শামীম রেজার সাক্ষাৎকার

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : হাসান নাঈম
প্রকাশিত : ০০:০৫, মার্চ ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৫, মার্চ ০৮, ২০২০

জন্ম ৮ মার্চ ১৯৭১; ঝালকাঠি। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, পিএইচডি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা শিক্ষকতা ও সম্পাদনা। প্রকাশিত বই : কবিতা—পাথরচিত্রে নদীকথা, নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে, যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে, ব্রহ্মাণ্ডের ইসকুল, শামীম রেজার কবিতা, হৃদয়লিপি, কবিতাসংগ্রহ, চর্যালোক ইত্যাদি। গল্প—ঋতুসংহারে জীবনানন্দ। উপন্যাস—ভারতবর্ষ [সমকাল ঈদসংখ্যা ২০০৮]। উল্লেখযোগ্য সম্পাদনা—শিবনারায়ণ রায়ের সঙ্গে যৌথভাবে, আফ্রিকার সাহিত্য সংগ্রহ (১ ও ২)।

 এ ধরনের প্রশ্ন সবাই করে, তবুও জানতে চাই, কবিতা বলতে কী বোঝেন? বা এই উত্তরাধুনিক বা উত্তরকাঠামোবাদী যুগে গদ্য এবং কবিতার মধ্যে স্বাতন্দ্র্য ঠিক কোথায়?

কবিতা লিখতে আসার পর খুব স্বাভাবিকভাবেই কবিতা নিয়ে, কবিতার সংজ্ঞা নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করতাম। যখন মালার্মের সংজ্ঞা পড়ছি তখন সংস্কৃত বা ভরতের কোনো একটি নাট্যশ্লোকে দেখলাম, শিব আর পার্বতীর মিলনই হলো কবিতা। তবে এখন আমার কাছে নিজস্ব একটি সংজ্ঞা দাঁড়িয়েছে, একটা পরিপূর্ণ কবিতা হতে যা লাগে সেটা হচ্ছে একটা সুস্থ দেহ, এই দেহটা হচ্ছে শব্দের, যা দিয়ে তুমি কবিতাকে সাজাবে আর এর মূলটা হলো বোধ।

আবার অনেকে বলছে কবিতায় যদি আড়াল না থাকে, সেটাকে কবিতা বলা যাবে কিনা—কিন্তু আড়াল ছাড়াও পৃথিবীর বহু বিখ্যাত কবিতা আমরা পড়ি, বা শতশত বছর ধরেও সেসব কবিতা আমাদের মাঝে আছে, কিন্তু তার শক্তিটা কী? সেটাই আমরা খোঁজার চেষ্টা করি। তবে এতোটুকু সত্য যে, কবিতা বিভিন্ন রকমের চিন্তা বা অনুভূতিকে ধারণ করে এবং পড়ার পর তুমি একরকমভাবে ব্যাখ্যা করবে, আমি একরকমভাবে ব্যাখ্যা করবো। এগুলোই প্রকৃত কবিতা। যেমন জীবনানন্দের কবিতায় আমরা সেটা খুঁজে পাই। ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’র মতো, সব কবিতাই কবিতা নয়, কিছু কিছু কবিতা প্রকৃত কবিতা।

 

গঠনের প্রক্রিয়াটা কী? এটা কি কোনো প্রতিভার মাধ্যমে আসে নাকি ওহির মতো নাজিল হয়, না এটা চর্চার ব্যাপার?

এটা যে শুধুই চর্চার ব্যাপার তা বলা যায় না। সাধনা ছাড়া তো কোনোকিছুই হয় না, সাধনার মাধ্যমেই আমরা প্রাজ্ঞতার দিকে যেতে পারি, তবে এই সাধনা কে কীভাবে করবে সেটা তার ব্যাপার, এর নির্দিষ্ট কোনো পথ নেই।

একসময় বাংলা একাডেমি যখন ক্রিয়েটিভ রাইটিংসের কোর্স শুরু করে তখন আমরা কেউ কেউ হাসাহাসি করেছিলাম, কিন্তু একটা জিনিস এখন এই বয়সে এসে মনে হয় তাতেও কিছু না কিছু কাজ হয়েছে।

