X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২২ আষাঢ় ১৪২৯

আবিদ আজাদ বাংলাদেশের কবিতার ব্র্যান্ড এম্বাসেডর

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২২, ১৬:০৩

[আবিদ আজাদ বাংলা ভাষার একজন আধুনিক কবি। তিনি বাংলাদেশের বিংশ শতাব্দীর কবিতার ইতিহাসে সত্তর দশকের সঙ্গে চিহ্নিত। তার কবিতা লিরিকধর্মী, অনুচ্চকণ্ঠ এবং চিত্রময়। তিনি ‘শিল্পতরু’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশক করতেন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ নভেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার চিকনিরচরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সত্তরের কালপর্বে কবিতার ভুবনে আবিদ আজাদের (১৯৫২-২০০৫) আবির্ভাব। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঘাসের ঘটনা (১৯৭৬) প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তরুণতম কবি হিসেবে পাঠক ও বোদ্ধা মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। ষাটের দশকের সংগ্রাম, সংঘাত, আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সত্তরের কবিদের মানস গঠনে ক্রিয়াশীল ছিল। তিনি ২০০৫ সালের ২২ মার্চ ৫২ বছর বয়সে ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।]

আবিদ আজাদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঘাসের ঘটনা (১৯৭৬) পড়তে গিয়ে বারবার কেন যেন আবুল হাসান উঁকি মারে। সাহিত্য সমালোচনায় একজন পড়তে গিয়ে আরেকজন উঁকি মারাকে খুব একটা ভালো চোখে দেখা হয় না। কারণ এটা দিয়ে একজনের ওপর আরেকজনের প্রভাবকে বোঝায়। কিন্তু আবিদ আজাদকে পড়তে গেলে আবুল হাসান উঁকি মারাটা সেই অর্থে নয়। আবুল হাসান যেমন ষাটের হয়েও ষাটের নন, আবিদও তেমনি সত্তরের হয়েও সত্তরের নন। তাঁরা উভয়েই তাঁদের নিজস্ব দশককে পাশ কাটিয়ে নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে পেরেছিলেন। দুজনই পরবর্তী সময়ের কবিতা লিখতে পেরেছিলেন। জাতীয়তাবাদী ডামাডোল এবং রাজনৈতিকতাকে পাশ কাটিয়ে নিজের অনুভূতির পসরা মেলে ধরার তাকৎ দেখাতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশের কবিতায় জাতীয়তাবাদী ও রাজনীতিস্পৃষ্ট অনেক ভালো কবিতার কথা মাথায় রেখেও বলা যায়, আবিদ আর হাসানের কবিতার দাঁড়ানোর জন্য জাতীয়তাবাদের ঠ্যাকনা বা রাজনীতির প্যালা প্রয়োজন হয়নি। আবিদ আজাদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঘাসের ঘটনা পড়ে যেকেউ এই কথার সত্যতা সহজেই টের পাবেন বলেই মনে হয়। শুধু কবি হিসেবেই সত্তরের দশকে আবিদ আজাদ আত্মপ্রকাশ করেছিলেন, অন্য কিছু নয়।

