কেন মানুষকে বাঁচার জন্য রাস্তায় নামতে হয়? : আনু মুহাম্মদ

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : রহমান সিদ্দিক
প্রকাশিত : ১৩:১৪, মে ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৯, মে ১৮, ২০২০

[আনু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বিশ্বব্যাপী শোষণ, বৈষম্য, নিপীড়ন ও আধিপত্য-বিরোধী তত্ত্বচর্চ‍া ও লড়াইয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদে জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনসহ যে কোনো প্রকার নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। বর্তমানে তিনি তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ত্রিশের অধিক। সম্পাদক, অনলাইন পত্রিকা ‘মেঘবার্তা’ ও ত্রৈমাসিক ‘সর্বজনকথা’।]

রহমান সিদ্দিক : উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে ইংল্যান্ডে কলেরা মহামারির পর সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হয়। বলতে গেলে তখন থেকেই ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন নতুন দিশা পায়। করোনা মহামারিতে এমন কিছুর প্রত্যাশা করছেন কি?

আনু মুহাম্মদ : উনিশ শতকে ইউরোপে যেসব পরিবর্তন এসেছিল, তার পেছনে আরও অনেক কারণ ছিল। তখন সামন্তবাদী ব্যবস্থা ভেঙে গিয়ে নতুন শ্রেণিবিন্যাস তৈরি হচ্ছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবন ও দর্শনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন হচ্ছিল। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে তাদের যে ঔপনিবেশিক আগ্রাসন, সেটার মধ্য দিয়ে পুঁজির পুঞ্জিভবন হচ্ছিল। এসব অনেক শর্ত মিলেই এই পরিবর্তনটা এসেছে। সেখানে মহামারি যে, কোনো ভূমিকা পালন করেনি, এমন নয়। শ্রেণিগত পরিস্থিতি, সমাজে ক্ষমতার বিন্যাস কিংবা ব্যাপক সংখ্যক মানুষের যে অবস্থা সেটা উন্মোচন করেছে ওই মহামারি। এই ধরনের মহামারিতে যেটা হয়—আসলে আমরা কোন সমাজে বাস করি, সেখানে জনগণের কতটা অধিকার আছে, নিরাপত্তা আছে, সেটা উন্মোচিত হয়। ইউরোপে সেটা হয়েছিল। সমাজের মধ্যে সংগঠিত শক্তি হিসেবে শ্রমিক-শ্রেণির যে উত্থান বা সংগ্রাম, সেই সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করেছিল। পরিবর্তন যে দরকার সেই উপলব্ধিটা সমাজের মধ্যে তৈরি হয়েছিল।

 

রহমান সিদ্দিক : বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তনে করোনা কি সেই প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে?

আনু মুহাম্মদ : করোনার এই বৈশ্বিক মহামারি পৃথিবীর জন্য অভূতপূর্ব এক অভিজ্ঞতা; এই অর্থে যে, মহামারি তো আগেও হয়েছে। তখন সমগ্র বিশ্ব এই মাত্রায় সংযুক্ত ছিল না। এখন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এমনকি রোগের ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক মাত্রা অনেক বেশি। তার কারণে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, একই সঙ্গে সারা পৃথিবীর মানুষ একই রকম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা নিয়ে বাস করছে। প্রথম বারের মতো একসঙ্গে পৃথিবীর অর্থনৈতিক তৎপরতা যেমন পরিবহন, জ্বালানি ব্যবহার, শিল্প কারখানা প্রায় থেমে গেছে। এই রকম বৈশ্বিকভাবে থেমে যাওয়া অভূতপূর্ব। আগে কখনো এমন হয়নি যে, পুরো পৃথিবী একসঙ্গে থেমে গেছে। এর ফলে প্রাণ-প্রকৃতির মধ্যে যে একটা স্বস্তি, একটা প্রাণবন্ত ভাব দেখতে পাচ্ছি সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। পরিবর্তন অর্থে বলতে পারি, এই দুর্যোগের মধ্য দিয়ে সবাইকে জেগে ওঠার, পরিবর্তনের ডাক আসছে।

 

রহমান সিদ্দিক : এখন এই ডাক শুনবে কে?

