হৃদয়ের অনুভব যদি খাঁটি হয় তাহলে লেখার বিষয়টি অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। আধুনিকতা নিয়ে লিখতে গিয়ে আমাকে এখন নতুন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। কেননা, একটি শতাব্দী শিল্পের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন যুগ হিসেবে কেটে গেল। শিল্পের আসল ও নকলের মধ্যে কোনো তফাৎ রইল না। জর্মান দার্শনিক ওয়াল্টার বেঞ্জামিন শিল্পের এই মাহিমাকে ‘অরা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই সময়ে শিল্পের আরেক যুগ শুরু হলো, শুরু হলো জগতের আরেক অধ্যায় লাইভ, টিকটক, ফেসবুক, ইউটিউভ, ওয়াটসআপ, ইনস্ট্রাগ্রাম, ইমু, ভাইভার, কত কি। আধুনিকতায় এখন এসবে লেপ্টে গেছে। এখন ঘরে বসে বলতে পারি সুদূর আমেরিকাকে দেখা যায়, কথা বলা যায়, হাতের মুঠোয় আঁকা যায় আধুনিকতার উল্কি। এই সময়েও কবিতা বিষয়ে এত বেশি লেখা হয়েছে, এত কথা বলা হয়েছে—আমি নতুন করে কী বলতে পারব; তবুও মনে মনে ধ্যান করি। ঢাকা শহরের গাড়ির সাউন্ড, ফুটপাতের দুর্গন্ধ, সাবঅলটার্ন মানুষের বেদনাভরা মুখ, ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক মহিলা, রাস্তায় প্রসাব করা ভদ্রলোক, মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়া নাগরিক মুসল্লি, মন্দিরে পূজা দিতে যাওয়া ধার্মিক লোক, কর্পোরেট সুফিদের ফাইলপত্র, মগজ-মস্তিষ্ক, গাড়ির হর্ন, টাইস্যুট, ভাসমান যৌনকর্মীদের আহ্বান, মসজিদের যত দরোজা তার চেয়ে বেশি ভিখারি, বাজার, মেঘা স্টোর, রাজনৈতিক দলের মিছিল, কাচেরশপসহ নগর বাঁচে নগরের মহিমায় আর আমরা বেঁচে থাকি পেটি বুর্জোয়া খায়েশে। নগরে সিনেমা নাটক, পুলিশ, র্যাব, লিটলম্যাগ, দৈনিক পত্রিকা, কবিতা, সেমিনার, অনুষ্ঠান—আহা, নগরের নতুন নতুন অরা। অধ্যাপক, মডেল, রাজনৈতিক, নিগার, নায়ক-নায়িকা, কবি, লেখক, গবেষক, নাট্যকার, ডিরেক্টর এত এত মেধাবী বিশেষজ্ঞদের ভিড় তুলনাহীন শহর। পৃথিবীর ইতিহাসে আমাদের ঢাকা শহরের তুলনা নেই। জ্ঞান ও প্রজ্ঞা—প্রযুক্তি আর প্রলোভন আমাদের মথিত করে রেখেছে। নতুন বাস্তবতা নতুন চাহিদাও তৈরি করছে কলগার্ল, ক্যাসিনো ইত্যাদি। প্রত্যেক বিল্ডিং-ই টাইলস করা, ঝকঝকে, তকতকে, তাক পরিস্কার করে রাখে কাজের বুয়া নামে গ্রামের হতদরিদ্র নারী। সেই নারীটিকে আবার বাংলার সুশীল মালিক গৃহস্থ ও গৃহিণীরা লিফটে চড়তে দেয় না, এ আমাদের নৈতিকতা। ঢাকা শহরে কোন বিল্ডিংয়ের নাম বাংলায় লেখা