নির্জনতা ভালোবেসে, নৈঃসঙ্গ্যের আবেশ উপভোগ করতে, নৈঃশব্দ্যের নিমন্ত্রণে, নিজের সাথে নিজের জীবনের মধু উদযাপনের ব্যক্তিগত প্রেরণা থেকে আবিদ কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন। তাঁর ঘাসের ঘটনা যখন লেখা হচ্ছে, অথবা যখন লেখা হচ্ছে আমার মন কেমন করে (১৯৮০) তখন বাংলাদেশের ক্যান্টনমেন্টে, পল্টন ময়দানে, বঙ্গভবনে, আন্ডার গ্রাউন্ডে, আমেরিকান দূতাবাসে এবং আরো বিচিত্র গুহায় নির্ধারিত হয়ে চলেছে পরবর্তী বাংলাদেশের বিধিলিপি। এবং এসব নিয়েই মূলত বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রায় সব শাখা গুমরে মরছে, উত্তেজিত হচ্ছে, মুষড়ে পড়ছে এবং অবশ্যই ক্ষুব্ধ হচ্ছে। কিন্তু এসব নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামাচ্ছেন না আবিদ আজাদ। তিনি একের পর এক কবিতায় নির্মাণ করে যাচ্ছেন নিজের জন্মমুহূর্ত, হারানো কৈশোর, বিগত প্রেমিকার স্মৃতি। লিখছেন, ‘নৌকার গলুইর মতো একা, হে আমার ছেলেবেলা, রাজহাঁস/তোমাদের ভিতরে সিল্কের সেই পুকুরের জল/আজো ডানা ঝাড়ে নাকি? ঝরে নাকি পাখার সাদায়/শেফালির গণ্ডদেশ রাঙা করা বালকের হাত?’। তিনি ক্রমাগত ঘুরছেন ফেলে আসা মফস্বল প্রকৃতির বিষণ্ন মখমলে। উচ্চারণ করেন ‘আমার মন কেমন করে’। বলেন, ‘একেকদিন নদী, একেকদিন পাখি, একেকদিন পাখি আর নদীর কাছে গিয়ে দাঁড়াই/তোমার আসবার কথা থাকলে এমন হয়—আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে/হিমঝরা পথ দিয়ে চলে যায় একেকটা সারা দিন/এমনভাবে যায় যেন এক-টুকরো পাথর আমি রাস্তায় পড়ে আছি।’ এইসব নিয়ে কেটেছে আবিদের কবিত্বের প্রথম দশ বছর। বাংলাদেশের গ্রহণকালের দশবছর আবিদ মূলত নিবিড় নৈঃশব্দ্যের কবি। এই সময়ের শুরুতেই তিনি আবিষ্কার করেছেন যে, তিনি নিবিড় কবি। আবিষ্কার করেছেন, ‘আমি নষ্ট আমি নষ্ট মৌলভি সাহেব। আমাকে ফুঁ দিয়ে আর লাভ নেই।’

সত্তরের দশককে বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে মোটাদাগে রাজনৈতিক চিৎকৃতির দশক বলা হয়। জাতীয়তাবাদী আবেগ পঞ্চাশ ও ষাটকে কাঁপিয়েছিল। সেই আবেগ সত্তরে এসে ভাটায় পড়ে। তৈরি হয় বিচিত্র হতাশা আর বিশৃঙ্খলা। সত্তরের কবিতা, শুধু কবিতা বলি কেন, পুরো সাহিত্যজগৎ, এই হতাশা আর বিশৃঙ্খলাকে ধরতে উদ্বাহু হয়েছে। ফলে, চিৎকার—বিশেষত কবিতার—নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আবিদ আজাদ তাঁর প্রথম দুই কাব্যগ্রন্থকে এই ঝাঁপটা থেকে দারুণভাবে বাঁচাতে পেরেছিলেন। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত অনুভব-অনুভূতিকে ব্যক্তিত্ববান উচ্চারণে মুড়ে ফেলতে পেরেছিলেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থের একটা বড় অংশ কবিতায় আছে যৌবনের শুরুতে একটা মায়াময় চোখে কৈশোরকে দেখার এবং মিস করার এক মেদুর সানাই। আর এই কৈশোরকে তিনি কাব্যিক রূপ দেন অবশ্যই তাঁর চিরকালের প্রিয় প্রসঙ্গ গ্রাম দিয়ে।

