X
রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪
৮ বৈশাখ ১৪৩১
জাহিদুল হক স্মরণে

'আমার পরিচয় আমি কবি'

শাহীন রেজা
১৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৯:৪২আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৯:৪৬

কথা দিয়েছিলাম, তার আগামী জন্মদিন 'কবি এবং কবিতা'র আয়োজনে পালিত হবে। হলো না। জন্মদিন আসার আগেই তিনি আমাদের ফাঁকি দিয়ে চলে গেলেন– দূরে কোথাও, অন্যলোকে। এরকমই হয়। বহু স্বপ্ন এভাবেই ঢেকে যায় কুয়াশায়। ম্লান হতে হতে হারিয়ে যায় অন্ধকারে। জাহিদ ভাইয়ের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটলো। যদিও এতে আমার কোনো দায় নেই। তবুও হলো না। এই না হওয়াটাই স্বপ্নভঙ্গ। কষ্টের এবং বেদনার। যেমনটি রেবেকা সুলতানার ক্ষেত্রেও। প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী রেবেকাকে তিনি বিয়ে করেছিলেন তার মৃত্যুর কিছুকাল আগে। চিরকুমার জাহিদুল হক যখন জানলেন তার এই ভালোবাসার মানুষটির আয়ু খুব বেশি হলে আর মাত্র ছয়মাস, তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন রেবেকাকে বিয়ে করার। এর মূল কারণ ছিল দুটি– একটি, প্রেয়সীর প্রতি ভালোবাসার স্বীকৃতি আর দ্বিতীয়টি, শেষ মুহূর্তে নির্বিঘ্নে পাশে থেকে তার সেবা করতে পারা। যা তিনি রেবেকার মৃত্যু পর্যন্ত করে গেছেন।

জাহিদ ভাইয়ের ইচ্ছে ছিলো, রংপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে রেবেকা ভাবির কবরটি যেন স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়। বলেছিলেন, ‘শাহীন আমার এই শেষ ইচ্ছেটি পূরণে পাশে থেকো।’ আমি তাকে কথাও দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে দেরি হয়ে যায়। হয়তো এ কারণেই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে তাকে চলে যেতে হলো পৃথিবী থেকে। আমি তাকে সহায়তা করার কোনো সুযোগই পেলাম না।

কবিরা চিরকালই স্বপ্নাক্রান্ত। জাহিদ ভাইও এর ব্যতিক্রম নন। তিনি সুদূর জার্মানি বসেও দুই চোখে বাংলাদেশের নদ-নদী এঁকেছেন কবিতায়। মাইকেলেঞ্জেলোর ভক্ত এই কবি তার কবিতায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বন্ধনকে নিবিড় করে তোলার জন্য আমৃত্যু কাজ করে গেছেন।

জাহিদুল হক আধুনিক কবি হয়েও কবিতায় ছন্দের দোলা খুঁজতেন। বলতেন, ‘আমি আল মাহমুদের মতো লিরিকিস্ট কবি না হলেও কবিতায় লিরিককে প্রাধান্য দেই।’ এজন্য অতি আধুনিক তরুণ কবিদের কাছে তিনি কিছুটা হলেও সমালোচিত ছিলেন। 

জাহিদ ভাইয়ের লেখা গানগুলো খুবই জনপ্রিয়তা পাওয়ায় অনেকেই তাকে গীতিকার কিংবা গীতিকবি হিসেবে উল্লেখ করেন। এতে তিনি শুধু অস্বস্তি বোধ করতেন না, মাঝে মধ্যে প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করতেন। একবার এক অনুষ্ঠানে সঞ্চালক তাকে গীতিকার হিসেবে উল্লেখ করায় তিনি মাইক ধরেই এর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আমার পরিচয় আমি কবি। শুধুমাত্র কবি। আমাকে অন্য পরিচয়ে উপস্থাপন করা বিব্রত করার নামান্তর। আমি এ থেকে বিরত থাকতে সকলের প্রতি আহ্বান জানাই।’

তিনি প্রশ্ন করেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা নজরুল ইসলামও গান লিখেছেন কিন্তু তাদেরকে কেউ গীতিকার বলে না, বলে কবি। তাহলে আমাকে কেন গীতিকার বলা হবে?’ শুধুমাত্র কবি হিসেবে পরিচিত হওয়ার এই আকুলতাকে তার মৃত্যুর পরেও সবাই শ্রদ্ধা জানালে তার আত্মা শান্তি পাবে।

কবি ফজল শাহাবুদ্দীন, জাহিদুল হক এবং আমার সম্পর্কের সুতোটা খুব গভীর ছিলো। হারুন ডায়েরির বৈকালিক আড্ডা অথবা গাড়িতে করে হৈ হৈ করে দূরে কোথাও চলে যাওয়া এখন শুধুই স্মৃতি। ফজল ভাইয়ের মৃত্যুর পর যতবার জাহিদ ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, ততবারই আমরা যেন আমাদের মধ্যে তার অশরীরী উপস্থিতি অনুভব করেছি।

লেখকের পাশে কবি জাহিদুল হক
জাহিদ ভাই কেন জানি না আমাকে এবং আমার কবিতাকে প্রাধান্য দিতেন। আমার ষাটতম জন্মদিনে তিনি আমাকে নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন। অনুজ কবির জন্য তার এই ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছিলো। লেখাটির সমস্ত শরীর বেয়ে ঝরে পড়েছিলো মমতা আর প্রশ্রয়। সত্যি সেদিন আমি কেঁদেছিলাম। যেমন কেঁদেছিলাম ইত্তেফাকের পাতায় আমার জন্মদিনে আল মাহমুদের অর্ধপাতা লেখা পড়ে। আমাকে নিয়ে আলাউদ্দিন আল আজাদ, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন, আল মুজাহিদী, কে জি মুস্তফাসহ অনেকেই লিখেছেন কিন্তু জাহিদ ভাইয়ের লেখার মতো এত আবেগ এত প্রশ্রয় এত মমতা কোথাও ছিল না।

কোথাও জাহিদ ভাইকে ডেকেছি আর তিনি আসেননি এমনটি কখনো ঘটেনি। কলকাতার কবিবন্ধু সৌমিত বসু এবং আমার যৌথ কবিতাপাঠ অথবা যৌথ কাব্যগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচনে তার সরব উপস্থিতি এবং আমাদের নিয়ে তার সেই জোরালো উচ্চারণগুলো ভুলি কী করে?

একজীবনে অনেক কিছুই পাওয়া হয়ে ওঠে না। যেমন হয়ে ওঠেনি তার একক কবিতা পাঠের আয়োজন কিংবা তাকে নিয়ে কাশ্মীরি বিরিয়ানি ও শর্ষে ইলিশ খাওয়া।

তবু অসংখ্য স্মৃতির সুতোয় গেঁথে আছি আমরা। এই সুতো ছেড়ে সাধ্য কার?

সবাইকেই চলে যেতে হবে একদিন। এটাই সত্য। কিন্তু এই সত্যটা মেনে নিতে কেন এত কষ্ট হয়! কোনো কোনো মৃত্যুতে পাথর না হয়েও চোখ দুটি কেনো ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়। গুড বাই জাহিদুল হক, যেখানেই থাকুন শান্তিতে থাকুন, ভালো থাকুন। বেঁচে থাকুন হৃদয়ে, স্মৃতিতে অনন্তকাল। যদিও কবির কোনো ক্ষয় নেই, বিলয় নেই। কবি তার ভাষায় বেঁচে থাকেন চিরদিন।


আমি আছি

আমি আমার দু-চোখ দেখিনি
দেখিনি আমার মগজ
তবু মগজ থেকে ধেয়ে আসা জল
বৃষ্টির মতো ঝরতে দেখেছি
দু-চোখ থেকে।

আমি আমার নাসারন্ধ্রের গহীনে দেখিনি
আমি আমার কর্ণগুহায় দৃষ্টি ফেলিনি
তবু বাতাসে মিশে থাকা অজস্র ঘ্রাণ
আর শব্দ, শুঁকেছি, শুনেছি
নাকে কানে মেখে।

আমি আমার পিঠ দেখিনি
মাথার পিছনে তাকাতে পরিনি
তবু অনুভব করেছি হাজার স্পর্শ
আঘাত অথবা আদর দিয়ে একে।

আমি আমার হৃৎপিণ্ড দেখিনি
দেখিনি আমার হৃদয়কে
তবু হাজার কষ্ট, যন্ত্রণা আর
হাজার আবেগের ঝড় সয়েছি,
হেসেছি, কেঁদেছি আর যন্ত্রণায়
গিয়েছি বেঁকে।

আমি পথ চলতে গিয়ে পায়ের পাতাকে দেখিনি
ছুঁয়ে দিতে গিয়ে কখনও হাতকে খুঁজিনি
তবু হোঁচটের হাজার আঘাত
আর কাঁটার খোঁচাই পেয়েছি থেকে থেকে।

তবু না দেখেও, শত অনুভূতি
জানিয়ে দেয় আমি আছি
হাজার মৌলের মিশ্রণে,
কোনো বস্তু হয়ে বেঁচে,
চলে যাবার ছাড়পত্র
বুকপকেটে রেখে।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ঢাকায় শুরু হতে যাচ্ছে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী শিল্পী উৎসব
ঢাকায় শুরু হতে যাচ্ছে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী শিল্পী উৎসব
এই গরমে কেমন পোশাকে স্বস্তি মিলবে
এই গরমে কেমন পোশাকে স্বস্তি মিলবে
তরুণদের নিয়ে বেসিস নির্বাচনে সোহেলের টিম স্মার্ট
তরুণদের নিয়ে বেসিস নির্বাচনে সোহেলের টিম স্মার্ট
তীব্র গরমেও শীতল করমজল!
তীব্র গরমেও শীতল করমজল!
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট, হিন্দু মহাজোট ‘নেতা’ পুলিশ হেফাজতে
ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট, হিন্দু মহাজোট ‘নেতা’ পুলিশ হেফাজতে
জানা গেলো বেইলি রোডে আগুনের ‘আসল কারণ’
জানা গেলো বেইলি রোডে আগুনের ‘আসল কারণ’
প্রবাসীদের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে কোটিপতি, দুই ভাই গ্রেফতার
প্রবাসীদের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে কোটিপতি, দুই ভাই গ্রেফতার
চট্টগ্রামে ভূমিকম্প, মাত্রা ৩ দশমিক ৭
চট্টগ্রামে ভূমিকম্প, মাত্রা ৩ দশমিক ৭
কেএনএফের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত, কেঁদে কেঁদে স্ত্রী বললেন আমার ৩ সন্তানকে কে দেখবে?
কেএনএফের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত, কেঁদে কেঁদে স্ত্রী বললেন আমার ৩ সন্তানকে কে দেখবে?