জাদুবাস্তবতা | ফ্রানৎস রোহ | শেষ পর্ব

Send
অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ১৪:৫২, মে ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:৫৩, মে ০৯, ২০২০

শিল্পের নতুন আধার

আগেই যেমনটা ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, উনবিংশ শতকের ইন্দ্রিয়গ্রাহী বাস্তবতার শিল্পীরা এই নতুন শিল্পধারার চিত্রকলাকে নকশাভিত্তিক, বুদ্ধিসৃষ্ট, নির্মিত, নির্জীব, ইত্যাদি বলে সমালোচনা করেছেন। আসলে যে ঘটনাটি ঘটেছে তা হলো শিল্পের বা চিত্রের আধার (space) বিষয়ক ভাবনা পাল্টে গেছে। এই পরিবর্তন বোঝার জন্য আমরা সর্বশেষ ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিংগুলো একটু তুলনায় আনবো। ইমপ্রেশনিস্টরা চিত্রের আধার বা স্পেস বলতে বুঝতেন বায়ুময় পুরো আকাশটি। এজন্য তাঁদের চিত্রে থাকতো একটা গতিময় বাতাসী ভাব, রঙটা যেন বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাঁদের ছবিতে তাই রঙের একটি বায়বীয় খেলা আছে। তাদের ছবির স্পেস দেখে মনে হয় পুরো দুনিয়াটা যেন রঙের এক নেকাব। এভাবে তাঁদের ছবিতে স্পেস হলো একটি ছড়িয়ে পড়া রঙের সমতল। আঙ্গিক ও রঙে তুলে ধরা মূল বস্তুটি তখন একটি রঙের সমতলে ভাসতে থাকা কোনো বস্তু মনে হয়। তখন বলা কঠিন হয় স্পেসে আটকে দেয়া রঙ ও আঙ্গিককে ক্যানভাসে প্রক্ষিপ্ত করেছে যে বস্তুটি সেটি কি স্পেসের পিছন থেকে নাকি প্রোজেকশন স্ত্রিনের সামনে থেকে এটি করছে। এভাবে ইমপ্রেশনিজমের যুগে অনেক কথা হয়েছে চিত্রের দৃশ্যপট (Visual Plane) নিয়ে। এই আলোচনার অনেক কিছুই এসেছে সমসাময়িক ক্লাসিসিজমের ভাবনাস্রোত থেকে (Fiedler, Hildebrand)। এক্সপ্রেশনিজমের আবির্ভাবের পরে চিত্রের উপরিতলের এই বিষয়াদির অর্থ কমে গেল। চিত্রের আধার বা স্পেসের বিষয়টি তখন অন্য অর্থ নিয়ে এলো। তখন চিত্রকরদের কাছে গভীরতা বড় হয়ে উঠলো। তাঁরা ছবিতে সবকিছু দেখাতে শুরু করলেন এমন একটি কোণ থেকে যে, কাছের জিনিসগুলোও খুব দূরের ও খর্বাকৃতির মনে হতে লাগলো। ইমপ্রেশনিজম ও ইমপ্রেশনিস্ট ক্লাসিসিজম উভয় ক্ষেত্রেই ক্যানভাসের কাজ ছিলো চিত্রের উপরিতলকে প্রসারিত করে তোলা। কিন্তু এক্সপ্রেশনিজমের আবির্ভাবের পরে সেই ক্যানভাসকে গভীর করে তোলার প্রয়াস হলো, ক্যানভাসের ভিতরভাগ প্রসারণের চেষ্টা চললো যাতে তার ভিতরে চড়াই-উৎরাইয়ের বৃহৎ স্পেস তৈরি হয়। কিন্তু সব সময়ই সন্নিহিত স্পেস আক্রমণ করলো দর্শকের নিকটস্থ ফোরগ্রাউন্ডের গভীরতাকে। এছাড়াও দূরে অবস্থিত মর্মে ভাব জাগানো দৃশ্যপট মনে হলো দূরে সরে না গিয়ে সামনে এগিয়ে আসছে। তবে দূরে অবস্থিত মর্মে ভাব জাগানো দৃশ্যপটের প্রতিটি ফিগারকে দেয়া গিয়েছিল এক একটি আলাদা গতিপথ। এই অবস্থা থেকেই বিশুদ্ধ এক্সপ্রেশনিস্ট পেইন্টিঙে আবির্ভূত হয়েছিল একটি হিংস্র ও রাগী অঙ্কনশৈলী।

