মনোরঞ্জন ব্যাপারীর সাক্ষাৎকার (পর্ব : দুই)

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মুশফিকুর রহমান
প্রকাশিত : ১২:৩৫, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৬, জানুয়ারি ০৫, ২০২০

মনোরঞ্জন ব্যাপারীর জন্ম বরিশালে। দেশভাগের পর পরিবারসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। জীবনের বিভিন্ন সময়ে অর্থের প্রয়োজনে বিভিন্ন রকমের কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কলকাতার মুকুন্দপুরে একটি বধির স্কুলে রান্নার কাজ করেছেন, চালিয়েছেন রিকশাও, কিন্তু সেসব টানাপোড়েন অতিক্রম করে সাম্প্রতিককালের বাংলার দলিত জীবনের অন্যতম কাহিনিকার তিনি।

প্রথম পর্বের পর থেকে

মুশফিকুর রহমান: আপনি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে চাচ্ছেন।
মনোরঞ্জন ব্যাপারী: আমি চাইছি, এই পৃথিবীটাকে এমনভাবে গড়বো যেন আমরা স্বাধীনভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারি।

মুশফিকুর রহমান: সত্যিই কি আমরা স্বাধীনভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারি, আপনার কী মনে হয়?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: আমি যেটা বলছিলাম সেটা তো শেষ হয়নি। আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে, আমরা সেইরকম একটা সমাজ নির্মাণ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। তার জন্যে আমরা জেলে গিয়েছি, গুলি খেয়েছি, সারা শরিরে ছুরি-চাকুর অনেক দাগ আছে তবু পারিনি। তবুও সমাজটাকে আমরা বদলাতে পারিনি। আমাদের তো এখন শেষ সময়, আমরা আর ৫-৭ বছর বড়জোর থাকবো দুনিয়ায়। এই যে নবনিতা দেবসেন গতকাল চলে গেলেন। উনি আমার অতি কাছের মানুষ, প্রিয় মানুষ। কাল উনি যেমন চলে গেলেন, পরশুদিন হয়তো আমি চলে যাবো। এইবারে, যে পৃথিবীতে তোমরা বাস করছ তোমরা ভেবে দেখো, এই পৃথিবী বসবাস যোগ্য কিনা, যদি বসবাস যোগ্য হয়, ভালো।

আর এখানে শ্বাস নিতে পারছো কিনা, তা তো তুমি আমার থেকে ভাল জানো, যদি শ্বাস নিতে পার তবে নাও। আর যদি ভাবো, শ্বাস নিতে পারছি না, এই ব্যবস্থাটাকে বদলাতে হবে। তবে তোমাকে পথে নামতে হবে, লড়তে হবে। সেই লড়াইয়ের জন্যে যদি তুমি ভয়ংকর সেই আগুনের সমুদ্র সাঁতরে ওপারে যেতে পারো তবে তুমি নতুন জীবন পাবে। আর যদি না যেতে পারো, তুমি আমার মত বুড়ো বয়সে এসে আক্ষেপ করবে।

মুশফিকুর রহমান: তাহলে সারকথা হলো, যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আপনি শুরু করেছিলেন তা পূরণ হয়নি, বরং তা আক্ষেপের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: বহু মানুষ, আমরা পারিনি। দেশ, নতুন সমাজ পরিবর্তনে আমাদের প্রয়াস-প্রচেষ্টা ছিল, কিন্তু আমরা পারিনি । আমরা ব্যর্থ মানুষ, পরাজিত মানুষ। এইতো আমাদের পরাজিতের আখ্যান। আমরা ব্যর্থ-পরাজিত মানুষের আখ্যান লিপিবদ্ধ করে যাচ্ছি, আমরা এইভাবে এসেছিলাম, এই আমাদের লড়াই, এইভাবে আমরা পরাস্ত হয়েছি।

এবার তোমরা ভাবো, সে লড়াই কি ঠিক ছিল, নাকি ভুল ছিল, যদি ভুল থেকে থাকে তাহলে ঠিক করার উপায় তোমরা বাছাই করো। যদি মনে করো, পৃথিবী তোমাদের জন্য সহনশীল, তাহলে ঠিক আছে। আর যদি তুমি মনে করো পৃথিবী সহনশীল নয় তাহলে তুমি ঝাঁপ দাও।

মুশফিকুর রহমান: বলা হয়ে থাকে, ‘বীর ভোগ্যা বসুধা বা যোগ্যতমের জন্য পৃথিবী’।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: এইটা মালথাস থিওরী, মালথাসবাদ। তার মানে কি দুর্বলকে বাঁচতে দেয়া হবে না, তাই তো?

