জাদুবাস্তবতা | ফ্রানৎস রোহ | পর্ব-৩

Send
অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ০০:০১, মে ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০১, মে ০১, ২০২০

বস্তুর বাঙময়তার বিষয়ে আমার এ কথা ইতালিয়ান ফিউচারিস্ট আর্টিস্ট Gino Severini, Umberto Boccioni, Carlo Carrà  প্রমুখ ইতোমধ্যেই স্বীকার করেছেন। তাঁদের চিত্রে আমরা দেখি বিমূর্ত কম্পোজিশনের কতিপয় এলোমেলো আঁচড়ের মধ্যে সেখানে হঠাৎ আবির্ভূত হয় এক বস্তুরূপ, সৃষ্ট হয় এক বস্তুর অনুকৃতি, আর পর মুহূর্তে হারিয়ে যায় সে বস্তু। এমন হঠাৎ আবির্ভূত হওয়া আবার হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে বস্তুটি কোনো অর্থময়তা ধারণ করে বলে অনেকেই মনে করেন না। তবে অস্বীকার করা যায় না যে, সুর না হোক অনন্ত বে-সুরের মধ্য দিয়ে হলেও এর একটি অর্থপ্রভাব থেকে যায়। ফিউচারিজমে বিমূর্ততার মাঝে হঠাৎ করে বস্তুর অনুকৃতি যে অলৌকিকতা দেখিয়ে যায় সেটিই পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম তাড়াহুড়োহীন স্থিরতায় ধারণ করে। চিরন্তনভাবে গতিময় ও স্পন্দনময় বস্তুকণার সে এক অসীম অলৌকিকতা। প্রাণময় বস্তুকণার সেই প্রবাহের মধ্য দিয়ে, তার বস্তুরূপের অন্তহীন আগমন-নির্গমনের মধ্য দিয়ে, পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজমে স্থিত হয় বস্তুর শাশ্বত রূপ। এটি একটি শৈল্পিক অলৌকিকতা যার মাধ্যমে একটি অস্থির আলোড়ন একটি স্থির প্রতীতির ধ্রুবকে পরিণত হয়। বস্তুকণার ভূতুড়ে এই প্রবাহের মধ্যে বস্তুরূপের স্থায়ী স্থিতির অলৌকিকতা, বস্তুর চিরন্তন হয়ে ওঠা আর হারিয়ে যাওয়ার মাঝখানে বস্তুর স্থিতির এই রহস্যময়তা, চিত্রকলায় পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম লালন করে এবং এর জয়গান করে। এক্সপ্রেশনিজম কর্তৃক বস্তুর স্থায়ী বস্তুরূপকে বা স্থায়ী বস্তুরূপের পৃথিবীকে বস্তু হিসেবে না নিয়ে প্রতীক হিসেবে নেয়ার কারণ হলো এর মধ্য দিয়ে বস্তুর হয়ে ওঠা আর হারিয়ে যাওয়ার প্রবাহকে সে বন্ধ করতে চায়। পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম আলোর সামনে এক টুকরা কাচ দাঁড় করায় আর তারপর বিস্মিত হয়ে দেখে যে কাচটি গলে যাচ্ছে না অর্থাৎ হারিয়ে যাচ্ছে না, কাচটি অন্য কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে না, সে আলোকে দেখার সুযোগ করে দিয়েই আলোর সাথে চিরন্তনতা পেয়ে যাচ্ছে। ডানপন্থী বা বামপন্থী রাজনীতিকরা পর্যন্ত হয়ে ওঠা আর নাই হয়ে যাওয়ার মাঝের এমন স্থিতিকে সমাজের নীতি বা নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। এ স্থিতি বস্তুর অন্তস্থ জাড্য থেকে নয়, বরং বস্তুর জীবন থেকে আহরিত, যা বার্গসঁ কথিত রূপপরিবর্ততের ইলান ভাইটাল (Elan Vital) তত্ত্বও আটকাতে পারে না। ফলত, শিল্পধারার এই নতুন আন্দোলন যাকে বলা হচ্ছে পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম, আবার যার নাম দেয়া যেতে পারে নব্য বস্তুময়তার আন্দোলন, এটি বস্তুময় পৃথিবীর প্রতি শুধু শ্রদ্ধা জানানোর কোনো আন্দোলন নয়, বরং এ আন্দোলন চিত্রকলায় পাশাপাশি তুল্যার্থে স্থাপন করে আত্মাকে ও বস্তুকে, এবং তাদেরকে বুঝতে দেয় তাদের বৈপরীত্যের বিচারে এবং আকর্ষণ-বিকর্ষণের বিচারে। এরপর আত্মা ও বস্তু সেই তুলনার নিরিখে বিশ্লেষণী জ্যামিতিবিদ্যার নিয়মে কোনো কোঅর্ডিনেট সিস্টেমে প্রবেশ করবে কিনা তা নির্ভর করবে দর্শকের ইচ্ছা শক্তির প্রয়োগের ওপর। এক্সপেশনিজম অনেক চেষ্টা করেও আত্মাকে বা আধ্যাত্মিকতাকে এভাবে উন্মুক্ত অঙ্গনে স্পষ্ট করে দেখাতে পারেনি। শেষে এক্সপ্রেশনিজম আত্মার কাঠামোতে স্থিত দুনিয়াকে ভেঙ্গে-চুরে দিতে চাইলো, আত্মা তার কাঠামোকে সেভাবে ভাঙতেও দিলো না। অন্তত নব্য বাস্তবতাবাদ (New Realism) এবং আদর্শিক বাস্তবতাবাদ (Ideal Realism)-এর ব্যাখ্যায় এক্সপ্রেশনিজমের স্বরূপ এই। নব্য বাস্তবতাবাদ বলে যে, মানুষের সকল মৌলিক অনুভবের দিকে তার অনুধ্যান চালিত করার বিষয়ে এক্সপ্রেশনিজম ব্যক্তিবাদী ভাবনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। তবে সামষ্টিক প্রাতিস্বিকতা থেকে সে নিজেকে সরিয়ে নেয়নি। কারণ, পৃথিবীর আন্তসামঞ্জস্য পুরোটাই অবনমিত হয়ে প্রবেশ করেছে সামষ্টিক প্রাতিস্বিকতাবোধের গতি ও ছন্দের ভিতরে।

তুলনায় কিউবিজমকেও আনা যেতে পারে। কিউবিজম চিত্রায়িত করেছে চিত্রের ত্রিমাত্রিক আঙ্গিক-পূর্ব রূপ, আদি ত্রিমাত্রিক আঙ্গিক, মনুষ্য অনুভূতির রূপ এবং একই সাথে অনুভূত বস্তুরূপ। পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম বা নব্য বস্তুময়তার কম্পোজিশনের কারিগরির নির্দিষ্টতা থেকে চোখ না ফিরিয়েও বলা যায়, এই নতুন আন্দোলন বাস্তবতাকে চিত্রিত করতে চেয়েছে ঠিক যেভাবে আছে সেভাবে, কোনো আবেগতাড়িত বা আধ্যাত্মিক শক্তিতে ঋদ্ধ তুলির আঁচড়ে সৃষ্ট বাস্তবতা রূপে নয়। শিল্পের এ নতুন ধারা দৃঢ় নোঙরে অবস্থান করছে দুই চরমের মাঝে, একদিকে রয়েছে ধোঁয়াশা এক ইন্দ্রিয়গ্রাহিতার বস্তুজগৎ, অপর দিকে রয়েছে অতি নিখুঁত নকশায় আঁকা কোনো বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার জগৎ। শিল্পের এ নতুন ধারামতে, সত্যিকারের দর্শন নিহিত রয়েছে অতি সরল বাস্তবতাবাদ আর অতি উচ্চকিত ভাববাদের মাঝে।

বস্তু জগতের প্রতি এই নতুন শিল্প ধারার অবস্থান আরো স্পষ্ট করে তুলতে আমরা আরও একটি তুলনাচিত্রে উপস্থাপন করতে পারি—কেমন এর সম্পর্ক ধ্যানী ও জ্ঞানী মানুষের সাথে এবং কেমন এর সম্পর্ক কর্মী মানুষের সাথে। ইমপ্রেশনিজমের যুগসহ উনবিংশ শতকের শেষ দিকটা মানুষকে দিয়েছে উপভোগের কিছু নতুন সামর্থ্য, এক নতুন ঘ্রাণশক্তি এবং অস্তিত্বময় বা বিরাজমান বাস্তবতার এক নতুন জ্ঞান। এক্সপ্রেশনিস্টরা এই মানুষগুলোর বিপরীতে দাঁড় করিয়েছিলেন অন্য একধরনের মানুষকে যাঁরা এমন ধ্যানী বা জ্ঞানী নন, বরং তারা নীতিবিদ্যার নিয়ম তৈরি করেন, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করেন, তাঁরা একধরনের ইউটোপিয়ান মানুষ যাঁরা জ্ঞান নয় বরং কাজ নিয়ে ব্যাপৃত, একধরনের মহৎপ্রাণ মানুষ যাঁরা পৃথিবীকে বিপ্লবের পথে চালিত করেছেন। আর এই দুয়ের মাঝে পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম বা এই নতুন শিল্পধারা দাঁড় করিয়েছে আর এক তৃতীয় ধরনের মানুষকে যাঁরা ভবিষ্যৎ নির্মাণের আদর্শ থেকে বিচ্যুত নন, তবে তাঁরা একই সাথে সেই নির্মাণকে বাস্তবায়ন করতে চান বস্তুর প্রতি গুরুত্ব ও শ্রদ্ধাকে সমুন্নত রেখে।

তাঁরা বস্তুর সম্যক জ্ঞানকে সাথে নিয়েই বস্তুকে রূপান্তর ও উন্নীতকরণ করতে চান। এঁরা ম্যাকিয়েভেলিয়ান অভিজ্ঞতাবাদী মানুষ নন, এঁরা রাজনীতিবিমুখ নীতিশাস্ত্রবাদী মানুষ নন। এঁরা একইসাথে রাজনীতিক ও নীতিবাদী, দুই চারিত্র্যই তাঁদের মাঝে স্পষ্ট। এঁরা মধ্যবর্তী স্থানে থাকবেন, শক্তিহীনতায় নয় বরং তাঁদের শক্তি ও সামর্থ্যরে প্রতি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সাথে। এঁরাই হবেন ডানে ও বাঁয়ের অপর দুই ধরনের দুই খাদের মাঝখানে এক ধারালো পাষাণ প্রাকার।

 

