নাবালেক ও বালেক কাল || নাজিব তারেক

.
০৫ জুন ২০১৬, ১২:০৫আপডেট : ০৫ জুন ২০১৬, ১২:৩৪


ইলাস্ট্রেশন : নাজিব তারেক প্রথমে ছিঃ করিয়া লাফ দিয়া উঠি, তারপর ছবি-সুন্দরীর রূপে মজি আর ভাবি পাশের বাড়ির মেয়েটি কবে এরকম রূপসী হবে! এটাও আবিষ্কার করি বড় ভাই বড় হইয়াছেন আমরা এখন নেহাত ছোট

বালেক হইবার কালে জানিলাম আমি মুমিন নহে। পিতার সন্তান মাত্র, যাহার মুমিন হইবার সম্ভাবনা আছে। মুমিন হইতে গন্দম খাইয়া আদম হইতে লাগিবে। রাষ্ট্রের ভাষায় আঠারো বছর ও তদূর্ধ্ব। বেশ, তবে তাই হোক। যাহাই দেখিতে বুঝিতে চাই তাহাতেই লিখা ‘প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য’ ফিরি অভ্যাস ও শৈশবে ‘তুমি ছোট নও’। কি করি? কি করি? এসো তবে বন্ধুরা মিলি জীবন আবিষ্কারে, আবিষ্কার করি নিজেকেই...
দেখাদেখি চাষ
পাশাপাশি বাস
শরীর বাড়িতেছে বছর হিসেবে, কোনও কোনও অঙ্গ সেকেন্ডে বাড়িয়া যায়, ‘তুমি ছোট আছো’ বকা শুনিয়া সে আবার ছোটও হইয়া যায়! কি কাণ্ড, কি কাণ্ড! সমবয়সী বন্ধুদের চেয়ে বড় শিক্ষক কে? আর যে পড়িতে পারে তাহার জন্য জগৎ খোলা। সেটা এ নেটের যুগ হোক আর আমাদের কালের নিউজপ্রিন্ট কাগজে ছাপা চটি বই হোক। আর পড়িবার মজাই আলাদা। আর তাহা সচিত্র হইলে দারুণ জ্ঞান লাভ। আর বন্ধুরা যদি জানে তুমি আঁকিতে পারো তবে তো কথাই নাই। স্কুলের শ্রেণি শিক্ষক আসেন নাই। অতত্রব, ছাত্রেরা সাবধান! চুপ করিয়া বসিয়া বসিয়া ঝিমাইতে থাকো। তাহা কি সম্ভব? হে মধ্যবয়স্ক শিক্ষক সাহেব আপনার কিশোর বয়সে আপনি কি করিতেন? ধান খেত, পাট খেত আছে, আছে বিবিধ ফলগাছ! আমাদের নগরে যে তাহা নাই। স্কুল ব্যাগ আছে, আছে ব্লাক বোর্ড। স্কুল ব্যাগ ভর্তি বই, পাঠ্য এবং পাঠ্য। যদিও কিছু কিছু বইয়ের গায়ে রানী ভিক্টোরিয়ার কালে ছাপ দেয়া হইয়াছিল ‘প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য’। কিন্তু সকল চাকুরিতেই অভিজ্ঞদের আলাদা দাম। অভিজ্ঞতা বাড়াইতে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘বই অভিজ্ঞতার আধার’ পরামর্শ মানিয়া আমরা কল্পনায় স্বর্গের মুকসেদুল মুমিন হইয়া যাই। অপার বিস্ময়ে চারদিক দেখি, চারপাশের মানুষগুলি নারী ও পুরুষ হইয়া ওঠে।

আগে দর্শনধারী
পরে গুণ বিচারি
ইহা সকল নারীই জানে। জানে বলিয়াই কসমেটিকস কোম্পানিগুলির ট্রিলিয়ন ডলার ব্যবসা। ‘সেবা প্রকাশনী’র কাজী আনোয়ার হোসেন তাহা জানিতেন। সস্তার কসমেটিকসেও তাহার প্রকাশনীর বই আমাদের টানিতো। কারণ তিনি এটাও জানিতেন, কসমেটিকস নয় বউ সাজায় সাজুনি বা রূপ বিশেষজ্ঞ। আমাদের স্কুল ব্যাগে তাই প্রজাপতি মার্কা বই থাকিতো। শিক্ষক না থাকিলে পুঁথিপাঠ হইতো। থাকিলে নীরব পাঠ আর আদান-প্রদান। মাঝে মাঝে শেষ বেঞ্চে বসিয়া এ নীরব পাঠ ধরা পড়িতো এবং তৎক্ষণাৎ কর্ণ ধারণ পূর্বক দণ্ডায়মান থাকিবার পুরস্কার জুটিতো। বইখানা ক’দিনের জন্য বেহাত হইতো এবং প্রায় সপ্তাহ জুড়িয়া শঙ্কা থাকিতো পিতাকে ডাকিয়া পাঠানো হইবে।
আমরা বড়ই অভাগা কিশোর, আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বড়ই বেরসিক। তাহারা পণ করিয়াছিলেন আমাদের আদম বানাইয়াই ছাড়িবেন। পিতাকে না ডাকিয়াই সপ্তাহান্তে ধৃত আসামীর শাস্তি বিধান হইতো, ক্লাসের পাঠ শেষে অতিরিক্ত সময়ে পুঁথিপাঠ কর। কাজী আনোয়ার হোসেন, কাজী মাহবুব হোসেন, রকিব হাসান ভালোই লিখিতেন, কিন্তু আমরাও কম নই। পুঁথি পাঠক হিসেবে আমরাও সেন্সর বোর্ড প্রধান কিংবা জাদরেল অনলাইন এডিটর। ক্লাসের ঘণ্টা বাজিলে শিক্ষক মহাশয় বলিতেন ‘থাম! অনেক কিছু বাদ দিয়ে পড়েছিস। সকলকে বইটা দিস যেন বাদ দেয়া অংশ ওরা পড়ে নিতে পারে।’ চাঁদায় কেনা বই অবশেষে স্কুল ব্যাগ পাঠাগারে ফেরত আসিতো।
বয়সেতে বিজ্ঞ নয়
বিজ্ঞ হয় জ্ঞানে
আগেই জানিয়াছি সমবয়সী বন্ধুদের চেয়ে বড় শিক্ষক নাই। প্রজাপতি পাঠে আমাদের কিছু জ্ঞান হইলো কিন্তু আরো গভীর ও সুবিস্তৃত জ্ঞান লাভের প্রচেষ্টা যে জীবনেরই অঙ্গ। আমাদের যে পাট খেত নাই, নাই রসিক অথবা ফাজিল দাদি, যিনি আমাদের শোনাবেন ‘গার্লফ্রেন্ড হোক আর দাদিই হোক, আলিঙ্গন হচ্ছে আলিঙ্গন...’। আমাদের জানা ছিল বাংলিশ নগরের দাদিরা সকলেই ‘কুইন ভিক্টোরিয়া’, ক’দিন আগে আজিজ মার্কেটের বইয়ের দোকানে গিয়ে দেখি ফরাসি ফুকোও সে রকমই বলছেন। রেখা অভিনীত কামসূত্র সিনেমা দেখিয়া আমরা এও জানিয়াছি, একদা ভারত নামক কোনও এক দেশে বড় হইবার বিদ্যা প্রদানের জন্য বিদ্যালয় ছিল। তাহা এখন নাই এবং ইহা সিনেমার গল্পও হইতে পারে, যাই হোক আমরা দারস্থ হলাম ‘রসময় গুপ্ত ও গং-এর। হ্যাঁ, আমরা অবশ্য এটা জানতাম এবার ধরা পড়লে সেন্সর পুঁথিপাঠ হবে না, আমরাই সেন্সর হয়ে যেতে পারি। দেশ স্বাধীন হইলেও কুইন ভিক্টোরিয়ার আইন আজো বলবৎ, কারণ তাহাই উন্নয়ন ও নৈতিকতা। তাই স্কুল ব্যাগ পাঠাগারেও এ মুদ্রিত কাগজ রাখা নিরাপদ নয়। কিন্তু ছোটরা সর্বদাই সমস্যা সমাধানে ওস্তাদ। তো আমরা স্কুল শুরুর আগেই খবর সংগ্রহ করে ফেলতাম, চাকুরি ও সাংসারিক কাজে কোনও শিক্ষক আজ টিফিনের পর ক্লাস নিবেন না...। মোড়ের পত্রিকার দোকানের লাইব্রেরিয়ান নতুন কিছু এসেছে তা আগেই জানিয়ে রেখেছে। আমাদের বিজ্ঞরা টিফিনে তা নিয়ে আসতেন, তারপর পুঁথিপাঠ। বেচারা আমি, ব্লাক বোর্ডে এই সব পঠনের সচিত্রকরণের ভার নিতে নিতে শিল্পী হয়ে গেলাম। উত্তর-আধুনিক শিল্পকলার ভাষায় পারফর্মেন্স আর্ট বা লাইফ পারর্ফমেন্স আর কি। সেইসব রেখাটানা চটি আজ আর কোথাও খুজে পাচ্ছি না। যদি পাওয়া যেত, শিল্পী হইবার আশায় কিছু কাজ করিতাম, যাহাকে শিল্প রচনা বলে।
তিন মাথা যার
পরামর্শ লইয়ো তার
শিক্ষা বিষয়টিতে বড়দের ভূমিকা সর্বদাই শিক্ষকের। তো জীবনের পাঠ লইতে আমাদের গ্রাম্য সমাজে দাদা-দাদিরা ছিলেন কিন্তু বাংরেজ নাগরিক সমাজে তাহারা গ্রামে, আর আমরা এতিম। না শূন্যস্থান শূন্য থাকে না। বড়রাই পথ দেখান, আর তাহারা না থাকিলেও তাহারা বই লেখেন তাহাদের অভাব পূরণ করবার জন্য। হ্যাঁ, হতে পারে তাহারা যা লিখিয়াছেন তাহা যথার্থ নয়। তাতে কি? এক মাঘে কি শীত যায়? জীবন এক প্রবাহমানতা। আমি আজ লিখছি যা পাঠে আমার দৌহিত্র পাবে দাদুর সান্নিধ্য। এটাই লিখবার মজা। যাই হোক, আমাদের আলোকচিত্রী ছবি তুলতে শিখে নাই, তাই বলে ফরাসি বা সুইডিশ আলোকচিত্রীও তুলে নাই তাহাতো নয়। তাহারাতো আর কুইন ভিক্টোরিয়ার শাসনাধীনে নাই বা ছিলেন না। আর এ জীবন জ্ঞান জৈব জ্ঞানাকাঙ্খা, কার সাধ্য ইহাকে রুখে। আমরা বা বড় ভায়েরা কি এ সব ছবি, বই ও সিনেমার সন্ধান পান নাই? পাইয়াছেন, আমরাও ঘুড়ির কাগজ খুঁজিতে খাতা পত্রের মাঝে কিংবা তোষকের তলায়, অথবা বাদাম-চকলেটের দাবি জানাইতে গিয়া সিনেমার পোস্টারে ইহাদের খোঁজ পাই। প্রথমে ছিঃ করিয়া লাফ দিয়া উঠি, তারপর ছবি-সুন্দরীর রূপে মজি আর ভাবি পাশের বাড়ির মেয়েটি কবে এরকম রূপসী হবে! এটাও আবিষ্কার করি বড় ভাই বড় হইয়াছেন আমরা এখন নেহাত ছোট। কেউ কেউ আর একটু বাড়িয়া ব্যাটমিন্টন খেলি পাড়ার বড় বোনটির বা খালামণিটির সাথে। একটু সাইকেল চালানো শেখা... এর চেয়ে বেশি কিছু? এটা সমরেশ বসু ও মাহমুদুল হক জানেন। রসময় তো রসময়। আমরা জানি বড় ভাইরা গোপনে আমাদের জ্ঞান চক্ষু খুলিয়া দিয়াছেন...
জগত ধরা পড়ে রূপে

এটা রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন। আর আজকাল শুধু বিজ্ঞানের নয়, বিজ্ঞাপনেরও তথ্য- পাঁচ বয়সের মধ্যেই মস্তিষ্কের গঠন ও বিকাশ হইয়া যায়। অর্থাৎ মাদার বোর্ড, প্রসেসর ও হার্ডডিস্ক ফিক্সড। আপনি কোন ধরনের কম্পিউটার তাহা নির্ধারিত। আপনার ওপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোস ৯৮ না উইন্ডোস ১০ হবে তাহাও ফিক্সড। তো আপনার পুত্র, নাতি না আপনি কে স্মার্ট ফোনটি ব্যবহার করবে তাহা আপনাদের সকলের নিজ নিজ জন্ম পরবর্তী পাঁচ বছরেই নির্ধারিত। ইহাকেই বলে কপালের লিখন! বাসায় কিনিয়া আনিলেন এইচডি টিভি, দক্ষতার অজুহাতে কচি পুত্রের দখলে রির্মোট, সে না দেখালে আপনার ক্রিকেট ম্যাচ ভুলিয়া কার্টুন দেখিতে হইবে!
সে কথা থাক আমি বলি আমার কথা, জ্ঞান হইবার কাল হইতে আমি রোগা-ভোগা ভিরু মানুষ। সকলের মতে আল্লাহই জানেন আমার কি হইবে (মুসলিম পরিচয়ধারী পরিবারে ভগবানের প্রবেশাধীকার নাই, তাই...)। আমিও তাই আল্লাহতে নত। কিন্তু ঘুম না আসিলে চোখ খোলা থাকে। রবিবাবুর অমলের মতো জানালা নাই, তাহার প্রয়োজনও নাই...
বাকিটুকু বলিবার আগে একটা কথা সারিয়া লই, ১৯৯৪ সালে আমার চিত্র প্রর্দশনী দেখিয়া অধুনা খ্যাতিমান চিত্র সমালোচক লিখিয়াছিলেন- তাহার ছবিতে গল্প থাকিয়াও নাই। আর বন্ধুরা খালি জানতে চান তোর এতো টরসো (বাংলাটা জানা নাই কেহ জানাইলে প্রীত হইবো) প্রীতি কেন? ওই যে বলিলাম জানালার প্রয়োজন নাই। শীতের পড়ন্ত রোদের দুপুরে মা ও পাড়াতো খালারা আমার চারপাশে ঘিরিয়া বসিয়া। এক অসুস্থ শিশুর কিবা বোধ নারীরূপ ছোঁয়া কামে? অতএব বসন ভূষণের কোনও আড়ালের কিবা প্রয়োজন? কিন্তু সেজান জানাইয়াছেন বস্তুর রূপই ধরে রাখে বস্তুর সত্তাকে। তাহাকে আবিষ্কার করাই শিল্পীর কাজ। স্মৃতিরও নয় কি? আর নারীদের দাম্পত্য ও কামের গল্প সমূহ? শব্দের পর শব্দসমূহ সাজানো নেই কিন্তু ভাব ও রস? আমিনুল ইসলাম বিবিধ বিস্ময়ে কহিলেন তোমার ছবির ‘মাউন্টেন কোয়ালিটিটা আমার কাছে একটা বিরাট প্রশ্ন, বোতেরোও এটাকেই আলাদা করে বলেছে।’ ঢাকা চারুকলার প্রতিষ্ঠাতা-ছাত্র আমিনুল ইসলামকে চিনি, কে ফারনান্দ বোতেরো? সে যাই হোক শিশুর চোখে সাধারণ চেয়ারটিও অনেক বড়। আর দিনের পর দিন প্রায় প্রতিদিন ৩/৪ ঘণ্টা কুরুশাওয়ার ক্যামেরা এঙ্গেলে চোখের সামনে বিবিধ ভাজের শরীর সব কিছুকেই পর্বত না হোক টিলাতো বানিয়েই দেয়। পাঁচ বছর বয়সেই মস্তিষ্কের সিংহভাগ গঠিত হয়ে যায়...


 

বিশেষ সংখ্যারে আরো লেখা পড়তে ক্লিক করুন-

দু’নম্বর বই || হাসান আজিজুল হক

আরব্য রজনীর নিষিদ্ধ কুহক || পাপড়ি রহমান

খাচ্চর বই || মুম রহমান

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম