X
রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২
১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

আমার বোধ তো এক নিরবিচ্ছিন্ন স্রোত : অরিত্র সান্যাল

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : জাহিদ সোহাগ
১১ মার্চ ২০২২, ১১:৩৭আপডেট : ১১ মার্চ ২০২২, ১১:৩৮

[কবি এবং অনুবাদক অরিত্র সান্যালের জন্ম ১৯৮৩ সালে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ– নাবিক বিন্দু থেকে (২০১০), আজ কারও জন্মদিন নয় (২০১৩), নিজের আয়ুর মতো শ্যামবর্ণ (২০১৫) এবং একটা বহু পুরোনো নেই (২০১৮)। সমসাময়িক আমেরিকান কবিদের লেখা অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন– ‘ব্রিজেবল লাইনস’ (২০১৯) গ্রন্থে। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে পৌলমী সেনগুপ্তর সঙ্গে যৌথ অনুবাদে কানাডিয়ান কবি আদিনা কারাসিকের কবিতা 'সালোমে বীরাঙ্গণা'।]


জাহিদ সোহাগ : তোমার কবিতা কারা পড়ে বা পড়বে বলে মনে করো?
অরিত্র সান্যাল : উত্তরটি একটি কবির জেনে রাখা জরুরি, তাই না?
জাহিদ, উত্তর কীভাবে দেওয়া যায়–অনেক ভাবলাম। আমি এখনো লেখার প্রথম খসড়াটি খাতায় লিখি, পেন দিয়ে। তুমি কি সরাসরি যন্ত্রে লেখ? অনেকেই লিখছে আজকাল। আমি কিন্তু নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি এই ব্যাপারে। মনে হয়, লেখাকে যথেষ্ট এঁটো করতে পারলাম না। কামড়টা ঠিক বসেনি। ওই যে চোখের সামনে কাটাকুটিগুলো ফুটে ওঠে, ওই ঝঞ্ঝা ঠেলেই তো লেখা ঢুকে এল জীবনে! এসব দেখতে না পেলে–মনে হয় ‘আমার লেখা’ আমার লেখা হয়ে উঠল না। কথাটা এখানেই কিন্তু! আমার লেখা এই পরিশ্রমটুকু ছাড়া আর কী! আমার লেখা বলতে যা বোঝাচ্ছ, তার অবয়ব আমার মনে এটুকুই, আপাতত। এখন, তা কে পড়ে এই বিষয়ে আমার ধ্যান ধারণা থাকলে কী হতে পারে? হয় ক্রমে আমি পাঠকের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে পারি। শব্দে, রূপকল্পে আপ্যায়ন ঝলক দিয়ে উঠতে পারে পাঠকের প্রতি। যাই হোক, কবির ক্ষেত্রে এর উল্টোটা যদি হয়? মানে, কবি নিজের গণ্ডি অতিক্রম করতে, ছক ভাঙতে, পাঠককে আঘাত করতে লেখায় অবিমৃষ্য স্বাধীনতা নিয়ে নিলেন। প্রত্যাশা চূর্ণ করে–ছোবল মেরে, স্বাধীন হয়ে গেলেন যখন, তখন তাঁর উদ্দেশ্যটা কী থাকছে? তা কি এই দেখা যে, সেই উদ্দিষ্ট পাঠকই আছাড়িপিছাড়ি কাঁদছে, চোখ মুছে আবার পড়তে বসছে? কোন লেখা সে পড়তে বসছে তবে? যে লেখা তার রুচির বিপরীতে যাচ্ছে, সেই লেখা? সবাই কি সব লেখা পড়তে পারে? নিজের জন্য নয় এমন লেখা লোকে কখন দৈবাৎ পরে ফেলে? হয়তো কবির অন্ধ ভক্ত হলে, তাই তো? 
কাজেই, মৃদু হাসি ছাড়া এ প্রশ্নের উত্তর আর কী হতে পারে? 

জাহিদ : সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা নাকি দুর্বোধ্য–যদিও আমার কাছে লিরিক্যাল মনে হয়েছে–তোমার কবিতাকে কি জটিল বলা যাবে? [ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি উত্তরকালের প্রজন্ম হয়তো লিরিক্যাল বা নাটকীয়ও বলতে পারে]
অরিত্র : কেউ বলেছে দুর্বোধ্য, আর তোমার মনে হয়েছে লিরিক্যাল। তোমার কাছে কোন মতটি গুরুত্বপূর্ণ? নিশ্চয়ই নিজেরটি! কথা হচ্ছিল সুধীন দত্তকে নিয়ে, আর তুমি আমাকে আমারই কবিতা নিয়ে জিজ্ঞেস করছ–তা জটিল কি না? প্রশ্নটি কী? নিজের কবিতা আমার জটিল মনে হয় কি না? হ্যাঁ, হয়। কিন্তু যে অর্থে তুমি বলছ, হয়তো একেবারে সে অর্থে নয়। লেখা স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক যেকোনো নিয়মেই হোক বদলাবে, সময়ের সঙ্গে। কিন্তু সে বদল আমি কি নিজের কবিতায় অনুভব করতে পারি? জাহিদ, এ নিয়ে আমারই গভীর জিজ্ঞাসা আছে, যদি কিছু বলা যায় দেখ। যখন আমি লেখার কথা ভাবি, মানে, যেদিন থেকে সচেতনভাবে লেখালিখি করছি–অর্থাৎ যেদিন থেকে নিজের কাছে প্রত্যাশার জন্ম হচ্ছে–সেইদিন থেকে আজ অব্দি আমার বোধ তো এক নিরবিচ্ছিন্ন স্রোত। একটা continuum। এর মধ্যে যা বৈচিত্র্য তা জলের ওপর সকাল বিকেল রোদের রূপের তারতম্য যা হয়–হয়তো সেটুকুই। আমার যেটা বলার, তা–আমি সকালের লেখা বিকেলে বুঝতে পারি না–এই হেন পুরোনো একটি কথা। যাইহোক, আরেকটি কথা স্বীকার করে রাখি–সেই স্বীকারোক্তি তোমার প্রশ্নের যথাযথ উত্তর হতে পারে। যা খালি চোখে দেখতে পাচ্ছি, তাকে আমি কোনোদিনই বিশেষ একটা বিশ্বাস করে উঠতে পারিনি। মনে হয় উপযুক্ত চাপ দিলে, বা তাপ দিলে দৃশ্যের আবরণ ফেটে যাবে। লেখালিখি সম্পর্কিত আমার যেটুকু কর্তব্যবোধ, তা শুরু হয় তার পর থেকে। সেই চাপ বা তাপের তীব্রতা সর্বদাই সুষম হয়েছে–এমন তো নয়! তবে এই প্রয়াসকে আমার লেখার প্রসেসের থেকে কখনওই আলাদা করতে পারিনি। লেখার একটি উদ্দেশ্য থাকে, যদিও আমার লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমার স্বচ্ছ ধারণা এখনো নেই। তবু ওই যে টেনসনটি থাকে–তার ফলে হয়তো, লোকে যেমন মাঝে মাঝে ক্যামেরা কনসাস হয়ে পড়ে–আমার ভাষা আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছে প্রায়ই। 
কিন্তু, তুমি বলছ, উত্তর-প্রজন্ম আমার লেখাকে ‘লিরিক্যালও’ বলতে পারে–আবার ‘দুর্বোধ্যও’। একই সঙ্গে এই সব বিপরীতমুখী সম্ভাবনা কি আসতে পারে? কথা হলো, যে ভবিষ্যৎপ্রজন্মর এসব মনে হচ্ছে তা রয়েছে কেবল এক কবির অনুমানে। এই অনুমান একটা ইতিহাসচেতনার ফসল, খেয়াল কর! আমরা কিন্তু একটা কাঠামো দেখেই এগোই। 
ক্ষমাটা চাইলে কার কাছে?
 