আনু মুহাম্মদ : এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যে, এই ডাক শুনবে কে। যারা বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে এবং যারা এর সুফলভোগী তারা তো এই ডাক শোনার জন্য কোনোভাবেই রাজি না। কারণ তাদের কয়েকটা খুঁটি আছে। একটা খুঁটি হচ্ছে মারণাস্ত্র। সারা পৃথিবীতে এ ধরনের অস্ত্র (জৈবিক ও রাসায়নিক) উৎপাদন হচ্ছে, বিতরণ হচ্ছে, বিনিময় হচ্ছে এবং এসব নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে মানুষকে হত্যা করার জন্য, মানুষকে ধ্বংস করার জন্য প্রায় দুই ট্রিলিয়ন (দুই লক্ষ কোটি) ডলারের এই ব্যবসা চলছে। এর কাছাকাছি অন্য কোনো খাত নাই, যেখানে এত টাকা খরচ হয়।

জীবাস্ম জ্বালানি হচ্ছে তাদের আরেকটা খুঁটি। এ দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনসহ পৃথিবীর কতটা সর্বনাশ হয়েছে, তা তারা জানে। তারপরও তারা এই ব্যবসা ছাড়তে রাজি না। আরেকটা হচ্ছে ফাইনান্সিয়াল সেক্টর যেমন ইন্স্যুরেন্স, শেয়ার বাজার, যেখানে ফাটকাবাজারি থাকে। তেলের দাম, খাদ্যের দাম নিয়ে তারা ফাটকাবাজারি, প্রতারণার মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার কামাই করছে। সম্প্রতি গার্ডিয়ান একটা রিপোর্ট করেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন বিলিয়নেয়ার গত এক মাসে এই খাতে আড়াই বিলিয়ন (দুইশ’ পঞ্চাশ কোটি) ডলার আয় করেছে। আরেকটা গোষ্ঠী আছে, যারা কৃষিতে, খাদ্যে বিষ মিশিয়ে বিশাল বাণিজ্য করছে; লাখ লাখ হেক্টর সবুজ জমিকে ধ্বংস করছে। করোনাভাইরাসের কারণে পৃথিবীর কয়েক লাখ মানুষ মারা গেলেও কিংবা পৃথিবী শেষ হয়ে গেলেও তাদের কিছু যাবে আসবে না। বরং এর মধ্য দিয়ে আরও কীভাবে ব্যবসা বাড়ানো যায়, সেটা তারা করবে।

করোনা উপলক্ষে এদের প্রতিনিধিরা সারা পৃথিবীতে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বহু দেশের সরকার তাদের কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য আরও একটা অজুহাত খুঁজে পাচ্ছে। যারা মানুষকে ধ্বংস করছে তাদের ওপর নজরদারি করা দরকার, কিন্তু সেটা না করে উল্টো তারা মানুষের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে।

কিন্তু করোনাভাইরাস যে বার্তা দিয়েছে তা হলো—এখন পৃথিবীকে বা মানুষকে রক্ষা করতে হলে সমরাস্ত্রের পেছনে এত টাকা খরচ না করে চিকিৎসার পেছনে খরচ করতে হবে। যেসব গবেষণা বিপদ তৈরি করছে সেগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। ফাটকাবাজারি বন্ধ করতে হবে। জীবাস্ম জ্বালানি যেমন কয়লা, তেল নিয়ে বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। বিষ কোম্পানির বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। এগুলো বন্ধ করার তাগিদই আসছে করোনা সংকট থেকে। এগুলো বন্ধ করে জনস্বাস্থ্য আর সামাজিক নিরাপত্তায় তা ব্যয় করতে হবে।

 

রহমান সিদ্দিক : বিদ্যমান ব্যবস্থয় সেটা কি সম্ভব?

আনু মুহাম্মদ : পরিবর্তনের তাগিদটা সেই কারণেই। বিশ্বের শতকরা নিরানব্বই ভাগ মানুষ এখন ক্ষতির শিকার। বাংলাদেশে ১৬ কোটির ওপরে মানুষ। তাদের ১৫ কোটিরই ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ১০ কোটির তো না খেয়ে মরার মতো দশা। বাকি যারা আছে তারাও নানা রকম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। আজকের করোনার জন্য যে তারা ক্ষতিগ্রস্ত, এমন নয়। করোনার পূর্বে যে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল সেখানেও তারা নিরাপত্তাহীন ছিল। এই মানুষগুলোর ভেতর থেকে এই বিষয়ে কতটা উপলব্ধি, কতটা সচেতনতা এবং সংগঠিত অবস্থা বাড়বে, সেটার ওপরই নির্ভর করবে বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন। এই করোনাভাইরাসের মধ্য দিয়েই কি বৈশ্বিক মহামারি শেষ হবে, নাকি আরও একটি বড় মহামারির মধ্যে আমরা পড়ব, সেটি নির্ভর করবে ৯৯ শতাংশ বঞ্চিত মানুষের সংহতি কতটা শক্তিশালী হয় তার ওপর।

 

রহমান সিদ্দিক : আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের মতো সংস্থাগুলো দেশে দেশে সামাজিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আগাম হুশিয়ারি দিয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?

