X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ
আনিসুজ্জামান

মিছিলের অগ্রভাগের মানুষ

আপডেট : ১৪ মে ২০২২, ১২:৩২

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান অত্যন্ত রাজনীতিসচেতন ছিলেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ এবং তার চূড়ান্ত পরিণতির পথে সংঘটিত হওয়া নানা আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। কখনো বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, কখনো বাঙালি জাতিসত্তা, কখনো রবীন্দ্রসংগীত, তারপর বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রামের শেষ লক্ষ্য– মুক্তিযুদ্ধ– সংগ্রামের এইসব নানা মাত্রায় তাঁর নিজস্ব কর্মজগৎটি পরিপূর্ণ ঋদ্ধ হয়ে উঠেছিল। তাঁর সংগ্রামী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে পবিত্র সরকার লিখেছেন : ‘স্পষ্টভাষী এই মানুষটি (আনিসুজ্জামান) বাংলাভাষী ওই ভূখণ্ডের প্রতিটি আন্দোলনে যুক্ত থেকেছেন– ভাষা-আন্দোলন থেকে সংবাদমাধ্যম এবং ‘পাকিস্তানি’ উত্তরাধিকার থেকে রবীন্দ্র-নির্বাসন এবং রবীন্দ্র-শতবার্ষিকী পালন নিষেধের বিরুদ্ধে আন্দোলন, শেখ মুজিবের সমর্থনে দাঁড়িয়ে ষাটের উত্তাল বছরগুলিকে পার করা, ১৯৬৯-র গণবিদ্রোহে অংশগ্রহণ এবং পরে মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের নেতৃত্বদান, শেখ মুজিবের অতিশয় আস্থাভাজন হয়ে-ওঠা, জাতীয় সংবিধানের বাংলাভাষা রূপদানে তাঁর ভূমিকা, জাতীয় শিক্ষা কমিশনে এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির নানা বিভাগে নেতৃত্ব– পরপর এই ঘটনাশৃঙ্খল তাঁকে এমন এক মর্যাদা দান করে যে, সেখানে প্রায় কেউ তাঁর সমকক্ষ হতে পারেননি।’ 

১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও তার পরবর্তী বাঙালি জীবনের প্রতিটি রক্তাক্ত ও আলোকোজ্জ্বল ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা কেবল পরিস্থিতিগত ছিলো না; ছিলো অস্তিত্বগত ও সমগ্র জীবনশৃঙ্খলার সক্রিয়তায় বিশিষ্ট। সর্বোপরি রাজপথের সংগ্রামের অন্যতম অগ্রপথিকরূপে তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন। ‘সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে আনিসুজ্জামানের অংশগ্রহণ শুরু হয়েছিল ভাষা আন্দোলন দিয়ে। তারপর ৬০-এর দশকে রবীন্দ্র-নির্বাসন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আন্দোলন; উনসত্তুরের গণআন্দোলন; অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ; ৮০-র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ৯০-এর সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলন– সর্বত্রই তিনি ছিলেন পুরোভাগে।’   

তিনি অতি শৈশবে রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। তবে ১৯৪৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে রশিদ আলী দিবসের ধর্মঘটে অংশগ্রহণ এবং পিতার সজোরে চাপোটাঘাত খেয়ে রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস উপলক্ষ্যে গড়ের মাঠে মুসলিম লীগ আয়োজিত সভায় যোগ দিয়েছিলেন পিতার সঙ্গে। পাকিস্তান আন্দোলনের একজন ক্ষুদে সমর্থক হিসেবে নিজের জমানো স্কুলটিফিনের ৩৭ টাকা দান করেছিলেন জিন্নাহ্ ফান্ডে। জিন্নাহর মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন কিশোর তাৎক্ষণিকভাবে এক শোকগদ্য রচনা করলেও অল্প দিনের মধ্যেই তাঁর জিন্নাহ ও পাকিস্তান-মোহ কেটে যায়। দেশবিভাগের অব্যবহিত পরে প্রথমে খুলনায় এবং পরে ঢাকায় আসার পর যুক্ত হন প্রগতিশীল রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। জগন্নাথ কলেজে অধ্যয়নকালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগে যোগ দেন। তাঁদের বাসার পাশেই (৪৩ যোগীনগর লেনে) ছিল এ সংগঠনের অফিস। যুবলীগের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে খন্দকার আনোয়ার হোসেনের মাধ্যমে। সেখানে নিয়মিত যাতায়াতের সূত্রে পরিচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুস সামাদ আজাদ, সরদার আবদুল হালিম, প্রাণেশ সমাদ্দার, এম এ ওয়াদুদ, শামসুজ্জোহা, মোহাম্মদ ইমাদুল্লাহ, দেওয়ান মাহবুব আলী, নূরুল ইসলাম, মিজানুর রহমান, ডা. এম এ করিম, মোহাম্মদ সুলতানসহ অনেকের সঙ্গে। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরেই এ সংগঠনের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এ সময়ে আনিসুজ্জামান ও তাঁর সমকালীনদের জীবনকে গভীরভাবে আন্দোলিত করে ভাষা-আন্দোলন। বলা চলে, ‘ভাষা-আন্দোলনের গনগনে আঁচে পরিশুদ্ধ হন তিনি বালক বয়সেই।’ আটচল্লিশের ভাষা-আন্দোলনের সময় খুলনা জেলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন, তখন রাষ্ট্রভাষা কি তা বুঝলেও মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা আমজাদ হোসেনের (পরে মন্ত্রী) দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে অষ্টম শ্রেণিপড়ুয়া আনিসুজ্জামান ভাষা-আন্দোলনের মিছিলে অংশগ্রহণ করেন নি। বায়ান্নোতে এসে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হলেন। এবারে তিনি জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন পল্টন ময়দানের জনসভায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জগন্নাথ কলেজেও ভাষা-আন্দোলনের ঢেউ লাগে। জগন্নাথ কলেজে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। আনিজুজ্জামান জগন্নাথ কলেজ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য না থাকলেও, এর কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। ৪ ফেব্রুয়ারি এবং ১১ ফেব্রুয়ারির প্রতিবাদ দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন ধর্মঘট এবং পতাকা বিক্রির কর্মসূচি পালিত হয়। সহপাঠীদের সঙ্গে ট্রেনে নারায়ণগঞ্জের যাওয়া-আসার পথে পতাকা বিক্রি করেন। এছাড়া ঢাকা শহরের পোগজ ও সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে ধর্মঘট কর্মসূচি বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করেন। মূলত একজন প্রগতিশীল তরুণ এবং যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক হিসেবে তিনি ভাষা-আন্দোলন সংগঠনে ভূমিকা রাখেন। ভাষা-আন্দোলনে নিজের অংশগ্রহণ সম্পর্কে আত্মজীবনীতে লিখেছেন : ‘ভাষা-আন্দোলনের সময়ে আমি কলেজে পড়ি– প্রথম বর্ষে। আমার ভূমিকা সামান্য কর্মীর ছিল। নিজেকে গৌরবান্বিত করার ঝোঁক নেই। গৌরব বোধ করি শুধু এই কারণে যে, অনেকের সঙ্গে আমিও এই মহান আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম।’

৫২-র ভাষা-আন্দোলনের সময় প্রকাশিত প্রথম পুস্তিকার (রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কী ও কেন? প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ১৯৫২) রচয়িতা ছিলেন আনিসুজ্জামান। পুস্তিকাটি পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের উদ্যোগে প্রকাশিত হয় এবং সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক হিসেবে সেটি রচনার দায়িত্ব বর্তে তাঁর ওপর। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে নবাবপুর রোডে পূর্ব পাকিস্তানি আওয়ামী মুসলিম লীগ অফিসে আয়োজিত ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র সভায় অন্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তিনি এবং তাঁর বন্ধু আহমদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি অগ্নিগর্ভ মুহূর্তে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে উপস্থিত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সমাবেশে। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে রাস্তায় বের হতে শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় পুলিশ টিয়ার সেল নিক্ষেপ করলে আনিসুজ্জামানসহ অন্যেরা আহত হন। একুশে ফেব্রুয়ারির সেই তুঙ্গ মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে আত্মজীবনীতে লিখেছেন : ‘এবারে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া শুরু করলো আমাদের দিকে। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই, দৌড়ে যাই কলাভবনের পুকুরের দিকে। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, কেউ কেউ পুকুরেই ঝাঁপ দেয়; আমি গেঞ্জি ভিজিয়ে নিয়ে চোখে পানি দিই, শুধু শার্ট পরে থাকি, আর অধিকাংশের সঙ্গে ফিরে আসি রণক্ষেত্রে।’ বেলা ৩ টার পরে পুলিশের গুলিবর্ষণে হতাহতের ঘটনা ঘটলে পরিবেশ আরও থমথমে হয়ে ওঠে। এ সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ১১নং ব্যারাকে স্থাপিত কন্ট্রোল রুমের মাইকে প্রচারের জন্য তিনি বক্তৃতা লিখে দেন এবং নিজেও বক্তৃতা করেন।