একটি চিরায়ত ক্লাসিক অবস্থান গ্রহণ করে এই নব্য শিল্পধারা ইতিহাসের উপরোক্ত তিনটি ধারার বা সম্ভাবনার সমন্বয় সাধনের প্রয়াস পেয়েছে। শ্রেষ্ঠ ল্যান্ডস্কেপগুলোয় তুলে ধরা হয়েছে একটি অনড় ও ধ্রুব উপরিতল যার সঙ্গে প্রযুক্ত হয়েছে একটি সামনে-মুখো গতি। সঙ্গে দূরত্ব বোঝানোর কারিগরিও রয়েছে। এভাবেই বৃহৎ ও ক্ষুদ্রের সহাবস্থানের আনন্দও নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ নিকট ও দূরের সহাবস্থান এখানে রয়েছে। শুধু সহাবস্থান নয়, একেবারে একে অপরের মুখোমুখি হয়ে অবস্থান। এমনটা ইমপ্রেশনিজমে ছিলো না। ইমপ্রেশনিজমে এটা ছিলো একটা মধ্যবর্তী পর্দাসমেত, যে পর্দা রচিত হয়েছিল বায়বীয়তা, দ্রবীভূত হিসেবে একে অপরের মধ্যে মিশে যাওয়া ইত্যাকার উপায়ে। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকীয় কায়দায় এই নতুন ল্যান্ডস্কেপগুলো সামনের দিকে বেশ গতিময়, আবার একই সঙ্গে দূরের দৃশ্যপটের ফিগারগুলোর মধ্যে দূরে হারিয়ে যাওয়ার আবহও রয়েছে। এখানে দৃশ্যটি অনেক দূর থেকে পাখির মতো দেখা হচ্ছে এমন একটি ভাব আছে, যা দৃশ্যটির অর্থের দ্বৈততার যোগান দেয়। এই ভাবটা এক্সপ্রেশনিজমে ছিলো কিন্তু ইমপ্রেশনিজমে ছিল না কারণ এটা ছবির সমতলকে তারা যেভাবে দেখতে চায় সেভাবে দেখতে দেয় না। এক্সপ্রেশনিস্টরা কোনো এক পর্যায়ে তাঁদের এই বৈশিষ্ট্যটি লক্ষ্য করেছিলেন বলে তাঁরা গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন যে, তাঁরা জানেন কীভাবে দূরের দৃশ্যকে দৃষ্টিতে নিবদ্ধ করতে হয় এবং একই সঙ্গে তাঁরা জানেন কীভাবে বাস্তবভাবে দৃশ্যে প্রবেশ করতে হয়। তাঁদের এ কথা দ্বারা বোঝা যায় বস্তুতে প্রবেশ করতে পারাকে তাঁরা অনেক আনন্দের একটা সফলতা রূপে দেখেছিলেন। বস্তু তাঁদের ছবিকে একটি বাস্তবের আধারে পরিণত করতে পেরেছিল এবং ছবির স্পেসটি আহ্বান করছিল পরিদর্শকের পদচিহ্ন। এই ল্যান্ডস্কেপ দেয়ালে রাখলে তা দেয়াল থেকে লাফ দিয়ে নেমে আসতে চায় না যেমনটা Hans von Marées-এর ল্যান্ডস্কেপ চায়।