আনু মুহাম্মদ : এটা তো বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের বলার দরকার নেই; কাণ্ডজ্ঞান থেকেই বোঝা যায়। আর এই অবস্থা সৃষ্টিতে তাদেরও দায় আছে। বিপুল জনসংখ্যা যখন ভয়ঙ্কর রকমের নিরাপত্তাহীন থাকে, যেমন বাংলাদেশে পাঁচ কোটি মানুষ তো এমনিতেই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের। তাদের কোনো ধরনের কাজ নাই। এর বাইরে আরও পাঁচ কোটি মানুষ, যারা বিভিন্ন ধরনের ছোটখাট কাজ বা ব্যবসা করতো, তারা কিছুই করতে পারছে না। দশ কোটি মানুষের একেবারে দিনের খাবার নিয়েই সাংঘাতিক রকমের অনিশ্চয়তা। আরও যারা বেসরকারি খাতে বিভিন্ন ধরনের কাজের মধ্যে আছে, এমনকি যারা পেশাজীবী, তাদের একটা অংশও বিপদগ্রস্ত। মিডিয়া, বিনোদন, শিল্প সমস্ত জায়গা থেকেই ছাঁটাই হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে সাড়ে তিন কোটি মানুষ বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছে। প্রত্যেকটা দেশে তো এই রকম চিত্র। ইউরোপের তুলনায় কম হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেকার ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তার কিছু ব্যবস্থা আছে। সে দেশের মানুষের দীর্ঘ লড়াইয়ের ফসল এটা। কিন্তু আবার সেখানে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা খুব ভঙ্গুর। খেয়াল করা দরকার যে, যেসব দেশে সামাজিক নিরাপত্তা বেশি, সরকারের ভূমিকা সক্রিয়, সেসব দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের তুলনায় মানুষের বিপর্যয় বা অসহায়ত্ব কম হবে। কেননা সেখানে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য কিছু না কিছু ব্যবস্থা থাকে। তারপরে আমরা যদি কিউবা কিংবা ভিয়েতনামের কথা ধরি, তাদের সামাজিক নিরাপত্তা শক্তিশালী। রাষ্ট্র যেখানে নাগরিকদের প্রতি দায়-দায়িত্ব অনুভব করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে, সেখানে অস্থিরতা, ক্ষোভ কিংবা সংঘাত তুলনামূলকভাবে কম হবে।

 

রহমান সিদ্দিক : বাংলাদেশের অবস্থা কেমন?

আনু মুহাম্মদ : ভালো না। যে সমস্ত দেশের মানুষ করোনার আগেই নিরাপত্তাহীন ছিল, রাষ্ট্র তাদের দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। না শিক্ষা, না চিকিৎসা, না কর্মসংস্থান, না বেকারত্বের সময় কোনো সাপোর্ট—সে সমস্ত দেশের মানুষের দুর্ভোগ হবে অনেক বেশি। অস্থিরতাও বাড়ার সম্ভাবনা সেসব দেশে বেশি। বাংলাদেশ এরকম একটি দেশ। দেশের অবস্থা তো এখনই এমন দেখতে পাচ্ছি। করোনা চলাকালে যখন শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা, সেখানে মানুষকে প্রাণে বাঁচার জন্য রাস্তায় বিক্ষোভ করতে হচ্ছে। বকেয়া মজুরির জন্য, ত্রাণের জন্য, খাদ্যের জন্য, অনিয়মের বিরুদ্ধে মিছিল করতে হচ্ছে। এটা কীভাবে হতে পারে? কেন মানুষকে বাঁচার জন্য রাস্তায় নামতে হয়? 

 

রহমান সিদ্দিক : বিশ্ব খাদ্য সংস্থা করোনা মহামারির পরে বড় ধরনের দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করছে। এই দুর্ভিক্ষে মারা যেতে পারে সাড়ে তিন কোটি মানুষ। পূর্বাভাস যদি এমন হয়, আমাদের দেশে তার প্রস্তুতি কী?

