পরম্পরা

Send
কাজী মেহেদী হাসান
প্রকাশিত : ১৮:০০, এপ্রিল ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০০, এপ্রিল ২১, ২০২০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য১৮ আগস্ট, ১৯৪৬

ধর্মতলা, কলকাতা

জায়দা মা আমার, খুব খিদে পায় বুঝি তোর! তাই বুঝি এভাবে লাথি মারিস হাত ছুড়িস। মাফ করে দিস মা। মানুষগুলো যেদিন মানুষ হবে সেদিন পেটপুরে খেতে পাব আর তুইও তার ভাগ পাবি। ভাবলি যে তুই ছেলে না মেয়ে জানলাম কী করে? তোর বাবার ধারণা তুই মেয়েই হবি। জায়দা নামটা সেই ঠিক করে দিছে। দেশের অবস্থা ভালো না মা। রায়ট লাগছে। যদি দুনিয়ায় আসতে পারিস বুঝবি রায়ট কী। মানুষের চেয়েও ধর্ম বড়। নইলে যে বিমল, রতন, জগাদের নিজের ভাইদের মতো আদর করেছি তারাই কেন হামলা করবে অন্য লোকেদের সঙ্গে! তোর দাদুর দোকান জ্বালিয়ে দিয়েছে। তোর বাবা পালিয়ে আছে। বেঁচে আছে কিনা জানিনা। কত মানুষ যে মারা পড়ল। তুলসি কাকি আমাদের আগলে রেখেছে। তার রান্নাঘরে আছি। গতরাতে জাউভাত আর শুক্তোর বড়া খেয়েছি। জানিনা আবার কখন তুলসি কাকি খাবার এনে দেবেন সামনে। তারও যে গরিবানা হাল। সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে মা, দেশটা নাকি ভাগ হবে। তাও ধর্মের ভিত্তিতে। হিন্দুদের জন্য হিন্দুস্তান মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান। তাই যদি হয় তাহলে আমাদেরও পাকিস্তান যেতে হবে। চিঠি লিখে ট্রাঙ্কে রাখছি। যদি বেঁচে থাকিস আর দুনিয়াতে আসিস তাহলে একদিন পড়বি।

তোর মা

জয়নব

*****

২১ জুলাই, ১৯৭২

নয়াহাটি, যশোর

মা জাকিয়া, গত দুদিনে একটা দানাও পড়েনি পেটে। শুধু পানি খেয়ে আছি রে মা। কয়েকবার চুলা জ্বালাতে গেছি তখনই সাইরেন বেজে উঠেছে। সব আলো বন্ধ করে ঘরের মধ্যে সবাই আছি। সবাই বলতে আমি আর তোর নানু। সারাক্ষণ ভয়ে থাকি মা। আশেপাশের সবাই ইন্ডিয়া চলে গেছে। আমার যে অবস্থা যেকোনো সময় তুই এসে পড়বি দুনিয়াতে। নইলে ইন্ডিয়া চলে যেতাম। জানিস, তোর নানুর বাড়ি ইন্ডিয়া। দেশভাগের পর সবাই চলে এসেছিল। এখন সেসব বেহাত৷ তুই দুনিয়াতে আসলে খুশি হবি তোর বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। হরিনাহাটায় প্রশিক্ষণ নিয়ে গতমাসে দেশে ঢুকেছে। লুকিয়ে লুকিয়ে চিঠি দেয় তোর বাবা। শান্তি কমিটির লোকগুলো খুব জ্বালায় মা। আবার সাইরেন বাজছে। ব্লাক আউট। কুপি বন্ধ করতে হবে।

তোর মা

জায়দা

******

২৬ অক্টোবর, ২০২০

মিরপুর, ঢাকা

জেসিয়া, মা আমার। উদরেই থাক মা। বাইরে আসিস না। বাইরে বিষ। কী এক বিমর্ষ ভয়াল থমথমে পরিবেশ। খুব অচেনা লাগে। রাতের আঁধার কেটে সূর্য ওঠে ঠিকই কিন্তু আলোর ফোটনকণা যেন হারিয়ে যায় অজানা এক কৃষ্ণগহ্বরের টানে। রাশি রাশি অন্ধকার। বেরোতেও ভয় লাগে। মনেহয়, গলির মুখে ওতপেতে আছে মৃত্যুদূত। কোনোমতে গোজামিল দিয়ে দিন পার করে রাত নামলে হাফ ছেড়ে বাঁচি। ‘যাক বাবা, একটাদিন তো বাঁচলাম’। এমন দিন তো চাইনি কখনো।

করোনায় সারাবিশ্বে লাখ পনেরো লোক মারা গেছে। আমাদের দেশে সোয়া লাখ হবে। এখন আর খবর নেইনা। বসে বসে মৃত্যুর প্রহর গুনি। চারদিক সুনসান। সিটি করপোরেশনের গাড়ি সকালে দরজায় খাবার ফেলে দিয়ে যায়। বাসায় লোক বেঁচে থাকলে ভেতরে নেয়। নইলে পরের দিন ওরাই আবার তুলে নেয়। ঢাকায় কুকুরগুলোও বেঁচে নেই। সামনের অ্যাপার্টমেন্টে কবির আঙ্কেল বেঁচে ছিলেন। দুইদিন ধরে দেখি তাদের খাবারের বাক্সও ওঠায় না কেউ। মনে হয় কেউ বেঁচে নেই। টোলারবাগের সি ব্লকে শুধুমাত্র আমরাই বেঁচে আছি। বাসায় আমি আর তোর বাবা। বাকিরা গ্রামে গেছে। পায়ে পানি এসেছে। মর্নিং সিকনেসও বাড়ছে। হাসপাতালগুলো করোনা ছাড়া চিকিৎসা দিচ্ছে না। আর যেতেও ভয় লাগে।

তোর নানা মুক্তিযোদ্ধা ছিল। জয়লাভ করেছে। কিন্তু করোনা যুদ্ধে আমাদের রসদ নেই মা। চিঠি লিখে গুগল ড্রাইভে রাখছি। দুনিয়াতে আসতে পারলে পড়তে পারবি।

ইতি

তোমার মা জাকিয়া।

/জেড-এস/

লাইভ

টপ