পুলিশি তল্লাশির আশঙ্কায় ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি যুবলীগ অফিস থেকে দরকারি কাগজপত্র ও টাইপরাইটার নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যান। ২৩ ফেব্রুয়ারি পিতার গাড়িতে করে লক্ষ্মীবাজার থেকে একটি মাইক ভাড়া করে জগন্নাথ কলেজ-হোস্টেলে নিয়ে যান। এর পর মাইকে কিছুক্ষণ বক্তৃতা করেন। এদিন ফরিদপুর কারাগার থেকে একটি টেলিগ্রাম আসে তাঁর কাছে, আসে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের দপ্তরে, যাতে শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমদের অনশন ও একুশের ঘটনার প্রতিবাদ-সম্পর্কিত বার্তা ছিল। পরে ঐ বার্তা তিনি দৈনিক আজাদ-এ প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। এ প্রসঙ্গে আত্মজীবনীতে লিখেছেন : ‘২৩ তারিখে একটা টেলিগ্রাম পেলাম ফরিদপুর জেল থেকে। রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে সেখানে কয়েকদিন ধরে অনশন করছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদ। একুশের হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে অনশনের কারণ হিসেবে তার প্রতিবাদও তাঁরা যুক্ত করেছেন এবং সে-সংবাদ জানিয়েছেন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদককে। এই টেলিগ্রামের ভিত্তিতে একটা খবর তৈরি করে আমি আজাদ পত্রিকায় দিয়ে আসি এবং তা যথারীতি মুদ্রিত হয়।’

২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে শহীদ মিনার নির্মাণের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে জনতার শ্রদ্ধা জানাতে পুষ্পস্তবক ও টাকা-পয়সা নিয়ে ভিড় জমায়। আনিসুজ্জামানের মা সৈয়দা খাতুন শহীদ মিনারের পাদদেশে একটি সোনার চেন দেন, চেনটি ছিল তাঁর অকালপ্রয়াত বোনের। ২৫ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘটের প্রচারপত্র রচনা এবং তা মুদ্রণের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর অলি আহাদসহ নেতৃবৃন্দ আত্মগোপনে গেলে চিরকুটের মাধ্যমে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। ৭ মার্চ শান্তিনগরে ডা. মোতালেবের বাসভবনে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের গোপন বৈঠকে তিনি অলি আহাদকে পৌঁছে দিতে যান। বৈঠক চলাকালে পুলিশ নেতাদের প্রায় সকলকেই গ্রেপ্তার করে, যার জন্য তাঁদের কেউ কেউ আনিসুজ্জামানকে দোষারোপ করেন, তবে তিনি একে ‘অমুলক ও অন্যায় খোঁচা’ বলে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন।    

১৯৫২ সালের পরেও আনিসুজ্জামান একুশের চেতনা লালন ও বাস্তবায়নে সক্রিয় ছিলেন। হাসান হাফিজুর রহমানের একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলন (১৯৫৩) প্রকাশের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। একুশের ফেব্রুয়ারী সংকলনের উৎসর্গপত্রের লেখাটুকু (যে অমর দেশবাসীর মধ্য থেকে জন্ম নিয়েছেন/একুশের শহীদেরা/যে অমর দেশবাসীর মধ্যে অটুট হয়ে রয়েছে/একুশের প্রতিজ্ঞা,–/তাঁদের উদ্দেশ্যে) তাঁর নিজের হাতের। পনেরো বছরের এক কিশোর পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সেদিন নিজের হস্তাক্ষর মুদ্রিত করতে দিয়ে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। তাছাড়া এ সংকলনে ‘দৃষ্টি’ নামে তাঁর একটি ছোটোগল্প প্রকাশিত হয়। ফেব্রুয়ারির শেষে পুলিশ যুবলীগের অফিস সিল করে দিলে তিনি এবং ইমাদুল্লাহ্ মিলে জেলা শাখার নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে একুশের চেতনা লালন ও বিস্তারে নানাভাবে কাজ করেন। ‘বাংলা ভাষায় সংবিধান লিখতে, সরকারী কাজকর্মের জন্যে পরিভাষা তৈরি করতে– এক কথায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিশেবে প্রবর্তন করার বাস্তব পদক্ষেপ নিতে অন্যদের তুলনায় তিনি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন।’

ভাষা-আন্দোলন ক্রমে থেমে গেলেও এর মাধ্যমে তরুণদের মনে ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক যে-জাতীয়তাবোধ জাগ্রত হয়, তা থামে না; বরং তা আরও বেগবান হয়। এই আন্দোলনের পর আনিসুজ্জামান যুক্ত হন কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকাণ্ডে, যদিও এ-ক্ষেত্রে তাঁর মহড়া শুরু হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগে যোগদানের মাধ্যমে। তখন তিনি মার্কসবাদী বই-পুস্তক পড়ার পাশাপাশি যোগ দিতে থাকেন কমিউনিস্ট পার্টির অনুশীলন-ক্লাসগুলোতে। মার্কসবাদের দীক্ষা নিতে এ সময়ে পড়েছিলেন অমিত সেনের ইতিহাসের ধারা, নীহার সরকারের রাজনীতির গোড়ার কথা এবং অর্থনীতির গোড়ার কথা। সঙ্গে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ইতিহাস ও দর্শন এবং মার্কসবাদ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে লেখাগুলো গোগ্রাসে গিলেছেন। আরও পড়েছেন অনিলকুমার সিংহের নতুন সাহিত্য, লাইসেংকোর জীববিজ্ঞান, পাভলোভের মনোবিশ্লেষণ, ফ্রয়েডের স্বপ্নতত্ত্ব ও লিবিডো-ভাবনা প্রভৃতি বিষয়ের নানা বই। কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েই আনিসুজ্জামান ও তাঁর সঙ্গীরা ছদ্মনাম ধারণ করে গোপনসভাগুলোতে অংশগ্রহণ করেন এবং চিঠি-পত্র লেনদেন ও গোপনে পার্টির ইশতেহার বিলি করতে থাকেন। বস্তুত নতুন পৃথিবীর স্বপ্নে বিভোর হয়ে চলতে থাকে তাঁর কিশোর-বেলার প্রতিটি মুহূর্ত। এর পর কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে একাডেমিক পঠন-পাঠনে ডুবে যাওয়ায় প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে যায়। প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও বাঙালির স্বাধিকার-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়গুলোতে তাজউদ্দীন আহমদ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে থেকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্র-সংগীত নিষিদ্ধ করাসহ বাঙালি সংস্কৃতির মূলোৎপাটনে গৃহীত নানা পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ করেন। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা সেনাবাহিনীর গুলিতে শহিদ হলে তার প্রতিবাদে নানা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে শুরু হলে তিনি তাতে যোগ দেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ তাঁকে রোমাঞ্চিত করে। ৮ মার্চে এই বক্তৃতা শুনেই তাঁর মনে হয়েছিলো, ‘পৃথিবীর বুকে একটি নতুন জাতির জন্ম হলো।’ ঐদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ আর মল্লিকের সভাপতিত্বে আয়োজিত এক সভায় অন্যান্যদের সঙ্গে তিনিও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বক্তৃতা দেন। সভায় ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হলে তিনি তার সদস্য হন। ৮ মার্চ বিকেলে আরও একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম শহরে অধ্যাপক আবুল ফজলের বাসভবন ‘সাহিত্য-নিকেতনে’। সভায় চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সংস্কৃতি-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। স্বাধীনতা-সংগ্রামে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য গঠন করা হয় ‘শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিসেবী প্রতিরোধ সংঘ’। আনিসুজ্জামান এই সংঘের সহ-সভাপতি হন। পরে ‘শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিসেবী প্রতিরোধ সংঘে’র উদ্যোগে মিছিল বের হলে তার অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দেন। ‘আমার একাত্তর’-এ লিখেছেন : ‘আলী আহসান সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে আমি, কোরেশী ও রশিদ চৌধুরী মিছিলের সম্মুখভাগে জায়গা নিই। মিছিল করে আমরা সেদিন সাহিত্য-নিকেতন থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত যাই।’ এ সময় প্রতিরোধ সংঘ আয়োজিত একাধিক সভা-সমাবেশে যোগ দেন। ১৫ মার্চ লালদিঘি ময়দানে আয়োজিত শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিসেবীদের সমাবেশে তিনি বক্তৃতা করেন। ২৪ মার্চ লালদিঘি ময়দানে বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদ-সভায় যোগ দেন। ২৫ মার্চ রাত ১১টায় এ আর মল্লিকের বাসভবনে মিলিত হন এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। ২৬ মার্চ ভাইস-চ্যান্সেলরের অফিসে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিরোধ-সংগঠনের আহ্বান সম্পর্কে অবহিত হন। ঐ দিন বেলা ৩টায় চট্টগ্রামের সংগ্রাম পরিষদের সদর দপ্তর থেকে ছাত্রলীগ নেতা রফিকুল আনোয়ার  কর্তৃক ফোনে প্রেরিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে নেন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তা প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি জানাচ্ছেন : ‘বেলা তিনটের দিকে সংগ্রাম পরিষদের সদর দপ্তর থেকে ছাত্রলীগের এককালীন নেতা ও প্রতিরোধ-সংগ্রামের কর্মী রফিকুল আনোয়ার বাসায় আমাকে ফোন করে বলেন একটা জরুরি বার্তা লিখে নিতে। আমি কাগজ-কলম নিয়ে বসি এবং তিনি যেমন বলেন তেমনটিই লিখে নিই। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা-ঘোষণা– ভাষ্যটা ছিল ইংরেজিতে। রফিকুল আনোয়ার অনুরোধ করেছিলেন, আমি যেন এটা ক্যাম্পাসে প্রচার করার ব্যবস্থা করি। তা করতে গিয়ে জানতে পারলাম যে, এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বেতারের ফ্রিকোয়েন্সিতে স্বাধীন বাংলা বেতার-কেন্দ্রের অনুষ্ঠান থেমে থেমে শোনা যাচ্ছে এবং সেই বেতার-কেন্দ্র থেকে এম এ হান্নান একই ঘোষণার বাংলা পাঠ পড়ে শুনিয়েছেন। যখন বার্তাটি আমি লিখে নিই তখন গভীর বেদনার মধ্যেও রোমাঞ্চ অনুভব করেছিলাম। স্বাধীন বাংলা বেতার-কেন্দ্রের কথা জেনে আবার রোমাঞ্চ ও আশার সঞ্চার হলো।’  

সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে গিয়ে জানতে পারেন রাঙামাটির ডিসি এইচ টি ইমাম খবর পাঠিয়েছেন সীমান্ত এলাকা থেকে ই পি আরের বাঙালি সদস্যদের পাঠানো হচ্ছে চট্টগ্রাম সেনানিবাস ঘিরে রাখার জন্য, যার বেজ ক্যাম্প হবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ই পি আর জোয়ানদের আগমনে উপাচার্যের অফিস এক ধরনের সমর-দপ্তরে পরিণত হয়, যার অধিনায়ত্ব গ্রহণ করেন ড. এ আর মল্লিক এবং আনিসুজ্জামানকে দেওয়া হলো তাঁর সার্বিক সহকারীর দায়িত্ব। এপ্রিল মাসে পাকিস্তানি সৈন্যরা একের পর এক পর দেশের অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামের প্রায় সমস্ত এলাকায় দখলদারিত্ব কায়েম করলে এবং নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করলে ড. এ আর মল্লিকসহ অন্যদের সঙ্গে আনিসুজ্জামান সপরিবারে রামগড় হয়ে আগরতলা চলে যান।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ভারতে অবস্থান করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অবদান রাখেন। এ সময়ে ‘তিনি বাংলাদেশের জন্য বিশ্বজনমত সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছেন।’ মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র তিনি ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। ‘এই সময় আনিসুজ্জামান শুধু বাংলাদেশের শিক্ষকদের সংগঠিত করেননি, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগ্রহের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। মুবিনগর সরকারের প্ল্যানিং সেলের সদস্য হয়ে কত ধরনের কাজেই-না ব্যাপৃত হয়েছেন।’ শিক্ষক নেতা হিসেবে ঐ সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। এ প্রসঙ্গে আমার একাত্তর গ্রন্থে লিখেছেন : ‘সহায়ক সমিতির অফিসই ছিল বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির অফিস। আমি রোজ যেতাম সকালে, সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে থেকে কিংবা বিকেলে সেখান থেকে বেরিয়ে অন্য কোনো কাজ সেরে ফিরতাম রাতে। যুগ্ম-সম্পাদক গোলাম মুরশিদকে কখনো আমাদের কাজে পাই নি, তবে আনোয়ারুজ্জামান প্রায় আসতেন। রাসবিহারী ঘোষ ছাড়া নিয়মিত আসতো নিত্যগোপাল সাহা আর সুকুমার বিশ্বাস।’ এছাড়া মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ-এর ভাষণ লেখার দায়িত্বও তিনি পালন করেন। পরে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন এবং সদ্যস্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে অবদান রাখেন। বিশেষ করে, বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলা খসড়া প্রণয়ন এবং শিক্ষানীতি প্রণয়নে তাঁর অবদান উল্লেখ করার মতো। তিনি শুধু অনুবাদের কাজে অপরিহার্য ভূমিকাই পালন করেননি, খসড়া প্রণয়ন কমিটির আলোচনাসভায় যোগ দিয়েছেন এবং তাঁর নিজের গভীর বিশ্বাসের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন। পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটে তিনি বারবার সোচ্চার হয়েছেন গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক বিপন্নতার বিরুদ্ধে। পরবর্তীকালে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পালন করেন সক্রিয় ভূমিকা। তিনি এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। এরশাদ যখন রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেছিলেন তখন তিনি নিজের হাতে বিজ্ঞপ্তি লিখে চট্টগ্রামের সর্বশ্রেণির নাগরিকদের একটি সভা আহ্বান করেন। এরশাদের সামরিক শাসন জেঁকে বসলে তা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে সংবিধানের আওতায় বিকল্প সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়ে ৩১জন বুদ্ধিজীবী মিলে বিবৃতি দেন। ১৯৮৭-র ৩১ মার্চ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রচারিত ঐ বিবৃতিতে বলা হয় : ‘বাংলাদেশে এখন এক গুরুতর সংকটের মধ্যে আমরা কালাতিপাত করছি। সর্বতোমুখী এই সংকট আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্র স্পর্শ করেছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গভীর হতাশা বিদ্যমান, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের ব্যাপ্তি ও অসাম্যের বিস্তার, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নৈরাজ্য, শিক্ষাক্ষেত্রে অনভিপ্রেত পরিস্থিতি, সামাজিক ক্ষেত্রে চরম নৈরাশ্য ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। ...এই নৈরাজ্য থেকে মুক্তির পথ অবিমিশ্র গণতন্ত্র। ...আমরা মনে করি, বর্তমান নৈরাজ্য ও নৈরাশ্য থেকে মুক্তির এটিই একমাত্র পথ। গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গঠনের জন্য এ ব্যাপারে আমরা দেশের সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় সমর্থন প্রার্থনা করি।’    

