বইপড়ার গল্পশূন্য থেকেও মহৎ কিছু হতে পারে

Send
মোজাফফর হোসেন
প্রকাশিত : ১৩:৩৪, মে ২০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৮, মে ২০, ২০১৮

একজন লেখকের সার্বক্ষণিক সঙ্গী বই। নিজেকে সৃজনমুখর করতে বইয়ের বিকল্প নেই। বইয়ের স্পর্শ, গন্ধ ও অক্ষর-সমুদ্র সবসময়ই আন্দোলিত করে লেখককে। বাংলা ট্রিবিউন সাহিত্য বিভাগের লিখিত প্রশ্নে আমরা শুনতে চেয়েছি এ সময়ের পড়ুয়া লেখকের বইপড়ার গল্প। 

বাংলা ট্রিবিউন : আপনার পড়া প্রথম বইয়ের নাম মনে আছে? বইটি কীভাবে পেলেন? প্রচ্ছদ বা ভিতরের পৃষ্ঠাগুলো কেমন, পড়ার অনুভূতি কেমন—ইত্যাদি গল্প শুনতে চাই।

মোজাফফর হোসেন : ছোটবেলায় প্রচুর হাদিসের বই পড়েছি। আমাদের গ্রামে আহলে হাদিস ও হানাফি মাজহাবের ভেতর প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব ছিল; এখনো আছে। বাড়ির দু’পাশে মসজিদে দেখেছি দু’ভাবে নামাজ পড়তে। একদিকে ঈদের নামাজ ছয় তাকবির, অন্যদিকে বারো তাকবির। একদিকে তারাবি পড়ানো হয় ৮ রাকাত, অন্যদিকে বিশ রাকাত। একদিকে নামাজের মধ্যে উচ্চস্বরে আমিন না বললে রাগ করে, অন্যদিকে বললে বিরক্ত হয়। ফলে আমি সহি সিত্তাহ হাদিস ঘেটে ঘেটে এই বিভেদের রহস্যটা বুঝতে চেষ্টা করেছি অল্প বয়স থেকেই। তখন সবচেয়ে বেশি পড়া হয়েছে বুখারি শরিফ। আর স্কুল সিলেবাসের বাইরে প্রথম সাহিত্যের বই পড়ি ক্লাস সেভেনে উঠে। গল্পগুচ্ছ এবং ফেলুদা সমগ্র একসঙ্গে। গল্পগুচ্ছটা বাড়িতে কীভাবে এল আজও ভেবে পাই না। আমি বারো ভাইবোনের এগারতম। বড় ভাইবোনদের কাউকে সাহিত্যের বই পড়তে দেখিনি। তবুও গল্পগুচ্ছটা কিভাবে যেন পেলাম বাড়িতে। দু’ তিনজনের ব্যবহৃত পোশাকের মতো জীর্ণদশা বইটির। আর ফেলুদা সমগ্র এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়ে না বলে নিয়ে আসি। চুরি বলছি না কারণ পড়া শেষ হলে আবার ফেরত দিয়ে আসি গোপনে। তার মানে বলছি না জীবনে বই চুরি করিনি। দুটো গল্প সংকলন পড়ে দুইরকম মজা পাই। দুটোই সমান ভালো লাগে। এর আগে ক্লাস ফাইভ কিংবা সিক্সে বড়ভাইয়ের মুখে রলিংসয়ের গল্প ‘মাদার ইন ম্যানভিল’ এবং কোলরিজের কবিতার গদ্যভার্সন ‘রাইম অব এনসিয়েন্ট ম্যারিনার’-এর গল্প শোনা হয়। সাহিত্যের প্রতি আমার প্রেম জন্মে এই দুটো গল্প থেকে। তখনই আমার মনে হতো, আমিও যদি কোনোদিন এরকম কিছু লিখতে পারতাম!

 

বাংলা ট্রিবিউন : বই-চুরির প্রসঙ্গটি আরেকটু বিস্তারিত জানতে চাই।

মোজাফফর হোসেন : বই কেনার জন্য বাড়ি থেকে বাড়তি টাকা পেতাম না। তাই মা-বাবার কাছ থেকে টাকা যেমন চুরি করতে হয়েছে তেমনি লাইব্রেরি থেকে কিছু বইও সরাতে হয়েছে। মেহেরপুরে ভালো লাইব্রেরি বলতে ছিল ‘দোয়েল বুক হাউস’, ‘বইঘর’ এবং ‘পপি লাইব্রেরি’। সাহিত্যের বই বেশি বিক্রি হতো না, তাই ক্রেতা হিসেবে আমার একটা কদর ছিল ওদের কাছে। সেই আস্থাটার ‘সদ্ব্যবহার’ করেছি বলা চলে। কিনে বা সরিয়ে আমি গোর্কি এবং পার্ল এস বাকের ‘মা’, ‘প্যারাডাইস লস্ট’, গ্যেটে সমগ্র, ‘আঙ্কেল টমস কেবিন’, ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’, ‘ড. জেকিল অ্যান্ড মি হাইড’,  ‘আনা কারেনিনা’,  ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’,  ‘কবি’,  ‘গল্পগুচ্ছ’, ‘আরণ্যক’, ‘ভলগা থেকে গঙ্গা’—এরকম কিছু বই আমি সংগ্রহ করেছি নবম এবং দশম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে। বোনের মেয়ের বিয়ে হলো, রীতি অনুযায়ী নববধূর সঙ্গে কাউকে যেতে জামাইবাড়ি যেতে হয়। আমাকে পাঠানো হলো। ঐ বাড়ি থেকে আনলাম রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা। ছেঁড়া কপি। অবহেলায় পড়েছিল। কাউকে বললে আনন্দে ঝেড়ে-মুছে দিতো, কিন্তু বলতে লজ্জা হলো। এসব বই পড়ার মতো ‘নিষ্কাম’ কাজের কথা কাউকে বলা যেত না। একবার আমার এক বন্ধু ও আমি তার চাচার বাড়ি পাহারা দিতে গেলাম, কেউ ঐ রাতে বাড়ি ছিল না বলে। ঐ বাড়ি থেকে ফ্রয়েডের একটি বই নিয়ে আসি। আমার সেই বন্ধুও বিষয়টি জানে না।       

 

বাংলা ট্রিবিউন : সর্বশেষ কী বই পড়লেন—বইটির পাঠ-অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

মোজাফফর হোসেন : সু তং-এর বিখ্যাত উপন্যাসিকা ‘রেইজ দ্য রেড ল্যানটার্ন’। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে চীনে নারীদের ওপর সামাজিক নিপীড়নের এক বাস্তবধর্মী গল্পের শৈল্পিক উপস্থাপন। একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবেও দেখা চলে। কাহিনি গড়ে উঠেছে সঙলিয়ান নামের উনিশ বছরের এক তরুণীকে কেন্দ্র করে। সঙলিয়ানের বাবা পরিবারকে আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে রেখে হঠাৎই মারা যায়। বাধ্য হয়েই সঙলিয়ানকে বিয়ে করতে হয় চেন যুয়োকিয়ান নামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের বয়স্ক পুরুষের সঙ্গে। সঙলিয়ান ছাড়াও চেনের আরও তিনজন স্ত্রী (উপপত্নী) ছিল। সঙলিয়ন কিছুদিন থাকার পর বুঝতে পারে, প্রত্যেক স্ত্রী সমানভাবে বিলাস জীবনযাপন করতে পারে না। চেন প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নেয় সে কোন স্ত্রীর সাথে রাত্রিযাপন করবে, এবং শুধুমাত্র সেই স্ত্রী সেদিনের জন্য বিশেষ সম্মান পায়। স্বামীর আনুকূল্য পাবার জন্য স্ত্রীদের ভিতর চলে তীব্র প্রতিযোগিতা।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কিনে রেখেছেন, পড়া হয়নি কিন্তু পড়ার জন্য ভেতরে এক ধরনের চাপ অনুভব করেন—এমন বই সম্পর্কে জানতে চাই।

মোজাফফর হোসেন : এরকম বই বেশকিছু আছে। এর ভেতর দুটি বইয়ের কথা বিশেষভাবে বলতে চাই—সম্প্রতি দিল্লি সফরে গিয়ে সংগ্রহ করেছি শশি থারুরের ‘অ্যান এরা অব ডার্কনেস’ বইটি। বইটির কথা শামসুজ্জামান খান স্যার বহুদিন থেকে বলে আসছেন। এবার পেয়ে গেলাম। কুমার চক্রবর্তীর ‘উৎসব : দেহ প্রেম কাম’ কিনেছি। এই দুটি বই যত দ্রুত সম্ভব পড়ে ফেলতে চাই। এরপর Black Skin, White Masks Ges BodiesThat Matter বইদুটি পড়তে পারলে খুশি হবো।  

 

বাংলা ট্রিবিউন : কোন কোন বই পড়ার আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু সংগ্রহে নেই?

মোজাফফর হোসেন : এমন বই অনেক আছে। সিনেমা দেখে ‘ব্রেডউইনার’, ‘মিস্টার নবডি’,  ‘মাই লাইফ অ্যাজ এ ডগ’ এই উপন্যাসগুলো পড়ার খুব ইচ্ছা হয়েছে, সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। এছাড়াও ছোটগল্প নিয়ে New Short Story Theories, Reading Fictions: Applying Literary Theory to Short Stories, The modernist short story: a study in theory and practice-এই বইগুলি সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কোন বইটি সবচেয়ে প্রিয়, বারবার পড়তে চান? কেন?

মোজাফফর হোসেন : প্রিয় বই অনেক আছে। কিন্তু বারবার পড়তে চাই এমন বই একটাও নেই। এত কিছু পড়ার আছে যে, কোনো একটি বই বারবার পড়ার প্রয়োজন অনুভব করি না। এত বিলাসিতা করার মতো সময় একজীবনে কোথায়! তার ওপর আমি ওতো পড়ুয়া মানুষ না, তাই বেছে বেছে পড়তে হয়। তবে কয়েকবার পড়েছি এমন কিছু গল্প বা ছোট-উপন্যাস আছে। স্কুলজীবনে বই পেতাম কম, তখন যে বইটি পেতাম, দু-তিনবার করে পড়া হয়ে যেত। কিছু কিছু লাইন দাগিয়ে কবিতার মতো মুখস্থ করতাম। দাগাতে দাগাতে রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ এবং গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসটাই প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। এখন আর সেই সময় নেই।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কোন বইটি আপনার জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে? কী করেছিলেন?

মোজাফফর হোসেন : একবার সিনেমা হলের সামনে থেকে কামসূত্রের আসন ও চটি টাইপের বই কিনে পড়েছি। তখন আমাদের শহরের বাড়িতে একটা রুম নিয়ে থাকি। বাকিটা ভাড়া দেওয়া। একদিন বাবা বোধহয় বিছানার নিচে কিছু খুঁজতে গিয়ে বইগুলো দেখেন। কয়েকদিন পর আমাকে বলেন, ‘ঐ ধরনের বই পড়ার বয়স তোর এখনো হয়নি’। এতেই আমি বুঝে যাই। বইগুলো পুড়িয়ে ফেলি। কিন্তু কিছুদিন পর আবার কিনতে হয়, তখন আর বিছানার নিচে রাখিনি। মাঝখান থেকে কিছু টাকা লস হলো। এছাড়া অল্প বয়সে প্রবীর ঘোষ, ভবানীপ্রসাদ সাহু, রাসেল—এঁদের বই পড়ে নিজের ভেতর একধরনের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। আজ সেগুলো ইতিবাচকভাবে দেখি।   

 

বাংলা ট্রিবিউন : নির্জন দ্বীপে একজন মাত্র লেখকের বই নিয়ে যেতে বললে, কোন লেখককে বেছে নেবেন, কেন?

মোজাফফর হোসেন : জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’। বহুবার হাতে নিয়েছি, এগুতে পারিনি। নির্জন দ্বীপে না পড়ে আর উপায় থাকবে না, এই ভেবে ওটা সঙ্গে নিতে চাই। আর একজন লেখক নিতে হলে রবীন্দ্রনাথ।

 

বাংলা ট্রিবিউন : বই না পড়ে আপনি বাঁচতে পারবেন কিনা? কেন?

মোজাফফর হোসেন : পারবো নিশ্চয়। বেঁচে থাকার জন্য জীবনটা ছাড়া কোনোকিছুই অপরিহার্য না। কিন্তু সেভাবে বেঁচে থাকতে চাইবো কিনা সেটাই প্রশ্ন। আমি খুব পড়ুয়া না, পূর্বেই বলেছি। কিন্তু যতটুকু পড়ি ততটুকু আমি পড়ি বলেই যেন বেঁচে আছি। পড়ার সময়টা আমার একান্ত নিজের বলে মনে হয়। তবে আমি বইয়ের চেয়ে চলচ্চিত্র থেকে বোধহয় বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছি। সিনেমা আমাকে দেখতেই হবে।   

 

বাংলা ট্রিবিউন : অন্যকে কোন বইটি পড়ার পরামর্শ দেবেন, কেন?

মোজাফফর হোসেন : প্রশ্নটার উত্তর একেক সময় একেকরকম হবে। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে দুটি বইয়ের কথা—বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’। আরো দুটি বই যোগ করে নিই—‘একাত্তরের চিঠি’ এবং ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’। আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষকে এ-বইগুলি পড়াতাম। যারা পড়তে পারেন না তাদের অডিও করে শোনাতাম। এর কারণ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি না।  

 

বাংলা ট্রিবিউন : আপনার লেখা কোন বইটিকে আপনি বেশি গুরুত্ব দেন, কেন?

মোজাফফর হোসেন : গল্পের জন্য ‘অতীত একটা ভিনদেশ’ এবং প্রবন্ধের জন্য ‘বিশ্বসাহিত্যের কথা’ ‘অতীত একটা ভিনদেশ’ গল্প সংকলন আমার নিজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, আমি আমার নিজের জন্য একটা স্বতন্ত্র গদ্য এবং ন্যারেটিভ শৈলী এখানে কিছুটা খুঁজে পেয়েছি। আর ‘বিশ্বসাহিত্যের কথা’ বইটি তরুণ পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ সাহিত্যপাঠ এবং বিশ্লেষণ করার একধরনের একাডেমিক পাঠ এখান থেকে হবে। কেবল গ্রন্থ সমালোচনা করার জন্য না, ভালো বই, কিংবা যেকোনো বই পড়ার জন্য সাহিত্যের কিছু খুঁটিনাটি বিষয় জানার দরকার আছে। নইলে বইপড়ার বিষয়টি সাধারণ দৃষ্টিতে পেইন্টিং দেখার মতো হবে। এতে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হতে হয়। সেই বিবেচনায় বইটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এর বেশি কিছু না। কারণ আমি মনে করি, কোনো বই-ই বা কোনো নির্দিষ্ট লেখকই কোনো কিছুর জন্য অপরিহার্য না। একদম শূন্য থেকেও মহৎ কিছু সৃষ্টি হতে পারে; হয়েছেও তাই।


 

 আরও পড়ুন—

প্রতিষ্ঠান তৈরির আগেই প্রতিষ্ঠান বিরোধী

//জেডএস//

লাইভ

টপ