গ্রন্থে স্মৃতিচারণ করে বলেন :

ছাপার অক্ষরে নাম দেখার লোভ-ওটি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে, খেলা নেই আর। অস্তিত্বের প্রশ্ন।... পাঠকের ডিমান্ড বাড়ে, ভেতরেও কেউ চিৎকার করে বলে, ‘আর কত দিন তুতুত্তুতু’ পদ্য লিখবে, এবার কিছু মানুষের কথা বল, আধুনিক মানুষের সংকটের কথা বল, সভ্যতায় সংলগ্ন হও—একটা স্পষ্ট দর্শনে ভর দিয়ে দাঁড়াও।

কবিতানির্মাণ প্রসঙ্গে এরূপ অভিব্যক্তির প্রকাশ ঝোঁকসর্বস্ব নয়, অনিবার্য সিদ্ধান্তের মতো এ প্রতীতিতে বাক্সময় তাঁর শিল্পিমানসের মুখশ্রী। বক্তব্যের গর্ভাংশ হতে এরূপ ধারণা করা যেতে পারে যে, পাঠকসংলগ্ন হবার বাসনা, বিবেকীতাড়না ও মানুষের প্রতি জাগ্রত প্রেমচেতনা—এ তিনের সংমিশ্রণজাত বোধ তাঁর শিল্পিমানসের স্তম্ভস্বরূপ। এরই স্পন্দনে মূর্ত তাঁর কবিতা, আর সে কবিতার প্রতিবিম্বে আভাসিত তাঁর শিল্পিমানসের মুখশ্রী। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যসমূহ : অসম্ভবের পায়ে (১৯৭৩); সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে (১৯৭৪); চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া (১৯৭৭); সশস্ত্র সুন্দর (১৯৮২); একজীবনে (১৯৮৩); হাতুড়ির নিচে জীবন (১৯৮৪); পরিকীর্ণ পানশালা আমার স্বদেশ (১৯৮৫); খুব বেশি দূরে নয় (১৯৮৯); ক্ষমা করো বহমান হে উদার অমেয় বাতাস (১৯৯২); করো অশ্রুপাত (১৯৯৪); কনে তুলে আনতে চাই (১৯৯৭);  বিরিশিরি পর্ব (১৯৯৭); হৃদয়ের কী বা দোষ (১৯৯৭) প্রভৃতি। কবিতার টেকনিকের ইতিহাসে কবি রফিক আজাদের সাধনকর্ম কবি নাজিম হিকমত (১৯০২-১৯৬৩), পাবলো নেরুদা (১৯০৪-১৯৭৩), ফয়েজ আহমদ ফয়েজ (১৯১১-১৯৮৪), অ্যালেন্স গিন্সবার্গ (১৯২৬-১৯৯৭) প্রমুখের সঙ্গে তুলনীয় । 

২.

একজন প্রকৃত কবি হিসেবে রফিক আজাদ তাঁর লেখনীশক্তিকে আজীবন চালনা করেন এবং সমাজ সচেতন মনস্বিতায় সত্যানুসন্ধানে নিয়োজিত হন। আত্মভাষ্যের অন্তরালে তাঁর কবিতায় পরিস্ফুট হয় সময়চেতনা, ইতিহাসচেতনা ও আন্তর্জাতিক প্রতীতির সামগ্রিকতা। তাঁর কবিমানসের বিবর্তন সুগঠিত এবং প্রগতিমুখী। জন্মসূত্রে কবি নিজেকে ‘এটম বোমার চেয়ে দু’বছরের বড়’ এই অভিজ্ঞানে সুচিহ্নিত করেন এবং অনিবার্যভাবে স্বীয় প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতাকে বিশ্বযুদ্ধোত্তর বৈশ্বিক আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অন্তর্বয়ানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। প্রথম কাব্যের কবিতাসমূহে বিষয়বৈচিত্র্য ও ভাষাগত স্বাতন্ত্র্যে তিনি অবক্ষয়ের অনিবার্য প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। সতীর্থ সমালোচক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ (জ. ১৯৪০) যাকে চিহ্নিত করেন সময়ের ‘দুঃসাহসিক ও নতুন’ কাব্যচেতনা হিসেবে। এর পরবর্তী কাব্যের আত্মপ্রকাশ ঘটে মুক্তিযুদ্ধের পরে। এসময়ের কাব্যকৃতি তাঁর জনশ্রুতির কারণ এবং এ সময়পর্বেই কবির উত্তুঙ্গ উচ্চকিত স্বর পূর্বের কাব্যের কাব্যপ্রবণতা হতে পৃথক হয়ে যায়। কবিতায় এ উচ্চকিত স্বরায়ণ, জনমুখী দৃষ্টিকোণ ও পৌরুষের সামূহিক দ্রোহের উন্মোচনে কবি রফিক আজাদ কাব্যসায়রে বিশিষ্ট ও চিহ্নিত হন। কিন্তু তাঁর কবিসত্তা সম্বন্ধে এটিই শেষকথা নয়, তার যথার্থ অভিজ্ঞান বিম্বিত হয় পরবর্তী কাব্য ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’য়। এ কাব্যের সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্যে কবির শিল্পপ্রতিম উচ্চারণ, স্পর্শকাতর মৃদু উচ্চারণ, কামের সঙ্গে প্রেমের সম্পৃক্তিসাধন প্রাধান্য পায়। এভাবে তিনি তাঁর পারিপার্শ্বের চিত্রায়ণ করেন কবিতায়। অসম্ভবের পায়ের (১৯৭৩) মাধ্যমে যার সূচনা, সুন্দরের দিকে চোখ রেখে (২০১১) কাব্যের জীবন অনুধ্যানের অতৃপ্তি নিয়েই যার সমাপ্তি।