আধ্যাত্মিক সৃজনরূপে বস্তুর নৈকট্য

বর্তমান চিত্রকলা অর্থাৎ পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম বস্তু এবং এবং তার আধারকে বাস্তব অনুভব করে, মনে করে না যে, এগুলো প্রকৃতি থেকে নকল, বরং মনে করে এগুলো প্রকৃতির মতোই নতুন এক সৃষ্টি। আমরা ইতোমধ্যেই দেখেছি এক্সপ্রেশনিজম তার শেষ পর্যায়ে আধ্যাত্মিকতা দ্বারা মারাত্মক উজ্জীবিত ছিল। ফলে বর্তমান এই ধারা আবার ইন্দ্রিয়গ্রাহিতার দিকে ফিরে যাবে এমনটা হওয়া স্বাভাবিক নয়, যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তেমন বিপদগ্রস্ততার নজিরও দেখা যায়। উনবিংশ শতকীয় বাস্তবতাবাদের চেয়ে এখানে বরং বিশুদ্ধতার পথে সরে আসার অন্তর্গত প্রবণতা প্রবল। এর কম্পোজিশন কাঠামোতে একটি ভিন্নতর শুদ্ধতার স্বাক্ষর রয়েছে। এর স্থায়ী আগ্রহ হলো বস্তুর গোপন এক ত্রিমাত্রিক পরিমিতির মাধ্যমে বস্তু ও অস্তিত্বের মৌলিক রহস্য ও অন্তঃসঙ্গতির ছন্দকে তুলে ধরা। এর বিশ্বাস মতে বস্তু বা অস্তিত্ব অনেক মৌলিক ও সরল ফর্ম দ্বারা গঠিত। শ্রেষ্ট আধিুনক চিত্রকর্মে এই ফর্মগুলো শান্ত ও সংযত। বাস্তববাদী চিত্রায়ন বলতে ইদানিং যা বোঝায় তাতে বলা যায় প্রকৃতির রূপায়নে এই ফর্মগুলোকে খুব স্পষ্ট করা হবে, বিমূর্তে যেমনটা স্পষ্ট হবে না। বাস্তববাদী চিত্রায়ন মানে বস্তুর নকল করা নয়, বরং বস্তুকে সৃষ্টি করতে হবে এই ফর্মগুলোর মাধ্যমে তার আদি ও সরল রূপে। এ্যারিস্টটলিয় অনুকৃতির ধারণা ইতোপূর্বেই আধ্যাত্মিকতাবাদিতায় আত্মস্থ জনপ্রিয় ধারণায় পরিণত হয়ে আছে। ফলে সেই অনুকরণ মোটেই পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজেমের কাম্য নয়। নতুন এ শিল্পধারা ঘটনা, বস্তু ও ফিগারকে তার অন্তস্থ রূপের স্পষ্টতায় এক অন্তর্দর্শনসহ চোখের সামনে হাজির করতে চায়। এক্সপ্রেশনিজমের কাছে এটা মোটেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিল্পের এই নতুন ধারা বস্তু দিয়ে শুরু করে আত্মার অনুসন্ধান করে না, বরং আত্মিকতার সহযোগে বস্তুকে আবিষ্কার করে। ফলত এই নতুন ধারায় চিত্রায়ন পদ্ধতিতে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় যাতে আধ্যাত্মিকতার ফর্মগুলো বৃহৎ, বিশুদ্ধ ও স্পষ্ট হয়। এভাবে সৃষ্ট দ্বিতীয় বস্তুজগৎটি পুরোপুরিভাবে প্রথম বা আদৎ জগৎটির সদৃশ হবে এবং এটি হবে প্রথম জগৎটির চেয়েও বিশুদ্ধ। সাথে সাথে এটি অনুকৃত নয় বরং আরেক আদৎ জগৎ। আমরা আগেই দেখেছি যে, আমরা ইচ্ছে করলেই যাপিত জগৎটি থেকে লাফ দিয়ে বের হয়ে একটা আধ্যাত্মিকতার আধার-রূপ জগতে প্রবেশ করতে পারি না, যদিও এক্সপ্রেশনিজম সেই চেষ্টা খুব করেছে। ফলে পোস্ট-এক্সপ্রেশনিস্টরা বাহ্যিকতাসম্পন্ন যাপিত জগৎটিতে থেকেই সেই জগতের বস্তগুলো তাঁদের ভাবানুযায়ী আকার দিয়ে নতুন বানিয়ে নিতে চান। 

এভাবেই ইতিহাসের এই সময়বিন্দু অসাধারণভাবে আমাদের বলছে যে, বস্তুকে প্রথমে আবিষ্কার করতে হবে, এরপরে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে, এটাই হলো পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম কথিত বস্তুর সৃষ্টি। এটা আমাদের সকলের জানা যে, উনবিংশ শতক বস্তুর অন্তর্গত অনুকৃতি ছাড়া আর তেমন কিছুর চেষ্টা করেনি। এ কারণে শিল্পীকে এসময় বসে থাকতে হয়েছে সামনে প্রকৃতি নিয়ে অথবা প্যারিস-প্লাস্টারের ঢালাইয়ে নির্মিত মূর্তি নিয়ে, উদ্দেশ্য হলো চোখের সামনের বস্তুটি নকল করে কাগজে-ক্যানভাসে তুলে আনা। এর প্রতিক্রিয়ায় এক্সপ্রেশনিজম দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো বস্তুর বিষয়ে তাদের অন্তর্গত ভাবনার দিকে। বস্তুটি আসছে মনের ভিতর থেকে এবং তাকেই দেখছে একেবারে অন্তরের কাছ থেকে। একদম নিজের ভিতর থেকে বস্ত তৈরির এক সুযোগ। সেই আপেলের উদাহরণে যদি আবার ফিরে যাই তাহলে বলা যায় এক্সপ্রেশনিজমের আপেলটি আরও আদর্শ জগতের, কিন্তু আপেলটি যাপিত জীবনের অস্তিত্বময় আপেল নয়। তাত্ত্বিকভাবে বললে বলা যায়, এক্সপ্রেশনিজমের আদর্শ মূলত বাস্তবে অরূপায়িত এক আদর্শ। আসলে শ্রেষ্ঠটি বানাতে পেরেছি বলতে হলে তো বানানো বস্তুটিকে যেগুলো ইতোমধ্যে বানানো আছে সেগুলোর একটি রূপে আত্মপ্রকাশ করে তার মধ্য দিয়ে তাকে অস্তিত্বশীল হতে হবে।

শিল্পের এ নতুন ধারা কীভাবে তার সৃষ্টিকর্ম সম্পাদন করে করে তা এতক্ষণে স্পষ্ট হয়েছে আশা করি। বাইরের পৃথিবীকে সৃষ্টিতে নিখুঁত শিল্পী জার্মান চিত্রকর গেয়োর্গ শ্রিম্পফ (Georg Schrimpf) মনে করেন পেইন্টিং করতে রঙ-তুলি নিয়ে ঘরের বাইরে যাওয়ার দরকার নেই, সামনে কোনো মডেলও দরকার নেই। ছবিটি আগেই প্রকৃতি থেকে অন্তরে এসে বসে থাকবে, সেখান থেকে ক্যানভাসে চলে যাবে। একারণেই তিনি তাঁর ল্যান্ডস্কেপের ছবিগুলো স্টুডিওতে বসেই এঁকেছেন। এগুলোর জন্য তাঁর কোনো মডেলও ছিল না, কোনো প্রাক-স্কেচও ছিল না। তবে তিনিও কিন্তু বার বার বলেছেন ল্যান্ডস্কেপটিকে অবশ্যই হতে হবে বাস্তব যাতে প্রকৃতির আদৎ ল্যান্ডস্কেপের সাথে যে কেউ এটিকে গুলিয়ে ফেলতে পারে। তিনি বলেন এটি হবে আদৎ প্রকৃতিরই একটি যা হবে সাধারণ, চিরচেনা, দৈনন্দিনতায় সাদামাটা; সাথে সাথে এটি হবে জাদুর মতো কিছু কারণ এর জন্ম হয়নি প্রকৃতিতে বরং এর জন্ম হয়েছে একটি কক্ষে; এমনকি এর শেষ ঘাসের পাতাটিও বহন করবে আত্মা বা আধ্যাত্মিকতার শক্তি। এটাই শিল্পীর লক্ষ্য। তবে শিল্পী সব সময় এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন না। যখন শিল্পীর সৃজনপদ্ধতি ভিতর থেকে কাজ করে বাইরে নিয়ে আসতে পারে তখনই মূলত বাস্তবের এই নতুন সৃজন সম্ভব হয়। এটি বিন্দুতে বিন্দুতে ভিতরে তৈরি হয়, এটি বস্তুর নকল বা অনুকরণ নয়।

দুই-রকম পার্শ্ববিশিষ্ট এই শিল্পের অপর পার্শ্বটি বৈপরীত্যে গড়ে ওঠা। সেই পার্শ্বটি দেখা যেতে পারে জার্মান চিত্রকর আলেকজান্দার কানোলডৎ (Alexander Kanoldt) এর চিত্রে। তিনি তাঁর ল্যনাডস্কেপগুলো সব এঁকেছেন ইতালির শহরগুলোর বাইরে কোথাও। তিনি মনে করেন প্রয়োজনীয় আধ্যাত্মিকতার সংসর্গগুলো প্রকৃতির মাঝেই সজীব হয়ে উঠে। এভাবে একই ধারার আরেক শিল্পী প্রকৃতি ও প্রকৃতির বস্তুর উপস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম এই দ্বান্দ্বিকতা নিয়ে যতদিন কাজ করবে ততদিনই এর অঙ্গন উন্মুক্ত থাকবে আধ্যাত্মিকতার এমন বহুমুখী সম্ভাবনার জন্য। কিন্তু এটি যদি পর্যবসিত হয় বস্তুর বাহ্যিকতার অনুকরণে, যেটা বস্তুময়তাকে গুরুত্ব দেয়া শিল্পধারার ক্ষেত্রে একটি বড় ভয়, তাহলে এ শিল্প হারাবে তার সকল মহত্ব এবং ফটোগ্রাফি, ফিল্ম ইত্যাদি জাদুর মেশিন এ শিল্পকে এক সময় পায়ে পিষে মেরে ফেলবে। চলবে

আরও পড়ুন :  জাদুবাস্তবতা | ফ্রানৎস রোহ | পর্ব-২

//জেডএস//

লাইভ

টপ