মনোরঞ্জন ব্যাপারীর সাক্ষাৎকার (পর্ব : তিন)

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: মুশফিকুর রহমান
প্রকাশিত : ১৩:০১, জানুয়ারি ০৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১০, জানুয়ারি ০৫, ২০২০

মনোরঞ্জন ব্যাপারীর জন্ম বরিশালে। দেশভাগের পর পরিবারসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। জীবনের বিভিন্ন সময়ে অর্থের প্রয়োজনে বিভিন্ন রকমের কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কলকাতার মুকুন্দপুরে একটি বধির স্কুলে রান্নার কাজ করেছেন, চালিয়েছেন রিকশাও, কিন্তু সেসব টানাপোড়েন অতিক্রম করে সাম্প্রতিককালের বাংলার দলিত জীবনের অন্যতম কাহিনিকার তিনি।

দ্বিতীয় পর্বের পর থেকে

মুশফিকুর রহমান: আমি সর্ব-ভারতের কথা জানতে চাইব।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: আমি সর্ব-ভারতের কথাটাই বলছি।

মুশফিকুর রহমান: সর্ব-ভারতের সবখানেই তো আর বামপপন্থা ছিলো না।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: কেন ছিল না, ক্ষমতায় পশ্চিমবঙ্গ ছিলো, JNU তে বামপন্থা ছিলো, তাহলে আর কোথায় থাকা চাই। যখন দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়, যেটা শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় সেখানে বামপন্থা এখনো আছে, এবং তা একাডেমিক স্তরে। কিন্তু তা সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার কোনো পদ্ধতি বা প্রয়োগ হয়নি।

মুশফিকুর রহমান: আচ্ছা, তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, বামপপন্থিরা জানে সাম্প্রদায়িকতা বর্জন করা উচিত, কিন্তু মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে পারে না!

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: ধর্মান্ধতা আমাদের দেশে আছে, বহুকাল ধরে আছে, বহুভাবে তাকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। বহু স্বার্থান্বেষী শক্তি সেটাকে মজবুত করেছে। আমি মুসলমান ধর্ম নিয়ে বলবো না, কেন-না ওই বিষয়ে আমি তো জানি না। হিন্দু ধর্মের বেদ যারা লিখেছে তারা কেউ মূর্খ ছিলো না—অত্যন্ত পণ্ডিত ছিলো, বুদ্ধিমান ছিলো, জ্ঞানী ছিলো, প্রজ্ঞাবান ছিলো। কিন্তু তারা মেধাটা প্রয়োগ করলো কোথায়—মানুষকে ‘গ-আকার’ বানিয়ে রাখার জন্যে, জ্ঞানী বানাতে নয়। তারা কিন্তু চাইলে মানুষকে যুক্তিবাদী, বিজ্ঞান-মনস্ক করতে পারতো। কিন্তু করেনি, কারণ অজ্ঞ-অন্ধ করে রাখলে নিজের স্বার্থটা চরিতার্থ করতে সুবিধা হয়।

মুশফিকুর রহমান: আচ্ছা, এর আগে ভারতের প্রেসিডেন্ট যেন কে ছিলেন?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: প্রণব মুখার্জি…

মুশফিকুর রহমান: তার আগে…

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: এপিজে আব্দুল কালাম। উনি খুবই বিখ্যাত। উনি কী করেছেন? মিসাইল তৈরি করেছেন! মিসাইল দিয়ে কী হয়? হত্যা করা যায়। হত্যা করার অস্ত্র তৈরি করেছেন। তবে আমার কাছে তিনি নমস্য নন, যত বড় বিজ্ঞানী বা যাই হোন না কেন।