কবি রফিক আজাদ কবিজীবনের প্রথম থেকেই সচেতনতার সাথে কবিতার গতানুগতিক কাব্যরুচি, বহুল পরিচিত কাব্যজগৎ, বহুচর্চিত ভাব ও ভাষা, অতিপরিচিত রূপকল্প ও উপমার ভিড়কে অতিক্রম করেন। তাঁর কবিতায় ‘আধেয়’কে যথোচিত ‘আধারে’ উপস্থাপনের প্রয়াস বেশি লক্ষযোগ্য। কিন্তু, অন্যান্য অনেক কবির মতো তাঁরও সৃজনশীলতার শক্তি একইরকম থাকেনি। তাঁর সৃজনের মৌলিকত্ব হারানোর নেপথ্যে যেমন দায়ী তাঁর বৈরী পরিপার্শ্ব, তেমনি কবির অন্তর্লোকে জনপ্রিয়তার দায় ও তদ্সঞ্জাত পৌনঃপুণিকতা। তবে তাঁর স্বাতন্ত্র্য এখানে যে, তিনি যে উত্তর-আধুনিক চর্চায় ধর্মভীরু মায়ের সংস্পর্শে বেড়ে উঠেও ‘রফিক আজাদ’ হয়ে ওঠেন— তাঁর সে প্রজ্ঞা ও সচেতন প্রয়াস জীবনের শেষ অবধি ছিলো। সময়ের সামনে নতজানু হলেও আল মাহমুদ (জ. ১৯৩৬) কিংবা আবদুল মান্নান সৈয়দের (১৯৪৩-২০১০) মতো কবিজীবনের শেষার্ধে বিপ্রতীপ মতাদর্শকে গ্রহণ করেননি। বরং রফিক আজাদের শেষদিকের কাব্যসমূহে তাঁর অভিজ্ঞতার প্রাজ্ঞতা এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক কৃষিসভ্যতার চেতনা মাত্রালাভ করে। ক্রমশ তাঁর কবিতায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ মানব অনুধ্যান ও বিচিত্র জীবনের সারাৎসার প্রাণতা পায়, যা তাঁর কাব্যযাত্রাকে জনমূলসংলগ্ন ও সমগ্রস্পর্শী করে তোলে।

রফিক আজাদ যখন তুমুল উৎসাহে কবিতাচর্চায় ব্যতিব্যস্ত হন, তখন নাগরিকচেতনায় আচ্ছন্ন হন। এলিয়ট প্রবর্তিত প্রুফকের মনস্তত্ত্ব তাঁর কবিতায় বিদ্যমান। পাশাপাশি ‘জাহাজ’, ‘শব’, ‘রক্ত-পুঁজে মাখামাখি’, ‘শস্য’, ‘জিরাফ’ প্রভৃতি বোদলেয়ারীয় প্রতীকী শব্দসমূহ সংকেত হয়ে তাঁর কবিতার ডিকশনে গাম্ভীর্য আনে। মধ্যবৃত্তিক নাগরিক চেতনার অবক্ষয়িত রূপটি তিনি ব্যঙ্গার্থকভাবে বারবার তাঁর কবিতায় চিত্রিত করেন। তবে মূলত তিনি ‘বহিরঙ্গে নাগরিক, অন্তরঙ্গে অতৃপ্ত কৃষক’। তাই অসম্ভবের পায়ে, সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে কাব্যদ্বয়ে উন্মোচিত সংকটকে অতিক্রম করে চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, সশস্ত্র সুন্দর কাব্যদ্বয়ে স্বপ্নের বাস্তবে যাবার প্রত্যাশায় অগ্রগামী হন। বৌদ্ধধর্মের হীনযান সম্প্রদায়ের মতো দেহাত্মবাদী তাঁর এ সাধনা। ‘নারী’ ও ‘কবিতা’ তাঁর নিকট সমার্থক শব্দ, এবং কবিতার জগতে তাঁর শব্দপুরুষ অত্যন্ত জৈবিক। পৌরুষস্পান্দিত লীলালস্যে তাঁর প্রত্যাশা এমন : ‘স্পর্শের ভাষায় শুধু / লেখা হতে পারে / সম্পূর্ণ নিঁখুত এক প্রণয় সংহিতা।’ বোধের এই গভীরতা, জানার এ আকুলতা, প্রেমের সংরাগ স্পর্শকাতরতা তাঁকে পরিপূর্ণ ‘কবি’ হিসেবে গড়ে তোলে। দেহের আলিঙ্গন দিয়েই তিনি বুঝতে চান পৃথিবী, জীবন ও শিল্পকে। আবেগের এরূপ প্রকাশভঙ্গি নিঃসন্দেহে করপোরেট নাগরিকবিশ্ব হতে সুদূরে অবস্থান করে। এ কারণেই উপনিবেশ আশ্রিত কাব্যভাষাকে অতিক্রম করে নতুন কোনো আঙ্গিকচেতনা উন্মোচনে ব্যগ্র হন তিনি। কৃষকের কাছে যেমন নারী-ভূমি আর বৃষ্টি আরাধ্য সত্য, তেমনি শিল্পে এ কবি তারই যথাযোগ্য অধিষ্ঠান কামনা করেন। কবিতায় প্রবলবৃষ্টির প্রয়োজনের কথাই তিনি বারবার ব্যক্ত করেন। তার এই আহাজারি একাত্ম গোটা উপনিবেশবিরোধী বিশ্বের মানুষের সঙ্গে। ‘চেতনার গূঢ় মর্মমূলে’ বৃষ্টির চিরন্তনী আবেদনকে তিনি রূপ দেন সময় ও সমাজঅন্বিষ্ট সকল জড়চেতনার বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে। কবিতায় বলেন : ‘বৃষ্টি চাই খরাময় ত্রিভুবন জুড়ে/ সর্বত্র সর্বথা; —বৃষ্টি চাই অফ্রিকায়/ এশিয়ায় ইউরোপে অস্ট্রেলিয়াসহ / পৃথিবীর মরুময় প্রতিটি অঞ্চলে’। এমন বোধের রূপায়ণে এ কবি ইয়ুং কথিত ‘প্রত্নকায়’ দীর্ঘপুরুষরূপে শব্দদ্বৈরথে কবিতায় উপস্থিত হন। এমন ক্ষমতা প্রকাশের স্পর্ধায় তিনি হয়ে ওঠেন স্বতন্ত্র। ‘সবুজ প্রত্নপ্রীত’ এ কবি তাই সবুজের সমাহারে বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়নসমস্যা দূরকরণে বদ্ধপ্রত্যয়ে বলীয়ান হয়ে ওঠেন। উপরন্তু, মগ্নচৈতন্যে প্রেম, প্রকৃতি, মৃত্যুর চিত্রকল্পও তাঁর কবিতায় সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে ।

রফিক আজাদের প্রথম কবিতার বই অসম্ভবের পায়ে, যা ১৯৭৩ সালে প্রকাশ পায়। তবে এ কাব্যের কবিতাগুলোর জন্ম হয় ছয়ের দশকেই। এ দশকের দ্বিতীয়ার্ধের প্রথমেই তিনি ‘বিষাদপ্রজন্মে’র [‘স্যাড জেনারেশন’ আন্দোলন, ১৯৬৪] ইশতেহার রচয়িতা হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রে আসেন। যৌনতা, রিরংসা ও অবক্ষয়ের সমূহ চিত্রায়ণ এ কাব্যান্দলনে সংযুক্ত কবিদের আরাধ্য হয়। সে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তির দ্রোহ যেন অবক্ষয়জনিত মানসে অনাবৃত, অথচ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ সাল (কালোর দশক) এবং ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ (গণআন্দোলনের কাল) সালের অবরুদ্ধ এক সময়পর্বে আকস্মিক এ কাব্যান্দোলন ও কবি রফিক আজাদের স্বর এক অর্থে দ্রোহ। তবে তার স্বরূপটি ভিন্ন, যেন তা কোন সুসময়ের অপেক্ষায় প্রতীক্ষিত। ‘অসম্ভবের পায়ে’ শীর্ষক শিরোনামের পূর্বে কবি ভাবেন আরো দুটি শিরোনাম। একটি ‘উপদ্রুত যৌবনে’, অন্যটি ‘অন্তরঙ্গ দীর্ঘশ্বাস’। এই দুটি নামই কাব্যটির কবিতার চারিত্র্যনির্দেশ করে, বাংলাদেশের জন্মপূর্ব গুমোট সময়ের অনিবার্য ইঙ্গিত দেয়। অবক্ষয়ের সমূহচিত্রকে প্রতীকের সমবায়ে উপস্থাপন করতে গিয়েই কবি চিনে নেন স্বপ্নের সত্য ও তার সম্ভবনা। স্বপ্নের ভগ্নাংশগুলো জোড়া দিতে দিতেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন ‘তোমার স্বপ্নের দৃশ্যে তুমিই সম্রাট’৪। এই সম্ভাবনা ও আত্মবিশ্বাস তাকে টেনে নেয় মধ্যরাত্রে এবং বীরোচিত ভূমিকা গ্রহণের সত্যতায় একাত্ম করে। হতাশাকে ছাড়িয়ে দ্রোহ তখনও উচ্চকিত না হলেও, সামূহিক দ্রোহের বীজতলা সে সময়েই প্রস্তুত হয়। কবি তখন দ্রোহের প্রকৃত সময়কে অনুভব করেন। কবিতায় তা বিষয়ে রূপ দেন এভাবে :

এইতো সময় হলো, এসো তুমি বেরিয়ে এবার—
হে ব্যাঘ্র, বিবর থেকে উজ্জ্বল ভাঁটার মতো, চোখে
খাটো চুলে, বস্ত্রের বাহুল্যহীন গ্রিজ-মাখা দেহে
শাবল-গাঁইতি হাতে বিড়ালের মতো মৃদু-পায়ে
          সন্তর্পণে, এক্ষুণি বেরিয়ে পড়ো; এই তো সময়।
                   [‘চোর’; অসম্ভবের পায়ে]

উদ্ধৃতাংশে কবি উপযুক্ত সময়ে ব্যক্তির ভিতরের পুরুষকে আহ্বান করেন। তাঁর আহ্বানে সেই পুরুষ উন্মোচিত হয়, যে পুরুষের ‘পৌরুষ’ বিবরে, বস্ত্রের বাহুল্যে আবৃত হয়ে আছে। এরপর কবি নিজেকে গড়ে তোলেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। কৃষক, শ্রমিক, মাঝি-মাল্লা, শিক্ষক, সাহিত্যিক-শিল্পী, ছাত্র-ছাত্রী, বাঙালি সেনাসদস্যসহ বৃহত্তর জনতার মিলিত সংগ্রামে তিনি নিজেকে সামিল করেন। তাঁর স্মৃতিতে ভিড় করে স্বপ্নালোকিত বহু মানুষের চোখ, তাদের উষ্ণ হৃদয়ের সারল্য। এই পুঞ্জিত স্মৃতির চাপ তাঁর কবিমানসে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। তখন তাঁর রক্তে ধাবমান শত্রুধ্বংসী ‘dynamites’; SELF-DESTRUCTION’ নয়, তাঁর উচ্চকণ্ঠ ইশতেহার হলো ‘শত্রুখতম করো। জয় বাংলা’। মুক্তিযোদ্ধার সেই চেতনার পথ থেকে তিনি আর সরে আসেননি এবং ‘দ্রোহ’কে কবিচেতনার অন্যতম অনুষঙ্গ করে তোলেন।

৩.

রফিক আজাদের পরবর্তী কাব্য সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে (১৯৭৪), যেখানে সামূহিক দ্রোহের প্রকাশ প্রবল হয়ে ওঠে। তিনি এ বিশ্বাসে আস্থা রাখেন : ‘বিদ্রোহ তো সর্বকালেই,/ স্পর্শ করে মূল দরজা’। বাংলা কবিতার ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা যেমন, তেমন রফিক আজাদের ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতা আলোচনা-সমালোচনার পর্ব পেরিয়ে জনপ্রিয় হয়। মানুষের মৌলচাহিদার সমূহ সমস্যার বিরুদ্ধে কথা বলা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষণে দৃঢ় চেতনার বহিঃপ্রকাশ এ কবিতায় উপজীব্য হয়। কবিতার শিরোনামটি তাঁর নিজের রচনা নয়, তাঁর জীবনস্মৃতিসূত্রে জানা যায় এটি শিরোনামহীন কোনো ব্যক্তির দেয়াললিখন। নিছক চোখ এড়ানো এক তুচ্ছ বিষয়, কিন্তু তাকেই কবি রফিক আজাদ কবিতার কাঁচামাল হিসেবে গ্রহণ করেন। স্বীয় মানবিক অভিজ্ঞতায় বিষয়টিকে কবিতায় রূপ দেন। বিষয়ের নির্বাচনে তাঁর এই প্রাতিস্বিকতা এবং শিল্পে উন্নীত করার প্রয়াস সহজসাধ্য নয়। তদুপরি তা কবির জন্য ঝুঁকিপূর্ণও বটে। কেননা প্রতিষ্ঠিত নন্দনবীক্ষার আগ্রাসন ও যশোলাভের এষণা কবিমাত্রেই বিস্তার লাভ করে এবং সে সূত্রে তাঁর কাব্যাধারও সীমিত হয়ে ওঠে। কিন্তু রফিক আজাদ ঝুঁকি গ্রহণ করেন, চ্যালেঞ্জ করেন রাষ্ট্র ব্যবস্থার সকল অসংগতিকে। তিনি তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকেই গুরুত্ব দেন। কেননা তিনি ক্ষুধা-দারিদ্র্যযুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন চোখে নিয়েই মুক্তিযোদ্ধা হন; রণাঙ্গনেও অনুভব করেন অগণিত মানুষের স্বপ্ননির্ভর দৃষ্টি। তাই মানুষের মৌলিক দাবি যে ক্ষুধা, কবি সেই ক্ষুধার্তের অনুভব, প্রেষণার সঙ্গে একাত্ম হন। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে, বাংলার ভৌগোলিক পটভূমিতে ভুখা মানুষের যন্ত্রণা-ক্ষোভ-মেজাজের পরিচয় যখনই কবিতায় বিষয় হিসেবে এসেছে, তা ব্যক্তিক না হয়ে সমষ্টির প্রতিনিধিত্ব করেছে। তাই কবি বলেন :

আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ।
ভাত দে হারামজাদা, তা-না হলে মানচিত্র খাবো।
                   [‘ভাত দে হারামজাদা’; সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে]

উক্ত শব্দগুচ্ছে (ভাত দে হারামজাদা) মধ্যবিত্তের জাতক কবি রফিক আজাদের মুখটি সরে গিয়ে অগণিত ভুখা মানুষের মুখ ভেসে ওঠে। বৃহত্তর জীবনের এই রূপায়ণ, দ্রোহের মেজাজী প্রকাশ কবিতায় আনে নৈর্ব্যক্তিক স্বর। এই স্বরায়ণে কবি হিসেবে তাঁর বিষয়বীক্ষণের স্বাতন্ত্র্য উন্মোচিত হয়। মধ্যবৃত্তিক অবরুদ্ধ রুচি-অহমিকাকে পাশ কাটিয়ে তাঁর চেতনার গভীরে জায়গা নেয় দ্রোহ। তাই অবলীলায় কবিতায় জানান দেন ‘দরকারি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধের সুপারিশ’ (উক্ত নামধারী কবিতায়)। পরবর্তী কাব্যগুলোতে মানুষের মৌল চাহিদার বিষয়ে তাঁর সামূহিক দ্রোহের বহিঃপ্রকাশ অব্যাহত থাকে, তবে তা ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতার মতো ততোধিক ব্যঞ্জনার অধিকার পায়নি। উদ্ধৃতিস্বরূপ কিছু কবিতাংশ স্মরণ করা যেতে পারে :

ক.       মোটকথা, দু’বেলা পেটপুরে খেতে না পাওয়া
          মানুষের শাদা চাদর বিষয়ক এই সমস্যার
          জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে
          যোগ্য ও যথাযর্থ সমাধান হওয়া দরকার।
                   [‘চাদর-বিষয়ক-দৃষ্টি আকর্ষণীয় প্রস্তাব’: সশস্ত্র সুন্দর]

খ.       ক্ষুধার্ত, বেকার, কোণঠাসা মুক্তিযোদ্ধা ব্যর্থতায়
          বোঝা পিঠে বয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলে রাজপথ
          হাড্ডিসার সমস্ত শরীরে তার শুধু দুটি চোখ
          দৃশ্যমান ধ্বকধ্বক জ্বলে, আরেকটি যুদ্ধের জন্য

          মনে-মনে তৈরি হয় মুক্তির সৈনিক
                                 [‘তোমার দু’চোখ :খুব বেশি দূরে নয়]

গ.       এইখানে রক্ত নিয়ে হোলি খেলা হয়,
          রক্তমূল্যে চাল-ডাল-তেল-নুন কিনে
          মানুষেরা খায়,
          মানুষতো রক্ত বেঁচে খায়-দায় নিজে,
          নিজেরই রক্তে,
          জীবিকা-নির্বাহ চলে প্রকাশ্যে-গোপন
          এ্যাতো রক্ত কেন?
                              [‘এ্যাতো রক্ত কেন?’ :ক্ষমা করো বহমান হে উদার অমেয় বাতাস]

ঘ.       বাবার হাল গেল, গোরু গেল
          মার চুলা নিভে গেল
          মেয়ের পা স্থির হয়ে গেল
          বেণী খুলে গেল, চুল রুক্ষ হলো....

          বাবা : ক্ষুধা
          মা   : ক্ষুধা
          ছেলে : ক্ষুধা
          মেয়ে : ক্ষুধা
                   [‘ক্ষুধা’ : পাগলাগারদ থেকে প্রেমিকার চিঠি]

উপর্যুক্ত প্রতিটি উদ্ধৃতি কবির জীবনাজিজ্ঞাসার স্বরকে ধারণ করে। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের একজন কবি হিসেবে তাঁর প্রেক্ষণবিন্দু ঘিরে থাকে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র। তাঁর কবিতায় সমাজের বৃহত্তর মানুষের দৈনন্দিন জীবনবাস্তবতা প্রতিফলিত হয়। সেখানে চরিত্র হিসেবে আনাগোনা করে ক্ষুধার্ত, বেকার, কোণঠাসা মুক্তিযোদ্ধা অর্থাৎ জীবনসংগ্রামে ব্যর্থ ও ব্রাত্য মানুষ। যার প্রতিকারহীন ক্রন্দন কবিকে তাড়িত করে শতগুণে। তিনি খুব সহজভাবেই এই দাবি মেটানোর পক্ষে। সহজভাবেই বৃহত্তর জীবনের দাবিকে বুঝে নিতে চান বলেই ক্রমোত্তর তাঁর কাব্যভাষা সহজ রূপ পরিগ্রহ করে। আরেকটি যুদ্ধের জন্য তৈরি হয় তাঁর যোদ্ধাহৃদয়, প্রশ্ন তোলেন ‘এ্যাতো রক্ত কেন?’ কখনো কাতর হয়ে হারিয়ে ফেলেন মানুষ, মানবিকতা, পারিবারিক সুখ। কবি অনুভব করেন, কেবল আনুপাতিক ভিত্তিতে ‘ক্ষুধা’ হয়ে ওঠে সর্বগ্রাসী নিয়ামক (ঘ সংখ্যক দৃষ্টান্তে)। উল্লেখ্য, যখন বাংলাদেশের বহু কবি পরাবাস্তববাদ, কলাকৈবল্যবাদ, অবক্ষয়বাদের অন্তরালে কবিতা রচনায় মগ্ন তখন কেনো এ কবি ক্ষুধার্ত মানুষের বিষয়ে এতো চিন্তিত? কেনো তিনি ভিন্নমত বেছে নেন? এর নেপথ্যকারণ সমাজ বিষয়ক সচেতনতা এবং তা প্রকাশের যথাযোগ্য সাহস। প্রসঙ্গত আল্বার্তু কামুর (১৯১৩-১৯৬০) সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তিনি (আল্বার্তু কামু) সিদ্ধান্ত দেন : এ রকম প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তির বিদ্রোহ সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য এক প্রয়োজনীয় শর্ত। ‘আই রেবেল- দেয়ারফোর উই একজিস্ট’ [I rebel - therefore we exirt]। তিনি আরো বলেন : শুধু নির্যাতিত মানুষের মধ্যেই এ বিদ্রোহ উদ্ভূত হয় না, নির্যাতনের দৃশ্যমাত্রও বিদ্রোহের উদ্রেক করতে পারে। রফিক আজাদের কবিস্বভাবে সামূহিক দ্রোহের অন্তর্নিহিত সত্য এ বক্তব্যের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। তিনি সমাজস্থ সকল অসংগতিকে নির্মোহ দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করেন। ফলে কবিতায় ‘দু’বেলা খেতে না পাওয়া মানুষের জীবনাচার বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। অকপটে তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতিতে জনসাধারণের প্রকৃত জীবনবাস্তবতাকে শিল্পবিশ্বে উন্নীত করেন। ‘ক’ সংখ্যক দৃষ্টান্তে তিনি ব্যক্তিমানুষ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যকার দূরত্ব এবং হাস্যকর সম্পর্ককে চিত্রিত করেন। সেখানে কবি সন্তর্পণে রাষ্ট্রীয় অনুশাসনের অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেন। এরই সাপেক্ষে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারকে চিহ্নিত করেন, যা পূরণে রাষ্ট্র বারবার ব্যর্থ হয়। কবি সচেতনভাবে এ বিষয়টি কবিতায় তুলে আনেন। আবার সংক্ষিপ্ত বাক্যে ও সংহত উপস্থাপনে তিনি জনসাধারণের প্রাত্যাহিক জীবনসংগ্রামের ছবি আঁকেন।

রফিক আজাদের দ্রোহের স্বর বরাবরই পুরুষোচিত। নিজের ব্যক্তিবিশ্বেই এই পুরুষের আবিষ্কার তাঁকে প্রণোদিত করে, সাহস যোগায় দ্রোহ প্রকাশের। তিনি দেখেন : ‘ভিতর থেকে জেগে উঠল সিংহপুরুষ/ কোনোক্রমে তাকে রোখা যায় না যে তা তোমার ভালো ক’রেই জানা’৮। এই ‘তুমি’ প্রতিষ্ঠানমুখী এবং জনস্বার্থবিরোধী মানুষ, তাদের বিরুদ্ধেই তাঁর চ্যালেঞ্জ। খুব সচেতনভাবে তিনি মধ্যবিত্তের সমালোচনা করেন, প্রকাশ করেন সামূহিক দ্রোহ। তাঁর লেখনীর নেপথ্য কারণও কবিতায় ব্যক্ত করেন এভাবে :

কেন লিখি?—নির্বিবেক মধ্যবিত্ত পাঠকের পরম্পরাময়
মাংসল পাছায় খুব কষে লাথি মারা সম্ভব হয় না বলে
লাথির বিকল্পে লেখা, বারবার, মুদ্রিত পৃষ্ঠার
মাধ্যমে পাঠাই...
                           [‘কেন লিখি’; সশস্ত্র সুন্দর]

কেনো কবির এমন আক্রোশ বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতি? এর জবাব মেলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রমাগত ক্ষয়ের ধারাবাহিকতায়। বিশেষত, বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিরূপ পরিস্থিতি, ঈশ্বরহীন দুনিয়ার বাস্তবতা মধ্যবিত্তের মূল্যবোধে আনে পরিবর্তন। মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব-বিকাশের পারম্পর্য বিবেচনায় তার ভঙ্গুর ও আপোষকামী চারিত্র্যলক্ষণই লক্ষ করা যায়। উপনিবেশ শাসনামলেই উনিশ শতকে মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটে। ক্রমশ এ শ্রেণি উপনিবেশ শাসকের প্রতি অনুগত হয়ে ওঠে এবং ক্রমাগত আপোষ করতে করতে বিপ্লববিমুখ  গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। রফিক আজাদ নিজেও একজন মধ্যবিত্ত। তবে তিনি স্বীয় শ্রেণির সকল অসংগতির বিরুদ্ধে শাণিত। মধ্যবিত্তের মধ্যস্থ সকল অবক্ষয়কে চিহ্নিত করে তিনি বলেন :

আমি রফিক আজাদ বলছি :
তোমরা যারা নকল রাজা, ভাঙ্গা কলম, নকলনবিশ, নফর গোলাম
তোমাদের সব দুর্বলতা, ছিদ্র-টিদ্র, আমার সকল কিছুই জানা—

...       

একমাত্র এই শ্রীমান ছাড়া
নিজের মুখোমুখি হ’তে কোনো শালা
সাহস পায় না॥
          [‘মানব-যৌবন ও স্থান-কাল প্রতিবেশ’ : সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে]

কবি উপলব্ধি করেন, নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস ও অবসর মধ্যবিত্ত হারিয়ে ফেলেছে। ফলত সমাজে বেড়ে যাচ্ছে অবক্ষয়। সভ্যতার জন্য তা নিঃসন্দেহে সংকটজনক। সে সংকটের নিরসনই কবির কাম্য। তাই নিজের ভেতরদিকে আঙুল দেখিয়ে তিনি মধ্যবিত্তের খোলস উন্মোচন করেন কবিতায়। কখনো শ্লেষের সঙ্গে, কখনো বিরক্ত হয়ে আত্মোসমালোচনায় নিমগ্ন হন। কবির প্রত্যাশা মধ্যবিত্তের মূল্যবোধ, তার সম্ভাবনার উপর। ভিতরে সে চেতনাকে জাগ্রত করতেই তাঁর এই দ্রোহ। সময়ের গতিপথে চোরাটানে ডুবে যাওয়া মধ্যবিত্তকে তিনি মেনে নিতে নারাজ, তিনি চান পরিবর্তন। মধ্যবৃত্তিক স্বার্থপরতার বাইরে এসে প্রকৃত মানুষের মতো বাঁচার কথা বলেন তিনি।

কখনো অত্যন্ত শ্লেষের সঙ্গে রাজাকার পিতার উচ্চবিত্ত সন্তান আর মধ্যবিত্ত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের মধ্যস্থ করুণ এবং বিপ্রতীপ সম্পর্ককে তুলে আনেন। অত্যন্ত শ্লেষের সঙ্গে জীবনযাপনের প্রকৃত বিরোধাভাস চিত্রিত করেন। কবি তাঁর সচেতন মানসে অনুধাবন করেন, মধ্যবিত্তের চারিত্র্যগত উদারতা বর্তমান সময়ে পরিণত হয়েছে আপোষকামিতায়। মূল্যবোধের এমন পরিণতি, নির্বিবেক স্বভাবকে যথেচ্ছা ভাষায় গালমন্দ করে কবিতায় তুলে আনেন কবি। পরিত্রাণ চান এই অব্যবস্থার, যা সভ্যতার জন্য ক্ষতিকর। এই আক্রোশেই কবি কখনো ‘আগ্নেয়াস্ত্র’ চান, ‘মানুষ’ শব্দটি লিকে মুখে দিতে চান। কখনো নন্দনবীক্ষার সীমা লঙ্ঘন করে বলেন ‘শুয়োরের বাচ্চা’। কবিতায় মধ্যবিত্তের প্রতি রাগী, সংক্ষুব্ধ, কর্কশ মনোভঙ্গীর প্রকাশ মেলে। কবির এতসব প্রতিক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে সমাজের সুস্থতার প্রতি, মানুষের প্রতি দায়বোধ। তাঁর নিজস্ব এ ভাষ্য উপস্থাপনে তিনি নান্দনিক উপায় নিতে পারতেন, রূপক-সংকেতের আড়ালে, কিংবা পরাবাস্তবের ইশারায় অচেনা করেও প্রকাশ করতে পারতেন। কিন্তু সে পথ তাঁর আরাধ্য নয়। নজরুল ইসলাম কবিতায় যেভাবে দ্রোহের প্রতিরূপ উন্মুক্ত করেন, যা তার যুগমানসে অনিবার্য ছিলো; তেমনি কৈফিয়তের ভঙ্গিতে রফিক আজাদ বলেন : ‘তেতো হয়ে যাওয়া জীবন থেকে কেউ/ মধুক্ষরা উচ্চারণ আশা করতে পারে না’। তাঁর রচিত ‘মানুষ’, ‘সতর্কীকরণ’, ‘একজীবনে’, ‘নতহও’, ‘কুর্নিশ করো’, ‘অটোবায়োগ্রাফিক অব অ্যান আননোন বেঙ্গলি’ প্রভৃতি কবিতায় এরই অনুরূপ চেতনা প্রবহমান। ভিতরসন্ধানী আলো ফেলে মানুষ খোঁজার জন্য নগরের অলি-গলিতে ঘুরে বেড়ান কবি। অথচ কবির প্রত্যাশিত মানুষের দেখা মেলে পানশালায়। মধ্যবিত্তের সমূহ অবক্ষয়ের সত্যের পাশাপাশি, তাদের ভিতরকার ক্ষয়িষ্ণু সত্তার দ্রোহ উপচে পড়ে পানশালার তর্ক-বিতর্কে। প্রতিক্রিয়াশীল বাজেটের যারা ভুক্তভোগী এবং যারা অন্ধ বাজেটপ্রণেতা উভয়ের এক অদ্ভুত আলাপ ঘটে পানশালায়, মধ্যরাতে। কবি তা প্রত্যক্ষায়ণের অনুভবে কবিতায় বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেন। ‘মধ্যরাতের পানশালা’ থেকেই তিনি মধ্যবিত্তের ক্ষয়প্রাপ্ত স্বপ্নের ভগ্নাংশ কুড়িয়ে নেন, তাকেও দক্ষতার সঙ্গে বানিয়ে তোলেন কবিতা।

৪.

রফিক আজাদ তাঁর চিন্তার উষ্ণতা পরিব্যাপ্ত করেন সমগ্রবিশ্বে। কেননা, মানুষের প্রতি মমতা হতে জাত তাঁর দ্রোহের প্রকাশ। সভ্যতায় ক্ষতিকর দিক প্রসঙ্গে, ক্ষমতার অপব্যবহার, মারণাস্ত্র প্রস্তুতের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ সঞ্চারিত হয় সর্বত্র। ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ শীর্ষক কবিতায় এ বিষয়কেই নন্দনলোকে উপনীত করেন। কবির ধ্বংসোন্মুখ সভ্যতার প্রতি সুতীক্ষè প্রতিরোধের প্রকাশ এ কবিতায় প্রাধান্য পায়। খুব সহজভাবে কবি তাঁর স্বপ্নগুলোকে দেশ-মাটি মানুষের সমন্বয়ে ইউটোপিয়া’য় পরিণত করেন। যা সম্ভাবনা, আশাবাদ, সৌন্দর্য ও সুস্থতার প্রতিনিধিত্ব করে। আবার এক অর্থে তা সামূহিক দ্রোহ, যার রূপ শান্ত ও দৃষ্টান্তমূলক। চুনিয়া নামক গ্রামের উপর কবি সেসব গুণ আরোপ করেন, তা ধ্বংসকামী সভ্যতার বিপরীতে মাতৃসুলভ আশ্রয়। কবি সযত্নে এ ব্যক্তিক বিষয়টিতে নৈব্যক্তিক ব্যঞ্জনা  যোজিত করেন। কবিতায় তার শিল্পিত প্রকাশ এমন :

রক্তপাত, সিংহাসন প্রভৃতি বিষয়ে
চুনিয়া ভীষণ অজ্ঞ:
চুনিয়া তো সর্বদাই মানুষের আবিষ্কৃত
মরণাস্ত্রগুলো
ভূমধ্যসাগরে ফেলে দিতে বলে॥
[‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ :চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া]

উদ্ধৃতাংশে কবির অন্তরের যে বিশ্বাস ও স্বপ্ন প্রকাশ পায়, তা মূলত প্রকৃতির কোলঘেষা প্রান্তজনের জীবন। কবি সেই বিষয়কেই সজীব করে তোলেন যা মানুষ ও সভ্যতার জন্য মাঙ্গলিক। রক্তপাত, সিংহাসন প্রভৃতি রাজন্যদের বিষয়ে চুনিয়াবাসীর কোনো আগ্রহ নেই, যা এক ধরনের প্রতিবাদ। আরো বড় প্রতিবাদ—‘চুনিয়া শান্তির কথা বলে’। এমনকি ‘মরণাস্ত্র’, যার প্রভাবে নয়া উপনিবেশবাদ অনুন্নত বিশ^কে ক্ষমতার দম্ভে পদদলিত করে রাখে, আশংকায় রাখে পৃথিবীর মানুষকে, প্রকৃতির স্বাভাবিকতার পরিপন্থী—তার বিনাশ চায় ‘চুনিয়া’। ভূমধ্যসাগরে অস্ত্র নিক্ষেপ করে সমূলে উৎপাটন করতে চায় ধ্বংসের সকল বীজ। ‘চুনিয়া’ নামক আর্কেডিয়ার স্বপ্ন কবির একার নয়, তা তিনি সঞ্চারিত করেন পাঠকের হৃদয়ে। খুব মৃদুস্বরেই নীরব ও যুগপৎ দ্রোহ এখানে প্রকাশ পায়। কবি সশস্ত্র সুন্দরের প্রতীক্ষা করেন, যা সহসা এসে পতন আনবে সকল অসুন্দরের।