নেই, খুব কম। মন্দির মসজিদ ইসকন খ্রিস্টান মিশনারি ইসলামি দাওয়াতি দল সব মিলে আমরা আবারও একটি রক্তাক্ত দাঙ্গাকে স্বাগত জানাচ্ছি। আমরা সময়ের দিক থেকে আধুনিকতায় পৌঁছেছি, মনের দিক থেকে মধ্যযুগে বাস করি। মধ্যযুগ পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে আমাদের মন, ভারতীয় বৈদিক মন তারও পূর্বে বাস করে—রামায়ণ ও মহাভারতের যুগে। সে মনের উদ্ধার কি? আমাদের নারীরা মস্তিষ্ক উন্মোচনের আগে বক্ষ উন্মোচন শুরু করে দিয়েছে। আমাদের পুরুষদের ক্ষমতার পূজা দাস যুগকেও হার মানিয়েছে। আমাদের লেখক বুদ্ধিজীবীরা সমান্য স্বার্থের জন্য তাদের সারাজীবনের অর্জনকে ক্ষমতার তোষামোদিতে ধূলিস্যাৎ করে দেয়। এমন একজন বুদ্ধিজীবী কবি নেই প্রকাশ্যে সত্য কথা বলতে পারে। সলিমুল্লাহ খানের ভাষায়— ‘আমাদের বাক স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সত্য বলার অধিকার নেই’।
এই শহরে আকাশ ও দিগন্ত দেখতে পাওয়া মুশকিল। কিন্তু আপনি দেখতে পাবেন বড় বড় ফ্লাই ওভার, ওভার ব্রিজ, বড় বড় ফ্লাট বাড়ি, হাজারে হাজারে রিক্সা, বাজারে গেলে দেখতে পাবেন ডজন ডজন মুরগি কিনছে টাইস্যুট পরা লোক, ১০/১২ কেজি করে গরুর মাংস বাজারের থলিতে ভরছে—তার কাছে হাত পাতছে অনেক ভিখারি, পথে পড়ে আছে যুবতী-শিশু—শিশুটিকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে মা। পিপীলিকার মতো মানুষের মিছিল। এই শহরে এত ধনী এবং এত ভিখারি কোথা থেকে এলো ভাবতে অবাক লাগে। এই উন্নয়ন বাস্তবে গর্ব করার মতো। ধানমন্ডিতে এক সমাজ, কামরাঙ্গীর চরে আরেক সমাজ। কামরাঙ্গীর চরে উঠতি পয়সাওয়ালার রমরমা অবস্থা আর ধানমন্ডি, উত্তরা, বনানীতে পয়সাওয়ালাদের আরেক ধরনের রমরমা ও বেদনাদায়ক অবস্থা মাদক, নারীবাদ, রেস্টুরেন্ট, ড্যান্স, পার্টি, ক্লাব, সিসা, পরকীয়া, সমকামীতা, ডিপিএস, লোন, রাজনীতি, তিন চারটা গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ, ট্যুর, ছেলের একটা, মেয়ের একটা, মায়ের একটা আহা! ধনতন্ত্র ও আহ্লাদের জীবন। একুশে বইমেলা, পহেলা বৈশাখ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, চিত্রকলা প্রদর্শনী, সেমিনার, মিটিং, বাজেট, সম্মানি, ভাতা, ত্রাতা। নাগরিক জীবনের কি শনৈঃ শনৈঃ বিকাশ। রাজনৈতিক ডিজিটাল বিলবোর্ডে নেতাদের পালিশ করা মুখ, ঢাকার সব ওয়াল পোস্টারে ভরা, চোখ যেন পারে না আর দেখতে তবুও উপায় নেই, দেখতে হবে। কিছুদূর বাস চললো, আবার বন্ধ, জ্যামে পড়েছে, আবার কিছুদূর বাস চললো, কী হয়েছে মন্ত্রীর গাড়ি যাচ্ছে সব রাস্তা বন্ধ। ফুটপাত দখল রেখেছে হকার, সবখানে অচল অবস্থা। প্রচুর গরম, শীতেও ঘেমে যায়। হাসপাতালে রোগীর জায়গা নেই, বারান্দা, ব্যালকনি যেখানে পারছে সেখানে রোগীকে রাখা হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে কবি হিসেবে আমি আহত হই।
জগতের যে কোনো অসঙ্গতিতে কবি ফুঁসে উঠবে, এ তার সংবেদনশীল মনের দাবি। কবির স্বভাবই হচ্ছে বৈষম্য, প্রতারণা, বাটপারি, জোচ্চুরি, মুনাফেকি যুগের হুজুগের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। আর সে কবি যদি হয় সমাজ সচেতন, ভাবেন মানুষের বেদনদগ্ধ হৃদয়ের কথা, তাহলে তাকে আরও বেদনায় দগ্ধ হতে হবে, এবং হয়ও। সমাজে, রাষ্ট্রের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেন তিনি।
এই যুগ হচ্ছে পুঁজির সুপারম্যানের যুগ, সবাই হিরো; এখানে আলাদা কোনো হিরো নেই। সবারই প্রচার মাধ্যম আছে; কে কখন টয়লেটে গেছে তাও মানুষ মুহূর্তেই খবর পেয়ে যায়। মানুষ হিরো বা সুপারম্যানের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। নতুন রচনা, নতুন চিন্তা, নতুন নতুন মন্তব্যে সয়লাব জগৎ। পান থেকে চুন খসলেই সেটা খবর হয়ে ছড়িয়ে (ভাইরাল) পড়ে। তাই এখন কথা বলতে ভেবে চিন্তে বলতে হয় না, বলে দিলে হয়। এই নতুন যুগের জ্ঞাত বা অজ্ঞতা কি? সেই অজ্ঞতা কেউ ধরতে পারছে না। নিৎশে ঘোষণা করেছিলেন— ঈশ্বর মৃত, ঈশ্বর মারা গেছেন। আমরা কি বলতে পারি না শহরগুলো মরে গেছে, আধুনিকতা মরে গেছে। কীভাবে মরলো। মরলো ধনতন্ত্রের আদর্শে-বিকাশে-উৎকর্ষে। ধনতন্ত্রের বিকাশ মানে নাগরিকপনায় ক্ষুদ্রতা, সংকীর্ণতা, নিষ্ঠুরতা, লোভ, লালসা আর ক্ষমতার কাছে মাথা নত করা। গণতন্ত্র যেহেতু সম্পত্তির মালিক শ্রেণির তালুকে পরিণত হয়, তাতে আর কি। নিজের বিবেকের আয়নায় কেউ-ই নিজেকে দেখার সুযোগ পায় না। গ্রাম এবং শহরে ক্ষমতার পূজা ছাড়া মানুষ আর কিছুই করে না। তাহলে বইপত্রে, ধর্মে, নৈতিকতায় যা যা বলা হয়েছে সব কি মিথ্যে! হাদিসে আছে কেয়ামতের দিন—যার যার বিষয় নিয়ে মানুষ এতই ব্যস্থ থাকবে কেউ কারো দিকে তাকাতে পারবে না, কেউ কারও খোঁজ নিতে পারবে না, সবাই নিজের পাপ, অপরাধ নিয়ে আতঙ্কে ভয়ে তটস্থ থাকবে। পুঁজিবাদের যুগে এই হাদিসটি আংশিকভাবে ফলে গেছে—এই যুগে এখন যে যার বিষয় নিয়ে এত ব্যস্ত যে কেউ কারও দিকে ফিরে তাকাতে পারে না; প্রতি সেকেন্ডে শুধু লাভের হিসেব। অতিরিক্ত লাভ মানে প্রতারণা, বাটপারি। আপনি মানেন কি না মানেন তাতে কিছু যায় আসে না, আমরা এখন বাটপারদের যুগে বসবাস করি মানে অতিরিক্ত লাভের যুগে বসবাস করি। যাদের মাথায় চব্বিশ ঘণ্টা মুনাফা, মুনাফা।