জাহিদ : তবে তোমার সাম্প্রতিকালের কবিতায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন গল্প দেখতে পাচ্ছি–এর বৃত্তান্ত কী?
অরিত্র : তুমি কিন্তু উত্তর দিলে না। এ নিয়ে রাগারাগি পরে করছি। তুমি প্রশ্ন শুরু করেছ ‘তবে’ দিয়ে। অর্থাৎ, আগের প্রশ্নটির উত্তরে আমি যা বলতে পারি, তার অভিমুখ তুমি অনুমান করেই নিয়েছ। এই প্রশ্নটি প্রতিযুক্তির মতো এল, তাই তো? কবিতায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন কাহিনির ছায়া পড়লে তা দুর্বোধ্য হয়ে যায় কি না–সব মিলিয়ে এই নিয়ে ভাবা যেতে পারে। 
কাহিনি দিয়ে একটি অভিজ্ঞতাকে সহজে অনুধাবন করা যায়। ছিন্নবিচ্ছিন্ন গল্প হয়তো আমার কবিতায় আগেও ছিল, এক এক লহমার বর্ণনা হিসেবে, আচমকা। তবে, গল্পের ওপর ভর করে কবিতা উৎরে যাচ্ছে, এটা এখনো মেনে নিতে পারি না। সেকারণেই হয়তো গল্প এলেও ভাঙা কাচের টুকরোমাত্র হয়েই আসে। তাতে প্রতিবিম্ব দেখা যায় না, বরং আত্মপ্রতিকৃতিকে সংহার করা যায়। কিছু টুকরো বেমক্কা ফুটেও যেতে পারে মনে, যদি কারোর রক্তক্ষরণ হয় একটু–এ-ই মাত্র আশা। এই হলো এককথা।
আরেকটি কথা, দুবছর আগে আবিষ্কার করলুম, চার্লস সিমিক বলে রেখেছেন নিজের গদ্যগ্রন্থের ভূমিকায়। সে-ও আমার যুক্তিই হয়ে গিয়েছে। সিমিকের মতে আমাদের অস্তিত্বের রহস্য কোনো সুদীর্ঘ গদ্যে ধরা যায় না। …the secret to our identity lies not in some grand narrative, but more often in parentheses between events, among minor incidents and details we have preserved vividly in our memory। এখানে উনি যা বলেছেন, বলেছেন–আমার মনে পড়ল এক একটি মুহূর্তের ওজনের কথা। এক একটি দুপুরে সারা জীবন অতিবাহিত হয়ে গেল–এমন মনে হয় না? সেই মুহূর্তগুলোই আমাদের বেঁচে থাকা, একে একে তাদের সেলাই করে রাখা। এই কথার সূত্রেই একটা মজার চিন্তা মাথায় এসেছিল। ধরো, একজন যত কবিতা লেখে সারা জীবন, তাদের লিখিত হবার মুহূর্তগুলো একের পর এক জুড়ে দেওয়া হলো। ঘণ্টার হিসেবে তা কত হবে? নাকি দিনের হিসেব? সপ্তাহ? হিসাব করে দেখেছি, আমার সব মিলিয়ে চব্বিশ ঘণ্টাও হবে না, এদিকে পাঁচটা কাব্যগ্রন্থ বেরিয়ে গেল! 

জাহিদ : তোমার একটি কবিতা এমন, ‘কোথাও ফিরবার নেই/ পৃথিবীর আকাশে পৃথিবীর উদয় দেখা যাচ্ছে/ সামনে ঘষা কাচ এলে মনে হয়/ তুমি কত আবছাভাবে বেঁচে থাকো’। বুদ্ধদেব বসুর ‘প্রান্তরে কিছুই নেই; জানালায় পর্দা টেনে দে’র মতো নৈরাশ্যজাত তোমার কবিতা? আমরা কেবল নাস্তির সন্তান-সন্ততি?
অরিত্র : দেখো, যা যখন সত্যি মনে হয়, লিখি–এই হল আদর্শ উত্তর। এই লাইনটা কোন কবিতায় লিখেছিলুম ভুলে গিয়েছি। বরং যা দিয়ে ভয় দেখাতে চাইলে, বুদ্ধদেবের সেই লাইনটা নিয়ে ভাবা যাক। প্রান্তরের অসহ্য নিঃস্বতা থেকে নিজেকে রক্ষা করে রাখা। দুহাতে যেমন আলতো একটা শিখাকে বাঁচিয়ে রাখা হয় আর কী! দেখো, এই ঘর ব্যাপারটা তো মূলত আমাদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত একটি সংস্কার বৈ আর কিছু নয়। দরজাগুলো, দেওয়ালগুলো–সবই কি আমরা নিজেরাই নই? আমাদের এটুকুর মধ্যে শান্তি সুস্থতা বেছে নেওয়া মানে, এটুকুর বাইরে বিপন্নতাকে ঠেলে ঠেকিয়ে রাখাও তো বটে! বুদ্ধদেবের এই পঙক্তিগুলি তো সেক্ষেত্রে একটি প্রতিরোধের নামান্তর হচ্ছে–তাই না? আমরা কি খুব খারাপ সময়ে বেঁচে আছি, জাহিদ? ভালো সময় ছিল তবে কোনটা? আমি এর উত্তর সত্যিই জানি না। তুমি লিখেছিলে ‘আমার রক্তের আঁধার তো গেল না’। সুতরাং, প্রশ্নটি আরো ভয়ঙ্করভাবে তোমার দিকেই তাক করে রাখলাম। 