এরই অনুপূরক আরেকটি কবিতা ‘হারানো কবিতাগুলো আমার’। কবিতাটির রচনাকাল ১৯৮০-১৯৮২। যখন স্বৈরশাসকের শাসনে অতিষ্ট জনজীবন, তখনই এ কবিতার জন্ম। এ কবিতার সৃষ্টি প্রসঙ্গে কবি প্রথমেই স্মরণ করেন ববি স্যান্ডস্রে উক্তি। আমরণ অনশনকারী এ আর্মিসদস্য মৃত্যুর আগমুহূর্তে জেল ডায়রিতে যে অনুভূতিকে লিপিবদ্ধ করেন, তার দ্বারা কবির চেতনালোক উজ্জীবিত হয়। সুদূর অ্যায়ারল্যান্ডের এক মানুষের প্রতিবাদের সঙ্গে বাংলাদেশের এক কবির চেতনা একাত্ম হয়, কেননা উভয়ের প্রতিবাদ ইতিবাচক রূপান্তরের সাপেক্ষে। ববি স্যান্ডসের লিখিত বক্তব্য :  ‘Somone should write a poem of tribulations of a hunger striker. I would like to, but how could I finish it?’ এ বক্তব্য কবির অন্তঃকরণ আলোড়িত করে, তিনি অনুভব করেন বিশ্ববোধ। ভৌগোলিকার সীমা পেরিয়ে তাঁর দ্রোহী সত্তা সেই যুগনিষ্ঠ কবিতার সন্ধান করে, যা হারিয়ে গেছে। বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলতে কবি সময়ের যোগ্য পরিভাষা খোঁজেন। তাঁর স্মৃতিতে জড়ো হয় বহু অনাস্বাদিত অভিজ্ঞতা। কবি তখন তাঁর কল্পনাকে প্রসারিত করেন। ফলে বিশ্ববোধে অন্বিষ্ট কবিতারা যেন সত্যিকার জীবন্ত সত্তায় পরিণত হয়; তারা হাসে-কাঁদে-প্রতিবাদ করে, এমনকি তারা স্বাধীনতা ও নিজ আত্মমর্যাদা বজায় রাখতে মিছিলে সোচ্চার হয়ে ওঠে। রজার মোলান্ডারের ‘গ্রাউন্ড জিরো উইকে’ বোমা-বিরোধী মোমবাতি শোভাযাত্রায়ও অংশ নেয় কিছু কবিতা। এ প্রসঙ্গটি কবি উপস্থাপন করেন এভাবে :

অন্যায়কে রুখতে আমার কিছু কবিতা ববি স্যান্ডসের মতো
আমারণ অনশন করে যাচ্ছে—
         ...

খুনীর রক্তাক্ত হাত যখন শান্তি-পুরস্কারের সনদপত্র
গ্রহণ করে তখন আমার কবিতাগুলি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে,
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে—
       [‘হারানো কবিতাগুলো আমার’ : একজীবনে]

এক্ষেত্রে বোঝা যায় কবিতার নিকট কবির প্রত্যাশা এমন, যা হবে সত্য ও বিপ্লবের সারাৎসার। কবিকল্পনায় তা হয়ে উঠবে জীবন্ত সত্তার প্রতিভূ, ‘কমর্’ থেকে যা ‘কর্তা’য় রূপান্তরিত হবে। কবিতা হবে নিপীড়িত মানুষের মূলমন্ত্র, এমনই প্রচলরীতির বাইরে কবিতার ক্ষমতাকে অনুভব করতে চান কবি। এ প্রত্যাশার সঙ্গে মিলে যায় ‘আরো কবিতা পড়ুন’ [১৯৬০ সালের সেনেট হলে কবিতাপাঠের আসর] এবং ‘অধিক কবিতা ফলাও’ [আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যহেতু পাঠক কমে যাওয়ার অভিযোগে জবাব দেবার অভিপ্রায়ে ঢাকার রমণা রেস্তোরাঁয় কবিদের সভা] স্লোগানের মৌলস্বর। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রাক্কালে শক্তি চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৩-১৯৯৫) ‘সীমান্ত-প্রস্তাব-১’ শীর্ষক কবিতায় লেখেন : ‘কবিতা ভাতের মতো কেন লোকে নিতেই পারছে না / যুদ্ধ বন্ধ হলে নেবে ...।’ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, আধুনিক কবিতার সূচনালগ্নেই তার দুটি অভিমুখ লক্ষণীয়। এর একটা দিক অবক্ষয় ও নেতির দিকে, অন্যটি ইতিবাচক, দ্রোহ এবং স্বপ্নের স্বপক্ষে। তাই কবিতার বিশ্বমানের ইতিহাসে পাউন্ড, এলিয়টের পাশাপাশি পাবলো নেরুদা, নাজিম হিকমত, ফয়েজ আহমদ ফয়েজের মতো কবিরও দেখা মেলে। এই শেষোক্ত কবিরা মানবতা নিয়ে উৎকণ্ঠিত, তবু হার না মানা স্বভাবে অন্তর্লীন তাঁদের কবিতা। রফিক আজাদ এই শেষোক্ত আধুনিকতার প্রতি আস্থাবান, তাই ‘আত্মকথনযুক্ত’ (কনফেশনাল) কবিতাশৈলী গ্রহণে তিনি আগ্রহী হন। ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার কথা বলেই পাঠকের বোধের জগতে উন্মুক্ত করেন রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতের সারবত্তা। আটের দশকের আগ পর্যন্ত তাঁর সামূহিক দ্রোহের প্রকাশভঙ্গিটি যতটা উচ্চকিত কিংবা প্রত্যক্ষ ছিলো, পরবর্তী দশকে তার রূপ ভিন্ন হয়ে ওঠে। এ দশকের কবিতায় তাঁর দ্রোহের স্বর প্রকৃতিঘেঁষা, মেদুরতার কাছাকাছি। তিনি এক সহজ সমাধানের নির্দেশ দেন, যা এক আধ্যাত্মিক আবহমিশ্রিত। তিনি আস্থা রাখেন ‘বর্ষণ’ বা ‘অবিরল বৃষ্টিপাতে’র সবুজ উর্বরতায়। একেই কবিতার অন্যতম বিষয়ে রূপ দেন। এই শক্তিই তাঁর নিকট ‘সশস্ত্র সুন্দর’ বলে প্রতিভাত হয়। কবিতার এর ধারাবাহিকতার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় এভাবে:

