এমন একটি মহামারিও আমরা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি : তুষারমৌলি চক্রবর্তী

Send
অনুবাদ : সুদেষ্ণা মৈত্র
প্রকাশিত : ১৪:৪১, মে ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫১, মে ২৩, ২০২০

[এই চিঠিটি এসেছে এপ্রিলের প্রথমে—যখন আমাদের ঘরের চাল কোভিডের ভয়ে নড়ছে—জাপানের সাইজো শহর থেকে। শহরটি হিরোসিমায়। লিখেছেন তুষারমৌলি চক্রবর্তী, ভারতবাসী দীপক মণ্ডলকে। আজ এতোদিন পরও চিঠিটি খুবই প্রাসঙ্গিক আমাদের দেশের জন্য। যে দেশ ছেলেকে পাঁচদিন পর বলছে, ‘তার মা হাসপাতালে কবেই মারা গেছে, জানাতে না পারায় দুঃখিত…’]

প্রিয় দীপক

আজ রবিবার। এই সময় আমার সঙ্গ দিচ্ছে কোনো এক বিলাসী মধুর হাওয়া। আমি হিরোসিমার সাইজো শহর থেকে লিখছি এই চিঠি। দেখতে পাচ্ছি, সন্ধে নামার ঠিক আগে দিগন্তরেখার ওপারে ওই ঝকঝকে সূর্যটা অস্ত যাচ্ছে। প্রকৃতি তার প্রতিটি আবেদনের তীব্রতায় জানান দিয়ে যাচ্ছে এখন বসন্তকাল। আর এই বসন্তকাল আমার জাপানে বসে কাটানো প্রথম বসন্ত। আমার এখানে যারা বন্ধু, তারা আমায় বলেছে, এই সময় প্রকৃতি কী চমৎকার সাজ সাজে—যেন এক ঐশ্বরিক আশ্চর্য! এই সময়টাই জাপানে ঘুরতে আসা পর্যটকদের জন্য উপযুক্ত। আচ্ছা আমি কি এই কথাগুলো বলতেই চিঠি লিখছি? না। তা নয়। আসলে এই বছর, এই বসন্ত, এই সূর্যের রোশনাই, কোনোটিই ঠিক যাপন করে আসা বিগত বছরগুলোর মতো নয়। আমি যখন এসব লিখছি তখন আমার মাথা একমুহূর্ত খালি নেই সেই মহামারির কথা ছাড়া, যে মহামারি তাণ্ডব করে বেড়াচ্ছে সমগ্র বিশ্বে। অন্তত দুই মাস আগেও মহামারির খবর জানার জন্য খবরের কাগজ বা টিভি খুলে বসতে হতো। কিন্তু এখন সেই খবর এতোটাই প্রকট যে, আমাদের প্রতিদিনের নিরাপদ থাকার ভান তার কাছে ধরা পড়ে যাচ্ছে। চারপাশের সমস্ত চাওয়া-পাওয়া অনর্থক মনে হচ্ছে। এই স্বাভাবিক জীবনের ছদ্মবেশ বা প্রচ্ছদ খসিয়ে দিচ্ছে কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস। এই ভাইরাসের প্রথম চিহ্ন ধরা পড়েছে চীনের উহান শহরে। আর এখন বিশ্বের ২০৬টি দেশ মরণব্যাধির কবলে। হ্যাঁ, জাপানও এর মধ্যেই রয়েছে। যে জাপানের বসন্তকালের সৌন্দর্যের কথা বলে এই চিঠির সূচনা, সেই জাপান বিশ্বের সেই দেশগুলির তালিকায় পড়েছে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে কোরোনায় আক্রান্ত প্রথম সারির দেশ হিসেবে। ২০২০ সালের জানুয়ারির ঠিক মাঝেই এ দেশে করোনা আক্রান্ত রোগীর খবর পাওয়া যায়। এখন এপ্রিল। এখন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৩০০০ বা তারও বেশি।

গত বছরের জুলাই মাসে আমার জাপানে আসা। আগস্ট মাস থেকে হিরোসিমা ইউনিভার্সিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে নিযুক্ত হয়েছি। নতুন দেশে এসে প্রথমদিকে কিছু অসহায়তা কাটিয়ে ওঠার পর এই দেশ, এই শহর আমায় কোনো বড়ো বাধার মুখোমুখি করেনি, কখনোই। তার চেয়ে এটা বলি যে, আমার প্রতিবেশীরা এবং সহকর্মীরা আমাকে প্রতি মুহূর্তে সাহায্য করেছেন। এককথায় বলা যায়, এই নতুন দেশ আমাকে খুব সাদরে গ্রহণ করেছে।

৩০০০ এমন কিছু ছোট সংখ্যা না হলেও চারপাশের গতিবৃদ্ধি দেখে আমি বলতেই পারি, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার জাপানে এখনও কম। যার অগ্নিকাণ্ডের মতো ছড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা সামলে রাখার কৃতিত্ব এই দেশের সরকার এবং নাগরিক, উভয়ের। এই দেশের মানুষদের জীবন-যাপনের পদ্ধতি করোনাকে আটকে রেখেছে বলে আমার মনে হয়। দেশে ভাইরাসের প্রথম খোঁজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সরকার কঠোরহাতে সংক্রমণ মোকাবেলার চেষ্টা শুরু করে। এ সময় পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশই লকডাউন করে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু ব্যতিক্রম জাপান—একমাত্র তার সুঅভ্যাসের জোরে। সরকার এখনও এখানে কোনো বিপদকালীন জরুরি অবস্থার ডাক দেয়নি। তার একমাত্র মনযোগ হলো সচেতনতা প্রচার। তিনি দেশবাসীকে বারবার অনুরোধ জানিয়ে চলছেন, যেন তারা তাদের প্রতিদিনের পালিত সুঅভ্যাস আরো দৃঢ়ভাবে, আরো নিরবিচ্ছন্নভাবে পালন করে যায়। জানতে চাইতে পারো, কী এই অভ্যাসগুলো—মুখে মাস্ক পরা। হাত পরিষ্কার রাখা। ভিড় এড়িয়ে চলা।

ইতিহাসে এই প্রথমবার অলিম্পিক গেমস স্থগিত রাখা হয়েছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে। এসব দেখে মানুষও খুব আতঙ্কিত। তাদের অনেকেই সরকারের কাছে আর্জি জানাচ্ছে, যেন দেশে লকডাউন জারি করা হয়। বিশেষত, টোকিও শহরে, যেখানে সংক্রমণের হার ক্রমেই বাড়ছে। আমিও মাঝে মাঝে অধৈর্য্য হয়ে ভাবছি, বোধহয় সরকার মহামারিকে ঠিক প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। কিন্তু এই কথা আমি বা আপনি কী করে অস্বীকার করি যে, দেশের জনগণের যাপনপদ্ধতির ধরন-ধারণের ওপরেই সরকারের সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে!

টোকিও শহরটি ঘিরে কিছু ধারণাগত বিবেচনার প্রয়োজন হলেও, জাপানের বেশিরভাগ মানুষেরই সামাজিক মেলামেশার পদ্ধতিগুলো এতোটাই সুস্থ এবং সচেতন নাগরিকের মতো যে, তার সৌভাগ্যময় ফলশ্রুতি হলো ভাইরাসের নিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির হার। আসলে মহামারি আসার বহু আগে থেকেই এদেশের জনগণ স্বাভাবিকভাবেই মাস্ক ব্যবহার করে, এটা মাথায় রেখে যেন কোনো প্রকার অসুস্থতা সমাজে ছড়িয়ে না পড়ে। বেশিরভাগ দোকান এবং শপিংমলে রয়েছে হাত পরিষ্কার করার আলাদা স্যানিটাইজিং বিভাগ। এখানে মানুষেরা একে অপরকে অভিবাদন করতে হাত মেলায় না। মাথাটিকে সামান্য ঝুঁকিয়ে সম্ভাষণ জানায়। এরই পাশাপাশি আরেকটি সত্যি কথা হলো, জাপানের জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম বা নিয়ন্ত্রিত। ফলে বিভিন্ন যানবাহন পরিষেবা দেওয়ার স্থানগুলোতে অযথা ভিড় লক্ষ্য করা যায় না। এভাবেই সবকিছুর মিলিত প্রচেষ্টায় আটকে রাখা হয়েছে কোভিড-১৯-এর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা।

সাইজো—যেখানে আমি বাস করি, সেখানে এ সমস্ত যাপনের ধরনগুলো আরো দৃঢ়ভাবে সত্যি। ফলে আমরা সংক্রমণ এড়াতে এতোটাই সফল মনে করছি যে, ভাইরাসটি নিয়ে রীতিমতো হাসাহাসি করি। আমরা বলি, ‘সাইজো আগেও যা ছিল, এখনও তাই আছে। মহামারি এসে কিচ্ছু বদলাতে পারেনি।’

পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকবে, দিন যতো এগোবে। এমন সুখের হাসি হয়ত থাকবে না আর ঠোঁটে লেগে। আমি যখন এই চিঠি লিখছি তখন মাথায় কড়া নাড়ছে এই ভয়—‘সংখ্যা বাড়ছে, সংক্রমণও।’ হ্যাঁ, এটা সত্যি যে, পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের মতো একই গতি ধরে জাপানে সংক্রমণের হার বাড়বে না। কিন্তু সামনের দিনগুলো এই বর্তমান অবস্থা থেকে আরো জটিল হয়ে দাঁড়াবে নিশ্চয়ই। আক্রান্তের সংখ্যা যদি এই হারেও বাড়তে থাকে, তাহলে জাপানেও লকডাউন জারি করা ছাড়া সরকারের হাতে কোনো বিকল্প থাকবে না।

সূর্য অস্ত যাচ্ছে। জাপানের বসন্তের সূর্য। আমার হাত থেকেও বিদায় নিচ্ছে আরও একটি দিন। আমি বরাবর আশাবাদী, তাই কল্পনা করছি এমন একটি দিনের, যা খুব শীঘ্রই আসুক আমাদের জীবনে—যে দিনটিতে আমরা পেছন ফিরে স্মৃতিচারণ করছি এই মহামারির, আর বলছি নিজেদের—‘হ্যাঁ! এমন একটি মহামারিও আমরা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।’

সেই দিনটি যতোক্ষণ না আসছে, সেই সময় পর্যন্ত চলুন একে অপরকে বলি, ‘বাড়িতে থাকুন, সুস্থ থাকুন।’

ইতি—

তুষারমৌলি

//জেডএস//

লাইভ

টপ