জাহিদ : ময়রা নিজের রসগোল্লা খায় না, অন্য ময়রা এসেও চেখে দেখে না–এমন কথা প্রচলিত আছে, কিন্তু কবিতার বেলায় দেখো ব্যাপারটা উল্টো; কবিতার নিরপেক্ষ পাঠক বলে কিছু নেই। কবিতার পাঠক মানে, তিনি কবি, বা ব্যর্থ কবি। নাকি এর ভিন্নতাও আছে?
অরিত্র : এসব কিন্তু আমাদের মন খারাপের কথা। নিরপেক্ষ পাঠক কি কেউ নেই? নিশ্চয় আছেন, কম সংখ্যায়, হতেই পারে যে তাঁরা কবির সঙ্গে পরিচয়ে আগ্রহ বোধ করলেন না। কবিতা শেষ পর্যন্ত তো একটি ভোগ্যবস্তু। কথা হচ্ছে, যিনি লিখছেন, তিনিও কিন্তু ভোগই করছেন। তাই লিখে বাড়তি কিছু চাওয়ার কথা অবান্তর; আর চাইলেও তো পাওয়া যায় না। 
তুমি যে অনুযোগের সুর এনেছ, তার নিষ্পত্তি কিন্তু কবির কাজ না। আরো সুষ্ঠুভাবে বলতে গেলে, একা কবির কাজ না। সুস্থ রুচির বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে, প্রকাশক, উপস্থাপক, ব্যবস্থাপক–সবাইকে উদ্যোগী হয়ে উঠতে হয়। সামগ্রিক বাতাবরণে বদল না এলে এতকিছু একসঙ্গে এতকিছু সম্ভব কি? আমি প্যারাডাইম শিফটের কথা বলছি। কবিতাকে না-পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে তাকে পণ্য হিসেবেই দেখতে হবে। কিন্তু কবিতাকে বিনোদন হিসেবে দেখতেও অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। এই তো, এত কথা বলছি, আমার নিজেরই কিছু শুচিবাই রয়েছে। বিনোদন শব্দটিকে লঘুভাবে ছাড়া ভাবতে পারিই না। অথচ, যা আমায় ভাবায়, বিনোদন তো সেটাই। বেশিরভাগ সময়েই অন্যান্য বিনোদনের মাধ্যম আমাদের ভাবনাচিন্তার পরিশ্রম থেকে ছুটি দিয়ে দেয়।
আচ্ছা, এই ব্যর্থ কবি বস্তুটি কী? পারলে ব্যর্থ প্রেমিক কী, সেটির মানেও বুঝিয়ে দিয়ো। 
ব্যর্থতাবোধ ছাড়া কবি হয়? 
সমাজের কোন মানদণ্ডে কোন কবি ব্যর্থ হল, এই প্রসঙ্গ তখন আসবে যখন আমাদের বাজার কবিতামুখী হবে। সে নানানরকমভাবে হতে পারে।
এখন, এইসব কথা বলেই নিজেদের শান্ত রাখা আর কী!

জাহিদ : তোমার সময়ে পশ্চিমবঙ্গে যারা লিখছে তাদের কবিতা কি অগ্রাহ্য করো? এমন কি ভাবো যে, শুধু তোমারই হয়, আর কারো কবিতা হয় না?
অরিত্র : সেটা কি আমরা সবাই-ই কোনো না কোনো সময়ে ভেবে থাকি না? আমি ছাড়া পারেটা কে? কার পক্ষে সম্ভব? কিন্তু একটি মুশকিল আছে। আমার সমসাময়িক কবিরা যে যে ভাবে লেখেন, তার কোনোটার মতোই লেখার আমার কোনোদিনই রুচি হয়নি। রুচিই বললাম, কারণ পার্থক্যটা রুচিরই। তাঁরাও কেউ আমার মতো লেখার ভুল করেননি। লিখতে কতটা পারি কি না-পারি, সে প্রশ্নের আগে আসে লেখার intention। সেখানেই হয়তো মিশ খায় না। এদিকে যা লিখছি, তা হয়তো প্রত্যাশার থেকে তো বটেই, বন্ধুদের থেকেও খারাপ।
সে তো ভাই, তুমিও ভাবো, অরিত্রর আর হলো না! যেমন আমিও ভাবি, জাহিদের আর হলো কই? সমসাময়িকদের কি আমরা মেনে নিতে পারি? পারলে সকল মহাকবিই সমকালে স্বীকৃত হতেন। আমাদের মধ্যেই তো কেউ আছেন, যিনি আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে আসল উজ্জ্বলতায় ফেটে পড়বেন, হয়তো সামনেই আছেন, বা কয়েকদিন পরে আসবেন, তাকে বিশেষ পাত্তাও দেবো না। এইরকমই হয়। 

জাহিদ : শঙ্খ-শক্তি-বিনয়ের বিপরীত দিকে উৎপলকুমার বসুকে কীভাবে পাঠ করো?
অরিত্র : প্রশ্নটার মানে কী? আর বিপরীতে শব্দটি তো বলেই দিলে! এরপর আর কী বলতে পারি। শঙ্খ, শক্তি, বিনয়ের সঙ্গে এক ব্র্যাকেটে উৎপল থাকতে পারেন না, ঠিকই, তবে এঁরা এক ব্র্যাকেটে থেকে নিশ্চয়ই কম হয়ে গেলেন না! তুমি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন গল্পের প্রসঙ্গে কথা বলছিলে না? তা উৎপলকে গ্রহণ করার পরেও তাঁকে আমার খঞ্জ অনুগমন নিয়ে আপত্তি থাকার তো কথা না! উৎপল সম্পর্কে কী বলা যায়–কবিতা কী, তা তো কবিতা কী নয়–তার ওপরও নির্ভরশীল। নানান অবান্তর কথা অনর্গল ভাবে এসে যাচ্ছে–কিন্তু কবিতায় গৃহপ্রবেশের পরে তারা আর অবান্তর থাকছে না। 
আমার মনে হয়, জীবনের মধ্যে একটি অসীম নির্বিকারতা আছে। কিন্তু তার মধ্যে থেকেই অর্থ দোহন করে আমরা বেঁচে থাকি। অন্যদিকে তাকিয়ে থাকছি, ভুলে থাকছি যে কিছুরই হয়তো অর্থ নেই। সেই কারণেই হয়তো, মানুষের বিনোদন, কৃষ্টি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস। অর্থ নেই, কিন্তু আমরা উৎপাদন করছি অর্থ–সুখে আছি, বা দুঃখে। এটা মহাজগতের নীরবতার বিরুদ্ধে একটা resistance। কেউ কেউ এই অর্থহীনতার ধাঁচটাকে পাকড়াও করতে পারেন অবলীলায়। জন অ্যাশবেরি এই পথের মহানবি। 
উৎপল যা-ই লেখেন, ওঁর ওষ্ঠ থেকে মুচকে হাসিটা কখনওই যায় না। 

জাহিদ : বাংলাদেশের বইপত্র পাঠের ক্ষেত্রে তোমার আলস্য কেমন? তোমাদের দোকানে তো পাওয়াই যায় না, তোমরা নিশ্চয়ই দোকানে গিয়ে চাও-ও না? 
অরিত্র : তুমি সারাক্ষণ আমায় উৎত্যক্ত করার চেষ্টা করছ। এইবার সফল হলে। আমাদের বাণিজ্য ব্যবস্থার ব্যর্থতার দায়ভার তুমি আমার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছ। এটায় একপ্রকার উল্লাস বোধ করছ নিশ্চয়ই! তুমি এদিককার ক’টা ওঁচা কবির নাম করতে পারবে? আমি না হয় বন্ধু; আমার কথা বাদ দাও। আমার লেখা তো হাতেগরম পড়ছ বরাবর–কিন্তু ক’টা বই দেখেছ নিজের চোখে? যেক’টা দেখেছ সবই আমি নিজে হাতে দিয়েছি। একটা জায়গার লেখার সঙ্গে পরিচিত হওয়া মানে তো এই নয়–শুধু বাছাই কবিদের সারাৎসারটুকু জানা! সবাইকে জানতে হবে, বুঝতে হবে। তোমার লেখা আমায় প্রভাবিত করে, ব্যক্তিগতভাবে আগে তোমায় বলেছি–তবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে বলেই তোমার নাম আমি করছি না। হাসান রোবায়েতের লেখা ধারাবাহিকভাবে পড়ি। হাসান অনেক লেখে, অনেকরকম লেখে, হাতে ক্ষমতা ঈর্ষণীয়। তবে ওর সব পরীক্ষাই যে আমায় আন্দোলিত করে–তা না। আগে তো কালি ও কলম ছাড়া কোনো বাংলাদেশ প্রকাশিত পত্রিকা এখানে নিয়মিত পাওয়া যেত না। বিগত দশকের শেষ দিক থেকে অনেকের লেখা পড়তে শুরু করলাম। ওয়েব্জিন আসার ফলেই তা সম্ভব হয়েছে। তার আগে নব্বইয়ের কবি–রাদ আহমেদদার বই কৌরব থেকে বেরিয়েছিল। ব্রথেল মালিকের কারপার্ক। সেটা সহজেই হাতে এসেছিল। আমার বন্ধু সিলভিয়া নাজনীন ওর বই হাতে করে আমায় দিয়েছে–ও তখন কোলকাতায় থাকত। ব্যাপারটা বোঝো, ও আমার জন্য এনেছে বই, আর মায়ের জন্য রান্নার মসলা। সব ক্ষেত্রেই দেখ, ব্যক্তিগত যোগাযোগটাই মূল হয়ে যাচ্ছে। দোকানে দাঁড়িয়ে পাতা উলটে শুঁকে যে পড়ব, সে সুযোগ এখনো আসেনি। সিলভিয়া আমায় এনে দিত অর্বাক পত্রিকার সংখ্যা। সেই সূত্রে দ্রাবিড় সৈকতের লেখা পড়েছি একটানা। আগে শ্রীমাণী মার্কেটের ওপর ছিল নয়া উদ্যোগের দোকান, কিন্তু সেখানে কি আর আমাদের বয়সীদের বই পাওয়া যেত? সে-ই বইমেলাই ভরসা। নাম অনেকেরই করা যায় জাহিদ, কিন্তু সেটা মাত্র শর্তে জেতার চেষ্টা হয়ে থাকবে। বিচ্ছিন্নভাবে সবার লেখা পড়েছি, এখানে পত্রিকায় ছাপা হয়, কবিসম্মেলনে ছাপা হয়, পড়েছি, বই পাইনি হাতে। নিজে বেছে যে বই কিনব, সে পরিস্থিতিই আসেনি–এই সূত্রে আমাদের সময়ের বাংলাদেশের কবিরা কেমন গ্রন্থ নির্মাণ করছেন, তাতে তাদের কতটা চিন্তাভাবনা প্রকাশিত হচ্ছে–এটা জানার সুযোগ হয়নি। এই আমার আলস্যযাপন। 

জাহিদ : তাহলে আজ আমাদের নটে গাছটি মুড়োল?
অরিত্র : হ্যাঁ

অরিত্র সান্যালের কবিতা

 

/জেডএস/
বিএসআরএফ-ওয়ালটন স্পোর্টস ফেস্টিভ্যাল শুরু সোমবার  
বিএসআরএফ-ওয়ালটন স্পোর্টস ফেস্টিভ্যাল শুরু সোমবার  
চীনে টানা চতুর্থ দিনের মতো কোভিড শনাক্তের রেকর্ড
চীনে টানা চতুর্থ দিনের মতো কোভিড শনাক্তের রেকর্ড
সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি ৩ আগস্ট
সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি ৩ আগস্ট
ঋণ খেলাপের অভিযোগে গ্রেফতার ১২ কৃষক জামিন পেয়েছেন
ঋণ খেলাপের অভিযোগে গ্রেফতার ১২ কৃষক জামিন পেয়েছেন
সর্বাধিক পঠিত
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী