করোনাকালের এক সন্ধ্যা-রাত

Send
স্বপ্নময় চক্রবর্তী
প্রকাশিত : ১৩:৩৯, মে ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৩, মে ১৫, ২০২০

সব ‘আমি’র ভিতরে হয়তো অন্য একটা আমি থাকে, হতে পারে সে আমার এই আমি’র অপছন্দের, কিংবা সে হতে পারে শয়তানের পাঠক্রম পড়া, কিংবা সে নিতান্ত সরল। আমার ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে সন্ধেবেলা হাততালি দিয়ে হেঁকে উঠল ‘বেশ হয়েছে, ঠিক হয়েছে।’ সেদিন শনিবার ছিলো। আমি শত নিষেধ সত্ত্বেও সূর্যাস্তের নিঃস্তব্ধ নগরীর লাশের উপর পিঁপড়ার মতো হাঁটি, নইলে যে শরীরে জং ধরে। হৃদয়েও। হাওয়া বয় শন শন তারারা কাঁপে। হৃদয়ে কি জং ধরে পুরনো খাপে। চুপচাপ হাঁটি, মাস্কে ঢাকা মুখ। কোনো পরিচিত সামনে এলে ভদ্রতা বশত আমার স্মিত হাস্য সে দেখে না, কিংবা দুজনেরই মাস্কের তলায় ঢেকে রাখা লকডাউন না মানার অপরাধবোধ দুজনেরই অগোচরে থেকে যায়। এখন মানুষকে দেখে কেমন আছেন বলে কাঁধে হাত রাখা এখন অসামাজিক কাজ। মানুষের কাছে আসা, পাশে দাঁড়ানো এখন অন্যায়। ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ একটা ভুলভাল গান। তুমি শুধু তোমার জন্য। নিজেকে গোটাও, প্যাঙ্গোলিনের মতো, নাকি কেঁড়াকীটের মতো নিজেকে গুটিয়ে পেঁচিয়ে ছোট করে রাখো। ঐ নচ্ছার আমিটা মাস্ক পরা আমির ভিতর থেকে বেরিয়ে বলে দ্যাখ কেমন লাগে। লিফটে চেপে পাঁচতলায় উঠেছিস, ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে পিৎজা আর পেপসিতে, নিচের বস্তির টিনের চালায় লকলকানো পুঁই, ম্যাক্সি মেলতে আসা কিশোরী-সমেত দেখে আহা আহা করেছিস, কিন্তু আহারে, কেন তোর স্কুল ছাড়তে হলো, ‘আমি আছি তো’ বলিসনি। ‘ডিসট্যান্স’ রেখে গেছিস। এখন বোঝ সামাজিক দূরত্ব কাকে বলে। ওরে বোঝ, মানুষ মানুষকে কাছে না পেলে কতটা উতলা হয়। হাপিত্যেশ কাকে বলে বোঝ। সে বলে ওরে মূঢ় ওরে গাণ্ডু, সামাজিক দূরত্ব শব্দটাকে দিব্যি মেনে নিলি তোরা? হরদম বলছিস, লিখছিস খবর কাগজে। শারীরিক দূরত্ব লিখতে পারতিস না? তোরা বুদ্ধিজীবী?

অশ্বত্থ তলাটা পার হই। আবার হাততালি দিয়ে হেঁকে ওঠে ও। বলে দ্যাখ, চেয়ে দ্যাখ, ওই পাথরে হেগেছে কাক। কেউ পরিষ্কার করে না এসে। আগে তো এটা শিবঠাকুর হয়েই থাকত, ফুল, ধূপ কাঠি, রেকাবি, পয়সার ঠুংঠাং...। বেশ হয়েছে। মানুষ বুঝুক এই দেবতা-টেবতা কতটা অসহায়। এই যে শনি মন্দির, আজকের শনিবারে কতটা ভক্তসমাবৃত, মিনতি-প্রার্থনা-মন্ত্র ব্রাহ্মণের বিপদ ভঞ্জনমুদ্রা, সব স্তব্ধ হয়ে অন্য কোনো নৈঃশব্দ্যকে খুঁজে নিতে চায়। শক্তিমান শনিদেব কী করুণ, কী অসহায়, দেখেনে, বুঝেনে এবার।

এটা হলো সেই আমি, শয়তানের অংশস্বরূপ, আমি তাকে পারি না এড়াতে, যে দু’হাজার এক সালের জোড়া টাওয়ার ধ্বংসের পরও হাততালি দিয়ে নেচে উঠেছিল, বলেছিল ঠিক হয়েছে, বেশ হয়েছে, দ্যাখ কেমন লাগে। যে বলেছিল এতদিন ধরে আঁচড়ে কামড়ে রক্তাক্ত করেছিস ভিয়েতনাম, কুয়েত, ইরাক, বলিভিয়া, আফগানিস্তান...ভেবেছিলি একাই মস্তানি করে যাবি? আমার আমি তারে থামাই, বলি চোপ, এটা সন্ত্রাস। সেই শয়তানের অংশী আমি আমেরিকার করোনা আক্রান্ত তেরো লক্ষ সংখ্যার দিকে তাকিয়ে বলে বড় রোয়াব নিয়েছিলি ট্রাম্প...আমি ওকে ধমক নয়, হাত জোড়া করে থামাই, বলি চুপ কর প্লিজ...মানবতা বলে একটা কিছু তো...। সে শালা  ‘তবু জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়। সে আমার মাথার চারিপাশে, তবু সে চোখের চারিপাশে, তবু সে বুকের চারিপাশে। আমি চলি, সাথে সাথে সেও চলে আসে’।

সন্ধ্যার নিঃস্তব্ধ পথ। পথে পড়ে আছে ঝরা পাতা চুপচাপ, ঋতুরক্তমাখা কাপড়ে ঝরেছে হলুদ কমলা রঙ রাশি রাশি রাধাচূড়া ফুল। এই ফুলে ছাওয়া রাস্তা অস্বাভাবিক অবস্থাতেই ঘটে। পিষে যাওয়া ঝরাফুলগুলোর উপর টায়ারের দাগ ফুটে ওঠা মানে স্বাভাবিক অবস্থার দিকে ফিরে যাওয়া। পাখিরা করোনা জানে না। ওরা একটু আগেই সবাই মিলে বাড়ি যাবো বাড়ি যাবো বলতে বলতে নীড়ে ফিরেছে। সেই কাকলি শুনেছি। ভোর বেলায় ভোর হলো দোর খোলো ও শুনতে পাই। যখন পাখিদের স্বর ঢেকে যাবে গাড়ির ঘর্ঘরে, তুমুল হর্নে, জিন্দাবাদ মুর্দাবাদ স্লোগানে, বুঝতে হবে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরছে। রাস্তায় কুকুরগুলো বড় বেশি চিৎকার করছে নিজেদের মধ্যে বড্ড বেশি ভৌ ভৌ। ওদের কথাবার্তা অনুবাদ করে আমাকে শোনায় অন্য আমি। ওরা বলছে জীবনে দেখিনি এমন। থার্মোকলের বাটি পড়ে নেই মদের দোকানটার পাশে একটাও, যেখানে ঘুগনির ঝোল লেগে থাকত আমাদের চেটে খাবার মতো। মদের দোকানটাও বন্ধ কতদিন। সেই গরিব রিকশাওলাটাও আসে না আর বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে। মানুষের নিশ্চয়ই বিপদ হয়েছে বড়। আমরা কুকুররা তো বড় প্রভুভক্ত জাতি, আমাদের উচিত মানুষের জন্য কিছু করা। আমাদের কী করা উচিত? আমার এই সন্ধ্যাকালীন পদচারণায় মনে হয় আমরাও তো প্রভুভক্ত। হাইড্রোক্সি ক্লোরোকুইনিন পাঠিয়েছি পাঠিয়েছি তো আমেরিকায়...।

সেই রিকশাওলাটির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ও রিকশা চালাচ্ছে। রিকশার সিটে শূন্যতা বসে আছে। কুকুরগুলো ওর দিকে দাও দাও করে ধেয়ে আসে। ও বলে নাইরে বুল্টু ভুলু ঝুমনি লালু, বিস্কুট নাই। সওয়ারি নাই, পয়সা নাই। বিস্কুটও নাইরে তাই। আমি দেখি ও একা একা চলে যায়, ওর পিছন পিছন যায় দখিন হাওয়া। একা একা ঘোরে কেন ও? সওয়ারির খোঁজ? এখন তো এই রাস্তাই মানুষই নাই। তবু কেন প্যাডেল ঘোরায় ও? মদন তাঁতীর কথা মনে পড়ে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মদন তাঁতি, একা একা সুতাহীন মাকুতে শূন্যতা বোনে মদন। মাকুই ওর যাপন। ওর জীবন। শূন্য মাকুতে জীবনের আস্বাদ পায় ও।

ঘুরে, ফের বড় রাস্তায় আসি। দুটো চারটে গাড়ি চলে যায়। জরুরি সার্ভিস তো জারি। জ্যোতিষ সম্রাট বাস্তুবিদ তান্ত্রিকাযার্চ্য শ্রী শ্রী ভৃগুর চেম্বারে তালার গর্তের ভিতর থেকে উঁকি দেয় ল্যাদা পোকা এইসব জ্যোতিষীর গুষ্টি, কেউ বলেনি অমুক মাস থেকে করোনা ছড়াবে। করোনাকাল শেষ হয়ে গেলে আমরা কি ভাগ্য জানতে আর ভাগ্য ফেরাতে এদের কাছেই যাবো? এরা কি করোনাদমন কবচ বিক্রি শুরু করবে? বিচিত্র নয় কিছু করোনাশ্বরী মাতাও জন্মাতে পারে।

মসজিদে এখন কজন যায় জানি না। আমাদের ওস্তাগর মাসখানেক আগে বলেছিলো সুরা ফাতিহা, নাস আর ইখলাস পড়ে হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে সর্বাঙ্গে মাখে। করোনা ওরে ধরবে না। জানি না কেমন আছে ও। ফুটপাথের উপরে গাছ ঘেরা বেদি, ওখানে কয়েকজন, সামনের বেঞ্চিতে কয়েকজন বসে আছে, সবারই কালো ধোঁয়ামাখা মুখ। অথচ রাস্তা এখন ধোঁয়াহীন। জলধোয়া আকাশে উজ্জ্বল তারা। ওরা বাইরেই বসে আছে। পিছনে বস্তি। একটা ঘরে চারজন পাঁচজন থাকে। নিরাপদ দূরত্বের অর্থ বোঝাতে গেলে ওদের মুখে আরও বেশি ধোঁয়া জমে যাবে।

ফোনটা রেখে এসেছি ভুলে। বাড়িতে চিন্তা শুরু করে দিয়েছে পরিবারের লোক। অদ্ভুত একটা শঙ্কা। আমরা রেড জোনে আছি। গোপীবল্লভপুর, ডেবরা একসময় রেড জোনে ছিলো। প্রায় মুক্তাঞ্চল গড়ে উঠেছিল ১৯৭১-এ। আমাদের তখন আঠারো বছর বয়স। আমাদের এই নব্য রেড জোনে দোকানপাট বন্ধ। সপ্তাহে দুই দিন বাজার।

পাশাপাশি পাড়াগুলিতে আক্রান্তের সংখ্যা আট। মৃত এক। চামচিকার মতো খবর ওড়ে। আট নয়, আঠারো। নার্স বা ডাক্তার যেসব আবাসনে থাকে, তাদের অনেকেই নাকি নিজের ঘরে ঢুকতে পারছে না। বাধা দিচ্ছে প্রতিবেশী। এ কী অবিশ্বাসের ভাইরাস? এই শিক্ষা আমাদের এত দিনে? রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথ থাকেন কি শুধু কোটেশনে?

বাড়ির দিকে যাই। না শোনা সাইরেন। সামনে কি খাদ? মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে। দিক দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা...।

আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সুররিয়ালিস্ট শিল্পী এডভার মুঞ্চ-এর সেই ছবিটি। অদ্ভুত রঙের একটা আকাশ, একটা খাদের পাশে, অগোছালো সাঁকোর পাশে দাঁড়ানো এক একাকী মানুষ, হাতের পাতা দুটো অনেক বড়, চোখ দুটো গোল গোল, সামনের কিছু দেখে আতকে ওঠে স্থির। কিংকর্তব্যবিমূঢ় বলে একটা শব্দ আছে বাংলায়, সেটাও যথেষ্ট নয়। ছবি অনেক কথা বলতে পারে যা বর্ণমালা পারে না, আকাশে স্তব্ধ ঘড়ি, আমরা ভয়বভস্ম খাই। সালভাদর দালির পার্সিস্টেন্স অফ মেমোরি সিরিজের ছবিগুলির স্তব্ধ রূপ দেখি মুমূর্ষু শহরে।

আমার ভিতর থেকে শয়তানার বাচ্চাটা জেগে ওঠে ফের বলে এতদিন ধরে নিংড়েছো এই বসুন্ধরা। কাশবন, জলশামুক ভাটফুল বেহুলার ঘুঙুরের মতে কেঁদেছে যখন, শোননি। খঞ্জনার পালক ছিঁড়ে কংক্রিট উঠিয়ে নাম দিয়েছো বসুন্ধরা। আটকে দিয়েছো নদীস্রোত, গলিয়েছো পাহাড়ের মাথায় জমানো বরফ মুকুট। খালি তুমি একা বাঁচবে ভেবেছো। এখন থাকো গ্যামাক্সিন ব্লিচিং পাউডারে, থাকো অন্ধকার ঘরে একা। ভেবেছিলি একাই মস্তানি করে যাবি? আমি তারে থামাই। বলি এটাও সন্ত্রাস। সে বলে তবে নামা ট্যাঙ্ক, ছোড় মিসাইল, গ্রেনেড, নাপাম। মার ভাইরাস।

আমি ঘরে ফিরি। করোটির মতো চাঁদ ফিনাইলের জল বমি করে ক্রমাগত। এই চাঁদ একদিন আমাদের কপালের টিপ ছিলো। মায়েরা পরিয়ে দিতো আমাদের কপালে। চাঁদ হে, তোমার মধ্যে পহেলা বৈশাখের ভোরে স্নান করে আসা ডুরে শাড়ি পরা মায়ের মুখটি দেখতে চাই ফের।

আজ সকালের খবর কাগজে একটা পূর্ণচাঁদের ছবি বেরিয়েছিলো। আকাশে বিক্ষত চাঁদ এবং মাটিতে ঝলসানো রুটি। এই রুটি ছিল দূর থেকে ঘরে ফিরতে চাওয়া শ্রমিকদের পথের খাবার। যারা চারঘণ্টার নোটিশের লকডাউনে আটকে পড়েছিল। তারপর দুশো-তিনশো কিলোমিটার রেললাইন বরাবর হেঁটে ফিরতে চেয়েছিল ঘরে। ঘুম পেয়েছিল রাতে। একটা আচমকা মালগাড়ি তাদের পিষে দিয়ে চলে গেছে। ছিন্ন, ছেটানো রক্তমাখা রুটির উপরও ওই চাঁদ ছড়িয়েছে ফিনাইল আলো, স্যানিটাইজার।

আমি পরিমিত পেয়েছি পৃথিবী। আস্বাদন করেছি রূপ রস গন্ধ। আমি নিরাপদ ফ্ল্যাটে আছি। যদি ভারমুক্ত হতে চাও হে পৃথিবী আমাকে নাও, আমাদের, যারা অকাজের। শুধু নিই, দিই না। যারা দিতে পারে, ওদের নিও না।

শয়তানের বাচ্চাটা আমার পিঠে হাত বুলায় কেন? বেকুফ, বেয়াদপ।

//জেডএস//

লাইভ

টপ