তুমি যে কথাটা বলছো, প্রতিভা আর মেধা নিয়ে বুদ্ধদেব বসু একটা লেখায় বিশদ আলোচনা করেছেন। এখান থেকেই তুমি সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, সেটা হলো, আমরা যারা প্রচলিত অর্থে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট কিংবা ভালো রেজাল্টধারী বা যাদের অনেক আর্থিক ও পেশাগত উন্নতি দেখতে পাই তারা বেশিরভাগই মেধাবী। প্রতিভার ছায়া তাদের লাগে না। খুব কমই আছেন যাদের প্রতিভা আর মেধার সমন্বয় ঘটেছে। যদি পুঁথিগত বিদ্যাই ধরি, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল বাদ পড়ে যাবেন।

এখনকার মেধাবী কারা? যারা ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড হচ্ছে, ক্লাসে কিংবা পরীক্ষার প্রশ্নের একটা নির্ধারিত ছক আছে, সেটা মেনে লিখলেই আশি শতাংশ মার্কস পাচ্ছে। প্রতিভাবানরা এসব জায়গাকে তাচ্ছিল্য করে। তারা মনে করে এই যা পড়ানো হচ্ছে তা আমি আগেই জানি, এটা একবার দেখলেই আমি পারবো।

আমরা যেমন বলি, নদীর জল ঘোলাও ভালো, জাতের মেয়ে কালোও ভালো—এই জাতের ব্যাপারটা কী?

প্রকৃত কবি বা শিল্পী প্রতিভাবান হয়। মেধা দিয়ে একটা জায়গায় উপনীত হওয়া যায় কিন্তু প্রতিভা না থাকলে শিল্প করা যায় না, আর এর সঙ্গে সাধনারও যোগ চাই।

তুলনামূলক সাহিত্য পড়াতে এসে দেখছি, না পড়ে এলে ক্লাস নেওয়া সম্ভব না। এটা অনেক প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকরা বুঝতে পারেন না। আর শুধু প্রতিভা থাকলেই হবে না, পড়াশোনাও করতে হবে। আমি নাম ধরে ধরে বলতে পারবো, ষাট, সত্তর দশক কিংবা তার পরেও এমন অনেক কবি কবিতা লিখেছেন, তারা জীবনের প্রথমদিকে যেমন কবিতা লিখতেন এখনো তেমনই কবিতা লিখছেন। নিজেকে পাল্টাতে পারেন না। আবার দেখবে অনেকেই সেটা পেরেছেন। কারণ তারা এসবের সমন্বয় ঘটাতে পেরেছেন।

 

অনেক আগে থেকেই আমরা দেখছি, ছন্দ থেকে অনেক কবিই বের হয়ে আসার চেষ্টা করছেন। অনেকেই গদ্যে কবিতা লিখছেন, সেখান থেকে আমি জানতে চাইবো, এই যুগে এসে কবিতা আর গদ্যের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করবেন কীভাবে?

মধুসূদন পড়াতে গিয়ে কিংবা আলোচনা করতে গিয়ে আমি পেলাম যে, তার সময়কার সমালোচকরা মধুসূদনকে বলতেন, তিনি নাকি বাংলা ভালো জানতেন না, এজন্য অমিত্রাক্ষর ছন্দের মাধ্যমে পাঁচ-ছয়শ বছরের ধারাবাহিকতাকে পাশ কাটিয়ে নিজের মতো লিখলেন। এটাও তো সত্য যে, মাইকেলের এরকম বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের ফল আজকে আমরা কীভাবে দেখছি, সেলিম আল দীনের প্রসঙ্গে আসি, তিনি যখন নাটক লিখলেন তিনি এটাকে কবিতা বলতে চাইলেন, শ্রদ্ধার সঙ্গেই বলছি, তিনি ব্যর্থ কবি। কিন্তু তিনি তার নাটককে যখন সংলাপ থেকে সরিয়ে গদ্যের মধ্যে নিয়ে এলেন তখন আমরা নতুন কিছু পেলাম, একেবারেই নতুন কিছু। একটা বিষয় খেয়াল করলে দেখা যাবে, যারা লেখক হয়েছেন বা হতে চেয়েছেন তাদের অধিকাংশই কবিতা দিয়েই শুরু করেছেন, কবি হতে চেয়েছেন। যা হোক, প্রশ্নটা ছিলো কবিতা কি গদ্যের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে, নাকি গদ্য কবিতার মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে? বর্তমান যুগে এদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? সেলিম আল দীনের তত্ত্ব দিয়েই বলি, সেটা হচ্ছে সেলিম আল দীন আমাদেরকে বলতেন, নাকের ডাক্তার, গলার ডাক্তার এইসব আলাদা আলাদাভাবে তো আগে কিছু ছিলো না, কবিরাজ কিংবা যারা শৈল্য চিকিৎসক যারা সরাসরি ন্যাচারকেই ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করেছেন, এখানে তোমরা হয়ত জেনে থাকবে দেবেশ রায়ের একটা আক্ষেপ ছিলো যে, এখানের মতো বিশেষ মৌসুমি হাওয়া পৃথিবীর আর কোথাও বয় না, শুধু বঙ্গোপসাগরের তীরে এখানে বয়, এটা নিয়ে কেউ উপন্যাস লিখলো না। তোমার প্রশ্নটি আরও কিছু কথা বললে পরিষ্কার হবে, আমাদের এখানে যেমন ভ্রমণগান, কবিগান, আমাদের গায়েনরা কিংবা আমাদের রাজশাহী বা উত্তর অঞ্চলে গেলে দেখা যাবে সেখানে একজনই নাচছেন, গাইছেন, ঢোল বাজাচ্ছেন, একই সঙ্গে নারী চরিত্রে অভিনয় করছেন, পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করছেন, মানে একই অঙ্গে অনেক রূপ, ফলে এই যে সমগ্রকে ধারণ করা এটা প্রাচ্যেই সম্ভব, এটা পাশ্চাত্যে ছিলো না এখনো নেই।

সমালোচনা সাহিত্য আমাদের দাঁড়ায়নি কবি-সাহিত্যিক বিশেষ করে জীবনানন্দ দাশের কারণে, এখানে আল মাহমুদের সময়ে একজন তার মানের সমালোচক দাঁড়ালো না, তার কারণ তুচ্ছ করা এই বলে যে, তোমার তো কিচ্ছু হয় না, তুমি তো ক্রিয়েটিভ না। সমালোচক যদি উঠে আসতেন তাহলে তত্ত্বও দাঁড়াত। ফলে যখন আমাদের বড় বড় তাত্ত্বিকরা তৈরি হবেন তখন এইসব প্রশ্নের সুরাহা হবে। পাশ্চাত্যের কথা অনুসারে নয়, আমাদের তাত্ত্বিকরাই আমাদেরকেই বুঝে নিয়ে বলবেন এটা গদ্য হবে নাকি কবিতা হবে নাকি নাটক হবে। আমাদের এখানে সমস্যা হলো, একজন আরেকজনকে বলে অমুকে এটা জানে না, ও এটা পারে না, ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে আমাদেরকে দিয়েই আমাদের তত্ত্ববিশ্ব তৈরি করতে হবে এবং তখনই কোনটা কবিতা কোনটা গদ্য সেটার সঠিক নির্ণয় করতে পারবো।

 

নিজেকে আপনি কোন দশকের কবি হিসেবে অভিহিত করতে চান?

দশক ব্যাপারটা আলোচক বা সমালোচকদের জন্য উপযোগী, কারণ আলোচনার জন্য সেটা লাগে। আমি লেখা শুরু করেছি নব্বই দশকে, আমার বন্ধুরাও সবাই নব্বই দশকের। কিন্তু আমি মনে করি এটা বুদ্ধদেব বসুর একটা ভুল সিদ্ধান্ত, হওয়া উচিত ছিলো প্রজন্ম। তাহলে হতো কী দ্যাখো, স্বাধীনতা-উত্তর সত্তরের দশক, আশির দশক, নব্বইয়ের দশক, এটা একটা প্রজন্ম হতো। এভাবে চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট, একটা প্রজন্ম হতো। এখন তোমরা যারা, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় দশকের তারা মিলে একটা প্রজন্ম। আমরা যে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লেখার চেষ্টা করছি, যদি বেঁচে থাকি এটা সম্পন্ন করবো, সেখানে আমরা প্রজন্ম বিভাজন করেই কাজ করবো। তত্ত্ববিশ্ব নিয়েও আমাদের কাজটা সম্পন্ন হয়ে যেত, কিন্তু আমার দুই বন্ধু ব্যস্ত থাকায় পেরে উঠিনি, আমি যেটা চিন্তা করছি সেটা সম্পন্ন করতেও তো কারো সহযোগিতা দরকার। একা সবটা পারা যায় না।

ইংরেজরা আসার আগে এই অঞ্চলে তো আর তাদের আমলাতান্ত্রিক ব্যাপার আসেনি, কিংবা তাদের ধরনে ক্যাটাগরিতে ফেলা কিংবা তাদের শিল্প-সাহিত্য স্প্রেড হয়নি। সুতরাং আমাদের সেই মৌলিক তত্ত্ববিশ্ব নিয়ে কাজ হয়নি, সেটা আমি করতে চাই।

 

আমরা সমরেশ বসুকে দেখেছি যাকে চল্লিশের দশক থেকেই সব দশকের বলে মনে হয়। এই যে বৈচিত্র্য, আপনার লেখার মধ্যেও আমরা তেমন বৈচিত্র্য দেখতে পাই। আপনি ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’ লিখছেন, যখন ‘নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে’ লিখছেন কিংবা ‘হৃদয়লিপি’ লিখছেন এগুলোর মাঝে বিস্তর ফারাক লক্ষ করা যায়, এই যে বিষয়ের বৈচিত্র্য, এ সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।

আমি যেটা দেখেছি জীবনানন্দের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বিষয়-বৈচিত্র্য নিয়ে গীতবিতানসহ বলতে হবে, সেখানে আমার সম্পর্কে আমি এক লাইন বলে যাই, সেটা হলো ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’ যখন লিখলাম ইন্ডিয়ার একজন ফিল্মমেকারের সঙ্গে দেখা হয়েছিলো, প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল ক্যেমিকেলসে একটা বক্তৃতা করতে গিয়েছিলাম ২০০১ সালে, তার নাম শতদ্রু চাকতি, দুই বছর পর উনি মারা যান, উনি আমার কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন : মরমিয়া এবং সূফীবাদ আমাদের এখান থেকে উঠে যাচ্ছে, কিন্তু তোমার কবিতায় তা দেখা যাচ্ছে। এটা দেখে আমার অনেক বন্ধুরা বললো, তুই যদি সুফিজমের মধ্যে ঢুকে যাস তাহলে তোকে মধ্যযুগের ধরা হবে। পুরাণ বা মিথ নিয়েও কিছু কবিতা ছিলো, আর ওইদিকে আমার দুর্বল কবিতার বই আমার কাছে মনে হয় ‘নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে’, সেখান থেকে যখন আমার তৃতীয় কবিতার বই ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’-তে এসে ভাষা বিষয়ে চিন্তাভাবনার একটা আমূল পরিবর্তন এলো। ওই পাণ্ডুলিপি নিয়ে অনেক আলোচনা হলো, সিনিয়রসহ বন্ধুরা অনেক আলোচনা করলেন, পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে গেলো, বলা হলো এটা কবিতার বই কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। যা, হোক, এই বইটা নিয়ে অনেক আলাপ আলোচনা হয়েছে, বিষয়, ভাষা আর চিন্তার বৈচিত্র্যের কারণে। এরপরে ‘ব্রহ্মাণ্ডের স্কুল-এ এসে একটি মহাকাব্যিক আবহ তৈরি করার প্রচেষ্টা ছিলো। এবং আমাদের মহাকাব্যের জায়গা থেকে শুরু করে আমাদের উপনিবেশ ধরেছি, সেখান থেকে ‘হৃদয়লিপি’ আবার কিছুটা অন্যরকম। এখন ‘চর্যালোক’ নিয়ে কাজ করছি, দুই লাইনের ৪০০ কবিতা নিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করছি। দেখা যাক কী হয়, তবে প্রতিনয়তই নিজেকে যেভাবে চিন্তা করছি সেটা হলো, আগেরগুলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। হয়তো এভাবেই বৈচিত্র্য এসেছে।

 

আপনি নিজেকে বাংলা ভাষার উত্তরসূরি হিসেবে মনে করেন কিনা, আর কাউকে আপনার উত্তরসূরি হিসেবে মনে করেন কিনা?

এটা বাংলা কবিতার ধারাবাহিকতারই ফল। আমরা তো সবাই কাছ থেকেই নিচ্ছি, আলাদা করে কারো নাম বলতে পারবো না, তবে মির্জা গালিবকে আমার কাছের মনে হয়, কিন্তু তিনি শুধু প্রেমের পক্ষেই থেকেছেন, মানুষের পক্ষে দাঁড়াননি, আবার জীবনানন্দের একটা ব্যাপার হলো, তার পরে যারা লিখতে এসেছেন সবার মধ্যেই জীবনানন্দের একটা ব্যাপার রয়েছে, যদিও আমি সেখান থেকে বেরিয়ে গেছি। আর আমার পরের দশকে অনেকেই আছেন, বিশেষ করে যারা ছন্দে লিখছেন না।

 

ভাষা কি আমাদের দ্বিধায় ফেলেছে? মানে আমাদের কবিরা বুঝতে পারছেন না যে, এখন নতুন কোন ভাষায় লিখবেন। যেমন পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষা আর আমাদের বাংলা ভাষা পৃথক হয়ে গেছে, এটা মানতে হবে।

এখানে একজন বয়ঃজ্যেষ্ঠর একটা উক্তি বা তার সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে পাওয়া দুটি লাইন বলি—আমার আগে আমার মতো কাজ করেছেন দুজন, ‘মানুষের মানচিত্র’-তে রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং সৈয়দ শামসুল হক ‘পরাণের গহিন ভিতর’-এ—উনি বললেন, এরকম কাজ অঞ্চলিক ভাষায় পশ্চিমবঙ্গে বহু হয়েছে, কিন্তু আমি বিস্মিত হই, যিনি ছন্দ জানেন তিনি কীভাবে সাহস করতে পারেন এভাবে সবকিছু ভেঙেচুরে নিজের পূর্ববঙ্গীয় জায়গা তৈরি করতে। এখন সেটা কেউ নিচ্ছে কিংবা নিচ্ছে না, বা হয়ত ভবিষ্যতে নেবে।

একটা মজার ব্যাপার আছে, আমি খুবই বেদনাহত কণ্ঠে, এটা অবশ্য আমি লিখেওছিলাম বা উৎপলকুমার বসু লিখেছিলেন আমার উপরে, তিনি সেখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন : মানুষ চার হাজার বছর ধরে জানে যে, মিশরেই শুধু পিরামিড হয়েছে, কিন্তু যখন ফরাসিদের দ্বারা (বোধহয়) মায়াসভ্যতার পিরামিড আবিষ্কৃত হলো কোনোভাবেই পঞ্চাশ-ষাট বছর মানুষ সেগুলো নিতেই পারছিলো না। এবং দেখা গেলো মিশরের পিরামিডের কাছাকাছি সময়েই ওই পিরামিডগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, সুতরাং মানুষকে নিতে দিতে হলে কিছুটা সময় দিতে হবে। তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তুমি যা লিখেছো, লিখেছো।

 

মহাকাব্যের যুগ নেই, এই কথা কতটুকু সত্য? আর মহাকাব্য লেখার ইচ্ছে আপনার আছে কিনা?

শুধু মহাকাব্য বা তার যুগ নয় সবসময়েই ক্লাসিক ফিরে ফিরে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আসে, জীবনানন্দ তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী নয় কি? আল মাহমুদও তোমার প্রতিদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। আমিতো একসময়ে এরকম করে ভাবতাম, নব্বই দশকের প্রধান কবি জীবনানন্দ দাশ তারপর আমরা। ফলে আমি মনে করি, মহাকাব্য যদি কেউ লিখতে পারে সেরকম সার্থকভাবে তাহলে তার যুগ আছে, আপাতদৃষ্টিতে সেরকম ক্ষমতাবান কবি নেই বলে আমরা বলি মহাকাব্যের যুগ শেষ। আর আমার সবকিছু নিয়েই আগ্রহ আছে, মহাকাব্য নিয়ে স্বপ্ন অনেকদিন থেকেই জারি ছিলো।

 

শেষে একটা প্রশ্ন, বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ কী বলে আপনি মনে করে?

মানুষ বাংলায় যদি কথা বলে তাহলে আমার অক্তাবিও পাজের কাছে যেতে হবে—জনগণ যে ভাষার মধ্যে নিশ্বাস নেয়, যা ছাড়া সংযোগ স্থাপন করতে পারে না, কবিরা হচ্ছে সেই ভাষার প্রতিনিধি। কোনোদিন কবিতার মৃত্যু নেই। আমার কথা হচ্ছে, বাংলা ভাষায় যদি কথা বলা হয়, তাহলে বাংলা কবিতার যুগ শেষ হবে না।     

//জেডএস//

লাইভ

টপ