আনু মুহাম্মদ : আমাদের দেশে কোনো বিষয়েরই কোনো পূর্বপ্রস্তুতি নাই, আছে শুধু বাগাড়ম্বর। প্রস্তুতি না থাকার একটা বড় কারণ হচ্ছে, সরকার নিজেদের নিয়ে সবসময়ই অনেক বেশি সন্তুষ্ট। সরকারের এই আত্মসন্তুষ্টি একটা বড় সমস্যা বাংলাদেশে। করোনাভাইরাসের অবস্থা এতটা খারাপ হতো না যদি জানুয়ারি মাস থেকে সরকার প্রস্তুতি নিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এমনকি বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সতর্ক করে দিয়েছে। কিন্তু সরকারের কর্তারা সব সময় বলে আসছে আমাদের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন। তারপর যখন সংক্রমণ ধরা পড়ল, দেখা গেল টেস্ট করার সামগ্রী নাই, চিকিৎসকদের সুরক্ষা সরঞ্জাম নাই, হাসপাতালে চিকিৎসা নাই, ভেন্টিলেটার নাই। চিকিৎসক-নার্সরা শুধুমাত্র চিকিৎসা সামগ্রীর অভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। প্রস্তুতি একদম নাই, অথচ সরকার আত্মসন্তুষ্ট হয়ে বসে আছে। আরেকটা সমস্যা হলো স্তুতি বা বন্দনা। সারাক্ষণ তোয়াজ-তোষামোদের সংস্কৃতি। ওপর থেকে নিচ পর্যস্ত এই যে সংস্কৃতিটা গড়ে উঠেছে, এটাতেই কর্তাদের মনোযোগ থাকে বেশি। সমস্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানে যে, কাজ করার চাইতে তোয়াজ করাতেই তাদের সাফল্য। এতে তার চাকরি, তার প্রমোশন, তার অবৈধ সুবিধা পাওয়া নিশ্চিত হয়। কাজের মধ্যে বেশি দক্ষতা দেখাতে গেলে বরং অসুবিধা। এসব কারণে কোটি কোটি মানুষ এখন ক্ষুধার্ত আছে, সামনে তাদের কী অবস্থা হবে কে জানে।

 

রহমান সিদ্দিক : সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় সরকারের প্রতি আপনাদের পরামর্শ কী?

আনু মুহাম্মদ : আমরা আগেই কিছু সুপারিশ করেছিলাম। মার্চের মাঝামাঝি থেকে আমরা বেশ কয়েক দফায় করণীয় প্রস্তাব করেছি। আশু করণীয়, স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন ধরনের করণীয় ও সুপারিশ সরকারের জন্য আমরা প্রস্তাব করেছি; এগুলোর কয়েকটি মে-জুলাই সংখ্যা সর্বজনকথায় (https://sarbojonkotha.info/) রাখা আছে। এই মুহূর্তে কী করণীয় এবং মানুষকে ক্ষুধার হাত থেকে বাঁচাতে হলে কী করতে হবে; দীর্ঘ মেয়াদে ধানের মজুদ, চালের মজুদ কীভাবে বাড়াতে হবে; খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের দিক থেকে কী কী উদ্যোগ নেওয়া দরকার ইত্যাদি বিষয়গুলো আমরা স্পষ্ট করেই বলেছি। তারপরে কৃষিখাতে বরাদ্দ ও ঋণ পুনর্বিন্যাসসহ অনেকগুলো পরামর্শ আমরা দিয়েছি। এ নিয়ে সরকারের দৃশ্যমান তৎপরতা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। বরং যাদের হাতে এমনিতেই বিপুল সম্পদ আছে, তাদেরকেই সরকার যেন মনে করছে বেশি দুর্দশাগ্রস্ত। সে কারণে তাদেরকেই বেশি বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক মালিক, গার্মেন্টস মালিক, ঋণখেলাপি—তারাই বেশি সুবিধা পাচ্ছে। খাদ্য সংকটে যে মানুষ পড়তে যাচ্ছে, সেটা মোকাবেলা করার জন্য রেশনিং সিস্টেম, তারপরে সরকারের গুদামে খাদ্য মজুদ করা এবং তালিকা তৈরি করে বিভিন্ন অঞ্চলে কারা কারা অনেক বেশি দুর্দশাগ্রস্ত, তাদেরকে অন্তত তিন মাসের জন্য সমর্থন দেওয়ার কথা আমরা বলেছি। সেগুলোর কোনো কিছুই করা হচ্ছে না।

 

রহমান সিদ্দিক : সরকার তো ত্রাণ দিচ্ছে।    

আনু মুহাম্মদ : হ্যাঁ দিচ্ছে। এমপি সাহেব বা জেলা প্রশাসক সাহেব একটা করে পোটলা দিয়ে ছবি তুলে দেখাচ্ছেন যে তারা অনেক ত্রাণ দিচ্ছেন। বর্তমান সংকটকালে একটা করে পোটলা দেওয়া তো সমাধান হতে পারে না। আমরা তিন মাসের একটা হিসাবও দিয়েছিলাম, যেটা সরকারের পক্ষে বাস্তবায়ন করা খুবই সম্ভব। পরিকল্পিতভাবে একটা তালিকা করে যারা দুর্দশাগ্রস্ত তাদেরকে দেওয়া। এখনই তো দুর্ভিক্ষের অবস্থা চলছে। তারপরও সরকার কিন্তু বলেই যাচ্ছে সব প্রস্তুত, সব ঠিক আছে। এখন যে ক্ষুধার সমস্যা আছে, খাদ্যের সংকট আছে, ত্রাণ ঠিকমতো বিতরণ হচ্ছে না, সেগুলো তারা স্বীকারও করে না। তারা সারাক্ষণ বলে যাচ্ছে, খাদ্যের কোনো সংকট নাই, কোথাও কোনো অভিযোগ শুনছি না। এই যে অস্বীকার করা; তারপর রয়েছে আত্মসন্তুষ্টি আর কর্তারা সার্বক্ষণিক স্তুতি করে যাচ্ছে—এই তিন সমস্যা বাংলাদেশের জন্য দুর্দশা, সর্বনাশা ও দুর্যোগ ডেকে আনছে। এটাই আমাদের উদ্বেগের প্রধান কারণ।