মুশফিকুর রহমান: তাহলে আপনি অ্যালফ্রেড নোবেলের ডিনামাইট আবিষ্কারকে কী বলবেন?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: ডিনামাইড ধ্বংসাত্মক কাজে প্রয়োগ হচ্ছে আজকে। কিন্তু উনি কিন্তু ওই উদ্দেশ্যে তা আবিষ্কার করেননি। আজকে একদল বদ-লোকের হাতে পড়ে তার অমন ব্যবহার হচ্ছে, কিন্তু সেতো ওই জন্য আবিষ্কার করেননি। আবার ধরো একে-৪৭ রাইফেলটা, রাইফেলটাকে অত্যন্ত উন্নত করা হয়েছে, যেন সর্ষে পরিমাণ জিনিসকেও গুলি বিদ্ধ করতে পারে। এই অস্ত্রটাকে যিনিই উন্নত করে থাকুন, তিনি তো জানতেনই যে, এই অস্ত্রটা দিয়ে মানুষ মারাই হয়। যিনি পারমাণবিক বোম তৈরি করেছেন, তিনি জানেন এটা দিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়। ধরো, এবার আমি একটা ধারালো-সুন্দর চাকু বানিয়েছি, মায়ের হাতে গেলে মা কেটে-কুটে সবজি বানাবেন, ডাক্তারের হাতে গেলে তিনি কেটে-কুটে অপারেশন করে একটা রোগীর টিউমার সরিয়ে দেবেন, আর একটা খুনীর হাতে গেলে, একটা খুন হয়ে যাবে। তাহলে চাকুটা আমি বানিয়েছিলাম সুন্দর-শিল্প করে মায়ের তরকারি কাটার জন্যে, ডাক্তারের জন্য। কিন্তু খুনির জন্য ছুরিটা বানাইনি। অর্থাৎ কী উদ্দেশ্য নিয়ে তুমি তোমার জ্ঞানটাকে-বিজ্ঞানটাকে প্রয়োগ করছো, ব্যবহার করছো সেটার মুখ্য। আমার কাছে প্রণাম পাওয়ার যোগ্য সেই মানুষ, যিনি মানবের মঙ্গলের জন্য কোনোকিছু করেছেন। কিন্তু যিনি মানব হত্যার জন্য করেছেন, সে যতই উন্নত অস্ত্র হোক, তিনি আমার কাছে প্রণাম পাবেন না। কিন্তু শাসক শ্রেণির কাছে তিনি মহান, কারণ শাসক শ্রেণি অস্ত্র হাতে পাওয়ার পর আরেকটা দেশের ওপর গিয়ে দাপিয়ে বেড়াতে পারবে।

মুশফিকুর রহমান: এটাও তো হতে পারে যে, বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা বা প্রতিরক্ষার জন্যও এটা প্রয়োজন

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: প্রতিরক্ষা শব্দটা আসছে কোথা থেকে?

মুশফিকুর রহমান: পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা থেকে।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: এইবার তুমি সমাধানে এসে গেলে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা শ্রেয় বা ভালো ব্যবস্থা নয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা টিকে আছে শোষণ ব্যবস্থার ওপরে। তোমাকে যত বেশি শোষণ-দম-দলন-দহন করতে পারবে তার পুঁজি তত বিকশিত হবে।

মুশফিকুর রহমান: সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরও তো আমরা সেই অস্ত্রের অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখছি। বলসেভিক বিপ্লবের পরে রাশিয়ার যে উঠে আস…

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: আবার তো সে চাকুর গল্প এসে যাচ্ছে। বলসেভিক বিপ্লব হয়েছে, শ্রমিকদের হাতে ক্ষমতা এসেছে, কিন্তু চিত্র পাল্টায়নি, ওই যে চাকুটা কার হাতে পড়লো (!) যেটাই বোঝাবার চেষ্টা করছিলাম এতক্ষণ।

মুশফিকুর রহমান: আচ্ছা, আপনি কি তাহলে বলতে চাচ্ছেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজই হচ্ছে স্ট্রিম রুলারের মতো, সেই যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে যেই বসুক, জনগন নিপীড়িত হবেই।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: হ্যাঁ, একদম মেনে নিচ্ছি, মার্ক্সবাদে আমাকে ওই কথাই বলেছে। রাষ্ট্রের প্রয়োজনটাই পড়েছে কেন। এই যে বাংলাদেশের বর্ডার, কেন? এটা তো আমার জন্মভূমি, আমার মাতৃভূমি, এখানে আমি জন্ম নিয়েছি, কিন্তু এই যে একদল লোক বর্ডারটা ঘিরে দিয়ে ঠিক করলো আমরা এখানকার লোক নই। এখানে শোষণ-দহন-দলন-দমন সব আমরা করবো, তোমরা নাক গলাবে না, তোদের ঐদিকটা তোরা কর, আমরা নাক গলাতে যাব না।

জিন্নাহ কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতেই পারতো, যোগ্যতা তার ছিলো।

মুশফিকুর রহমান: এখন জানতে চাইব—কাশ্মীর ইস্যুটা নিয়ে। পাকিস্তান, চীন, ভারত সবাই একে নিয়ে টানাটানি করছে।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: ভাই আমারো একগাদা প্রশ্ন আছে। আমি তো ভাই সবার মত বই পড়িনি, আমি জীবন থেকে শিখেছি, তোমরা তো জানোই, আমি কোনো স্কুলে পড়িনি—মানুষের কাছে মুখে-মুখে শুনে-শুনে শেখা নিজের অভিজ্ঞতা। ভারত তো ইউনাইটেড, তাহলে প্রথম কথা সেখানে থেকে হরি সিং পালালো কেন? ওই দেশ থেকে, পালালো ওই জন্য যে, ওই দেশের মানুষ সে।

মুশফিকুর রহমান: প্রণব রায়ের একটা বই আছে এই ব্যাপারে। পড়েছেন নিশ্চয়।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: না না, পড়া হয়নি। নামটা শুনেছি মনে হয়।

মুশফিকুর রহমান: আচ্ছা, হরি সিং পালালো কেন? এই ব্যাপারটা নিয়ে উনি ওনার বইতে লিখেছেন। আপনার কাছে জানতে চাই, আপনার হোমটাউন কোথায়?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: বাংলাদেশের বরিশালে। ৪৭’র দেশভাগের সময় ওখান থেকে আমার বাবা-মা, ভাই-বোন সবাইকে ওপারে পার হয়ে যেতে হয়েছে। আসলে অনেকটা বাধ্য হয়েই যেতে হয়েছিলো।

মুশফিকুর রহমান: আর এখন, ওয়েস্ট বেঙ্গলে।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: মুকুন্দপুর বলে একটা জায়গা আছে, চব্বিশ পরাগণা আর কলকাতার সীমানায়।

মুশফিকুর রহমান: বনফুলের একটা গল্প পড়েছিলাম, অনেকটা এমন, বাসে বসে বিভিন্ন জন বিভিন্ন প্রার্থনা করছে, হ্যাঁ ভগবান আমাকে চাকরি পাইয়ে দাও, এই করে দাও, ওই করে দাও। সেদিকে ভগবান ব্রহ্মা ভগবান বিষ্ণুকে ডেকে বলছেন, ওহে বিষ্ণু আমার সরিষার তেলের বোতলটা দাও তো। এখন কি ভগবানের কাজ নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো? আপনি কি তাই মনে করছেন দাদা?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: আমার বক্তব্যটা হচ্ছে, আমরা একটা এমন শক্তি যেটা পরীক্ষিত নয়, বহু ধরনের প্রমাণ দেওয়া যাবে, আসিফা বলে একটা ছোট্ট মেয়ে সবে জন্ম নিয়েছে, ৬-৭ বৎসর বয়স। তাকে মন্দিরে ফেলে ধর্ষণ করা হচ্ছে। ভগবান!... তুমি কি অন্ধ? ওইটুকু মেয়ে, তোমার আত্মা কেঁপে উঠলো না? ভগবান, কী করলে তুমি? কী করছো তুমি? পুরীর মন্দিরে ধর্ষণ হচ্ছে, কী করছো তুমি ভগবান? আচ্ছা, তুমি যখন এত অথর্ব-অক্ষম, আমি একটা ধূপকাঠি জ্বালাবো তারপর তোমার ঘর সুগন্ধ হবে।

মুশফিকুর রহমান: আপনি দেখে থাকবেন, ভারতবর্ষ বা প্রায় দেশেই সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে ধর্মের বিরুদ্ধে দেখানো হয়। এতে করে মেজরিটির যে ধর্ম বিশ্বাস, সেই দিক থেকে তারা সমাজতন্ত্রকে-বামপন্থাকে তাদের জন্য থ্রেট মনে করে। আর সেইজন্যেই শাসক শ্রেণি জনগনকে সমাজতান্ত্রিকধারা এবং চিন্তা থেকে দূরে রাখতে সমর্থ হয়। সেখানে যারা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তাদেরও কি কিছু দায়ভার বর্তায় না? আপনি হয়তো মাওলানা ভাসানীকে জেনে থাকবেন, তিনিও কিন্তু সমাজতন্ত্রিক ধারায় বিশ্বাসী থাকার পরও কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। ব্যাপার হচ্ছে কৃষকরা তাদের ধর্ম বোঝে, তাদের কার্ল মার্ক্সের থিওরি বোঝানো যাবে না।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: হ্যাঁ, এই জায়গায় লেলিনের একটা লাইনই আছে যে, যারা ঈশ্বরে বিশ্বাসী, তাকে বোঝানোর দরকার নেই যে, ঈশ্বর আছে কী নেই। তাকে সঙ্গে নিয়েই আন্দোলন করতে হবে। চলবে

আরো পড়ুন: মনোরঞ্জন ব্যাপারীর সাক্ষাৎকার (পর্ব : দুই)

(সাক্ষাৎকারটি ঢাকায় অনুষ্ঠিত Dhaka Lit Fest 2019-এর ২য় দিন গ্রহণ করা হয়েছে।)

//জেডএস//

লাইভ

টপ