জন্মদিনে

কথাশিল্পীকে নিয়ে কথা

স্বকৃত নোমান
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৩:৩১আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৩:৩৩

ফেসবুকে একটা রিল দেখা যায়। চীনের কোনো এক রেস্টুরেন্টে জনৈক বাবুর্চি সবজি কাটে। কাটার সময় তার হাত এতটাই দ্রুত চলে যে, যেন হাত নয়, মেশিন চলছে। হাতটি দেখা যায় না। ছুরিটিও না। মুহূর্তের মধ্যে একটা শসা বা একটা আলু কেটে ফেলে। টুকরোগুলো ছোট-বড় হয় না,সবই হয় এক সাইজের। সাধারণ কাউকে যদি তার মতো করে একটা সবজি কাটতে দেওয়া হয়, নিশ্চিতভাবেই সে তার আঙুল কেটে ফেলবে। কেননা এই কাজে তার চর্চা নেই, এই কাজে সে পারঙ্গম নয়। দীর্ঘদিনের চর্চার ফলে সেই বাবুর্চি তার কাজে এই দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে। সে জানে কীভাবে ছুরি চালাতে হয়, কীভাবে ছুরির কাছ থেকে আঙুলকে রক্ষা করতে হয়, কীভাবে সবজির প্রতিটি টুকরো একই সাইজের রাখতে হয়।

লেখালেখির ব্যাপারটাও এরকমই। দীর্ঘদিনের চর্চা থাকতে হয়। লিখতে লিখতে লেখক বুঝে যান কোথায় কোন শব্দটা বসাতে হয়, আখ্যানটা কীভাবে সাজাতে হয়, চরিত্রগুলো কীভাবে দাঁড় করাতে হয়, গল্পের মোচড়টা কোথায় দিতে হয়, পাঠককে কীভাবে আকৃষ্ট করে রাখতে হয়। কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন এই কাজটা সুচারুভাবে পারেন। দীর্ঘদিনের চর্চার ফলে এই দক্ষতা তিনি অর্জন করতে পেরেছেন। ফলে ছোট্ট একটা বিষয়কেও তিনি বিস্তৃত পরিসরে ফেলে লিখতে পারেন। যদি বলা হয় একটা চড়ুই পাখিকে নিয়ে লিখতে, তিনি লিখে ফেলবেন একটি অসাধারণ গল্প। যদি বলা হয় কোনো দিনমজুরকে নিয়ে উপন্যাস লিখতে, তিনি এমন এক চমৎকার উপন্যাস লিখে ফেলবেন, যা হয়ে উঠবে অনন্য। মৃত্যু সাধারণ একটা ব্যাপার। প্রত্যেক মানুষকেই মরতে হয়। কারো মৃত্যু হয় স্বাভাবিক, কারো বা অস্বাভাবিক। ইমদাদুল হক মিলনকে যদি কোনো একজন মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে লিখতে বলা হয়, তিনি এমনভাবে, এমন বিস্তৃত পরিসরে লিখবেন, মানুষটা মরতে মরতে উপন্যাসের দুই শত পৃষ্ঠা শেষ হয়ে যাবে, তবু রয়ে যাবে সেই মৃত্যুর শোক, সেই মৃত্যুর রেশ। পাঠক মোটেই ক্লান্ত হবে না। পাঠকের কাছে মোটেই একঘেয়ে লাগবে না। কেননা তিনি জানেন কীভাবে পাঠককে মুগ্ধ করে রাখতে হয়।

অধিক লেখার এই একটা সুবিধা, হাত খুলে যায়। শব্দ, বাক্য, আঙ্গিক, গল্প নিজের আয়ত্তের মধ্যে চলে আসে। অনেকে বলেন বেশি লেখা ভালো নয়, বেশি লিখে ভালো সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় না। কথাটা সর্বক্ষেত্রে সত্যি নয়। এর উল্টোটাও হয়। অনেকে কম লেখেন। কিন্তু কম লিখতে গিয়ে তার হাতটা ঠিকঠাক খোলে না, আখ্যানটা ঠিকঠাক সাজাতে পারেন না, কোথাও যেন একটা দ্বিধা টের পাওয়া যায়, সংকোচ টের পাওয়া যায়। শব্দের সঠিক প্রয়োগ ঘটাতে পারেন না, ভাষায় জড়তা টের পাওয়া যায়। তা পড়তে গিয়ে ক্লান্তি লাগে। তা পড়ে সাহিত্যের প্রকৃত রস আস্বাদন করা যায় না। সেক্ষেত্রে ইমদাদুল হক মিলনের সবচেয়ে দুর্বল উপন্যাসটি পড়তে গেলেও অন্তত এটা মনে হবে না যে তার ভাষা শ্লথ, তিনি শব্দের সঠিক প্রয়োগ করতে পারেননি, কিংবা গল্পটা ঠিকঠাক সাজাতে পারেননি। আমাদের কালে আমরা যে-সব ঔপন্যাসিককে পেয়েছি, যাঁদেরকে দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ইমদাদুল হক মিলন একজন, যিনি উপন্যাস-সাহিত্যটা ঠিকঠাক বোঝেন। উপন্যাস লিখতে গিয়ে তিনি প্রবন্ধ ফেঁদে বসেন না, উপন্যাস লিখতে গিয়ে তিনি জীবনবৃত্তান্ত লিখে ফেলেন না।

আমাদের আড্ডাগুলোতে কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলনের প্রসঙ্গ উঠলে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় তাঁর ‘অধিবাস’, ‘পরাধীনতা’, ‘কালাকাল’,‘পরবাস’, ‘কালোঘোড়া’, ‘ভূমিপুত্র’ প্রভৃতি উপন্যাস। ‘নূরজাহান’ তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাসগুলোর একটি। কিন্তু সম্ভবত এটির পঠিত হয়েছে তুলনামূলক কম। আয়তনের দিক থেকে বিশাল হওয়ায় অধিকাংশ পাঠক ধৈর্য নিয়ে উপন্যাসটি পড়ে শেষ করতে পারে না। এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত ধারণা। উল্টোটাও হতে পারে। এমনও হতে পারে, ইমদাদুল হক মিলনের বহুল পঠিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘নূরজাহান’ একটি। এমনও হতে পারে, তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মতো এটিও বাংলাদেশের একেবারে প্রান্তের পাঠকটির কাছেও পৌঁছে গেছে। গল্প-উপন্যাস লিখে প্রান্তের পাঠকের কাছে পৌঁছা সহজ কথা নয়। বাংলাদেশের কম লেখকই পৌঁছাতে পেরেছেন। সবচেয়ে বেশি পৌঁছেছেন হুমায়ূন আহমেদ, তারপরেই ইমদাদুল হক মিলনের স্থান। বাংলাদেশের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হিসেবে এ দুই ঔপন্যাসিকের নাম পাশাপাশি উচ্চারিত হয়।

সাহিত্যের পাঠক হিসেবে আমরা কত কিছুই তো পড়ি। কিন্তু সব পাঠ আমাদের স্মৃতিতে থাকে না, আমাদের সঙ্গে থাকে না। অধিকাংশ পাঠই হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় সেসব পাঠ আমাদের মনে কোনো রেখাপাত করতে পারে না বলে, কোনো দোলা দিতে পারে না বলে। আমাদের সঙ্গে, আমাদের স্মৃতিতে থাকে অল্প কিছু লেখা, গল্প-উপন্যাসের অল্প কিছু চরিত্র, কবিতার অল্প কিছু পঙ্‌ক্তি। আমার স্মৃতিতে থেকে গেছে প্রায় পনেরো বছর আগে পড়া ইমদাদুল হক মিলনের বেশ কিছু গল্প। আমি মনোযোগ দিয়ে তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ পড়েছিলাম। বুঝতে চেয়েছিলাম গল্পকার হিসেবে ইমদাদুল হক মিলন কেমন, কতটা দক্ষ, বাংলাদেশের শীর্ষ গল্পকারদের সঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে কিনা। বুঝতে চেয়েছিলাম গল্পকার হিসেবে তিনি আমাকে তুষ্ট করতে পারেন কিনা। পেরেছেন। তাঁর গল্প আমার মনে রেখা এঁকে দিয়ে গেছে, দোলা দিয়ে গেছে। অবশ্য সব গল্প নয়, সব গল্পের কথা স্মৃতিতে নেই। আছে এই গল্পগুলো : ‘গাহে অচিন পাখি’, ‘মমিন সাধুর তুকতাক’, ‘কিরমান ডাকাতের প্রথম ও দ্বিতীয় জীবন’, ‘লাশ পড়ছে’, ‘খরা কিংবা বৃষ্টির পরে’, ‘জোয়ারের দিন’, ‘মানুষ কাঁদছে’, ‘গগনবাবুর জীবনচরিত’, ‘সোনাদাস বাউলের কথকতা’, ‘রাজাবদমাস’, ‘লোকটি রাজাকার ছিল’, ‘নেতা যে রাতে নিহত হলেন’, ‘মানুষের আড়ালে মানুষ’ এবং ‘গোপন দুয়ার’।

