‘‘প্রথম ছবিটা দেখেই আমার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল, গাঁয়ে কাঁটা দিল আর বুকের ভেতরে একটা হাতুড়ির ঘা পড়ল। এই প্রথম আমি একদম উদোম মেয়ে-পুরুষ দেখলাম। তারপর প্রতিটি পাতায় ওই রকম ছবি। দুজন উদোম পুরুষ-মেয়ে শুধু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বা বসে আছে তা তো নয়, প্রত্যেক ছবির ওপরে লেখা আছে একটা কথা : আসন। আসন এক, আসন দুই, আসন তিন–এই রকম’’
এইবার দোতলার উত্তরদিকের শেষ ঘরটার কথা বলি। ঘর ভালোই, শুধু মেঝে হয়নি আর বরগাপাতা, তার মানে কোনো ঘরই নয়। উত্তরদিকের ভাগ্যিস-করা জানালাটা দিয়ে জামগড়ে, আর দুটো ডোবা, কলার ঝোপ, বাঁশের ঝাড়, আঁটিসার অখাদ্য খেজুরওয়ালা একটা ধনুকের মতো বাঁকা খেজুরগাছ আর দূরের জোলের মাঠ, বামুনগাঁয়ের ঘরবাড়ি এইসব দেখতে পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের বাড়িতে যে পঞ্চাশ-ষাটটি পায়রা থাকে, তারা সবাই এই ঘরটার দেয়াল আর টিনের চালের মাঝখানে যে ফাঁক, সেখানে নামকাওয়াস্তা বাসা বানিয়ে থাকে। আমাদের জন্য একদম অকোজো এই ঘরটাতেই ওরা থাকে, বাড়ির অন্য কোনোদিকে যায় না। এইখান থেকে উত্তরে যায়, পশ্চিমে যায়, পুবে যায়, দক্ষিণে যায়, ফিরে আসে, রাত দুপুরে বকবকম করে আর যারা বাইরে যেতে পারে না, তারা আর কি করে, বাসায় বসে চুপচাপ ডিমে তা দিয়ে যায়। সবাই জানে পায়রাদের বাসার ছিরিছাঁদ কিছু নেই, কোথা থেকে কতকগুলো কাঠিখোঁচা কুড়িয়ে এনে জড়ো করে তার ওপরেই ডিম পাড়ে। জোরে বাতাস দিলে বাসা উড়ে মাটিতে পড়ে, তাতে হয়তো তিন-চারটে ডিম ভেঙে ভর্তা হয়ে গেল! এমনকি পায়রার ছানাও কখনো কখনো পড়ে যায়। ছানাসুদ্ধ পড়লে আমি বাসাটা যেখানকার সেখানে আবার তুলে দিয়ে আসি। পায়রা এমন অদ্ভুত যে ডিমে তা দেওয়ার সময় হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললেও নড়ে না। আমি খুব খেয়াল রাখি, কোন্ বাসায় ডিম আছে, কোন্ বাসায় ছানা জন্মিয়েছে। একেবারে গ্যাদগেদে ছানা, চোখ-ডানা কিছুই হয়নি, গোল নরম বলের মতো। একটু ঘেন্না লাগে, হাতে কেমন তলতল করে আর দপাস দপাস শব্দে বুকের ভেতর জানটা চলছে বুঝতে পারা যায়।
এখানে সব জালালি পায়রা, নীলচে রঙের ওপর কালো ডোরা। পা জোড়া লাল। আমি ঠিকই খোঁজ রাখি, পশ্চিম-উত্তর কোণের বাসার ছানাটা অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। উড়তে এখনো পারবে না, তবে ডানা-টানা বেশ ভালোই গজিয়েছে। হাতে নিয়ে থাকলে নড়াচড়া করে না, চুপ করে বসে থাকে। এ ছানাটার রং কেমন নীল নীল কালো। পিঠের দিকে কালো ডোরা নেই। দু-একটা এমন অন্য রঙের হয়। এটাকে আমার খুব ভালো লাগে, এক দিন-দু-দিন পর পরই একবার করে গিয়ে দেখি। বরগা টপকে টপকে সেদিনও দুপুরবেলায় দেখতে গিয়েছি। বাসাটা একদম অন্ধকার। কাঠিখোঁচা, শুকনো ঘাস, খড়–এইসব দিয়ে ভরা। দুপুর একইরকম কটকটর করছে। ঘরটা মনে হয় আর বেশিদিন থাকবে না। হাওয়ায়-বিষ্টিতে-রোদে-ঝড়ে মাটির পুরনো দেয়াল এবড়ো-খেবড়ো, কোথাও কোথাও মাটি ধসে দেয়াল পাতলা হয়ে এসেছে। বাড়ির ভেতরের দিকে নিচের বারান্দাটা উঁচু-নিচু, ধারি বলে কিছু নেই। সমান জায়গা পুরো বারান্দায় কোথাও নেই বলে একটা পিঁড়ি পেতে বসা পর্যন্ত যায় না।
আমি টিনের চালের ক্যাঁ-ক্যাঁ শুনছি, গরম হাওয়ায় ধুলো আর শুকনো নিমপাতা ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে দেখতে পাচ্ছি, আর এক পা এক পা করে কোণের বাসাটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। দেখি, মা পায়টা নেই, ছানাটা চুপচাপ বসে আছে। হাত বাড়াতে আজ সে কেমন একটা ঠোকর মারল। বোধহয় কোনো খাবারের দানা-টানা মনে করেছে। একটু চমকে উঠে বাঁ দিকে ঘাস, খড়, কাঠিখোঁচার মধ্যে হাতটা নিয়ে যেতে শক্ত কি একটা যেন হাতে ঠেকল। খড়কুটো, শুকনো ঘাসের জঙ্গলের তলা থেকে জিনিসটা বের করতেই দেখি সেটা একটা দোমড়ানো-মোচড়ানো উল্টোপাল্টা ভাঁজ করা বই। পাতাগুলো হলুদ, মলাট-ফলাট নেই। শুরু থেকে আছে কিনা, শেষটা আছে কিনা জানি না। তবে মলাট না থাকলেও কিংবা মলাটের পরে দু-একটা পাতা না থাকলেও শুরুর ঠিক আগের একটা পাতায় ছাপা আছে–‘বাৎস্যায়নের কামসূত্র’।
এই কথা দুটোর মানে বোঝা তো দূরের কথা, বানান করে করেও ঠিক পড়ে উঠতে পারছি না। কি উচ্চারণ হবে? ‘বাত’-ব-এ আকার খণ্ড ৎ-হ্যাঁ, বাতই তো হবে। তারপর ‘স্যায়ন’, বাতস্যায়ন। পরের শব্দটা পড়তে পারলাম কিন্তু মানে বুঝতে পারলাম না। ‘কামসূত্র’ আবার কি? বইটা কবেকার, কে কিনেছিল, বাবা, না বাবার বাবা? এমন করে লুকোনোই বা ছিল কেন? বইটার ভেতরে হিলহিলে ঘিয়ে রঙের সুতোর মতো যে পোকাদের দেখতে পাচ্ছি, ওরাই গোল গোল ফুটো করেছে পাতাগুলোয়। ছাপার অনেক কথার ওপরেই এই ফুটো। কথাগুলো পড়ার আর কোনো উপায় নেই। একটা পাতা ওল্টাতেই দেখি ওপরের দিকের কোণে শিব, মানে মহাদেবের ছবি। বাঘছাল-পরা, মাথার চুড়োর ওপর ফণা-তোলা সাপ। দুই কাঁধেও বোধহয় তাই। থাবনা গেড়ে জোড়াসনে বসা। পায়ের কাছে পাতলা নাক, পটলচেরা চোখ পার্বতী বসে শিবের কথা শুনছে। হর-পার্বতী সংবাদ এই রকম কি যেন লেখা। একটা চার লাইনের সংস্কৃত শ্লোক আছে, তার তলায় বাংলায় মানে লেখা। পড়ার চেষ্টা করে প্রায় কিছুই বুঝলাম না। তার পরে দেখি, প্রত্যেক পাতায় একটা-দুটো করে ছবি আছে। সব ছবি কালো কালিতে ধ্যাবড়ানো করে ছাপা, তেমন স্পষ্ট নয়।
প্রথম ছবিটা দেখেই আমার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল, গাঁয়ে কাঁটা দিল আর বুকের ভেতরে একটা হাতুড়ির ঘা পড়ল। এই প্রথম আমি একদম উদোম মেয়ে-পুরুষ দেখলাম। তারপর প্রতিটি পাতায় ওই রকম ছবি। দুজন উদোম পুরুষ-মেয়ে শুধু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বা বসে আছে তা তো নয়, প্রত্যেক ছবির ওপরে লেখা আছে একটা কথা : আসন। আসন এক, আসন দুই, আসন তিন–এই রকম। একটা পাতায় চারটে মেয়ের উদোম ছবি দিয়ে লেখা আছে, দুনিয়ার চার রকমের মেয়ে আছে : শঙ্খিনী, পদ্মিনী, অশ্বিনী আর হস্তিনী। কোনো ছবিতেই কেউ চুপচাপ বসে বা দাঁড়িয়ে নেই। একজন বসে, একজন শুয়ে। গায়ে গা জড়াজড়ি করে তো বটেই, অদ্ভুত অদ্ভুত ঢঙে। দুজনেই মুখোমুুখি দাঁড়িয়ে; মেয়েমানুষ শুয়ে, পুরুষ মানুষ বসে, আবার পুরুষ মানুষ শুয়ে, মেয়েমানুষ বসে। এসবের আর শেষ নেই।
ভালো করে চেয়ে দেখি। আচ্ছা, পুরুষ আর মেয়েতে কি এমন তফাত? মেয়েদের লম্বা চুল, পুরুষদের ছোট। কিন্তু ইচ্ছা করলে পুরুষও তো মেয়েদের মতোই লম্বা চুল রাখতে পারে, মেয়েরাও পারে চুল ব্যাটাছেলেদের মতোই ছোট করতে। কারো পরনে কাপড়-চোপড় নেই বলে তফাতটা পরখ করে দেখতে আমার সুবিধা হচ্ছিল। সত্যি বলতে কি, তফাত মাত্র একটাই চোখে পড়ে, এমন তফাত যে চোখে পড়বেই। ছেলেমেয়েকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়ে ওই তফাতটা আমি একটু আধটু দেখেছি। আমার তেমন কিছু মনে হয়নি, ওখানে ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেমেয়ের খাওয়ার দুধ আছে। তেমন দুধ তো আমিও আমার মায়ের খেয়েছি। কই, কোনোদিন তো কিছু মনে হয়নি। তবে এখন এমন লাগছে কেন? অল্পবয়সী মেয়েদের খোলা বুক আগে কোনোদিন দেখিনি বলে? খুব যে সুন্দর মনে হচ্ছে, তা ঠিক নয়। এ যেন কেমন নরম গোল বলের মতো। কারো লম্বাটে ধরনের, কারো একটু ঝুলে পড়েছে। বোঁটা দুটো ছোট-বড় নানারকম আছে। দেখতে দেখতে আমার একবার শীত শীত লাগছে, একবার গরম লাগছে। ঝিমধরা দুপুরবেলায় দেখা যাচ্ছে একটা পায়রা বকবকম করতে করতে আরেকটা পায়রাকে ঘিরে নাচতে শুরু করেছে। বকবকম, কটকট রোদের আপন-মনে জ্বলে-যাওয়া আর বাতাসের সেই রোদটাকে একবার নাড়িয়ে দেওয়া। আমার শরীরের মধ্যে কোথায় যেন শিরশির করে কিছু একটা নেমে আসছে নিচের দিকে। বলা হারামজাদার গল্পগুলো মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে ওর ওইসব কথা যদি না শুনতাম, তাহলে হয়তো এমন করে আমার তলপেট শিরশির করত না। কি ভীষণ লজ্জার কথা, শিরশিরানিটা নামতে নামতে আমার ব্যাটাছেলের অঙ্গের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছে আর সেটা আস্তে আস্তে কেমন শক্ত হয়ে উঠছে। হ্যাঁ, এটা একটা তফাত বটে, মেয়েদের এটা নেই, তাদের একটা আলাদা চিহ্ন আছে। আসনগুলোর দিকে চেয়ে মনে হচ্ছে এই দুই চিহ্নের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে।
কখন আমি বরগায় বরগায় পা দিয়ে দরজায় এসে বসে পড়েছি মনে নেই। দরজা তো নেই, শুধু দরজার ফাঁকাটাই আছে। সেখানে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসেছি বইটা খুলে, একটার পর একটা আসনের ছবি দেখছি আর বিবরণ পড়ছি। কিছু বুঝছি, বোধহয় সামান্যই, বুঝছি না-ই বেশি। কতরকম ছায়া, কতরকম ছবি, অন্যরকম ঘর-আলো-বাতাস মাথার মধ্যে আবছা ভেসে বেড়াচ্ছে, ডুবে যাচ্ছে। যখন উঠছে তখন দেখছি ছবির অর্ধেকটা আর নেই। হঠাৎ কিছু মুছে যাচ্ছে, হঠাৎ আলোর ধাঁধানি লাগছে আর নেশা-নেশা লাগা তো আছেই। দুনিয়ার যেন তল মিলছে না। খুব চেনাও লাগছে না, আর মনে হচ্ছে, কত কি চেনার আছে, পাবার আছে, তার বোধহয় শেষ নেই। মীরার মরে যাওয়ার খবর যেদিন পেয়েছিলাম, সেদিন আমার যেমন মনে হয়েছিল, আজ সেইরকম মনে হওয়ার কোনো কথা নেই বটে, আবার মনে হয় আছেও।
মোটকথা, আজ কি অদ্ভুত! এটা আমার পড়ার বইয়ের বাইরে দু’নম্বর বই। এটা হাতে পড়া ভালো হলো কি মন্দ হলো, আমি জানি না। পড়াটা কি সবার চোখের আড়ালে হওয়া দরকার ছিল, নাকি বইটা আমার হাতে না পড়লেই ভালো হতো! তবে হাড়ে হাড়ে একটা কথা বেশ শিখে ফেললাম। শরীরের মধ্যেই আনন্দ আছে, খুব আনন্দ আছে। সেই আনন্দটা ভালো, না খারাপ জানি না। মনে পড়ল খালাদের বাড়িতে মরদানা খালা যে আমাকে তার মাটির দেয়াল-ঘেরা বাড়িটায় অমন নিরিবিলি ঘরে দুঘণ্টা আটকে রেখেছিল, আমাকে নিয়ে তার কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল। সেদিন রাগে-কষ্টে কেঁদে ফেলেছিলাম। আবার তেমন করলে আমি কি ঘর থেকে বেরোনোর জন্য অস্থির হব? তা কিন্তু এখন মনে হচ্ছে না।
বইটা আবার একই জায়গায় লুকিয়ে রেখে যখন নেমে এলাম, তখন রোদ ঝিকিমিকি করছে। কেউ কিছু বলল না, শুধু ফুপু আমাকে দেখেই বলল, বাঁদর, সারাদুপুর কোথা ছিলি? গা ধুসনি, ভাত খাসনি, সারাগায়ে ধুলোবালি। চল, এখন আর কিছু করতে হবে না। ভাত খাবি। ঠাণ্ডা করকরে ভাত আর ঠাণ্ডা মাষকলাইয়ের ডাল। তোমাদের মতো বজ্জাতদের বেড়ে দিতে হয় দু-চুলোর ছাই, তবে শিক্ষে হয়!
(পুনঃপ্রকাশিত)
বিশেষ সংখ্যার আরো লেখা পড়তে ক্লিক করুন :
আরব্য রজনীর নিষিদ্ধ কুহক || পাপড়ি রহমান
নাবালেক ও বালেক কাল || নাজিব তারেক