কবিতা কি এভাবে ভাগ করা যায়?—প্রেমের কবিতা, রাজনীতির কবিতা, প্রকৃতির কবিতা আমি জানি না। এভাবে ভাগ করলে কবিতা তার প্রকৃত মেজাজ হারিয়ে বসে। কবিতা থেকে তার আবেদন হারিয়ে যায়। এও পুঁজিবাদের যুগে আরেক ধরনের ভণ্ডামি। বাজার তৈরি করা, বাজার মানে ভিড়; বাজার মানে প্রতিযোগিতা। ‘পশ্চিমী গণতন্ত্র, যে গণতন্ত্র, যে স্বাধীনতার কথা বলে, তা মূলত বাজার নিয়ন্ত্রিত, এবং বিশ্বায়নের কল্যাণে সেই নিয়ন্ত্রণ আজ সর্বব্যাপী। তথাকথিত খোলা দুনিয়াতেই আজ মানুষ সর্বাধিক নিয়ন্ত্রিত এবং এটাকে বলা হচ্ছে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রকাশ। কবিতা তো হৃদয়, কবিতা আত্মা, কবিতা তো রক্ত, কবিতা জীবনের সর্বস্ব, কবিতা ধ্যান, কবিতা দর্শন, ইতিহাস। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল কবিতার আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘কবিতা দর্শনের চেয়ে বেশি, ইতিহাসের চেয়ে বড়’। কবিতাকে যারা ক্যাটাগরি দিয়ে ভাগ করেছে তারা ভণ্ড। তারা জীবনকে কবিতা করে তুলতে পারেনি, কবিতাকে করে তুলতে পারেনি জীবন। আধুনিকতার এও এক বেদনা। আধুনিকতার বেদনা হচ্ছে আমি সম্পত্তির মালিক শ্রেণির শোষণ প্রক্রিয়ার সেবা করছি। তার ভেতরে থেকে আমাকে কবিতা লিখতে হচ্ছে। আমার কবিতাও অজান্তে তাদের পক্ষে কথা বলেছে। কিন্তু শোষিত মানুষের বেদনাটা আমি বুঝতে পারি নাই। তাহলে আমার কবিতা পৃথিবীর দশ ভাগ ধনতান্ত্রিক মানুষের মনকে ছুঁতে পেরেছে, কিন্তু তারা তা পড়ে দেখে না, ফেলে রাখে কার্পেটের তলে। বাকি নব্বই ভাগ না খাওয়া, অচ্ছুত, দলিত মানুষের হৃদয়ের কষ্ট ছুঁতেই পারে নাই। তাহলে আমার কবিজন্ম কি সার্থক হলো? প্রচলিত সমালোচনা হচ্ছে কিছু কবিতা কারও ভালো লাগবে, কারও ভালো লাগবে না। সব কবিতা সবার ভালো লাগে না। এসব সুবিধাবাদী আলোচনা দিয়ে কাব্য আলোচনা চলেছে। এখন তা আর চলতে পারে না। সমালোচনা ভাষাও হতে হবে হৃদয়ের, নিবেদনের, প্রতিশ্রুতি রক্ষার, জীবনকে নতুন করে আবিষ্কারের; কবি এখানে বেকারার।
পুঁজির বিস্তার থেকে আজ পর্যন্ত পুঁজিবাদী ছলনা ও কৌশল বা পলিটিক্স থেকে কে রেহাই পেয়েছে? মানুষকে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারাই আবার তা ভেঙেছে, রক্তাক্ত করেছে, জখম করেছে, দগ্ধ করেছে। হতদরিদ্র মানুষ যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে গেছে। তাই কবির কষ্ট এখানে মানুষের জন্য ফানাফিল্লাহ হয়ে মিশে গেছে। মানুষের জন্য এ দরদ কবির হৃদয়ভিত্তির পরিচয় বহন করে। হৃদয় আছে বলে হৃদয়ের যুক্তিগুলো দিয়ে তিনি দ্রোহ করছেন। আধুনিকতা নারী নয় নদী নয় বাজারের অপ্সরী, পুঁজিবাদ নদী নয় নারী নয় খুনী প্রজা-পতি। জগৎ শুদ্ধ কে কার প্রেমে মজনু দেওয়ানা, আধুনিক পৃথিবীর এই মাস্তি স্বর্গেও জুটবে না। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ দুই খল—বাঁধে জোট। আমি তুমি সে, চেতনার কাশবনে পুড়ে পুড়ে; সাদা চুলের বয়সী নাগরিক। ইন্ড্রাস্ট্রি, নদী দূষণ, পলিথিন, প্লাস্টিকের দূষণে কি সুখের অসুখে পুড়েছি।
কবি এই পুঁজিবাদী সমাজে পরিশুদ্ধ রাজনীতি খোঁজেন। এ যে কত বড় বোকামি আমি বলে বুঝাতে পারব না। ব্যক্তি মালিকানা ও পুঁজিবাদী এই সমাজে যেখানে মুনাফা, নিজের আখের গোছানো বড় কথা, সেখানে এসব ছোট কথা কেউ শুনবে না। কথার ফেনা ও প্রতিশ্রুতিতে জীবন কাটাতে হবে। আমি আমার পবিত্র মন থেকে যা চাই তা দিয়ে কি এ সমাজ চলে; চলে না। চলে না বলে এই অভাব, কষ্ট, অনটন, দুঃসহ যাতনা, তেলাপোকা, ক্রিমি, ডাস্ট, কুকুর, শহরজুড়ে দুর্গন্ধ, এসি, লিফট, বাথটাব ইত্যাদি। গুহাবাসী মানুষকে আধুনিকতা এমন মজা দিয়েছে সে তার অতীত ভুলে গেছে। তাই আজ আমাদের নতুন করে মনুষ্যত্ব ঋদ্ধ শুদ্ধ রাজনীতির জন্য আক্ষেপ করতে হচ্ছে। ব্যক্তি মালিকানার লাগাম না টানলে এ কখনও সম্ভব নয়। সুতরাং অচেতন আক্ষেপই সার। তাই বলব এই আক্ষেপ যেন পূর্ণতা পায়, এই আক্ষেপ যেন ঘুচে যায় তার জন্য প্রস্তুতি কি? কথায় তো চিড়া ভিজে না।
আধুনিকতার মহিমা হচ্ছে আমি কবিতা লিখতে পারি। একজন একাডেমিক মানুষ কিছু শব্দ এসেম্বেল করতে পারলে কবিতা লিখতে পারে, এ এমন আশ্চর্যের কিছু না। কিন্তু শিল্পী হয়ে ওঠা, শিল্পের বেদিমূলে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারা কত কঠিন, কত যে কঠিন আমার এই সম্পত্তির ব্যক্তি মালিকানার যুগে বিষয়টি বুঝতে পারছি না। মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় বেদনা হচ্ছে—সম্পত্তির ব্যক্তি মালিকানা। শিল্পের বেদনাও তাই। ব্যক্তিই সৃষ্টি করে কবিতা সে কথা মেনেছি। কিন্তু কবি এমন ভাব নেয় তিনিই স্রষ্টা, তিনিই দ্রষ্টা। সমাজ ছাড়া কবিতা হয় না, সমাজের স্বীকৃতি ছাড়া কবি ‘কবি’ হয়ে ওঠে না। দর্শনিক ফুকোর আবিষ্কারটি যদি আমরা দেখি তাহলে সব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষ নিজের আয়নায় নিজেকে দেখে না, সমাজের আয়নায় নিজেকে দেখে, যেমন: মানুষ আয়নায় নিজেকে দেখোর নামে সমাজ তাকে কীভাবে দেখে সেটিই দেখে।