 

রহমান সিদ্দিক : একটা আশার কথা শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কৃষির ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছেন।

আনু মুহাম্মদ : কৃষির ওপর জোর দেওয়ার কথা বলার পাশাপাশি তো কিছু কাজের পরিকল্পনাও নিতে হবে। এখন বোরো ধান কাটা হচ্ছে। বোরো ধানটাই হচ্ছে বাংলাদেশের চাল উৎপাদনের প্রধান অংশ। সেখান থেকে যে ধান বা চাল আসবে, সেটা থেকে সরকারের মজুদ বাড়াতে হবে। সেখান থেকে রেশনিং সিস্টেমে মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছাতে হবে। যাদের পয়সা থাকবে না, তাদের বিনা পয়সায় খাদ্য দিতে হবে। এটা হলো দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য প্রধান করণীয়। অথচ এই ধান ক্রয় সরকার শুরু করতেই দেরি করছে। সরকার ঠিকমতো সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ফসল ক্রয় করলে একদিকে সরকারের খাদ্য মজুদ বাড়ে এবং অন্যদিকে কৃষক তাদের ফসলের তুলনামূলক ভালো দাম পেতে পারে। 

 

রহমান সিদ্দিক : সরকার তো বলছে গুদাম সমস্যা, জায়গার সমস্যা। এত ধান-চাল রাখবে কোথায়?

আনু মুহাম্মদ : নতুন করে গুদাম তৈরির জন্যও তো একটা প্রস্তুতি লাগে। সেই প্রস্তুতি নেয়ার পাশাপাশি এখন যেটা দরকার, সেটা হলো অস্থায়ী ভিত্তিতে বা আপদকালীন কিছু ব্যবস্থা নেওয়া। যেমন গ্রামাঞ্চলে বা মফস্বল এলাকায় অনেক সরকারি ভবন, যেগুলো এখন কাজে লাগছে না সেগুলো ব্যবহার করা। স্কুল-কলেজও এখন বন্ধ। তারপরে রয়েছে বিভিন্ন জায়গায় সাইক্লোন সেন্টার, অডিটোরিয়াম কিংবা কমিউনিটি সেন্টার। এগুলোকে এখন অস্থায়ী ভিত্তিতে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। যে পরিমাণ মজুদ এখন সরকার রাখে, এভাবে তার অন্তত তিনগুণ মজুদ বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে এই কাজগুলোও তো করতে হবে। তার কোনো লক্ষণ কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি না। যদি এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকার সত্যি উদ্যোগ নেয় তাহলে ভালো।

 

রহমান সিদ্দিক : বড় ধরনের মন্দা দেখা দিলে অনেক দেশ উৎপাদিত শিল্প বা কৃষি পণ্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারে। এতে করে বিশ্বায়নের যে উদারীকরণ বাণিজ্যনীতি, সেটা কি ভেঙে যাবে?

আনু মুহাম্মদ : করোনার আগেই বিশ্বে একটা সংরক্ষণবাদী তৎপরতা শুরু হয়েছিল; অর্থনৈতিক সংকটের লক্ষণও দেখা যাচ্ছিল। করোনা এখন বিশ্বের বহু শাসকের একটা সুবিধা করে দিয়েছে। সবাই বলতে পারবে করোনার জন্যই সংকট হচ্ছে। আসলে করোনার আগেই অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে যেমন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান রাষ্ট্রে করোনার কারণে এই সংকট আরও তীব্র হবার আশঙ্কা। এর একটা বড় বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে মন্দা, উৎপাদন-কর্মসংস্থান-ভোগের ক্ষেত্রে বড় পতন। এর মোকাবেলা করার জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়ে তাদের কলকারখানা ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষতি পুষিয়ে অর্থনীতি চাঙ্গা করার পথ খুঁজছে। এখন এটা কতটা ফলপ্রসূ হবে সেটা নির্ভর করবে যাদের হাতে টাকাটা যাচ্ছে, তারা কারা? তারা কি সফলভাবে উৎপাদনশীল খাত সক্রিয় করতে বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজে লাগাতে পারবে? এসব প্যাকেজ বেশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারবে? যেসব দেশ দক্ষভাবে তা পারবে, তাদের দেশে সংকট উত্তরণ দ্রুত হবে। যেসব দেশে এই প্রণোদনার অর্থ গায়েব করে দেবে কিছু গোষ্ঠী, সেখানে মানুষের ভোগান্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে।

বাংলাদেশের সমস্যা হচ্ছে, এ দেশ যে সমস্ত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে যুক্ত, তার একটি হচ্ছে গার্মেন্টস রপ্তানি, অন্যটি রেমিট্যান্স। এই দুটো ক্ষেত্রেই আমাদের বিপদের সম্ভাবনা। গার্মেন্টস খাত যেহেতু শিল্পোন্নত দেশের ওপর নির্ভরশীল, সে সমস্ত জায়গায় যদি মন্দা দীর্ঘস্থায়ী হয় বা চাহিদা কমে যায়, তাহলে এর প্রভাব তো আমাদের দেশে পড়বেই। ভিয়েতনামের সঙ্গে বাংলাদেশ নিয়ে একটা তুলনা হচ্ছে। অথচ ভিয়েতনামের মোট রপ্তানির মাত্র এগার থেকে বারো ভাগ হচ্ছে গার্মেন্টস। বাংলাদেশে আশি ভাগই গার্মেন্টস। সুতরাং ভিয়েতনামে আন্তর্জাতিক মার্কেটে সমস্যা হলে তাদের অর্থনীতি এমনভাবে বিপদে পড়বে না, যেমনটা পড়বে বাংলাদেশ। বহু ধরনের তৎপরতায় না গিয়ে একমুখী রপ্তানি শিল্পের ওপর নির্ভরতার বিপদ আমাদের সামনে আসছে।

 

রহমান সিদ্দিক : আর রেমিট্যান্স? অনেক দেশ থেকে এরই মধ্যে বাংলাদেশি শ্রমিক ফেরত আসার খবর আসছে।

আনু মুহাম্মদ : মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নানা প্রকল্পে আমাদের শ্রমিকরা কাজ করে। করোনার কারণে অনেক প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে তার আলামতও আমরা দেখতে পাচ্ছি। অনেকে ফিরে আসতে বাধ্য হবে, কর্মসংস্থানের চাহিদা বাড়বে। এখন এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আমাদের যেটা করতে হবে, আভ্যন্তরীণ অর্থনীতি আরও সক্রিয় কিংবা আরও গতিশীল করার কর্মসূচি নেওয়া। দেশের মধ্যে কর্মসংস্থান থাকলে রপ্তানি যদি কমেও যায় বা রেমিট্যান্স যদি বন্ধও হয়ে যায়, সামগ্রিকভাবে মন্দার বড় ধরনের আঘাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। সেই ধরনের কোনো পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি তো দেখতে পাচ্ছি না।

 

রহমান সিদ্দিক : চলমান সংকট উত্তরণে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি টাকা ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আপনার কী মত?

আনু মুহাম্মদ : সরকার চাপের মধ্যে পড়লে বা নিজেদের ব্যর্থতার মুখে এমনিতেই টাকা ছাপায়। সেটা ঘোষণা দিয়ে বা মানুষকে জানিয়ে করে না সরকার। এজন্য অভিজিৎ ব্যানার্জির পরামর্শ লাগে না। বহু দেশের সরকারই তাদের প্রয়োজন মতো টাকা ছাপায়। অন্তত বাংলাদেশের জন্য এটা কোনো দরকারি পরামর্শ না। কারণ বাংলাদেশে টাকা ছাপানোর কোনো দরকার নাই, অন্য অনেক পথ আছে। সরকারের অনেক অপ্রয়োজনীয় এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল কিছু প্রকল্প আছে। যেটা একশ টাকায় করা যায়, সেটা পাঁচশ টাকায় করা হচ্ছে। ইচ্ছা করলেই সেসব প্রকল্প থেকে অনেক টাকা বের করা যায়। এছাড়া অনেক অপ্রয়োজনীয় বিপজ্জনক প্রকল্প একেবারে বন্ধই করে দেওয়া উচিত। এটা হলো একটা দিক। আরেকটা হলো, খেলাপি ঋণের বিশাল পাহাড়। সেই বিশাল পাহাড় নিয়ে যারা বসে আছেন, তাদেরকে কি এখনো পাকড়াও করার সময় আসে নাই? যখন আমাদের বিপুল অঙ্কের টাকা জনগণের বেঁচে থাকার জন্য দরকার, তখনো কি খেলাপি ঋণগ্রহীতারা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াবে? এইখানে তো একটা বড় অঙ্কের টাকা। যারা সম্পদ পাচার করছে, তাদের কাছে টাকা আছে। যারা ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, তাদের কাছে টাকা আছে। সরকারের আরও অন্যান্য পথ আছে। এসব চেষ্টা সরকারকে করতে হবে। সুতরাং টাকা ছাপানোর পাইকারি পরামর্শ কোনো কাজের কিছু না।

 

রহমান সিদ্দিক : পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেতন বৈষম্য কমানোর কথা বলেছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। ভ্যাটিকানের পোপও বলেছেন, একটা মৌলিক বেতন কাঠামো ঠিক করার সময় হয়তো এসেছে। যার মাধ্যমে মানুষের একই ধরনের কাজের সমান স্বীকৃতি দেওয়া যাবে।

আনু মুহাম্মদ : আন্তর্জাতিকভাবে একটা ধারণা এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, সেটা হচ্ছে ইউনিভার্সাল বেসিক স্যালারি বা সর্বজনীন ন্যূনতম আয়। তার মানে সকল মানুষের জন্য যাতে ন্যূনতম একটা আয় নিশ্চিত হয়, সেটা রাষ্ট্র ব্যবস্থা করবে। যাতে মানুষের ন্যূনতম জীবনযাত্রা সংকটগ্রস্ত না হয়। সেইটাই আরেকভাবে এই প্রস্তাবের মধ্যে আছে।

আমরা বাংলাদেশে বহুদিন থেকেই জাতীয় ন্যূনতম মজুরির কথা বলছি। এর মানে হচ্ছে এমন একটা পরিমাণ যার নিচে কোনো মজুরি হতে পারবে না। বাংলাদেশে কোনো কোনো খাতে এখন যে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত আছে, তা প্রকৃতপক্ষে দারিদ্র্যসীমার আয়ের থেকে নিচে। এখন বাংলাদেশ এবং সারা পৃথিবীর জন্য একটা প্রশ্ন তোলা খুব গুরুত্বপূর্ণ—মজুরি বা আয় কীভাবে দারিদ্র্যসীমার নিচে হতে পারে? যেকোনো দেশে সকলের জন্য অভিন্ন মানসম্পন্ন চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম জাতীয় মজুরি নিশ্চিত করা হলে বলবো প্রাথমিক শর্ত পূরণ হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা তো এই করোনাভাইরাসের মধ্য দিয়েই প্রকট হয়েছে। ভিয়েতনামে যে একটা লোকও মারা গেল না, তার দুটো কারণ। এক হচ্ছে, তাদের সামাজিক নিরাপত্তা, আরেক তাদের জনস্বাস্থ্য। তাদের দেশে এ দুটাই খুব জোরালো। শ্রীলংকা এবং ভারতের কয়েকটা রাজ্য যেমন কেরালা এভাবেই সাফল্য দেখিয়েছে।

আরও দরকারি বিষয় হচ্ছে প্রত্যেক নাগরিক যেন অন্তত তার ক্যালরির চাহিদা বা বেঁচে থাকার ন্যূনতম খাদ্য-পুষ্টি পায় তা নিশ্চিত করা। ছয় দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের পরেও ছোট্ট একটি দেশ কিউবার মানুষ এত সুস্থ-সবল কেন বা তাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিরাপদ কেন? কারণ ওখানকার নাগরিকরা মৌলিক যে খাদ্য সেইসাথে প্রতিদিনের দুধ-ডিম, সেটা রাষ্ট্র থেকেই পায়। যে পেশার, যে বয়সের হোক সবাই পাবে। এর ফলে যা হয়, তাদের পুষ্টির চাহিদা, তাদের শরীর, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, তাদের সুস্থতা সমস্ত কিছুই অনেক শক্তিশালী থাকে। পাশাপাশি তাদের জনস্বাস্থ্য। যে কোনো ধরনের অসুখের চিকিৎসার জন্য পয়সা নিয়ে নাগরিকদের চিন্তা করতে হয় না। তার ভেন্টিলেটার আছে কি না, তার আইসিইউ আছে কি না, হাসপাতাল আছে কি না, ডাক্তার আছে কি না—এগুলো নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা করতে হয় না। রাষ্ট্র তার সর্বোত্তম ব্যবস্থা করে, এগুলো তার অগ্রাধিকার। এগুলো হচ্ছে ন্যুনতম ব্যবস্থা। এগুলো একটা রাষ্ট্রে যদি না থাকে, কী পরিণতি হয় সেটা আমরা বহু দেশে এই করোনার সময় দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশে তো বটেই।

 

রহমান সিদ্দিক : লি ডকট্রিন বলছে, ‘গণতান্ত্রিক সরকারের চেয়ে কর্তৃত্ববাদী সরকার অর্থনীতি উন্নয়নের জন্য উপযোগী।’ সিঙ্গাপুরের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ বিদেশে চিকিৎসার জন্য গেছেন এমন কোনো নজির নেই। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্রটা এমন কেন?

আনু মুহাম্মদ : কর্তৃত্ববাদী হলেই যে একটা দেশের উন্নয়ন হবে, বিষয়টা এমন না। কিংবা কর্তৃত্ববাদের সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সম্পর্কটাও ঠিক এমন না। কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরতান্ত্রিক সরকার আফ্রিকায় অনেক দেখা যায়, লাতিন আমেরিকাতেও আগে অনেক দেখেছি। সেসব দেশে প্রকৃত উন্নয়ন হয় নাই, সেখানে তো কোনো পাবলিক হেলথ কেয়ার সিস্টেম তৈরি হয় নাই। বরং সম্পদ কুক্ষিগত হয়েছে কিছু গোষ্ঠীর হাতে। ইউরোপের যেসব দেশে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভালো সেগুলো তো গণতান্ত্রিকভাবেই পরিচালিত হয়। মূল বিষয় হচ্ছে সরকারে যারা আছে তাদের কাছে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ—পাবলিক ইন্টারেস্ট, নাকি কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থ। কর্তৃত্ববাদী বা গণতান্ত্রিক যেটাই হোক, দেখতে হবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন শিক্ষা, চিকিৎসা, আইন-আদালত, অর্থ বিভাগ এগুলো ঠিকমতো কাজ করছে কিনা।

সিঙ্গাপুরের সঙ্গে অনেক সময় বাংলাদেশের তুলনা করা হয়। তাদের দিকে তাকালে কী দেখি। তাদের দেশে প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। সাউথ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, কিউবায়ও তাই। প্রত্যেকটা জায়গায় একটা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হয়। সে জন্য তাদের প্রয়োজনীয় বিকাশ ও জাতীয় সক্ষমতা দেখা যায়।

 

রহমান সিদ্দিক : এ বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ। সরকার মুজিববর্ষ পালন করছে। বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই, তবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসেবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে ততদিন দুনিয়ার মানুষের ওপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না।’ তাঁর দল বর্তমান আওয়ামী লীগ টানা এক যুগ ধরে ক্ষমতায়। আপনার মূল্যায়ন কী?  

আনু মুহাম্মদ : যেই আশঙ্কা আমরা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে দেখলাম, সেই আশঙ্কাকেই অনেক দ্রুত গতিতে বাস্তবায়ন করছে সরকার। যেখানে উৎপাদনশীল খাত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়, মানুষের দক্ষতা-সক্ষমতা বাড়ানো হয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়—সেই ধরনের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আমরা বাংলাদেশে দেখতে পাচ্ছি না। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও আমাদের দেশে এমন একটা হাসপাতাল তৈরি হয়নি, যেখানে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রধান ব্যক্তিবর্গরাও ভরসা করতে পারেন। বছরে ত্রিশ হাজার কোটি টাকা বিদেশ চলে যায় কেবলমাত্র চিকিৎসার জন্য।

 

রহমান সিদ্দিক : শেষ করছি আবারও পরিবেশ দিয়ে। করোনার কারণে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি; দেশে দেশে লকডাউনে বিপর্যস্ত অর্থনীতি। এর বাইরে একটা ইতিবাচক দিক হলো দীর্ঘদিন দম বন্ধ থাকা প্রাণ-প্রকৃতি যেন কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। কী বলবেন এ বিষয়ে?

আনু মুহাম্মদ : সেটাই হচ্ছে আমাদের জন্য একটা বড় ট্র্যাজেডি। মানুষ যখন মহাবিপদে তখন প্রাণ-প্রকৃতি হাসিখুশি। তার মানে হচ্ছে এমন একটা ব্যবস্থা পৃথিবীতে তৈরি হচ্ছিল, যে ব্যবস্থাটা টেকসই না। মানুষ তো প্রকৃতিরই অংশ। মানুষ যদি এমন অবস্থা তৈরি করে, যে অবস্থায় প্রাণ-প্রকৃতি বিপর্যস্ত হয় তাহলে তো শেষপর্যন্ত মানুষই নিরাপদ থাকতে পারে না। সেটাই প্রমাণিত হয়েছে বতর্মান করোনা পরিস্থিতিতে। এটা স্পষ্ট যে, যে উন্নয়ন ধারায় বিশ্ব চলছিল, বাংলাদেশ চলছিল, সেটা প্রকৃত উন্নয়ন না। কারণ যা মানুষকে বিপন্ন করে, যা প্রকৃতিকে বিপন্ন করে, সেটাকে কোনোভাবেই উন্নয়ন বলা যায় না। প্রাণ-প্রকৃতিকে বিপর্যস্ত করে মানুষ ভালো থাকতে পারে না।

 

রহমান সিদ্দিক : আপনাকে ধন্যবাদ।

আনু মুহাম্মদ : বাংলা ট্রিবিউনের সকল পাঠককে ধন্যবাদ।

//জেডএস//

লাইভ

টপ
X