ক.       সমস্ত শরীর ব্যেপে, চেতনার স্তরে স্তরে আর
          মস্তিষ্কের কোষে-কোষে, হাড়ে ও মজ্জায়

          জলের প্রবাহ চাই-হৃদয়ে বর্ষণ;
[‘জলভরা মেঘ চাই যখন খরায়’ :হাতুড়ির নিচে জীবন]

খ.       দুই পঙ্ক্তির মধ্যবর্তী ঐ শাদা অংশজুড়ে
                   দৃষ্টি অন্ধ করা বৃষ্টিপাত হলে খুব ভালো হয়॥

[‘দুই পঙক্তির মধ্যবর্তী শাদা অংশ জুড়ে তীব্র বৃষ্টিপাত চাই’:খুব বেশি দূরে নয়]

গ.       এই ঋতু মাঙ্গলিক-ময়ূর আনন্দে
                   মাতো কৃষি সভ্যতার সকল সন্তান।

[‘ময়ূর আনন্দে মাতো’:বর্ষণে আনন্দে যাও মানুষের কাছে]

প্রতিটি পঙ্ক্তিতে ‘বৃষ্টি’ সকল শুভবোধ, উর্বরতা, সশস্ত্র সুন্দরের প্রত্নকল্পরূপে প্রতিষ্ঠা পায়। কবির চেতনায় এই দ্রোহের নেপথ্যেও সক্রিয় সভ্যতার সকল অসুন্দরকে সমূলে বিনাশের শপথ। তাঁর বৃষ্টিবন্দনা যেন অধ্যাত্মিক মুক্তির সুর ব্যক্ত করে। তিনি ক্রমাগত নগরের জমকালো মিথ্যাকে প্রত্যাখান করে প্রকৃতির শ্যামলিমা, আদিম জীবনাচারে আত্মার শান্তি খুঁজে ফেরেন। এই প্রয়াসকেও কবিতায় বিষয় হিসেবে ব্যক্ত করেন। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মের নিকট রেখে যেতে চান প্রকৃত জীবনদর্শনের দৃষ্টান্ত। সভ্যতার নোংরামিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে তাঁর প্রত্যাশাকে ঘিরে থাকে ‘রৌদ্রালোক’, ‘লাউডগা/ কচি কোলাহল’ (‘জ্যোতির্ময় ভিড়ে’ শীর্ষক কবিতা)। এভাবেই এক নধর শিশুর অবুঝ চোখের দৃষ্টিতেই তিনি বুঝে নিতে চান যন্ত্রসভ্যতাকে, খুব সহজেই তাকে প্রত্যাখ্যানও করেন। কবিতায় বলেন:

মোর কাছে ন্যাংটোপুটো হিসুকরা শিশুর জীবন—
যন্ত্রে কিবা প্রয়োজন অযান্ত্রিক শিশুর জীবনে?

          [‘বিল গেটস্ আইর কেনে হুদাহুদি আমার দুয়ারে’ : বর্ষণে আনন্দে যাও মানুষের কাছে]

এই স্বপ্নকে নবজাতকের সম্মুখে রেখেই কবি তাঁর সামূহিক দ্রোহের মশাল প্রজ্জ্বলিত করেন। স্বপ্নের সে মশাল হাতফেরী হোক প্রতিটি শুভবোধাশ্রয়ী মানুষের কাছে এটাই যেনো তাঁর প্রত্যাশা। সর্বোপরি, প্রতিকারহীন এক সময়ের বিশ্বস্ত ছবি অংকন করেই রফিক আজাদ তাঁর দেশ-কালের অনিবার্য কবি হয়ে ওঠেন। কিন্তু কবির সত্য ও স্বপ্নের সন্ধান তাঁর কবিতায় কালোত্তীর্ণ উপাদানের সংযোগ ঘটায়। কবি তাঁর কবিতায় সেই প্রবহমানতার সঞ্চার ঘটান, যা মানুষের চিরায়ত জীবনেরই অনুষঙ্গ। কবি এই বিশ্বাসে থিতু হন : ‘প্রতিটি নাচের শেষে কোনো তৃপ্তি নেই, /সর্বশেষ বলে কোনো তৈরি মুদ্রা নেই/ আমার যেখানে শেষ অন্য কারো শুরু সেইখানে’ (‘নর্তকী’ : চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া)। এভাবে জীবনের সমগ্রতাকেই শিল্পের সত্যে উন্নীত করেন, এ নন্দনের সূত্রে তাঁর কবিতা  কবির সৃজন ও মননের বহুভুজ অভিযাত্রার অভিজ্ঞান বহন করে।

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বন্যা মোকাবিলা: প্রকৃতির ভ্রুকুটি ও আমাদের বিস্কুট দৌড়
বন্যা মোকাবিলা: প্রকৃতির ভ্রুকুটি ও আমাদের বিস্কুট দৌড়
বঙ্গবন্ধু কূটনৈতিক উৎকর্ষ পদক পাচ্ছেন দুই রাষ্ট্রদূত
বঙ্গবন্ধু কূটনৈতিক উৎকর্ষ পদক পাচ্ছেন দুই রাষ্ট্রদূত
বিজিএমইএ’র নতুন লোগো
বিজিএমইএ’র নতুন লোগো
সীতাকুণ্ডে কনটেইনার বিস্ফোরণ: এক মাসেও অগ্রগতি নেই মামলার
সীতাকুণ্ডে কনটেইনার বিস্ফোরণ: এক মাসেও অগ্রগতি নেই মামলার
এ বিভাগের সর্বশেষ
খোঁপায় গমখেতের মায়া
খোঁপায় গমখেতের মায়া
বুভুক্ষাই জন্ম দিয়েছে ইরোটিকার
বুভুক্ষাই জন্ম দিয়েছে ইরোটিকার
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার মঙ্গলবার
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার মঙ্গলবার
কুসতুনতুনিয়ায় কয়েকদিন
পর্ব—চারকুসতুনতুনিয়ায় কয়েকদিন
মানববাদী মধুসূদনের নারীপ্রগতিভাবনা
মানববাদী মধুসূদনের নারীপ্রগতিভাবনা