তাহলে স্রষ্টা ও দ্রষ্টা সে একা না অপরকে নিয়ে, পরমকে নিয়ে, সমাজকে নিয়ে। একজনের মানুষের অস্তিত্ব কোথায়? অপরের মানুষের কাছে, অপর, পর, পরম, আপন ছাড়া স্রষ্টাও নেই। কবিতা বা শিল্পের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায় এসব কথা লিখি। আমি মনে করি এটা এক ধরনের অজ্ঞতা আর না হয় ভন্ডামি। আধুনিক কবি কি তার লেখাকে ধারণ করে, না ধারণ করতে পারে। যদি ধারণ করতে পারে তাহলে স্বাগতম। আর যদি নিজের লেখা নিজেই ধারণ করতে না পারে; তাহলে কেন তাকে আমরা স্বাগত জানাব। একজন কবি বোধ ও বেদনাকে ধারণ করে কবিতায়-যাপনে সৃষ্টিশীলতার ভেতর থেকে তিনি লিখেন। রাষ্ট্রের সেবা করে, রাষ্ট্রে সমস্ত অন্যায়কে দেখেও না দেখে সেটা কীভাবে সম্ভব! আরব্য রজনীর গল্প আমরা জানি। বাদশাহ’র প্রকাশ্যে কেউ প্রতিবাদ করতে পারছিল না বলে রূপকের আশ্রয় নিয়েছিল শিল্পীরা। কিন্তু আমাদের সময়ের শিল্পীরা রূপকের আশ্রয় তো দূরের কথা রাষ্ট্রযন্ত্রের সমস্ত অপরাধকে মেনে নিয়ে তাকে জীবনের চরম প্রাপ্তি বলে ধরে নিয়েছে। আজকে বাড়ি ভাড়া, গ্যাস বিল, চালের দাম, ডালের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। সরকারের একপক্ষ লুট করছে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সম্পদ, স্বপ্ন। কিন্তু আমরা কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছি না। শিল্প নিজের বেদানায় পুড়ে যাচ্ছে। এভাবে একটি জাতি চাটুকার হয়, শিল্পী হতে পারে না, নাগরিক হতে পারে না, সভ্যও হতে পারে না। সৃষ্টিশীলতার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ‘জীবনের দারিদ্র থেকে দুঃখ ভোগ করে শিল্পী’। নিৎশে বলেন—সমগ্র জগৎ গ্রথিত ধারণাবোধের বৃত্তি থেকে। মানবজাতির উন্নতিতে আদি যুগে প্রতিটি সারাৎসার ছিল। চার হাজার বছরের মধ্যে মানুষের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি শিল্পে। ধারণাবোধ, বৃত্তি অপরিবর্তনীয় মানবজাতির ক্ষেত্রে। আমাদের যুগ শয়তানবুদ্ধির। এইজন্য আমরা প্রয়োজন বোধ করি মানিয়ে নিতে।’ শিল্পের সমস্ত সৌন্দর্যকে অস্বীকার করে, মানুষের সমস্ত বেদনাকে অস্বীকার করে, আমরা ধর্ম, নৈতিকতা, সমাজ, রাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে নিজের আচারণকে ন্যায্যতা দিই। এসবের ভেতর কবিতা লেখা, কবিতায় ঘোরগ্রস্ততার মধ্যে কাটিয়ে দেওয়া আমি মনে করি আধুনিকতা বিরোধী। আধুনিকতা কি চাই, অমরত্ব, খ্যাতি, বাসনা, সৌন্দর্য, ঐশ্বর্য না অন্যকিছু, আধুনিকতা চাই যুগের সমস্ত অনুভব; পরিপূর্ণ মানুষ, এবসুলেট, নিৎশের ওভারম্যান, ইকবালের ইনসানে কামিলিয়াত। কিন্তু কোথায় সে সমাজ। মানুষ তো সমাজের হাতে বন্দী।
জগতে ষোলআনা প্রাপ্য নিয়ে কেউ কখনও ইনসানে কামিলিয়াত হতে পারেনি। ত্যাগ ছাড়া মর এ পৃথিবীতে কেউ অমর হতে পারে না। জোর করে কেউ অমর হতে পারেনি। মনে মনে অমরত্বের বাসনা যারা পুষে রাখে তারা প্রকাশ্যে মরে যায়। তাই এ পথ অনেক কঠিন, কঠোর। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির মনে এমন এক ভাব বা কামনা ঢুকিয়ে দিয়েছেন যে অমরত্ব, সবাইকে রবীন্দ্রনাথের মতো অমর হতে হবে। আমি বলি দুহাজার বছর আগে আমি কোথায় ছিলাম, দুইহাজার বছর পর আমি কোথায় থাকব। অমরত্ব হচ্ছে বুর্জোয়া ও পেটিবুর্জোয়া খায়েশ। আর এই খায়েশই পৃথিবীতে যত গলদের মূল। ভেবে দেখেন তো আমেরিকার মতো এত শক্তিশালী দেশের কয়জন প্রেসিডেন্টের নাম আমার মনে রেখেছি। যিশু বা মুহাম্মদ (সা.) কয়জন সাহাবার নাম। জগতে আপনি মানুষের জন্য নিজেকে বলি না দিলে জগৎ আপনাকে মনে রাখবে না। জগৎ আপনার মন নয়, মহাশয় জগত অনেক বড়। পুঁজিবাদী সমাজে মিডিয়া আপনাকে যে প্রলোভনের মধ্যে ফেলেছে অমরত্ব, পর্দার হিরোত্ব এগুলো ভাঁড়ামি, সাম্রাজ্যবাদী পণ্য বিক্রির জন্য সাম্রাজ্যবাদের ঘেটু তৈরি করেছে, যাদের মধ্যে সামান্যও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে তারা সাম্রাজ্যবাদের ঘেটু হবে কি করে। পুঁজিবাদে কার মহৎ লক্ষ্য আছে একটু দেখান আমাকে, আমি দেখতে চাই। পশ্চিমা ধাঁচের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যে দল ক্ষমতায় যায় সে দলের পক্ষে কথা বলা ছাড়া, তার স্বার্থ রক্ষা ছাড়া আমার আর কি করতে পারি। এসব বিবেচনায় আমি এই লেখার শিরোনাম দিয়েছি ‘আমাদের শিল্পযাত্রা : আধুনিকতার অনুরণন ও বেদনা। আধুনিকতার অনুরণন আছে বেদনাও কম নয়।
এটি হচ্ছে আধুনিকতার মহিমা ও বেদনা। মানুষ একাডেমিকভাবে শিক্ষিত হলে আর কিছু শব্দ এসেম্বেল করতে পারলে কবিতা বানাইতে পারে। কিন্তু আজাইরা তা বানাবে কেন? নিজের কাছেই নিজে প্রশ্ন করেন। এই বোধই আধুনিক। কিন্তু তা পরখ করবে কে?
এভাবে কবি নিজেই আধুনিকতাকে মহিমা দেন কিন্তু বহন করতে পারেন না আধুনিকতার বেদনা। আধুনিকতার বেদনা বহন করা সহজ নয়। সেখানে ঢেলে দিতে হয় হৃদয়—কোনো প্রশ্ন ছাড়াই। যেমন ধর্মে ঢেলে দিতে হয় বিশ্বাস।
আধুনিকতা ছুঁতে পারা না পারার এই যে আকুলতা কবিকে রোমান্টিক বেদনায় মথিত করে। এই আকুলতা প্রাকৃতিক বা ন্যাচারাল। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রোমান্টিসিজম একটি যুগ, একটি শতাব্দীব্যাপী পরিব্যাপ্ত। ব্যক্তির রোমান্টিক বোধ, রোমান্টিসিজিম এক জিনসি নয়। ‘মানব জগৎ বা মনুষ্য জগৎ কার্যত ব্যক্তিগত স্তরে এই আত্মস্বার্থ অন্বেষণ, বিশ্বস্তভাবে আত্মস্বার্থ অন্বেষণ দ্বারা পরিচালিত হয়। আত্ম-প্রীতি, বস্তুতঃ পক্ষে অন্যায় নয় বরং তা মানুষের পক্ষে অপরিহার্য এক পুণ্য বা গুণ। কিন্তু নার্সিসাস হয়ে উঠাটা মুশকিল। আধুনিকতার বেদনাা হচ্ছে বেশিরভাগ কবি, লেখক নিজের লেখায় নিজে এবং নিজের রূপে নিজেই মুগ্ধ। আর বেদনা হচ্ছে তারা তা চেতনভাবে বুঝতে পারে না। তাদের মধ্যে সম্প্রচারিক সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়ায় নিজের নাম, নিজেকে উপস্থাপন, নিজের জাহির করাটা বড় হয়ে দেখা দেয়। যেন কি হারিয়ে যাচ্ছে, যেন কবি তিনি নিজে কি যেন হারিয়ে ফেলেছে। নিজের সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে হলেও সেখানে হাজির থাকতে হবে, কবি হওয়ার এই লোভ, এই লালসা সংবরণ করতে পারে না কবি; কিন্তু সাধকরা কি বলেন। তারা বলেন—যারা খ্যাতির পেছনে পেছনে দৌড়ায় খ্যাতি তাদের লাথি মেরে চলে যায়, আর যারা সাধনা করে, নিজেকে শিল্পের বোধ ও বেদনায় বলিদান করে খ্যাতি তাদের পায়ে এসে চুমো খায়।
কোন প্রবণতার কবি সেটা বড় বিষয় নয়, তার মধ্যে আধুনিকতার অনুরণন আছে, বেদনা আছে, মহিমা ও প্রবাহের সঙ্গে তাকে মেলাতে পারার ক্ষমতা আছে, মমতা আছে; সেটা তিনি মিলিয়ে নেবেন। আধুনিকতার সেই বেদনা নিয়ে তার কবিতা দিয়ে শেষ করব এই লেখা।
আধুনিকতা বা আধুনিক সময় মানুষের জীবনকে কি কি দিয়েছে, কি কি কেড়ে নিয়েছে। আমি মনে করি আধুনিকতার মহিমা ও বেদনা এখানে। গ্রাম কীভাবে বদলে গেল, শহর কীভাবে বদলে গেল। সেই সময়ের শ্রমিক, কৃষক, নিম্নজীবী মানুষের শ্রম, জীবন, সত্তা ও শূন্যতার ব্যাপ্তি, উচ্চবিত্ত মানুষের জীবন, রাজনীতি। আধুনিকতা কীভাবে কেড়ে নিল প্রকৃতির সব স্বভাব, ঋতুর বৈশিষ্ট্য, রাজনীতি কীভাবে কেড়ে নিলো মানুষের স্বাভাবিক জীবন-সংগ্রামে বেঁচে থাকার অধিকার। যেমন নিৎশে বলেন— গ্যেটের কাছে থেকে শিখেছি, যথার্থ কবিরাই আঁকতে পারেন সেই মানুষের প্রতকিৃতি যে মানুষ একই সঙ্গে সৎ এবং শক্তিমান, সহৃদয় এবং নির্মল, যে মানুষদের চরিত্রে এবং ক্রিয়াকর্মে মাত্রাজ্ঞান স্বতঃস্ফূর্ত।