নব্বই দশকের শুরুতে একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচারে গঠিত গণ-আন্দোলতের অন্যতম সদস্য হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। এক্ষেত্রে তাঁর অপরিসীম উৎসাহ এবং তারুণ্যদীপ্ত অংশগ্রহণ অন্যদের সাহস জোগাতো।  ‘১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে গোলাম আযমের বিচারের জন্য গণ-আদালতের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই আদালতে বিচার চলাকালে আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। দেশদ্রোহের মামলা দায়ের হয়েছিল।’ এ ঘটনার সূত্রপাত ঘটে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে প্রত্যক্ষভাবে অবস্থানকারী গোলাম আযমের দেশে ফেরা এবং তাকে জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশ-এর আমির নির্বাচিত করাকে কেন্দ্র করে। ১৯৯১ সালের ২৮ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ অধ্যাপক গোলাম আযমকে তাদের আমির নির্বাচিত করে। এর প্রতিবাদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিবাদ করে। ১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে গোলাম আযম সম্পর্কে আলোচনায় বাংলাদেশ থেকে তার বহিষ্কার দাবি করে। এ সময়ে  গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে গণ-আদালত গঠনের  লক্ষ্যে শাহরিয়ার কবির, কর্নেল কাজী নূরউজ্জামান, জাহানারা ইমাম প্রমুখের নেতৃত্বে কয়েক দফা বৈঠকের পর গঠিত হয় ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল জাতীয় কমিটি’। এর আহ্বায়ক হন শহিদ জননী জাহানারা ইমাম, সদস্য-সচিব হন অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী। ১০১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির সদ্য ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সিদ্ধান্ত হয়, ২৬ মার্চে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণ-আদালত বসবে এবং গোলাম আযমের প্রকাশ বিচার অনুষ্ঠিত হবে। আরও সিদ্ধান্ত হয়, গণ-আদালতে অভিযোগকারী হবেন তিনজন– সৈয়দ শামসুল হক, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর এবং আনিসুজ্জামান। যথাসময়ে গণ-আদালত বসে এবং আনিসুজ্জামানসহ অন্যরা অভিযোগ উত্থাপন করেন। গণ-আদালতে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন জাহানারা ইমাম (চেয়ারম্যান), অ্যাডভোকেট গাজীউল হক, অধ্যাপক আহমদ শরীফ, স্থপতি মাজহারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, শিল্পী কলিম শারাফী, মওলানা আবদুল আউয়াল, কর্নেল (অব.) কাজী নূরউজ্জামান, কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী ও ব্যারিস্টার শওকত আলী। অভিযোগপত্র এবং সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে গোলাম আযমের অপরাধ মৃত্যুদ যোগ্য বলে ঘোষণা করে এবং সরকারকে তা বাস্তবায়নের জন্য অনুরোধ করে। এ ঘটনা সারা দেশে অভূতপূর্ব উদ্দীপনা সৃষ্টি করলেও সরকার ক্রুদ্ধ হয় এবং আনিসুজ্জামানসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০, ১২১, ১২৪ (ক), ১৪৮, ৫০৪ এবং ৫০৫ (ক ও খ) ধারায় অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়। ৩০ মার্চ শুনানি শেষে হাইকোর্ট অন্তবর্তীকালীন জামিন মনজুর করেন এবং নিম্ন আদালতে হাজির হতে বলেন। ১৯৯৬ সালে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবীবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ মামলা প্রত্যাহার করে। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কাজে অংশগ্রহণ তাঁকে ইতিহাসের অংশ করেছে। পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে গঠিত আদালতে ২০১৩ সালের ১৪ মে সাক্ষ্য দিতে সশরীরে হাজির হন। স্বীয় আদর্শবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাই এসব কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার শক্তি জুগিয়েছে। তিনি চিৎকার না করে প্রতিবাদের কথা বলতে অভ্যস্ত ছিলেন। এভাবে আজীবন নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন বাঙালির ভাষা-সাহিত্য, স্বাধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে গড়ে ওঠা আন্দোলন-সংগ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সব সময় সামনের কাতারে থেকে ভূমিকা রেখেছেন।    

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
লিডের পথে শ্রীলঙ্কা
লিডের পথে শ্রীলঙ্কা
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় সম্পৃক্ততার আহ্বান মোমেনের
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় সম্পৃক্ততার আহ্বান মোমেনের
রাশিয়ার ছবি নির্বাচন করায় ইউক্রেনীয় পরিচালকের নিন্দা
কান উৎসব ২০২২রাশিয়ার ছবি নির্বাচন করায় ইউক্রেনীয় পরিচালকের নিন্দা
শিশুদের রক্ষায় জীবন বিলিয়ে দেন শিক্ষক ইরমা গার্সিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলে বন্দুক হামলাশিশুদের রক্ষায় জীবন বিলিয়ে দেন শিক্ষক ইরমা গার্সিয়া
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত