কে এই স্টিফেন হিরো?

Send
অমল চক্রবর্তী
প্রকাশিত : ০৭:০০, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০০, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯

ডাবলিনের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে স্টিফেন দেদালুসের মাথায় হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো এক এপিফানিক মুহূর্ত এসে পরিবর্তন আনে জীবনে। না, সে আর ঘুরবে না। আয়ারল্যান্ড, চার্চ, পরিবার, রাজনীতি এইসব পরিচিত বিতর্কের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখবে না। এক নতুন আত্ম-বিনির্মাণ করবে সে; হবে এক নতুন লেখক, যার কাছে বাকি সব বিষয় হবে নিতান্তই অর্থহীন ও গৌণ। কতটুকু স্বাধীন হলে আপনি লেখক হবেন? স্টিফেন সিদ্ধান্ত নিল সে চলে যাবে; আত্মপরিচয়ের সংকটে এক দৃঢ় সিদ্ধান্ত। কে এই স্টিফেন দেদালুস?

জেমস জয়েসের ‘এ পোর্ট্রেট অফ দ্য আর্টিস্ট অ্যাজ এ ইয়াং ম্যান’ উপন্যাসের ঘটনা স্টিফেন দেদালুস ও তার বেড়ে ওঠার পটভূমি নিয়ে। এই উপন্যাসে এক আইরিশ যুবকের শিল্পবোধে উন্নীত হওয়ার ধাপগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এক বিশেষ স্টাইলে লেখা এই উপন্যাস—জার্মান মহাকবি গ্যোয়েথের ভাষায় যাকে বলা যায় ‘বিলডুংজরোমান’, জার্মান ‘বিলডুং’ শব্দের অর্থ শিক্ষা এবং ‘রোমান’ শব্দের অর্থ ‘উপন্যাস’। ‘বিলডুংজরোমান’ ধারার উপন্যাস বলতে বোঝায়, যে উপন্যাস মনস্তাত্ত্বিক বিষয়কে কেন্দ্র করে লেখা হয় এবং ছেলেবেলা থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রসমূহের নৈতিক উন্নতিকে দেখানো হয়।

‘এ পোর্ট্রেট অফ দ্য আর্টিস্ট অ্যাজ এ ইয়াং ম্যান’ উপন্যাসকে জেমস জয়েসের সাহিত্যিক হিসেবে বেড়ে ওঠার কাহিনী বলা যায়। জেমস জয়েসের অন্য বিখ্যাত নির্মাণ যেমন: ‘ইউলিসিস’ বা ছোট গল্পের সংকলন ‘ডাবলিনার্স’-এর চেয়ে ‘এ পোর্ট্রেট অফ দ্য আর্টিস্ট অ্যাজ এ ইয়াং ম্যান’ বেশি জনপ্রিয় এর সহজ উপস্থাপনা ও নান্দনিক প্রকাশের জন্য।

স্টিফেন দেদালুস এক কট্টর ক্যাথলিক পরিবারে বড় হয়েছে যেখানে ধর্ম ও শাসন জীবনের এক গুরুত্ত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্টিফেনের কাহিনী অনেকটা জেমস জয়েসের নিজের আত্মজৈবনিক কাহিনী। দশ ভাইবোনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ স্টিফেন বড় হয়েছে ইংল্যান্ড শাসিত আয়ারল্যান্ডে। একদিকে বাবার আর্থিক অবস্থা খুব বিপর্যস্ত, অন্যদিকে মা চরম ধর্মানুরাগী। ‘স্ট্রিম অফ কনশাসনেস’ বা চেতনার প্রবাহরীতিতে লেখা এই উপন্যাস শুরু হয়েছে শিশু স্টিফেনের দৃষ্টিকোন থেকে। সে অসীম  বিরক্তি নিয়ে দেখে পরিবারে ধর্মের বাড়াবাড়ি, আইরিশ রাজনীতি নিয়ে বাবার সঙ্গে চাচার তর্ক, বারবার বাড়ি বদল, স্কুলে ছাত্রদের দাদাগিরি। একটু বড় হলে পরিবারের সাথে ডাবলিনে চলে এসে জেসুইট পাদ্রীদের পরিচালিত ভেল্ভেদর কলেজে ভর্তি হয়ে মেধা আর যোগ্যতায় রেক্টরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শুরু থেকেই স্বাধীনচেতা স্টিফেন অনুভূতিপ্রবণ, মেধাবী ও কল্পনাপ্রেমী। অনেক বন্ধুর মধ্যে থেকেও সে নিঃসঙ্গ। এই পর্যায়ে তীব্র যৌনতাবোধ তাড়িত স্টিফেন এমনকি বেশ্যাপল্লীতে যাওয়া শুরু করে। আবার পরক্ষণেই ধর্মীয় মূল্যবোধে তাড়িত হয়ে মৌলবাদী ধার্মিক সাজে। আবার কিছুদিন পর এই ধর্মের আসক্তি দূর হয়ে সৌন্দর্যের প্রতি অনুরাগ আসে, একদিন সৈকতে হাঁটতে গিয়ে এক সুদর্শনার রূপে মুগ্ধ হয়ে জীবনকে পুরোপুরি যাপন করার ইচ্ছা জাগে। সৌন্দর্য, প্রেম আর নারীর প্রতি আসক্তি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও তাকে ক্রমশ শিল্পের দিকে ধাবিত  করে; আর এর পূর্ণরূপ আমরা দেখতে পাই যখন সে সবকিছু ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেয়—স্বদেশ, পরিবার আর স্বজাতি ছেড়ে অনেক দূরে একজন নতুন লেখক হবার বাসনায়।

স্টিফেন দেদালুস শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত যে পৃথিবী দেখে এসেছে, তার বাইরেও যে বিশাল শৈল্পিক পৃথিবী আছে তা অর্জনের জন্য একদিন চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সে এক নতুন ভাষায়, নতুন ভাবে, নতুন পরিচয়ে নিজেকে দেখতে চায়। তুচ্ছ জাতীয়তাবাদ, আইরিশ রাজনীতি, কট্টর ধর্মীয় মতবাদ, এমনকি পারিবারিক সব শিকল কাটিয়ে নতুন উচ্চতায় উড়তে ইচ্ছুক স্টিফেন ডিডেলাস, যেমনটা তার একই নামের একজন কিংবদন্তি শিল্পী নিজ সন্তান ইকারুসের জন্য মোম দিয়ে ডানা বানিয়ে দিয়েছিল সব বাঁধা কাটিয়ে ওঠার জন্য। বিচ্ছিন্নতা আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম প্রধান সুর। এই উপন্যাসে যুবক স্টিফেনের জীবনেও তা দেখি। ক্রমবর্ধমান শুষ্ক, হাস্যরসহীন স্টিফেন চার্চ থেকে তার বিচ্ছিন্নতা এবং তার বন্ধুদের কাছে যে তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করে তাতে আমরা দেখতে পাই—সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, আয়ারল্যান্ড তাকে একজন শিল্পী হিসেবে পুরোপুরি প্রকাশের অনুমতি দেওয়ার পক্ষে সীমাবদ্ধ। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয়—তাকে চলে যেতে হবে।

স্টিফেন দুঃখের সাথে তার বন্ধুকে বলে, 'তার মনে হয় তার শৈল্পিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনুসরণ করতে দ্রুতই তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিতে হবে এবং বন্ধুদের ছেড়ে যেতে হবে। স্টিফেন নিজেকে যে ‘আমি কারো নই’ বলেছিল, তা অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এমনকি উপর থেকে তার ওপর চাপানো কোনও আদর্শ, বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারকেও অস্বীকার করতে হবে'। বন্ধু ক্র্যাংলিকে স্টিফেন পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেয় তার লক্ষ্য : ‘যা আমি বিশ্বাস করি না, তার মধ্যে আমি আর নেই; তুমি তাকে স্বগৃহ, স্বদেশ, চার্চ যা ভাব না কেন। আমি আমাকে শিপের যেকোনো এক মাধ্যমে প্রকাশ করব—আমার পক্ষে থাকবে শুধু একটাই অস্ত্র: নীরবতা, নির্বাসন ও চাতুর্য’। বন্ধু ক্র্যাংলি স্টিফেনকে চরম নির্জনতার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে, কিন্তু স্টিফেন কোনো উত্তর দেয় না। এমনকি বান্ধবী এমার সাথেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

অবশেষে এমার মুখোমুখি হয়ে স্টিফেন দেখিয়েছে যে, সে আদর্শিক মূর্তির চেয়ে নারীদের সহকর্মী হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করেছে। তার আর অন্য কারো দ্বারা পরিচালিত হওয়ার দরকার নেই, কারণ তার আবেগময়, আধ্যাত্মিক এবং শৈল্পিক বিকাশ তাকে পথ দেখানোর জন্য দৃষ্টি ও আস্থা দিয়েছে।

নির্বাসনের দিকে মনোনিবেশ করে স্টিফেন শেষে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসে যে, নতুন আত্মপরিচিতি নির্মাণের জন্য তাকে সবকিছু থেকে আলাদা হতে হবে—গ্রিক কিংবদন্তি দেদালুস যেমন নিজ শিল্পকে অবলম্বন করে কারাগার থেকে পলায়ন করে; স্টিফেন তেমনি শিল্পের হাত ধরে সকল সীমাবদ্ধতার কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করবেই। স্টিফেনের ভাষায় :

‘... আমি অভিজ্ঞতার বাস্তবতায় হাজার বারের জন্য মুখোমুখি হতে এবং আমার আত্মার কামারশালায় আমার জাতির অব্যক্ত বিবেককে প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে যাই’।

শুধু কাহিনী নয়, যে বিষয়টি এই উপন্যাসকে আধুনিক উপন্যাসের শীর্ষস্থানে পৌঁছে দিয়েছে তা হল এর সাবলীল ভাষা ও নতুন বর্ণনারীতি। উপন্যাসের শেষ পাতায় জেমস জয়েস স্টিফেনের ডায়েরি এন্ট্রিগুলোর জন্য উত্তম পুরুষের মাধ্যমে বিবরণ দিয়েছেন—সম্ভবত এই যুক্তিতে যে, স্টিফেন অবশেষে তার নিজের স্বর খুঁজে পেয়েছেন এবং অন্যের গল্পগুলো শোনার দরকার নেই। শৈশবকাল থেকেই স্টিফেনের বুদ্ধির বিকাশ, পড়াশোনার মাধ্যমে তার বর্ধমান স্বাধীনতা এবং আয়ারল্যান্ড থেকে চূড়ান্ত নির্বাসনে যুবক হিসেবে জয়েস সম্পূর্ণরূপে নিরপেক্ষ থার্ড পারসন রূপে নিযুক্ত করেছেন। এই উপন্যাসের শুরুর পৃষ্ঠাগুলো স্টিফেনের শৈশবের চেতনাকে সরলভাবে প্রকাশ করে। পুরো উপন্যাসে ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে কেন্দ্রীয় চরিত্রের মানসিক ও চেতনাগত বৃদ্ধির সমান্তরালে। ভাষার জটিলতা এবং চারপাশের বিশ্বকে বোঝার জন্য স্টিফেনের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ায় এর পাঁচটি অধ্যায়ে প্রতিটি রচনার ধরণ পরিবর্তিত হয়েছে। উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে স্টিফেন দৃঢ়ভাবে নিজের সিদ্ধান্তে পৌঁছায় আর ভাষাও সবল হয়ে ওঠে।

বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ এই উপন্যাসটির মতো ‘বিলডুংজরোমান’ ধারার উপন্যাস। বিখ্যাত এই বাংলা উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অপু শেষ পর্যন্ত পথকেই বেছে নেয়, যেভাবে ‘এ পোর্ট্রেট অফ দ্য আর্টিস্ট অ্যাজ এ ইয়াং ম্যান’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র স্টিফেন সচেতনভাবে আরো বিদ্রোহী হয়ে ওঠে—ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি, প্রচলিত নীতিবোধ সবকিছু ভেঙে আরো সামনে এগিয়ে যেতে চায়; কারণ সৃজনশীলতা সবসময়ই নতুন কিছু সৃষ্টির পক্ষে। বিভূতিভূষণের অপু তার বেড়ে ওঠার সময় ঔপনিবেশিক ভারতের রাজনৈতিক উত্তাপ দেখেছে; বিভূতিভূষণে চিরাচরিত বাংলার প্রাচীন সমাজের ভাঙ্গন দেখি; পল্লীবাংলার অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখি কিন্তু ব্যক্তিক দ্রোহ দেখি না; স্টিফেন দেদালুস যা সুস্পষ্ট করে।

ত্রিশ বছর আগের কথা। ডাবলিনে ঝাঁকড়া চুল, মায়াবী নীল চোখ আর উন্মাদনার ঘোরে হাঁটা যুবক স্টিফেনের মতো এক তার ছেঁড়া তরুণ ঢাকায় চন্দ্রাহত মনে হাঁটতে গিয়ে ফুটপাথে হোঁচট খেতে খেতে এপিফানিক মুহূর্তে ভাবছে—এই চেনা জগতের তন্ত্র—বিশ্বাস, রাজনৈতিক দলাদলি, পিতৃতন্ত্র ও মোল্লাতন্ত্রের বাইরে নতুন ভাষা, নতুন পরিচয়ে, নতুন দিনের সাহিত্য লিখবে। নির্বাসনে যাবে সে; কেননা মহৎ সাহিত্যিক মাত্রই নির্বাসিত। পৃথিবীর সব প্রান্তেই সাহিত্যিককে স্বেচ্ছা নির্বাসনে যেতে হয়—নিজেকে, নিজের শিল্পকে বুঝতে। স্টিফেন দেদালুসের  ভাষায় ‘To forge in the smithy of my soul the uncreated conscience of my own nation’.

 
//জেডএস//

লাইভ

টপ