জলের মিনারের আড়ালে

Send
কিন্নর রায়
প্রকাশিত : ০৭:০০, জুন ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০০, জুন ০৩, ২০২০

দেবেশ রায়ের ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’র মলাট নির্মাণ করেছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। ফিল্ম মেকার, কবি, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, পেইনটার ও ইলাস্ট্রেটার পূর্ণেন্দু পত্রীর এই তিস্তা অভিযান ছিল দেখার। তখন আমরা সবাই পাক্ষিক ‘প্রতিক্ষণে’। সে এক তুমুল কলতান অথবা হই-হুল্লোড়ের দিন। আমার জীবনের অন্যতম সেরা কয়েকটি বছর।

‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’র প্রচ্ছদ আঁকা নয়, নির্মিত হয়েছিল, চোখের সামনে। কাঠের চৌকো জলচৌকি বা পিঁড়ি যেমন, এরকম একটি জায়গার ওপর মাটি, ভিজেমাটি। সেই মৃত্তিকা-যাপনে ‘ফেভিকল’ মিশ্রণ। তারপর বাঁশে তৈরি ছোট ছোট ছুরি দিয়ে অঙ্কন প্রণালি। পূর্ণেন্দু দা’র এই তিস্তা আবিষ্কারের সঙ্গী শিল্পী বন্ধু সোমনাথ ঘোষ ও সুব্রত চৌধুরী। দুজনেই তখন ‘প্রতিক্ষণ’-এর শিল্পী—কর্মসূত্রে।

এই তিস্তা-নির্মাণ আমাদের অনেকেরই সামনে। এই একই পদ্ধতিতে ‘বাংলা প্রবাদ’-এর প্রচ্ছদ প্রকল্প নির্মাণ পূর্ণেন্দু পত্রীর। সেই প্রসঙ্গে আর যাচ্ছি না। ‘বাংলা প্রবাদ’ এ মুখার্জি অ্যান্ড কোম্পানি থেকে বেরিয়েছিল।

টুকরো টুকরো করে নানা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’। বাঘারু, আপলচাঁদ ফরেস্ট, গয়ানাথ জোতদার, ‘শ্রীদেবীর রমণ নৃত্য’।

দেবেশ রায় থেকে দেবেশদা হতে সময় লেগেছিল বড়জোর মাস খানেক। সে কথায় নয় পরে আসব।

তাঁর ‘দুই দশক’—এই গল্প সংকলন প্রকাশ করেছিলেন নানিবাবুরা। নানিবাবু, প্রদীপ ভট্টাচার্য—এঁরা, হয়তো আরও দু-একজন। তাঁদেরই প্রকাশনা। এখান থেকেই শংকর বসু—রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায় তখন এই নামেই লিখতেন, তাঁর ‘শৈশব’ উপন্যাসটি বেরোয়।

‘দুই দশক’-এর মলাট করেছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। হালকা আকাশ রঙ অথবা ছাই ছাই, তার ওপর দুটি কালো দাগ—ব্রাশের। ওপর নিচে। তারপর মলাট জুড়ে দেবেশ রায় ও ‘দুই দশক’।

দেবেশ রায়ের তখন নাকের নিচে পাতলা-হালকা গোঁফ। ফুলপ্যান্ট, হাফহাতা বুশ শার্ট। দুটোই টেরিকটের। সেই সময়টা সম্ভবত ১৯৭৩-৭৪।

‘মানুষ খুন করে কেন’, দেবেশ রায়ের এই দীর্ঘ আখ্যান বেরিয়েছিল মনীষা গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড থেকে। চমৎকার মলাট নির্মাণ করেছিলেন সুবোধ দাশগুপ্ত। তার আগে দেবেশ রায়ের লেখা কয়েকটি গল্প বেরিয়েছে ‘দেশ’ পত্রিকায়। ‘দেশ’ তখন সাপ্তাহিক। গল্প দেখেন বিমল কর। ‘হাড়কাটা’ গল্পটির কথা এখানে, এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল।

‘দেশ’ পত্রিকার সাহিত্য সংখ্যায় সত্তর দশকে যে লেখকদের—আখ্যানকার ও কবিদের সাহিত্যকথন, লিখন প্রকাশিত হতো। সম্ভবত সেই তালিকাতেও তিনি অনুপস্থিত নন।

তাঁকে ‘তিস্তাপারের ব্যর্থ লেখক’ বলে একটি পোস্ট এডিটোরিয়ালে সম্বোধন করেছিলেন ‘বড়’ পত্রিকার একজন অতিবড় সাংবাদিক। পরে অবশ্য সেই ‘অতিবড়’ সাংবাদিক গড়িয়ে গেছেন ‘বড়’ থেকে ‘মেজো’ অথবা ‘সেজো’ বাড়িতে। থাক সেসব কথা।

শহর জলপাইগুড়ি, তার স্মৃতি, ফরেস্ট, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি—সিপিআই, ১৯৬২-তে দুঃখজনক চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ, ম্যাকমোহন লাইন অসমের তেজপুর পর্যন্ত চীনা রেড আর্মির নেমে আসা ও পরে হঠাৎই তাদের ফিরে যাওয়া, এইসব টানাপোড়েনে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি—সিপিআই-এর এক থেকে দুই হওয়া—সিপিআই ও সিপিআই(এম), তা নিয়ে কমিউনিস্ট কর্মীদের মনে অনন্ত বিষাদ—সকলের হয়তো নয়, কারও কারও মনে, যেমন দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৯৬৪-তে পার্টি—ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ভাঙার পর যিনি অসম্ভব মন খারাপ, বিষাদ—ডিপ্রেশনে ডুবে যেতে থাকেন, এই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত, হয়তো দেবেশ রায় নিজেও। দীপেন্দ্রনাথের কথা এই জন্য উঠে এল, দেবেশ রায় দীপেন্দ্রনাথকে—গল্পকার, ‘পরিচয়’ সম্পাদক, অসামান্য রিপোর্টাজ লেখক ও ঔপন্যাসিক—‘বিবাহবার্ষিকী’ ‘শোক মিছিল’-এর কথা মনে পড়ছে এখনই, মনে আসছে ‘জটায়ু’, ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’, ‘চর্যাপদের হরিণী’, ‘ঘাম’ ইত্যাদি গল্পের কথা। তো সেই দীপেন্দ্রনাথকে দেবেশ রায় বারবার ‘বন্ধু ও শিক্ষক’ বলে অভিহিত করেছেন, সেই দীপেন্দ্রনাথের সঙ্গে সঙ্গে নানা রাজনৈতিক ওঠা-পড়ার সাক্ষী দেবেশ রায়ও। স্মরণ করা যেতে পারে দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাবলির সম্পাদনায় ছিলেন দেবেশ রায়। যদিও এই রচনাবলির একটি মাত্র খণ্ডই প্রকাশিত হয়।

দেবেশ রায়, দীপেন্দ্রনাথ পার্টি ভাঙার পর—দুজনেই সিপিআই—কাস্তে-ধানের শীষ।

১৯৭৯-তে দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর মাসিক ‘পরিচয়’-এর সম্পাদক হন দেবেশ রায়। তাঁর সম্পাদনায় ‘পরিচয়’-এর বিষ্ণু দে সংখ্যা, গোপাল হালদার সংখ্যা, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যা—এখনও মনে পড়ে।

‘পরিচয়’-এর আড্ডায় তখন প্রায় নিয়মিত আসেন অমিতাভ দাশগুপ্ত, ধনঞ্জয় দাশ, শুভ বসু, কবি সিদ্ধেশ্বর সেন, কবি শিবশম্ভু পাল, কার্তিক লাহিড়ী। কখনো কখনো অমলেন্দু চক্রবর্তী, পূর্ণেন্দু পত্রী। অরুণ সেন আসেন নিয়মিত। তখন অরুণ সেন প্যান্ট শার্ট, হাতে ভারী ব্যাগ। ব্যাগটি চামড়ার। কদাচিৎ সুবোধ দাশগুপ্ত, পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়—সর্বজন মান্য দুলুদা। মতি নন্দীও এসেছেন কী? আসেন রঞ্জনবাবু।

দেবেশ রায়কে ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’, ‘তিস্তা পুরাণ’ ইত্যাদি প্রভৃতির ফ্রেমে গুঁজে দিতে চাইছেন কেউ কেউ। এই ফ্রেম-ঘেরাটোপ, ঘেরবন্দি বারে বারে ভাঙতে চেয়েছেন দেবেশ। লেখা, ভাষা প্রহার, শব্দ যোজন ও অভিযোজনে তিনি অসম্ভব ‘আরবান’—নগর মনস্ক। একইভাবে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথাও বলা চলে। দুজনের গদ্যভঙ্গি স্বতন্ত্র, স্বভাব অর্থে। কিন্তু দুজনেই গ্রাম নিয়ে লিখেছেন, কিন্তু গেঁয়ো—গ্রাম্য হননি। ‘গ্রাম গ্রাম গ্রাম’ বলে অকারণ আদিখ্যেতা দেখিয়ে, হেদিয়ে, মুখের ফেকো তুলে ফেলেননি। ফলে দেবেশ রায়ের ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’, ‘তিস্তা পুরাণ’, ‘জীবন চরিতে প্রবেশ’—কোনো অর্থেই তিস্তার গল্প হিসেবে আটকে থাকে না। একই কথা বলা যায় সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ প্রসঙ্গে। ‘অলীক মানুষ’, ‘তৃণভূমি’ কোনো তথাকথিত আঞ্চলিক আখ্যান নয়। তা আন্তর্জাতিক। যেমন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ঈশ্বরীতলার রূপকথা’, ‘স্বর্গের আগের স্টেশন’, ‘চন্দনেশ্বর জংশন’ ‘কুবেরের বিষয় আশয়’ শুধুমাত্র দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার চম্পাহাটির গল্প হিসেবে আটকে থাকে না। হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক, বহুকৌণিক, তৃতীয় বিশ্বের বেহুদা ভাঙা আয়না।

দেবেশ রায় তাঁর আখ্যান নির্মাণে ভারতীয় আধুনিকতা, পুরাণ-প্রতীক, উপনিবেশ-পূর্ব ও উপনিবেশ-উত্তর ভারতকে খোঁজার চেষ্টা করেছেন, সেখানে শুধুমাত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই নন, গ্রহণে বর্জনে নিরন্তর স্বদেশ-ছবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি সমর্থনের হাত প্রসারিত করেন অক্লেশে, অনায়াসে। বিভিন্ন কথাযাত্রায় তাঁকে মুগ্ধ হতে দেখেছি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সতীনাথ ভাদুড়ী প্রসঙ্গে।

কমলকুমার মজুমদারের ভাষাভঙ্গি, গদ্যচলন—যা কমলবাবুর ‘মতিলাল পাদরী’, ‘ফৌজি বন্দুক’, ‘লাল জুতো’ ইত্যাদি প্রভৃতি আখ্যান-উত্তর ‘অন্তর্জলী যাত্রা’, ‘পিঞ্জরে বসিয়া শুক’, ‘সুহাসিনীর পমেটম’ ইত্যাদি প্রভৃতির কথা অভিযানে ক্রমশ ভাষা নির্ভরতায় দোদুল হয়ে ওঠে, তার সমর্থনে দেবেশ রায় তাঁর গদ্যের শায়ক সাজান। সন্তোষ কুমার ঘোষ, নবনীতা দেবসেনরা যখন কমলকুমারের গদ্য ভাষা ও ভঙ্গিকে নস্যাৎ করেন, তার বিপ্রতীপে উচ্চারণ ও যুক্তিতে থাকেন দেবেশ রায়, পূর্ণেন্দু পত্রীরা। অমিয়ভূষণ মজুমদারের ভাষা দার্ঢ্য ও বিষয়কে বারবার প্রশ্রয় দেন দেবেশ।

আখ্যানের নিবিড় পটছাপে, বিস্তারীকরণ—ডিটেলিংয়ে তিনি যখন প্রায় ফরাসি জঁ-র-এ থাকতে থাকতে নেমে আসেন ভারতীয় আখ্যানকলায়, প্যান্ট-শার্ট ইত্যাদির বদলে পোশাকেও ধুতি-হাফ, নয়তো ফুল পাঞ্জাবি অথবা ঢোলা পায়জামা-পাঞ্জাবি ও পায়ে তালতলার বিদ্যাসাগরী নয়তো পায়ের সামনের দিক ঢাকা অন্য কোনো মডেলের বাহারি চটির চলনদার, তখনও তার লেখার কাগজটি ‘অক্সফোর্ড’ কোম্পানি। বন্ড পেপার। দামি কলম। কিন্তু আখ্যানকলায় স্বদেশের খোঁজ-নিরন্তর সন্ধান।

‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় শ্রমিক-কর্মচারী, সাংবাদিক-অসাংবাদিকদের একাংশের যে দীর্ঘ ধর্মঘট হয় আটের দশকের প্রায় মাঝামাঝি সময়ে, সেই স্ট্রাইকের সমর্থনে ‘আনন্দবাজার গ্রুপ অব পাবলিকেশন’-এর শ্রমিক কর্মচারীরা যে ইশতেহার-লিফলেট প্রকাশ করেন, তাতে শঙ্খ ঘোষ, পূর্ণেন্দু পত্রী এবং দেবেশ রায়ের সই ছিল।

বহুদিন চলা এই ধর্মঘটে শেষ পর্যন্ত নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, রমাপদ চৌধুরীদের নেতৃত্বে স্ট্রাইক ভাঙিয়ে লোকজন ভেতরে—‘আনন্দবাজার’ অফিসের ভেতরে ঢুকে যান। ধর্মঘট ভেঙে যায়।

পূর্ণেন্দু পত্রী তারপরই রেজিগনেশন দেন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র চাকরিতে। যদিও এর অনেক আগে থেকেই—‘প্রতিক্ষণ’ বেরনোর আগে থেকে তিনি প্রিয়ব্রত দেব-স্বপ্না দেবদের সঙ্গে জড়িত। ‘প্রতিক্ষণ’—পাক্ষিক প্রতিক্ষণ-এর বিজ্ঞাপন, লোগো নির্মাণ—শ্লোগান তৈরি—‘নাক উঁচু নয়, নজর উঁচু’—সবই পূর্ণেন্দুদার।

সেন্টার থেকে এক বছরের ছুটি নিয়ে দেবেশ রায় ‘প্রতিক্ষণ’ থেকে প্রকাশিত ইংরেজি পত্রিকা ‘পয়েন্ট কাউন্টার পয়েন্ট’ সম্পাদনা শুরু করেন। তখন তিনি ধুতি-পাঞ্জাবি। মুখে মহার্ঘ্য টোব্যাকোসহ বিদেশি পাইপ। মূলত ‘ফ্লাইং ডাচম্যান’ গোল, চ্যাপ্টা টিন-বন্দি তামাক দিয়ে পূর্ণেন্দু পত্রী ও তাঁর ধূম্রাভিসার। ‘ফ্লাইং ডাচম্যান’-এর সঙ্গে কখনো কখনো ‘ভ্যানগঘ’।

পূর্ণেন্দু পত্রী ‘উইলস’ বা ‘ক্যারাভান’, ‘ক্যাভেন্ডার’ টোব্যাকোও খেতেন পাইপে, দেবেশ রায় নন।

দেবেশ রায় দেবেশদা হয়ে উঠেছিলেন মাত্র কয়েক দিনেই। যে সামান্য কয়েকজন অতি মুষ্টিমেয়কে তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘আপনি’ সম্বোধনের বাইরে রেখেছেন, তাদের মধ্যে আমি একজন।

দেবেশদা শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘কয়লাকুঠি’কে খুব গুরুত্বপূর্ণ-বড় মাপের আখ্যান মনে করতেন। আমি করতাম না। এখনও করি না। তা নিয়ে বহুবার তর্ক হয়েছে তাঁর সঙ্গে।

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের আখ্যানে যৌনতার ব্যবহার ও যৌন প্রহারকে সমাজ বিপ্লবের প্রতিভূ—প্রতিবাদী সত্তা ও কণ্ঠ মনে করেছেন, বলেছেন, লিখেছেন। আমার তা কখনো মনে হয়নি, হয়ও না। তা নিয়ে তাঁর সঙ্গে বাহাস হয়েছে বহুবার।

অপর্ণা সেনের ‘যুগান্ত’ নামের চলচ্চিত্র কর্মটিকে তিনি দেখাতে চেয়েছেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিনেমা নির্মাণ হিসেবে। অঞ্জন দত্ত ও অন্যান্যদের অভিনয়, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ও ছিলেন এই ছবিটিতে—সকলের অভিনয়, ছবির বিষয়, ফ্রেমিং ইত্যাদি নিয়ে লিখেওছেন ‘আজকাল’ রবিবাসর-এ সেই প্রতিবেদন, তার উৎস ও অবতরণ নিয়ে তাঁর সঙ্গে তর্ক হয়েছে।

এরকম বহু বিষয় আছে আরও। ২০০৯-২০১০-২০১১ পর্বে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে তথাকথিত ‘শিল্পায়ন’ সমর্থনে তাঁর অজস্র লেখা সমর্থন করতে পারিনি। সিঙ্গুরে তিন ফসলী জমি জোর করে অধিগ্রহণ করে টাটাদের—রতন টাটাদের ‘ন্যানো’ কারখানা তৈরির ব্যাপারে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পরিচালিত বামফ্রন্টের নীতিকে কোনোদিন সমর্থন করতে পারিনি, আজও করি না। নন্দীগ্রামে কৃষকের ওপর গুলি চালিয়ে চোদ্দজন কৃষক হত্যারও সমর্থক হতে পারিনি। আমরা দেখেছি পরবর্তী সময়ে সিবিআই তদন্তে অনেক সত্য সামনে আসে। যদিও পুলিশকর্মী সাধু চট্টোপাধ্যায়ের হত্যা রহস্য উন্মোচিত হয়নি। সিঙ্গুরে তাপসী মালিকের হত্যা, সিপিআই(এম) নেতা সুহৃদ দত্তর গ্রেপ্তারি ও মুক্তি—সবই অনেক প্রকৃত বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে আমাদের। কিন্তু তথাকথিত ‘শিল্পায়ন’ সমর্থনে দেবেশ রায়—দেবেশদা যা যা লিখলেন, তার মূল সুর বদলে গেল ২০১২-২০১৩-তে। এফডিআই বিরোধী আন্দোলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভূমিকা’কে তিনি এগিয়ে রাখলেন বামপন্থীদের ভূমিকা থেকেও, ঐ ‘আজকাল’-এই। তারপর মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করে লেখা তাঁর আরও কয়েকটি উত্তর সম্পাদকীয়—মূলত ‘আজকাল’-এ, কখনো ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় ভালো লাগেনি। সমর্থন করতে পারিনি।

পাশাপাশি ভারতীয় জনতা পার্টি—বিজেপির সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড, সরকারে—ক্ষমতায় বসে বহু অন্যায় কার্যকলাপ তিনি সমালোচনা করেছেন তাঁর কলমে—উত্তর সম্পাদকীয়-তে। বিজেপি, আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদকে আক্রমণ করেছেন তীব্র ভাষায়।

অত্যন্ত সজাগ, মননশীল, তথ্য সমৃদ্ধ অথচ ভাষা সচেতন তাঁর এইসব উত্তর সম্পাদকীয়। বিরামহীনভাবে ভেবেছেন তিনি, লিখেছেন বিজেপি ও সংঘ পরিবারের ধর্মান্ধ, জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে।

বিগত লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির ক্ষমতায় নতুন করে ফিরে না আসার ব্যাপারে অনেকেই প্রায় নিশ্চিত ছিলেন। বিশেষ করে বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির একটা বড় অংশ। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে, লোকসভা ভোটের ফলাফলে তা হয়নি।

সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচনী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বিজেপির এই ক্ষমতায় পুনঃ প্রত্যাবর্তন দেবেশ রায়কে ব্যথিত ও চিন্তিত করেছিল। ক্রুদ্ধও হয়েছিলেন তিনি যথেষ্ট।

দেবেশ রায় মনে করতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বামপন্থী প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ জোট শক্তির প্রার্থীরা একের বিরুদ্ধে এক—এইভাবে লড়াই করলে বিজেপিকে পরাস্ত করা সম্ভব।

এই লাইন অফ অ্যাকশন খুব স্বাভাবিকভাবেই সিপিআই(এম) ও সিপিআই(এম) পরিচালিত বামফ্রন্টের পক্ষে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

দেবেশ রায়—দেবেশদা আগাগোড়া রাজনীতির মানুষ। ফলে রাজনীতি বাদ দিয়ে তাঁর আখ্যানযাত্রার মূল্যায়ন সম্ভব নয় কোনোভাবেই। যতদূর জানি শেষ পর্যন্ত তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি—সিপিআই-এর সদস্যপদও ছেড়ে দেন।

সমরেশ বসুও বহু আগে—মৃত্যুর অনেক আগেই তাঁর লেখালেখির ‘আনন্দবাজারী’ রমরমা শুরু হওয়ার আগেই ছেড়ে দেন না ভাঙা সিপিআই-এর মেম্বারশিপ।

দুই আখ্যানকারের পার্টি সদস্যপদ ছাড়ার কারণ ও অভিমুখ হয়তো কিছু ভিন্নতর। স্বতন্ত্র।

তবু এই মিলটুকু লক্ষ্য করার। হয়তো বা তা সমাপতনও।

সমরেশ বসুর প্রয়াণের পর ‘প্রতিক্ষণ’-এ একটি বড়সড় প্রয়াণ লেখা লিখেছিলেন দেবেশ রায়। তাতে একজন মহিমান্বিত সর্বসময়ের লেখক—‘হোলটাইমার’ সমরেশ বসুর প্রতি আভূমি কুর্ণিশ ছিল।

দেবেশ রায়—দেবেশদা যিনি তাঁর কথোয়ালি ভঙ্গিতে—গদ্য রচনা ও নির্মাণে কর্পোরেট, লুট হওয়া ফরেস্ট, লুমপেন পুঁজি, ক্রোনি ক্যাপিটাল বিরোধী সাংস্কৃতিক সংঘর্ষে প্রায় একক, অন্তত তাঁর সময়ের যাঁরা জীবিত লেখক, তাঁদের সঙ্গে তুলনায় আনলে, সেই একক, সদা নিঃসঙ্গ গদ্যভাষী, বাংলা ভাষার বিচিত্র মোড়কের ভেতর যিনি নিজের গদ্য পরিসরকে অনায়াসে স্থাপন, প্রতিস্থাপনের মধ্য দিয়ে ক্রমশ ক্রমশ করে তুলেছেন ‘জলের মিনার’, সেই মিনারটি কোনো পোস্ট ট্রুথ হিসেবে নয়, ট্রুথ হিসেবেই জাগরুক রইল হয়তো।

//জেডএস//

লাইভ

টপ