কিন্তু আমরা লক্ষ করব, তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ বনতরুদের মর্ম (১৯৮২) থেকে আবিদ বিচলিত হয়ে উঠেছেন। তিনি ‘এক দশকের বেদনাসংক্রান্ত’ কবিতা লেখার দিকে পা বাড়িয়েছেন। এটা কিছুটা বিস্ময়কর বৈ কি! সম্ভবত দেশ ও দশ নিয়ে তিনি ক্রমাগত হতাশ হতে হতে শেষে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় কবিতায় রাজনীতিকে ধারণ করা শুরু করেছেন। তিন হয়তো কবিতাই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শুধু কবিতা আর তাঁর করা হয়নি। করতে পারেননি। দেশ ও দশ তাঁকে অসহিষ্ণু করে তুলেছে। কোথাও কোথাও এই অসহিষ্ণুতা খিস্তিতে পরিণত হরেয়ছে। যেমন, বনতরুদের মর্ম কাব্যগ্রন্থের ‘গোধূলির হত্যাকাণ্ডে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সংলাপ’ কবিতাটির কথা উল্লেখ করা যায়, ‘দে শালাকে পাই-পাই করে গুনে খরচ করে দে!/আমাদের মতো জীবনের ভিতরে উপুড় হয়ে পড়ে-পড়ে/বাস্তবের রংবাজি আর গোয়ামারা খেতে-খেতে/আমাদের মতো শুধু-শুধু বেঁচে থেকে দেখে যাক/গোধূলির রাঙা-মৃত্যু, দেখে যাক উজ্জ্বল যন্ত্রণা...।’ আসলে আবিদের এই রূপান্তর হঠাৎ এবং অবিশ্বাস্য বটে! যেন এমন যে, অনেক হয়েছে আর না। এবার কথা বলতেই হবে।

এখান থেকে আবিদ বলতে শুরু করেছেন দেশ নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে। এ সময় থেকে তিনি পাছায় কষে লাথি দেয়ার ভাষা আর ভঙ্গি আয়ত্ত করে নিচ্ছেন। গলা চড়ে যাচ্ছে তাঁর। বিগত দশকের স্মৃতি হানা দিয়েছে তাঁর কবিতায়। কবিতায় উঠে আসতে শুরু করেছে ‘ভয়ার্ত সব মিলিটারি ভ্যান আর উল্টে থাকা ট্রলির পাশে ক্ষত-বিক্ষত একটা চাঁদ ওঠা রানওয়ে’। কবিতায় উঁকি মারতে শুরু করেছে ‘ছুরি’, ‘লাল রক্ত’, ‘গুপ্তহত্যা’, ‘ভন্ডামি’, ‘চরমপন্থীদের শোভাযাত্রা’, ‘মিছিল’, ‘স্লোগান’, ‘বোমাবাজি’, ‘এয়ারপোর্ট’, ‘প্রেসফটোগ্রাফারের ক্যামেরা’, ‘রাষ্ট্রীয় সফর’, ‘কূটনীতিকদের উষ্ণ করমর্দন’, ‘বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের যুক্ত ইশতাহার’, ‘সেক্রেটারিয়েট’, ‘দূতাবাস’, ‘বাঞ্চোৎ’, ‘ঘুঘুর বাবার ঘুঘু’ এইসব। কারণ, তিনি লক্ষ করেছেন, ‘পারে, আমাদের কবিতা এখন সবই পারে, সবই গ্রহণ করতে পারে—/টিন, সিসা, দস্তা, ঝামা-ইট, নিকোটিন, অস্তপ্রায় জুতোর সুক্তলি/বুড়োদের চোখের গোধূলি, বিমর্ষ রোগীর কফ/স্কুল-শিক্ষিকার ভোর, মৃত্যুন্মুখ কিশোরের চোখ/দুর্ধর্ষ বিকেলবেলা অগ্রজ কবির ভণ্ডামি, সুবিধাবাদ...।’ এই তৃতীয় কাব্যগ্রন্থেই আবিদ তাঁর ‘আমার কবিতাগুলি আর কারো নয়’ কবিতায় বলছেন, ‘আমার কবিতাগুলি সেই কিশোরের/সারা ক্ষণ যার গলা দিয়ে থোকা-থোকা লাল গোলাপের মতো রক্ত ঝরে পড়ে/আমার কবিতাগুলি সেই যুবকের/মৌমাছিপুঞ্জের মতো যার ঠোঁটে গুঞ্জরণ করে ওঠে সোনালি প্রলাপ/আমার কবিতাগুলি সেই কিশোরীর/যে দেখে রূপার রেকাবিতে জাফরান রঙের আবরণে ঢাকা গলাকাটা মুণ্ডু।’ আবিদ হতাশ হয়েই এই সময়ে এসে যেন সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, ‘আমি বলছি কিচ্ছু হবে না’। বলছেন, ‘কী হবে গণতন্ত্র দিয়ে যদি কাঁধে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন আর বুলেটের/জ্যোৎস্নাজ্বলা গর্ত নিয়ে ঝিলের জলে ভেসে থাকে অজ্ঞাত যুবকের লাশ?/যদি শীতের মফস্বল শহর থেকে কাঁচা হাতের লেখা নিয়ে নিরুদ্দেশ ভাইয়ের/ঠিকানা ঘুরে রোজ-রোজ ফিরে যায় ছোট বোনের চিঠি?/যদি আমি রুমাল হারিয়ে বারবার ফিরে আসি বিষণ্ন সন্ধ্যায়/যদি আমি দাঁড়াতে না পারি আর ঝাউগাছের মতো একা/তাহলে হবে না। আমি বলছি হবে না। হতে পারে না।’ অর্থাৎ আবিদ আজাদের কবিতার মধ্যে দেশ, দেশের রাজনীতি, নৈরাজ্য দেখা দিতে থাকল যেন একটু পরে। এ যেন আবিদের বিলম্বিত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। আবিদ আসলে বিলম্বিত সত্তরের কবি। নাকি আবিদ আশির দশকে বসে সত্তরের দশকের কবিতা লিখেছেন! বনতরুদের মর্ম কাব্যগ্রন্থের পর থেকে আবি অবশ্য পুরোপুরিভাবে তাঁর নিজের দশকের বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে কবিতা লিখেছেন। বিশেষত শীতের রচনাবলি (১৯৮৩) ও আমার স্বপ্নের আগ্নেয়াস্ত্রগুলি (১৯৮৭) কাব্যগ্রন্থে উচ্চৈঃস্বরের কবিতা আরো বেড়েছে।