যোগ্যতমের জয় কী বোঝায়? এই যে চেঙ্গিস খান, যে এতো লোক খুন করেছিলো, তার মানে কি?—সে যোগ্য, বাকিরা অযোগ্য? যোগ্যতমের প্রমাণ হবে কীভাবে, যার অস্ত্রের শক্তি বেশি সেইই কি যোগ্য? এখন যদি আমেরিকা ইচ্ছা করে আমাদের বাংলাদেশটাকে বা ভারতটাকে প্রস্তর খণ্ডে পরিণত করতে পারে, তারা পারে। তাহলে আমেরিকাই জিতবে? আমরা জিতবো না? আমাদের জেতার কোনো জায়গা নেই? এইটা তো পুঁজিবাদীদের-সম্রাজ্যবাদীদের ছুড়ে দেয়া মতবাদ। যেন আমরা মৃত্যুর সময়ও ভাবি, আমরা অক্ষম ছিলাম। যদি তাই হয়, ভিয়েতনামের মতো ছোট একটা দেশ কীভাবে আমেরিকার সঙ্গে লড়ে তারপর দাঁড়াতে পারলো? আসল ব্যাপার হলো অক্ষমতাকে সক্ষমতায় পরিণত করতে হবে। ঐ যে নরেন্দ্র মোদী চা বিক্রি করত, সে নিশ্চয়ই যোগ্য। কারণ ওই জায়গায় পৌছুবার জন্য তার একটা দীর্ঘ লড়াই ছিলো, প্রয়াস ছিলো। আমার সেই লড়াই ছিল না। তাকে প্রতিহত করার জন্য আসলেই যে লড়াইটা করার দরকার ছিল তাও আমি করিনি।

মুশফিকুর রহমান: হ্যাঁ, নরেন্দ্র মোদী বা আরো যারা এভাবে বিভিন্ন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে এই জায়গাটায় পৌঁছেছে। আপনি উদাহরণ টানলেন নরেন্দ্র মোদীর, যে চা বিক্রি করতেন এবং যারা এই ধরনের কাজ করে তারা আমাদের সমাজে শোষিত বা দলিত। কিন্তু তারা যখন রাষ্ট্র পরিচলনায় গেলো তারাও কি শোষণ-নিপীড়ন করছে না? এর কারণ কী, তাদের তো আপনাদের দুর্দশা অভিজ্ঞতা ও কারণ জানা আছে। তবে এ আচরণ কেনো?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: এটা তো প্রমাণিত, দলিত ক্ষমতা হাতে পেলে দলক হয়ে যেতে পারে, হয়ে যায়। হতো না কখন, যদি তার পাশে এত গার্ড না থাকতো, তার হাতে এত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে না পারতো, তাহলে কিন্তু সে ওমন হতে পারতো না। তার চারপাশে যে পাহারা সেটা জনগনের পাহারা হওয়া উচিত ছিলো। আমরা জনগন একজন লোককে ভোট দিয়ে মন্ত্রী বানিয়েছি, ভোটটা দিয়ে দিয়েছি কিন্তু ওই আসন থেকে টেনে নামানোর ক্ষমতা আর আমাদের থাকে না।

মুশফিকুর রহমান: এটার সমাধান কী হতে পারে দাদা?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: সমাধান, আমাকে সচেতন হতে হবে, সংগ্রামী হতে হবে, প্রতিবাদী হতে হবে, সব আমি মাথা পেতে মেনে নেব না, রুখে দাঁড়াতে হবে, আমাকে দেখে আর পাঁচজন রুখে দাঁড়াবে।

মুশফিকুর রহমান: এই যে মোদী সাহেব, উনি সচেতন বলেই এই জায়গাটায় আসতে পেরেছেন। কিন্তু তিনি কি সচেতনতার মর্যাদা দিচ্ছেন বলে আপনি মনে করেন?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: বলছি যে, বিজয় মাল্লো তিনি জ্ঞানী লোক, বুদ্ধিমান লোক, আমি যেখানে এক টাকা রোজগার করতে পারি না, তিনি সেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে রাজকীয় জীবন যাপন করছেন। তোমার যে শক্তিমত্তা তুমি বানিয়েছো সেটাতো তোমার ওপর নির্ভর করবে। তুমি স্টালিনও হতে পারো, তুমি হিটলারও হতে পারো।

তোমার অর্জিত ক্ষমতাকে তুমি দু’ভাবে প্রয়োগ করতে পারো, একটা হলো ক্ষমতা অর্জন করার জায়গা। দুই, তুমি যে ক্ষমতা অর্জন করলে, এইবার তার প্রয়োগ তুমি কীভাবে করবে। তুমি কি স্তালিনের মত, না হিটলারের মত তা প্রয়োগ করবে। হিটলারের মত করলে ঘৃণিত হবে, আর স্তালিনের মত প্রয়োগ করলে পূজনীয় হবে। এই যা!

মুশফিকুর রহমান: দাদা আমার প্রশ্নটা হচ্ছে, এই জায়গায় যখন দলিতরা ক্ষমতায় যায় তখন তাদের আচরণটা বদলে যায়। প্রত্যেকটা মানুষের কিন্তু একটা আদর্শ থাকে, তবে তারা কেনো তাদের সেই আদর্শ থেকে সরে আসে?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: সব মানুষ সরে আসে না । আমার চোখের সামনে খোকন মজুমদার ছিলো, নকশাল আন্দোলনের নেতা, তাকে আমি দেখেছি, তার জীবন আমি দেখেছি, তার মৃত্যু আমি দেখেছি। এ. কে. রায়ের জীবন আমি দেখেছি, মৃত্যু দেখেছি। সব মানুষ সরে কিন্তু আসে না, কেউ কেউ সরে আসে। যখন তোমার হাতে অঢেল ক্ষমতা এসে গেলো, এবার তোমার মানসিক স্থিতিটা কী এবং তার ওপর নির্ভর করছে ক্ষমতাটাকে তুমি কীভাবে প্রয়োগ করবে। যদি তুমি জনগণের হিতে প্রয়োগ করো তবে তুমি জনগনের কাছে পূজনীয় হবে আর যদি জনগণের বিরুদ্ধে প্রয়োগ কর তাহলে ঘৃণিত হয়ে যাবে।

মুশফিকুর রহমান: আমি আপনার একটা বক্তব্য শুনেছিলাম জোস টকসে. জেলখানায় থেকে পড়াশোনা করেছেন। আমি আপনার নামটা অনেকবার খুঁজেছি, ভাবিনি এইভাবে আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। আপনার ব্যাপারে আমি বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি কিন্তু আপনার নামটা পাইনি, কেননা আপনার নামটা ওইখানে উল্লেখ করে নাই। তবে আমি আপনার স্পীচটা শুনেছি।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: যা হোক, এলাম আপনাদের বাংলাদেশে প্রথমবার, ৬০ বছর প্রতীক্ষার পর।

মুশফিকুর রহমান: আপনি তো বাংলা আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: আরো অনেকগুলো পেয়েছি, আর ওগুলো গুনে কী হবে।

মুশফিকুর রহমান: ভালো লেগেছে, আপনি একজন পলিটিক্যাল আইডায়োলজি অ্যাক্টিভিস্ট, তারপর আপনার শেখার যে প্রক্রিয়াটা।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: সময় একেকজনকে একেকভাবে প্রভাবিত করে, আমিও হলাম। আরে বই পড়ে পাগল হয়ে গেছে! এ কী। তখন আমার মনে হলো বইয়ের মধ্যে কী আছে? বইয়ের মধ্যে কী আছে, জানতে হলে অক্ষর জানতে হবে। ভালো শিক্ষকও পেয়ে গেছিলাম। আমি ভাবলাম লেখাপড়া শিখবো কী করে, কিছুই তো নেই। উনি একটা কাঠি নিয়ে এলেন, বললেন, এইটা তোর পেন আর জেলখানার উঠোন দেখালেন, বললেন, এইটা স্লেট। আর আমি তোর জীবন্ত পুস্তক। ওই মাটির মধ্যে একটা ‘ক’ লিখে দিলেন, বললেন, এইটার মধ্যে কাঠি ঘোরা। তারপর এইটার মধ্যে ‘ক’ হলো, ‘খ’ হলো, ৩৪ টা অক্ষর হলো। তারপর আকার-একার হলো। একজন অন্ধ মানুষ, সে যদি দৃষ্টি ফিরে পায়, কী করবে সে? এটা দেখি, ওটা দেখি, না খাওয়া একটা মানুষ যদি অনেক খাবার পায়, সে কী করে? কোনটা রেখে কোনটা খাবে ভেবে ভেবে পাগলের মত খেতে থাকে।

কিংবা ধরো, কেউ যখন নতুন বাইক চালানো শিখেছে, তখন কী করে? খাওয়া নেই, ঘুম নেই, এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। আমি যখন পড়তে শিখলাম তখন দেখলাম, আরে! আফ্রিকার গহীন অরণ্যে কী আছে, আফ্রিকা নামে একটা মহাদেশ আছে, তার মধ্যে কী আছে, তা সব বই-এ খুঁজে পাচ্ছি। হিমালয়ের শীর্ষে কী আছে, আরে বাবা, সমুদ্রের মাঝে এরকম বরফ, কীভাবে কী! পড়েই যাচ্ছি, পড়েই যাচ্ছি। সেই বই পড়ার কারণেই একটা শব্দ ‘জীজিবিন্সা’ এটার অর্থটা বুঝলাম না, শুরু হয়ে গেল খোঁজা, হয়ে গেল মহাশ্বতা দেবীর সঙ্গে দেখা, তারপরই হয়ে গেল একটা শুরু, একটা সূচনা। তখন তো এসব পুরস্কার-টুরস্কার পাবো সে কথা ভাবিনি, শুধু লিখে গেছি, আর লিখেই গেছি, তারপর দেখলাম আকাদেমি পুরস্কারটা এলো। তারপর দেখলাম যে, আরো এলো হিন্দু পুরস্কার, এখন আবার সাউথ এশিয়ার একটায় আমার নাম এসেছে। JBC-র শর্টলিস্টেও আমার নাম এসেছে। তো সেইভাবে পেতে থাকলাম পুরস্কার, বাড়তে থাকলো বই।

মুশফিকুর রহমান: একটা ব্যাপারে জানতে চাইবো। হঠাৎ করে ভারতবর্ষে এই যে জাতীয়তাবাদ, তা জাগ্রত হলো কী করে?

মনোরঞ্জন ব্যাপারী: এই প্রশ্ন সকাল থেকে চলছে। সবথেকে বড় অপরাধ আমাদের, আমিও অপরাধী। বামপন্থীদের মানুষ ভোট দিয়েছিলো, বিশ্বাস করেছিলো, ৩৪ বছর তারা ক্ষমতায় ছিলো। আমরা মানুষকে যুক্তিবাদী বিজ্ঞান-মনস্ক করে তুলতে পারলাম না। আমার ভিতরে একটা সাম্প্রদায়িকতা রয়েছে, সেই সাম্প্রদায়িকতাকে হত্যা করতে হলে আমার যুক্তিবাদের অস্ত্রটাকে ধার দিতে হতো, শান দিতে হতো—আমি করলাম না, আমি ওইটাকে অদেখা রেখে গেলাম। কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার কুঁড়ি বছর তো হলো তার মধ্যে কোনো পলিটিক্যাল-ক্ল্যাশ হয়নি। ক্যাডার জিতেছে, কারণ সরকার আছে, সরকারের সঙ্গে জুড়ে গেলে পরে কিছু প্রাপ্তিযোগ আছে—ঠিকাদারি, প্রোমটারী, তোলাবাজি, হেনো-তেনো। আদর্শিকভাবে এটা হয়নি। সাম্প্রদায়িকতা আমার ভেতরে সুপ্ত ছিলো। কিন্তু এইটা তো ক্ষতিকারক। চলবে

(সাক্ষাৎকারটি ঢাকায় অনুষ্ঠিত Dhaka Lit Fest 2019-এর ২য় দিন গ্রহণ করা হয়েছে।)

আরো পড়ুন: মনোরঞ্জন ব্যাপারীর সাক্ষাৎকার, (পর্ব : এক)

//জেডএস//

লাইভ

টপ