কত বিষয়েই না তিনি গল্প লিখেছেন! লিখেছেন গ্রামীণ হাটের মিষ্টির দোকানিকে নিয়ে, হাজাম অথবা বেলদার সম্প্রদায়কে নিয়ে। তাঁর গল্পে বিষয় হয়ে এসেছে সেজাল খাঁ ফকিরের জ্বীন নামানোর কথা, সার্কাসের জোকার, গ্রামের পতিতা, পাগল, কুকুর, নদীর ভাঙন, জোয়ারভাটা, মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামের অনুচ্চারিত প্রেম, চোর-ডাকাত, গাছপালা, শহুরে টাউট, দুর্ভিক্ষ, স্বাধীনতা, পরাধীনতার মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়। মনে রেখাপাত করে যাওয়া গল্পগুলোর কাহিনি, চরিত্র আমার স্মৃতিতে এখনো সজীব। স্মৃতিতে সবচেয়ে বেশি জাগরূক আছে ‘গাহে অচিন পাখি’ গল্পটি। ইমদাদুল হক মিলনের সাহিত্য প্রসঙ্গ উঠলেই প্রথমে মনে পড়ে যায় এই গল্পটির কথা। নাকে এসে ধাক্কা খায় আমিত্তির ঘ্রাণ, চোখের সামনে ভেসে ওঠে পবনার মুখ, লতিফের মুখ। একজন লেখক তখনই সার্থক, যখন তার কোনো গল্প, কোনো উপন্যাস কিংবা গল্প-উপন্যাসের কোনো চরিত্র পাঠকের স্মৃতিতে থেকে যায়; যখন লেখকের নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে যায় তার সৃষ্ট চরিত্রসমূহের কথা। ফলে ইমদাদুল হক মিলন সার্থক। নিশ্চয়ই আমার মতো আরও অসংখ্য পাঠকের হৃদয়েও তাঁর গল্প-উপন্যাসের কাহিনি এবং গল্প-উপন্যাসের চরিত্ররা গেঁথে আছে।

ইমদাদুল হক মিলন রচিত আমার সর্বশেষ পড়া উপন্যাস ‘একাত্তর ও একজন মা’। শুরুতে যে কথা বলেছি, দীর্ঘদিনের চর্চার ফলে লেখার যে দক্ষতার কথা, হাত খুলে যাওয়ার যে কথা―এই উপন্যাস পড়ে ঠিক তেমনটাই মনে হয়েছে। এই উপন্যাসের কাহিনি নির্মাণে খুঁত নেই, কোনো দ্বিধা নেই, কোনো ছন্দপতন নেই, চরিত্রগুলো ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে যাচ্ছে; ভাষায় কোনো জড়তা নেই, সংলাপে কোনো বাহুল্য নেই। পুরান ঢাকার পটভূমিতে এই উপন্যাসে ব্যবহৃত হয়েছে বিক্রমপুরের আঞ্চলিক ভাষা। একইসঙ্গে রয়েছে পুরান ঢাকার ভাষাও। বর্ণনাও আঞ্চলিক ভাষায়, চরিত্রদের কথোপকথনও আঞ্চলিক ভাষায়। এটা একটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বটে। সব অঞ্চলের পাঠকের কথা বিবেচনায় রেখে ঔপন্যাসিকরা সাধারণত আঞ্চলিক ভাষায় উপন্যাস লেখার ঝুঁকিটা নিতে চান না। হাসান আজিজুল হক নিয়েছিলেন। লিখেছেন ‘আগুনপাখি’। আর নিলেন ইমদাদুল হক মিলন, লিখলেন ‘একাত্তর ও একজন মা’। এই উপন্যাসের চরিত্ররা বিক্রমপুরের যে ভাষায় কথা বলে, পাঠক হিসেবে সেই ভাষা আমার বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি। অন্য পাঠকেরও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। একবারও মনে হয়নি এই ভাষা উপন্যাসের ভাষা নয়, মনে হয়নি এই ভাষায় উপন্যাস লেখা যায় না। বরং মনে হয়েছে, উপন্যাসটি এই ভাষায় লেখা হয়েছে বলেই ব্যতিক্রম হয়ে উঠেছে, অসাধারণ হয়ে উঠেছে, অনন্য হয়ে উঠেছে। এই ভাষায় লেখা হয়েছে বলেই চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে, কাহিনিবর্তী হয়ে উঠেছে, কালবর্তী হয়েছে। এই ভাষায় লেখা হয়েছে বলেই একটা কালকে, একটা অঞ্চলকে ঠিকঠাকমতো ধরা গেছে।

কোন কালকে ধরা গেছে? মুক্তিযুদ্ধের সেই দুষ্কালকে, যখন স্বাভাবিক মৃত্যুর কোনো গ্যারান্টি নেই, যখন জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই, যখন আয়-রোজগারের কোনো পথ খোলা নেই, যখন সারা দেশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পাক হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরেরা। উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র মিলু সেই দুষ্কালের বর্ণনা দিচ্ছে এভাবে, ‘আমাদের পুরান ঢাকা, সূত্রাপুর গেণ্ডারিয়া লক্ষ্মীবাজার, এইসব এলাকায় লোক গিজগিজ করতো। এখন লোকজন সেই অর্থে নেইই। যে যেভাবে পারে ঢাকা ছেড়ে পালিয়েছে। গ্রামে চলে গেছে হাজার হাজার পরিবার। বর্ডার এলাকার লোকজন গেছে বর্ডার পেরিয়ে। ওপারে নিরাপদ জীবন। উদ্বাস্তু ক্যাম্পেও কষ্টের শেষ নেই। খাবারের টানাটানি, অষুদ পাওয়া যায় না ঠিকমতো। তা হোক। জীবনের নিরাপত্তা তো আছে। যখন তখন গুলি করে মারতে পারবে না পাকিস্তানি কুত্তারা। জীবনের নিশ্চয়তা তো আছে। বেঁচে তো থাকা যাবে। আমাদের মতো যারা অসহায় শুধু সেই রকম মানুষগুলোই হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে থেকে গেছে ঢাকায়। যাদের আর কোনো উপায় নেই। যাওয়ার জায়গা নেই। চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে মিলিটারি জিপ, সাক্ষাৎ যমদূত। একটু সন্দেহ হলেই গুলি। কোনো বাছবিচার নেই। ইচ্ছা হলেই গুলি। ইচ্ছা হলেই জিপে তুলে নিয়ে যাওয়া। যাকে নেয়, তেনারা দুচারজন হয়ত বরাত জোরে ফিরে আসে। বাকিরা ফেরে না। কোথায় কোন নদী-খালের ধারে নিয়ে গুলি করে লাশ ফেলে দেয়। গণহত্যা চালিয়ে মাটিচাপা দেয় একসঙ্গে বিশ পঞ্চাশ একশ দুশোজন মানুষ।’

এই উপন্যাস প্রধানত মুক্তিযুদ্ধের হলেও একইসঙ্গে এই উপন্যাস আনোয়ারা বেগমের, গিয়াসউদ্দিন ওরফে গগনের, মিলুর, আজাদের এবং মণিরও। গল্পটা তারাই বলে। উপন্যাসটির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে মূলত একজন বাবার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। একাত্তরের সেই দুষ্কালে মারা যায় আনোয়ারা বেগমের স্বামী গিয়াসউদ্দিন। স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, হত্যা। সেই হত্যা গুলি, বোমা কিংবা বেয়োনেটে নয়, অন্যভাবে ঘটানো হয়েছে। একজন কাবলিওয়ালা পাকহানাদারদের সহযোগিতা নিয়ে সেই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের দুষ্কাল এবং সেই দুষ্কালে গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুতে তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের যে লড়াই, সেই লড়াইকে দেখানো হয়েছে উপন্যাসটিতে। সে কারণেই উপন্যাসের নাম ‘একাত্তর ও একজন মা’। গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুকে ইমদাদুল হক মিলন এমনভাবে, এমন বিস্তৃত পরিসরে লিখেছেন, গোটা উপন্যাসে রয়ে গেছে তার প্রভাব, সব চরিত্র হয়েছে শোকার্ত। একজন মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধের সেই নিদারুণ অস্থির সময়ের পরিস্থিতি বর্ণিত হয়েছে অসাধারণভাবে।

ঢাকা শহরের পটভূমিতে রচিত বাংলাদেশের উপন্যাসের সংখ্যা কম। শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত আলী, সৈয়দ শামসুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-সহ আমাদের প্রধান ঔপন্যাসিকগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্রাম বা গ্রামীণ জীবনকেই উপন্যাসের উপজীব্য করেছেন। ব্যতিক্রম কেবল শহীদুল জহির। তাঁর বিখ্যাত দুটি উপন্যাসই ঢাকা শহর কেন্দ্রিক। ইমদাদুল হক মিলনের ‘একাত্তর ও একজন মা’ উপন্যাসে অর্ধ শতাব্দী আগের পুরান ঢাকার একটা চিত্র পাওয়া যায়। ঔপন্যাসিক অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পুরান ঢাকার ভূগোলকে সাজিয়েছেন। যেন প্রতিটা এলকা তাঁর চেনা, প্রতিটি রাস্তা তাঁর চেনা, প্রতিটা গলি তাঁর চেনা, এমনকি পুরান ঢাকার মানুষগুলোও তাঁর বহুদিনের চেনাজানা। যেন তিনি অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলে, তাদের জীবন, তাদের পরিবার, তাদের সংস্কৃতি প্রত্যক্ষ করে উপন্যাসটি লিখেছেন।

আমাদের আড্ডায় ইমদাদুল হক মিলনের যে উপন্যাসগুলোর কথা আলোচিত হয়, সেগুলোর সঙ্গে ভবিষ্যতে আলোচিত হবে ‘একাত্তর ও একজন মা’ উপন্যাসটিও। নতুন প্রজন্ম, কিংবা অনাগত প্রজন্মের যারা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চাইবে, সেই নিদারুণ দুষ্কাল সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হবে, তখন তারা খুঁজে নেবে ‘একাত্তর ও একজন’ মাকে। কেননা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এটি একটি সার্থক উপন্যাস। মনে হয়েছে, ইমদাদুল হক মিলন এই উপন্যাস হুট করে লিখে ফেলেননি, ঘরের কোণায় টেবিলে বসে লিখে ফেলেননি। এই উপন্যাস লেখার জন্য তিনি নিয়েছেন দীর্ঘ প্রস্তুতি, বিস্তর গবেষণা করেছেন, নানা বইপত্রের সহায়তা নিয়েছেন। এটি তার পরিশ্রমলব্ধ একটি সাহিত্যকর্ম। এটি থেকে যাবে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে, হারিয়ে যাবে না কালের গর্ভে।

একজন লেখক শুধু লেখালেখিকে অবলম্বন করে যে জীবনকে সাফল করে তুলতে পারেন, সেই দৃষ্টান্ত রেখেছেন কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলন। জীবনের সত্তর বছর তিনি অতিক্রম করছেন। জীবনের অধিকাংশ সময়ই তিনি লেখালেখির পেছনে ব্যয় করেছেন। অধিকাংশ সময় তিনি সাহিত্যের সঙ্গে ছিলেন, এখনো আছেন এবং অনাগত দিনেও থাকবেন। বাংলা সাহিত্যের ভূমিকে ফুলে ও ফসলে তিনি ভরিয়েছেন, ভবিষ্যতেও ভরিয়ে তুলবেন। তাঁর হাত দিয়ে আরও সমৃদ্ধ হবে আমাদের সাহিত্য। তিনি অক্লান্ত এক সাহিত্যস্রষ্টা। পরিস্থিতি অনুকূল হোক কিংবা প্রতিকূল, কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি সাহিত্যকে ছেড়ে যাননি, ভবিষ্যতেও যাবেন না। বাংলা সাহিত্যের পরিশ্রমী, সাহিত্যের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, পাঠক হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া এই কথাশিল্পকে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম