হুমায়ূন আহমেদ প্রসঙ্গে

Send
পারভেজ হোসেন
প্রকাশিত : ০০:৫৪, জুলাই ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৫৬, জুলাই ১৯, ২০২০

আমি যখন জগন্নাথ কলেজে অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি, তখন প্রথম হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, যে বইয়ের মাধ্যমে আমার পরিচয় ঘটে তার নাম ‘শঙ্খনীল কারাগার’। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ পড়ার পর আমি খুবই বিমোহিত হই। আমার খুব আনন্দ হয়, কারণ এর আগে এরকম কোনো বই আমি পড়িনি। বইটি পড়ার পর বন্ধু গল্পকার শহিদুল আলমের সঙ্গে এটা নিয়ে আলাপ করি। এরপর সেও বইটি পড়ে এবং আমরা দুইজন মিলে হুমায়ূন আহমেদের অন্য বই আছে কিনা খুঁজি।

ওই সময়টাতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সেখানে ক্লাসিক বই পড়ানো হতো, এবং পড়া শেষে সেগুলো নিয়ে আলোচনা হতো। প্রতি সপ্তাহে পঠিত বই নিয়ে এই আলোচনা, বিতর্ক হতো বই নিয়ে। এবং এইসব আলোচনার শেষে কথা বলতেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, তখন আমরা ওই পঠিত বইগুলো নিয়ে যতটুকু বুঝিছি সেই বোঝার সীমানা বাড়িয়ে দিতেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তো সেখানে একটা পর্যায়ে হুমায়ূন আহমেদের লেখা শুধু নয়, ওই সময়টাতে আরও অনেক বই পড়ি।

সে সময়টাতে এবং পরে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি, এবং একথা মানতেই হবে, গল্প বলার একটা দারুণ ক্ষমতা ছিলো হুমায়ূন আহমদের। খেয়াল করলে দেখা যাবে, উপন্যাস কিংবা গল্প, সবখানেই তিনি প্রতি মুহূর্তেই গল্প বলছেন, উপন্যাসের প্রতিটি চ্যাপ্টারে গল্প ক্রিয়েট করছেন, প্রতিটি চরিত্রের ভেতর গল্প তৈরি করছে। এই ক্ষমতা তার ছিলো। কাকতালীয়ভাবে একটা ব্যাপার মিলে গেল, কিছুদিন যাবৎ আমি আবার পড়ছি হুমায়ূন আহমেদের সর্বশেষ উপন্যাস ‘দেয়াল’—মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু হত্যা, ১৫ই আগস্টের আগে এবং পরে এই সবকিছু মিলেই তো উপন্যাসটা, এই বইটি আমি সম্প্রতি পড়ছি, এবং দেখছি, এটা যত-না বেশি উপন্যাস—উপন্যাস হয়েছে কি, হয়নি, কোথায় দুর্বলতা, কোথায় সবলতা, সেইসব আলোচনার মধ্যে না গিয়ে বলতে চাই এই উপন্যাসের প্রতিটি চ্যাপ্টারে রয়েছে একেকটি অসাধারণ গল্প। তিনি যেখানেই যে চরিত্র তৈরি করছেন, বা তার কথা বলছেন তাকে নিয়েই একটা গল্প ভাবেছেন। এবং পাঠকের মনের মধ্যে এমন একটা পরিস্থিতি ক্রিয়েট করছেন যে, শুরু করলে উপন্যাসটা পড়তেই হবে, শেষ করতেই হবে।

আজকে হুমায়ূন আহমদেকে নিয়েই যেহেতু লেখা—তাকে আমি কঠিন সমালোচনার জায়গায় দাঁড় করাবো না, শুধু বলবো তার গল্প বলার যে অসীম ক্ষমতা, তা অন্তত আমাদের দেশে—বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যে বিরল।

হুমায়ূন আহমেদ প্রবল জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু অনেকে বই বাজারে চলছে কিনা সেটা দেখেই লেখককে বিচার করেন। আসলে আমার মতে বইয়ের কাটতি থাকা না-থাকা, বিক্রি হওয়া না-হওয়া, এসব দিয়ে একজন লেখকের বিচার হয় না। পৃথিবীর অনেক দেশে গেলে দেখা যাবে, বই নিয়ে বিলবোর্ডের পর বিলবোর্ড বিজ্ঞাপন—বেস্ট সেলার রাইটার সারা পৃথিবী জুড়ে আছে, কিন্তু জনপ্রিয়তা দিয়েই কেবল সাহিত্যকে বিবেচনা করা যায় না। আমি মনে করি না, বেস্ট সেলার রাইটার মানেই সে একজন মহান লেখক। আমাদের দেশে ব্যাপারটা আমরা গুলিয়ে ফেলেছি। বেস্ট সেলার রাইটার মানেই মহান লেখক নয়।

জীবনের কথা সব লেখকই বলতে চান। হুমায়ূন ভাইয়ের লেখা পড়লেও তাই আমরা পাই—উনিও জীবনের কথা বলেছেন, তার সাহিত্যে যে হিউমার তা অসাধারণ, কিন্তু জীবনের ভেতরে মানুষের যে সিরিয়াসনেস থাকে তাদের ভাষায়, চিন্তায়, আর সেগুলো নিয়ে লেখকের যে একটা ভাবনা বা দায় থাকে সেটা থেকে তিনি সবসময়ই একটু দূরে থেকেছেন বলে আমি মনে করি। তার সব বই পড়লে মনে হয় একটা জায়গায় গিয়ে উনি একটা হিউমার দিয়ে—একটা সিরিয়াস কথা বলতে গিয়েও একটা তামাশা দিয়ে উনি সেই জায়গাটাকে এড়িয়ে গেলেন। জীবনের মধ্যে আমাদের ভাবনার যে গভীর জায়গাগুলো সেগুলো নিয়ে ডিল করা, হ্যান্ডেল করা, মানুষের চিন্তার নতুন মুখ তৈরি করে পথ দেখানো, সেগুলো তিনি করেননি, তিনি এড়িয়ে গেছেন। জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা-চিন্তার ভেতরে তিনি ঢোকেননি। মহান লেখকরা আমাদের জীবনের সেইসব চিন্তা-ভাবনার গভীরে গিয়ে আমাদের ভাবান। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ সেটা করেননি, তিনি অনেক সিরিয়াস প্রসঙ্গকে হাসি-তামাশা করে স্কিপ করে গেছেন। তবে একথাও সত্য, তিনি আমাদের জীবনের অনেক দিক দেখিয়েছেন—ছেলেদের, মেয়েদের, মানুষের, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত জীবনের।

আরেকটি ব্যাপার, যারা ক্লাসিক, যাদেরকে আমরা প্রথমে পড়ি, পড়তে হয়, এবং অনিবার্য—মানিক, বিভূতি কিংবা তারাশঙ্কর, অথবা ইলিয়াসের কথা বলা যায়, অথবা যদি তলস্তয় কিংবা দস্তয়েভস্কির কথা ধরি, যদি তাদের উপন্যাস পড়ি, দেখা যাবে প্রায়ই বাক্য বেশ দীর্ঘ। হুমায়ূন আহমেদের বাক্যের দিকে দেখলে দেখা যাবে তার বাক্যগুলো খুব বেশ দীর্ঘ নয়—এই যে দাঁড়ি দিয়ে বাক্যকে খাটো করা, এটা নিয়ে ভাবা গুরুত্বপূর্ণ। যেসব মহান লেখকদের নাম বললাম, তাদের একেকটি বাক্য যে এক প্যারা, কিংবা কখনো তারও বেশি, এই ব্যাপারটা কিন্তু পাঠকের মনে একটা প্রভাব ফেলে। এই যে একটা দীর্ঘ বাক্যকে বারবার পড়ে তার ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করা, একটা ভাবনার মধ্যে ডুবে যাওয়া, ভাবনার চর্চা তাতে হয়, কিন্তু বাক্য ছোটো হয়ে গেলে অধিকাংশ সময় পাঠক যদি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পেয়ে যান তাহলে তার ভাবনার জায়গাটা তো থাকলো না। মহান লেখকরা আমাদের সেই ভাবনার মধ্যে ডুবে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। শুধু পাঠককে পার করে দিলেই হয় না, লেখককে পাঠকের হাত ধরে একটা ভাবনার মধ্যে ডুবিয়েও দিতে হয়, আর কথাসাহিত্যে সেটা খাটো বাক্য দিয়ে হয় না। আমি অবশ্যই মানি তিনি অসাধারণ গল্প বলতে পারতেন, কিন্তু গল্পটা শেষ হওয়ার পর কোনো স্থিরতার ভেতরে যেন আমরা যেন ঢুকতে পারি না। তিনি যে ভাবনার কোথাও রেশ রেখে যাবেন, সেটা যেন হয় না, তার বই পড়ার পর আমার ক্ষেত্রে হয়নি। আর সহজে সবকিছু পাঠককে বুঝিয়ে দেওয়ার কারণেই কিন্তু তিনি অল্প সময়েই পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। হুমায়ূন আহমেদ পড়তে পাঠকের কষ্ট কম করতে হয় বলেই, তিনি সহজেই জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। মহান লেখকদের পড়তে সবসময়ই পাঠকদের একটা প্রস্তুতি নিতে হয়। ক্লাসিক লেখকদের কথা বাদই দিলাম, সমকালে মার্কেজের কথাও যদি বলি, সেখানেও দেখা যাবে তার গল্পের মধ্যে ঢুকতে গেলে পাঠকের অনেক ভাবনা আসে, গল্পের ভেতরে প্রবেশের পথটা খুব সহজ নয়।

লেখক যদি জনপ্রিয়তার দিকে যেতে চান, তরলতার দিকে যেতে চান, সেটা একটা পথ, আর যদি জীবনের গভীর অন্বেষণের মধ্যে যেতে চান সেটাও একটা পথ, লেখক সবসময় ইচ্ছেমতো একটা পথ খুঁজে নিতে পারেন।

হুমায়ূন আহমেদ আমাকে চমকিত করে, কখনো ভাবায় কিন্তু আমাকে স্থিরতা দেয় না। আমাকে টেনে ধরে না, আমাকে খামচে ধরে না।

তবে শেষে বলবো—শিল্প-সাহিত্যে অনেক রকমের পথ থাকে। হুমায়ূন আহমেদ যে পথে যেতে চেয়েছিলেন, তিনি সেই পথের রাজা হয়েছিলেন।

শ্রুতিলিখন : মো. মাসুদ হোসেন                 

//জেডএস//

লাইভ

টপ