প্রথম দুটি কাব্যগ্রন্থের পর আবিদ আজাদের কবিতার শুধু যে বিষয়ের অভিমুখ পরিবর্তিত হয়েছে তা নয়, কবিতার ফর্মেও একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রথম দিককার কবিতাগুলো কবির বিচিত্র একান্ত ব্যক্তিগত অনুভবে ঠাঁসা। ফলে একই কবিতার বিভিন্ন স্তবকে অনুভূতি দানা দানা পড়ে গেছে। কিন্তু পরের দিকের কবিতায় কবির অস্থিরতা যত বেড়েছে তত তিনি তালিকার দিকে ঝুঁকেছেন। ক্যাটালগধর্মী বা তালিকাপাতী কবিতা রচনার একটা মৌসুম গিয়েছে আবিদ আজাদের মধ্যভাগের কাব্যগ্রন্থগুলোতে। ভাষাও সংগত কারণে চেনা। ভাষার অভাবিত ভাংচুর এই পর্বে কম। ভাষার গায়ে যতটা না কাব্যময়তার গন্ধ তারচেয়ে দিনানুদৈনিকতার গন্ধ বেশি। কোনো সন্দেহ নেই যে, এই পর্বে আবিদের কবিতা তাঁর স্ব-স্বভাবের কিছুটা বাইরে গেছে এবং সশব্দতা গ্রাস করেছে নৈঃশব্দ্যকে। কবিতা বেশ মার খেয়েছে। কিন্তু দেশ ও দশের জন্য একটি উৎকণ্ঠিত কবি হৃদয়ের আন্তরিক আর্তি এই পর্বের কবি এবং কবিতাগুলোকে দায়িত্ববান করে তুলেছে। এটা আবিদের কবিতার আরেক প্রান্ত। তবে, একথা অনস্বীকার্য যে, এই ধারাটি আবিদের কবিতার মূল ধারা নয়। নৈঃশব্দ্য আর বিষাদের বিচিত্র উদ্ঘাটন আর উপভোগই আবিদের মূল পরিচয়। একারণে মধ্যপর্বের উচ্চকণ্ঠ শেষ পর্বে আবার শমিত হয়েছে। আবার তালিকাপাতী কবিতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আবার আবিদ প্রত্যাবর্তন করেছেন তাঁর নিজ স্বভাবে। তবে, একথা বলতেই হবে, আবিদ সব সময়েই থেকেছেন গ্রামীণ অভিজ্ঞতা আর প্রকৃতির কাছে।

আবিদ আজাদ পঞ্চাশ আর ষাটের মতো নাগরিক সাজতে যাননি। তিনি শহরে যা নিয়ে এসেছিলেন তাই দিয়েই তাঁর কবিতার জগৎকে নির্মাণ করেছেন। একারণে আবিদ বাংলাদেশের কবিতায় বরাবরই এত সজীব, আরামদায়ক। একারণেই তাঁর কবিতা আপন ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরার মতো অনুভূতি দেয়। আবিদ কৃত্রিম কবিতা লিখতেন না। তিনি গ্রামের মধ্যে শহরকে, ‘আধুনিক’ মানুষের অনুভূতিকে, পুরে দিয়েছেন। আধুনিকতার জন্য তাঁকে শহুরে হতে হয়নি। গ্রাম বিসর্জন দিতে হয়নি; যেমনটি হয়নি আল মাহমুদকে। আবিদ দেউলিয়া হয়ে গ্রামের কাছে ভিক্ষুকপনা করেননি। হাত পাতার গ্লানি ঢাকায় অনেককে কবি হতে দেয়নি।

বাংলাদেশের কবিতা থেকে এই ব্যাপারটা অর্থাৎ গ্রামের অনুভূতিটি বিসর্জিত হতে শুরু করে আশির দশকে এসে। তখনকার বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের কবিদের একটা বড় অংশ কবিতার জন্য হাত পাতেন মাথার কাছে, বুদ্ধির কাছে, কলকতার কাছে। অনেকের মতে, শামসুর রাহমানদের প্রজন্ম বহু সাধ্য-সাধনা করে কবিতাকে যে স্বদেশে নামিয়ে এনেছিলেন আশিতে আবার কবিতা কলকাতার কাছে হাত পাতে। বাংলাদেশের কবিতার উপনিবেশায়নের এটি দ্বিতীয় ঘটনা। জনবিচ্ছিন্ন কবিতা লেখার এটি দ্বিতীয় যাত্রাকাল। স্বাধীনতার পর ‘কৃত্রিম কবিতা’র উর্বর সময়ের শুরুও এটি বলে অনেকে মনে করেন। কেউ কেউ অবশ্য এর বাইরে গিয়ে লিখেছেন। তা তো লিখবেনই। অধিকাংশই যখন ঘুমিয়ে থাকে তখনও কেউ না কেউ জেগে থাকে। কিন্তু মূল প্রবণতা ছিল এটাই। আবিদ এসবের বাইরে থাকতে পেরেছেন চিরকাল। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম দেশাল কবি। একারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কবি বলে মনে করি।

আবিদ উচ্চকণ্ঠ এবং নীরব। আবিদ সবার আবার নিজের। এই দ্বৈতসত্তার উপস্থিতি আবিদের কবিতাকে কখনোই পুরোপুরি শ্লোগান বা রাজনীতি হতে দেয়নি। কবিতার মধ্যেই রেখেছে। আবিদের রাজনৈতিক কবিতা পড়তে গেলে কবিতাও পড়া হয়, রাজনীতিও পড়া হয়। এটা বাংলাদেশের খুব কম কবির ক্ষেত্রে ঘটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনীতি কবিতাকে ছাপিয়ে যায়। কিন্তু আবিদের কবিতা অধিকাংশ সময় শাসন করেছে রাজনীতিকে। তিনি কবিতাকে বিসর্জন দিয়ে রাজনীতি সচেতন হয়েছেন কখনো কখনো; কিন্তু তা কম।

দেশ সম্পর্কে বাজারে একটা ধারণা চালু থাকে। সেই চালু ধারণাকে শিল্পিতভাবে লিপিবদ্ধ করে কবিতা লেখেন অধিকাংশ কবি। কিন্তু আবিদ দেশকে এবং দশকে আবিষ্কার করেন অন্যের চোখ দিয়ে নয়; বাজারি ধারণা দিয়ে নয়। নিজের চোখ এবং হৃদয় দিয়ে দেশকে উপলব্ধি করেন। তবে তিনি চোখে দেখেন কম, হৃদয়ে অনুভব করেন বেশি। তিনি আসলে বোধের কবি। বাংলাদেশে ঠোঁটের কবি, হাটের কবি, বাটের কবি বেশি। বোধের কবি কম। আবিদ এই গোত্রের কবি। কিন্তু সত্তর সম্পর্কে বাজারে যে উচ্চকণ্ঠের কথা চালু আছে আবিদ সেই উচ্চকণ্ঠ দিয়েই বেশি বিচার্য হন। ওই উচ্চকণ্ঠের ফর্মে ফেলে আবিদকে বেশি বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আবিদের উচ্চকণ্ঠের চেয়ে নৈঃশব্দ্যই বেশি সুন্দর এবং প্রবল।

কবিতা অনেক পথ পাড়ি দিয়েছে। বিশ্বকবিতা এবং বাংলা কবিতা উভয়ই। এর মধ্যে নানা পালাবদল ঘটেছে। ফর্ম, ভাষা, আঙ্গিক, প্রকরণে বিচিত্র পরিবর্তন হয়ে নানা পালাবদল হয়েছে। কিন্তু কবিতা শেষ পর্যন্ত উচ্চারণ। আবিদ আজাদ আসলে ফর্মের, প্রকরণের কবি নন; উচ্চারণের কবি। তাঁর উচ্চারণমাত্রই কবিতা। একারণে তিনি ছন্দে কম যান। গদ্যেই তাঁর অনাবিল ও আয়েশী প্রকাশ।

বাংলাদেশে যাঁরা কবির জীবন যাপন করেছেন, কবিতাকে উদ্যাপন করেছেন আবিদ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। একারণে বাংলাদেশে খাঁটি কবির তালিকায় আবিদ বরাবরই এগিয়ে থাকেন; প্রধানদের পংক্তিভাজন হন। অনেকে মনে করেন আবিদ আজাদ কম আলোচিত হন। কথাটা বোধ করি পুরোপুরি ঠিক নয়। বাংলাদেশের কবিতা আলোচনায় আবিদ আজাদ আবশ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নাম। আবিদ বাংলাদেশের কবিতার অন্যতম ব্রান্ড এ্যাম্বাসেডর। তিনি আজীবন বাংলাদেশের কবিতাই লিখেছেন। তাঁর কবিতায় তাঁকে যেমন চেনা যায়, তেমনি মূর্ত হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মানচিত্র। একারণেই আবিদ আজাদ বাংলাদেশের কবিতার আলোচনায় নিয়তির মতো। তাঁকে এড়ানো যায় না।

পুনর্মুদ্রণ : বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পত্রিকা ‘মাদুলি’র আবিদ আজাদ সংখ্যা, ২০২২। 

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
নববধূ সেজে ইয়াবা কিনতে ঢাকা থেকে টেকনাফে
নববধূ সেজে ইয়াবা কিনতে ঢাকা থেকে টেকনাফে
ফেল নয়, বাছাই করে শিক্ষার্থী নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো: শিক্ষামন্ত্রী
ফেল নয়, বাছাই করে শিক্ষার্থী নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো: শিক্ষামন্ত্রী
পদ্মা সেতুর টোল প্লাজার পাশে দুর্ঘটনায় এমপির এপিএসসহ আহত ৩
পদ্মা সেতুর টোল প্লাজার পাশে দুর্ঘটনায় এমপির এপিএসসহ আহত ৩
বাড়ির গ্যারেজে লুকানো ছিল ২৭ কোটি টাকা মূল্যের রোলস রয়েস
বাড়ির গ্যারেজে লুকানো ছিল ২৭ কোটি টাকা মূল্যের রোলস রয়েস
এ বিভাগের সর্বশেষ
পুরস্কারপ্রাপ্তি আনন্দের
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০২১পুরস্কারপ্রাপ্তি আনন্দের
মারুফা মিতার কবিতা
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০২১মারুফা মিতার কবিতা
দিপন দেবনাথের কবিতা
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০২১দিপন দেবনাথের কবিতা
খোঁপায় গমখেতের মায়া
খোঁপায় গমখেতের মায়া
বুভুক্ষাই জন্ম দিয়েছে ইরোটিকার
বুভুক্ষাই জন্ম দিয়েছে ইরোটিকার