শিল্পকলা বারবারই চেয়েছে একটি দৃশ্যাধারের সম্পূর্ণ আয়তনকে চিত্রিত করতে। ত্রিমাত্রিক আঙ্গিক ব্যবহারের মাধ্যমে এই চিত্রায়নকে শিল্পী অনুভবযোগ্য করে তুলতে চান। গথিক পেইন্টিং সম্প্রসারণকে ঊর্ধ্বমুখী করতো। রেনেসাঁস শিল্প এই সম্প্রসারণকে আনুভূমিক করতো। আর উল্টো করে বারোক রীতিতে এই সম্প্রসারণের চেষ্টা হয় চিত্রতলের অন্তস্থ গহ্বরের মধ্যে। অন্যদিকে, পঞ্চদশ শতকীয় চিত্রকলায় একটি মোহনীয় বিষয় ছিল যেটি নিয়ে এখন খুব আলোচনা হয় না। সেটি হলো এ সময়ের শ্রেষ্ঠ সব চিত্রে চিত্রতলের গভীরতা আর স্পেসের সম্প্রসারণ একই চিত্রে সহাবস্থান করতো। এই সহাবস্থান একটি উঁচুমাত্রিক অর্থ-তীব্রতা প্রদান করে, যা একদিকে রাফায়েল এবং তিশান (ইতালিয়ান চিত্রকর Tiziano Vecellio)-এর যুগ এবং অপরদিকে উনবিংশ শতকের শিল্পকলার যুগ-উভয়ের বিপরীতে এক স্বাতন্ত্র্য নিয়ে দাঁড়ানো। উক্ত উভয় যুগে চিত্রতলের বিষয়ে অনেক নিয়মকানুন মানা হয়েছে কিন্তু তা দিয়ে চিত্রের অর্থে কোনো ঋদ্ধি ঘটেনি। আজ আবার চিত্রতলের গভীরতা আর চিত্রের গতিমুখ নিয়ে শিল্পীরা অনেক সচেতন ও অনুভূতিপ্রবণ হচ্ছেন। এই প্রবণতা উত্তর-অভিব্যক্তিবাদের এক স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য।

যেমনটা বলেছি, আনুভূমিক সম্প্রসারণ ও চিত্রতলের গভীরতার বৃদ্ধি—এই দুই ক্ষেত্রেই এক্সপ্রেশনিজমের লক্ষ্য ছিল একটি গোপন জ্যামিতি। এর সুবাদেই এক্সপ্রেশনিজম এখনো হারিয়ে যায়নি।

 

প্রকৃতির ক্ষুদ্র সংস্করণ

বস্তুর প্রতি নিগড়বদ্ধভাবে নিবেদিত হওয়ার অনেক অর্থ আছে। একটি অর্থ হলো—এই শিল্প সবসময় প্রকৃতির একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ নিয়ে চিন্তা করে। এর চেষ্টা হবে প্রকৃতির বস্তুটি সম্পর্কে দর্শককে একটি আনন্দময় অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করা, এ কথা মনে রেখে যে, দর্শক প্রকৃতিতে বস্তুটি গূঢ়ভাবে দর্শনের সময় পায়নি এবং সে হয়তো এসব বিষয়ে একটু অনাগ্রহী ধরনেরই কোনো লোক।

প্রকৃতির ক্ষুদ্র সংস্করণ বলতে আমরা বোঝাচ্ছি যে, এটি হবে ছোট এক চিত্রতলে সূক্ষ্ম ও বস্তু-অনুরূপ একটি চিত্র। এর অপরিহার্য ও চূড়ান্ত বৈশিষ্ট্য হলো বহিরাঙ্গিক মাত্রায় এর প্রয়াস হবে বৃহৎকে ক্ষুদ্র আঙ্গিকে ধারণের। চিত্রতল সংকীর্ণ বিধায় এ ধারার অন্তস্থ দায়ই রয়েছে সকল উপস্থাপিত বস্তুর মধ্যে ক্ষুদ্রতায় প্রকাশিত হওয়ার এক আকুতি সৃষ্টি করার। এটি মিনিয়েচার বা ক্ষুদ্র সংস্করণের বহিস্থ ও অন্তস্থ উভয়বিধ বৈশিষ্ট্য। অন্তস্থ আয়োজনে শিল্প মিনিয়েচার হয় এমন একটি উদাহরণ হলো জার্মান শিল্পী আলব্রশট আল্টদোরফের (Albrecht Altdorfer)-এর পেইন্টিং ‘ব্যাটল অব আলেক্সান্ডার’। এখানে চেষ্টা রয়েছে ‘অসীম’ বা ইনফিনিটিকে সীমায়িত করে একটি ক্ষুদ্র চিত্রতলে ধারণের। প্রকৃতির ক্ষুদ্র সংস্করণে এমন প্রকাশের প্রণোদনা বীজ নেয়া হয়েছে জগৎকে স্বজ্ঞায় ধারণের বিশেষ এক দার্শনিক পথ ও প্রতীতি থেকে। এটা প্রযোজ্য হতে পারে শিল্পের অন্যান্য শাখায়, বিশেষ করে সঙ্গীতেও। এর বিরুদ্ধ রূপ জীবনের অন্য এক প্রতীতি যার দ্বারা তাড়িত হয় কাঠামোভিত্তিক স্থাপত্য বা ভাস্কর্য শিল্প। সেই প্রতীতিও শিল্পের সকল শাখায় প্রযোজ্য হতে পারে। বৃহৎরূপী কাঠামোভিত্তিক শিল্পকে যে সবসময় বহিরাঙ্গিক স্থাপনা জাতীয় স্থাপত্য বা ভাস্কর্য শিল্প হতে হবে তা-ও সর্বত্র নয়। ডাচ শিল্পী Johannes Vermeer-এর কর্ম ‘The Lacemaker’ যেমন একটা বেশ ছোট চিত্রকর্ম, যার আকার একটি থালার চেয়ে বড় নয়, অথচ সেই থালার মধ্যে যে পোস্টারটি রয়েছে তাকে মনে হবে একটি ভবনের মতো বিশাল। ফলে ‘মিনিয়েচার’ এবং ‘মনুমেন্টাল’ হলো দুটো মেরু যা চিত্রশৈলীর দুই প্রান্তে অবস্থান করে এবং চিত্রশৈলী যাদের কখনো অতিক্রম করতে পারে না। ফলে তাদেরকে বুঝতে হবে তাদের পরিচয়েই। Johannes Vermeer এঁকেছেন একটি ছোট বস্তু, একটি আবক্ষ নারীমূর্তি, আর Albrecht Altdorfer এঁকেছেন এক বিশাল যুদ্ধক্ষেত্র দূরের পাহাড়ের পটভূমিসহ। এখানে ব্যবহৃত নান্দনিক কারিগরি বুঝতে হলে এটা বলাই যথেষ্ট নয় যে, ‘মনুমেন্টাল’ চিত্রের শিল্পী দর্শকের দেখার নিকটতম বিন্দুটি খোঁজেন, আর ‘মিনিয়েচার’ শিল্পী খোঁজেন দূরের দৃষ্টিরেখাটি। এর চেয়েও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বলার বিষয় হলো—মনুমেন্টাল শিল্পী ফিগার বা মুখাবয়বগুলো বড় বড় গ্রুপে উপস্থাপন করেন, আর মিনিয়েচার শিল্পী চান ভেঙ্গে ভেঙ্গে যত সম্ভব ক্ষুদ্র করে ফেলা হোক এই গ্রুপ। যখন মিনিয়েচার শিল্পীর সামনে অনেক বস্তু না থাকে, যেমন পত্র-পল্লবের ঝোপ কিংবা মানুষের আদিগন্ত ঢল, তখন তিনি চিত্রের ফোরগ্রাউন্ডকে বিচ্ছিন্ন করেন এবং বিভক্ত করেন।

আধ্যাত্মিকতাপন্থি চিত্রকলায় যখন ক্ষমতাবান কিছুকে উপস্থাপন করা হয় তখন তা ব্যঙ্গচিত্রে পরিণত হয়ে যায় এর অতিরিক্ত গুরুত্ব-ধারণ প্রচেষ্টার কারণে এবং এর দুর্বোধ্যতা ও নীরসতার কারণে। অন্যদিকে যে ছবিগুলোয় ক্ষুদ্র ও তুচ্ছকে উপস্থাপনের চেষ্টা হয় অনেক অর্থ বহনের জন্য সেগুলোও এক বিরক্তিকর তুচ্ছতার দিকে আমাদেরকে আমন্ত্রণের চেষ্টা করে যা আমাদের মনোযোগকে সংহত না করে বরং বিক্ষিপ্ত করে দেয়। পূর্বের সফল শিল্পযুগগুলোয় এই দুই আশঙ্কাকেই আমরা একত্র হতে দেখেছি, যেমন দেখেছি গথিক যুগ যখন গিয়ে রেনেসাঁসে মিশেছে সেই স্বর্ণযুগেও। এক্সপ্রেশনিজমের আগ্রহ মনুমেন্টাল শিল্পের দিকে। পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজমে এসে আমরা প্রথম মিনিয়েচার ও মনুমেন্টাল—এই দুই প্রবণতার এক সফল সমন্বিত প্রবাহ দেখলাম। তবে এ দুয়ের বিরোধ একেবারে শেষ হয়ে গেছে তা নয়। পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম কোনো বিভক্তি রেখা ধারণ করে না যা এই দুই প্রবণতাকে আলাদা করে দেখাবে, বরং চেষ্টা করে উভয়কে একত্রে বুননের। বড় কম্পোজিশনগুলোয় তাই দেখা যায় ক্ষুদ্রকে নির্দিষ্ট বিরতিতে শৈল্পিকভাবে প্রোথিত করা হয়েছে। অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে অবশ্য এই নতুন শিল্পধারায়ও দুয়ের বিরোধ দৃশ্যমান আছে। জার্মান চিত্রকর গেয়োর্গ শ্রিম্পফ (Georg Schrimpf)-কে দেখা যায় তিনি খুব রূক্ষ ও রাগতভাবে বিশাল বপুগুলোকে ঘাসের ক্ষুদ্রতার ওপর ধাক্কা মেরে ফেলে দেন এবং এভাবে ঘাসের ক্ষুদ্র পত্রাদির সঙ্গে বিশাল বপুর মানুষগুলোকে তুল্যার্থে পাশাপাশি উপস্থাপন করেন। আবার, একজন শিল্পী দর্শকের দৃষ্টিবিন্দুতে অত্যন্ত কাছে টেনে আনা একটা বস্তুকে দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন দর্শকের দৃষ্টিবিন্দু থেকে অনেক দূরে রাখা ক্ষুদ্রতায় ঢাকা বস্তুনিচয়ের সামনে, যেমনটা করতে পছন্দ করতেন পঞ্চদশ শতকীয় দক্ষিণ ইতালির শিল্পীরা। এ সময়টায় শেষ গথিক যুগের শিল্পীদের অনুপুঙ্খ বস্তুবয়ান খুশিচিত্তে মিশে গিয়েছিল ভারী আয়তনের রেনেসাঁস বস্তুর সাথে।  

ক্ষুদ্রতার অনুপুঙ্খ বস্তুবয়ান শক্তির কী প্রকাশ ঘটাতে পারে তা দেখানোর জন্য প্রকৃতি থেকেই একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। উদাহরণটি হলো তারাভরা আকাশের একটি রাতের দৃশ্য। এক বিশাল ক্যানভাসে বিভিন্ন গভীরতায় প্রোথিত অজস্র আলোকবিন্দু।

সত্যের নির্মাণে বিশ্বাসী নির্মাণবাদীরা (Constructivist) এবং সত্যের বস্তুগত অস্তিত্বে বিশ্বাসী প্রমাণবাদীরা (Verist)—উভয়েরই খুব আগ্রহ খুঁতহীনতা ও বিশুদ্ধতার প্রতি। এ কারণে বিষয়বস্তু বিমূর্ত হওয়ার পরেও Joseph Fernand Henri Léger,  Lyonel Charles Feininger, Oskar Schlemmer প্রমুখের চিত্রে দেখা যায় চক্ষুভেদী, অনুপুঙ্খ এক কাঠামো, যা এক্সপ্রেশনিজমের প্রথম পাঁচ বছরে অন্তত দেখা যায়নি। পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম থেকে এই প্রবণতার পার্থক্য বুঝতে হবে। পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম এটাকে ব্যবহার করেছে বাহিরের বস্তুজগৎ চিত্রে যে পুনঃসৃষ্টি হচ্ছে সেই ধারণাটি স্পষ্ট করতে; বিশুদ্ধতা, বৈভব ও অবিকলতা অর্জন করতে।

এক্সপ্রেশনিজমে দুই ধরনের মিনিয়েচার পুরো বিপরীত দুই ধরনের অর্থ বহন করে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় পরে কখনো আসবো, তবে এখানে একবার স্মরণ করিয়ে রাখা গেল। জার্মান চিত্রকর George Grosz I Otto Dix-এর মিনিয়েচার চিত্রে এক ভয়ঙ্কর দুনিয়াকে খুব স্থূলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এর মধ্যে তখনো কোনো রাজনৈতিক আক্রমণ ঢোকেনি। এ জাতীয় মিনিয়েচারে রাজনৈতিক আক্রমণ ঢুকেছে পরে। তখন একই সঙ্গে সমাজের শয়তানের চেহারাগুলো এখানে তোলার প্রয়াস এসেছে। তুলে ধরা হয়েছে সমাজের বিত্ত ও ক্ষমতাশালীদের (bourgeoisie) নাকের ডগায় যাতে তাদের দৃষ্টি না এড়ায়। বিপরীতে জার্মান চিত্রকর Georg Schrimpf, Walter Spies প্রমুখ জয়গান গেয়েছেন নিত্যদিনের আন্তরিক বিষয়গুলো নিয়ে। তাদের কাছে পৃথিবী তখনো এক মুঠো ঘাস, একটি পিঁপড়ার ঢিবি। তাঁরা তখনো পৃথিবীর ক্ষুদ্রের মাঝে হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর সুন্দরকে খুঁজছেন।

একটি কঠিন বিচারের বিষয় এই সবের ওপরে ঝুলে আছে। সেটি হলো ক্ষুদ্রের প্রদর্শনে আবশ্যিকভাবে সংশ্লিষ্ট থাকে আধ্যাত্মিক ক্ষুদ্রতা। আমরা মনুমেন্টাল শিল্পের উদাহরণে ইতোপূর্বে জার্মান শিল্পী Albrecht Altdorfer এর পেইন্টিং ‘ব্যাটল অব আলেক্সান্ডার’-এর কথা উল্লেখ করেছি। চিত্রটিকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হাজার টুকরায় বিভক্ত করলেও এখন এর যে চূড়ান্ত ও নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে মাইকেল এ্যাঞ্জেলোর ‘দি লাস্ট জাজমেন্ট’ ছবির ধারায় সেই অর্থই রয়ে যাবে। বিজ্ঞানে এমনটিই ঘটে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যেই গঠন, পরমাণুরও সেই গঠন। ফলত উভয় গোছের মিনিয়েচারিস্ট চিত্রে (যেগুলো দুনিয়ার প্রতি অনুরাগ জন্মায় আর যেগুলো দুনিয়ার প্রতি ভীতি জন্মায়) ক্ষুদ্র জিনিসের অসীমতার প্রতি অর্থাৎ অনুবিশ্বের প্রতি একটি ঝোঁক রয়েছে। ফলে এই বৈশিষ্ট্য দিয়ে ইমপ্রেশনিজম বা এক্সপ্রেশনিজম নির্ধারণের বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। যে বৈশিষ্ট্যগুলো অস্থায়ী এবং নড়বড়ে সেগুলোর উপর ভিত্তি করে অণুবিশ্বের প্রতি ঝোঁকের বিষয়কে ছোটো করে দেখা ঠিক হবে না, Albrecht Dürer যেমন এমন বৈশিষ্ট্যকে ‘ছিদ্রান্বেষণ’ (nitpicking) মর্মে সমালোচনা করেছেন। সত্যিকার অর্থে এটি ছিদ্রান্বেষণ নয় বরং ধীর পায়ে এ এক দর্শনীয় প্যারেড যার লক্ষ্য হলো নতুন গভীর কোনো অর্থে পৌঁছানো।

নতুন এই শিল্প ধারার সঙ্গে এক্সপ্রেশনিজমের একটি মিলের জায়গা হলো উভয়ই বিশাল বিস্তৃতিকে চিত্রে ধারণ করে। তবে এক্সপ্রেশনিজমে এটাই ছিল সার্বিক চেষ্টা আর পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজমে এর মধ্য দিয়ে পথ উন্মোচন করা হয় অনুপুঙ্খতার অভিব্যক্তির দিকে। আজ আবার এসেছে সেই শেষ মধ্যযুগীয় চিত্রের দিন যেখান থেকেই এক্সপ্রেশনিস্টরা নিয়েছিলেন বৃহদায়তন চিত্রের জ্যামিতিক পরিকল্পনা। চার্চে ঢুকতেই বেদীর গানের দৃশ্যের ছবিটা একশো হাত দূর থেকে এর অর্থ নিয়ে আগাতে থাকতো। ধীরে ধীরে দূরত্ব কমে আসতো এবং ছবির অনুপুঙ্খ বিস্তার ক্ষুদ্রের বিন্যাস নিয়ে ভাস্বর হতে থাকতো। সেই অনুপুঙ্খতার বিন্যাস বহন করতো জগতের সব আধ্যাত্মিকতা আর সেই অনুপুঙ্খতা থাকতো একটি বড় কাঠামোর অধীন ক্ষুদ্রতার বিন্যাসে। এভাবে অনুপুঙ্খতার বিন্যাস, জাগতিক পারস্পরিক সম্পর্কের এক সাংগঠনিক বিন্যাস, তৃপ্ত করতো দর্শকের চোখ। আজ আবার এসেছে সেই দিন। পোস্ট-এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রের অর্থও তেমনি প্রকাশিত হয় ধীরে ধীরে অনেক আয়োজনে, তারপর যখন পুরো আয়োজনটি হৃদয়ঙ্গম হয় তখন এক বিরল আনন্দে অন্তর উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, যে বিশুদ্ধ নান্দনিক আনন্দ আদর্শিক বিমূর্ত চিত্রকলাও কখনো উপহার দিতে পারেনি। ইমপ্রেশনিজম ও এক্সপ্রেশনিজম উভয়ই চেষ্টা করেছে এক উদ্দীপনাময়ী, বিস্ময়কর ও গূঢ়ার্থসম্পন্ন চিত্রকলা সৃষ্টির যা মানুষের মধ্যে জাগাবে কল্পনার বিস্তার এবং তার যাপিত জীবনের সংসর্গবোধ ও সৃজনশক্তি। আর পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম বা এই নতুন ধারার শিল্প দর্শককে প্রদান করতে চেয়েছে একটি সম্পূর্ণ ও সম্পন্ন সৃষ্টি যা অভ্যন্তরে অনুপুঙ্খ এবং যা আমাদের যাপিত জীবনের খণ্ড ক্ষুদ্রতার বিপরীতে সমগ্রতার এক আর্কেটাইপ। এ ধারায় মানুষ একদিন নিজেকেই সৃষ্টি করতে পারবে পূর্ণাঙ্গতায়।

আরও পড়ুন : জাদুবাস্তবতা | ফ্রানৎস রোহ | পর্ব-৩

[ঘোষণা: আগামী শুক্রবার থেকে মুহম্মদ মুহসিনের অনুবাদে আলেহো কার্পেন্তিয়ের 'লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা' ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে]

//জেডএস//

লাইভ

টপ