মোহাম্মদ রফিকের সাক্ষাৎকার

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মুশফিকুর রহমান
প্রকাশিত : ১৫:৩৪, জুলাই ৩১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৬, জুলাই ৩১, ২০২০

মোহাম্মদ রফিক ১৯৪৩ সালের ২৩ অক্টোবর বাগেরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলন ও কবিতায় এবং স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে কাব্যিক রসদ যুগিয়ে তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন। মোহাম্মদ রফিক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ২০০৯-এ অবসর নিয়েছেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।

বাংলা ট্রিবিউনের ঈদুল আযহা সংখ্যার জন্য ফোনে মোহাম্মদ রফিকের এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়েছে।মুশফিকুর রহমান : শুভ সন্ধ্যা। স্যার, কেমন আছেন?

মোহাম্মদ রফিক : এইতো বেশ আছি, তারপর বলো কী খবর?

 

মুশফিক : জি স্যার, বেশ আছিআমরা আজকে একটু কথা বলতে চেয়েছিলাম, স্যার

মোহাম্মদ রফিক : আচ্ছা, তবে কীভাবে কথা বলা যায় বলো? কী বিষয়ে জানতে চাইছো?

 

মুশফিক : বর্তমানে মহামারির যে বিশ্ব পরিস্থিতি, সেটা নিয়ে আপনি কী রকম ভাবছেন বা আপনার মতামত জানতে চাই।

মোহাম্মদ রফিক : আচ্ছা, শোনোঊনবিংশ শতকে, আমেরিকার বোস্টন শহরের কাছে এক গ্রামে কোনো অচেনা এক লোক, তার পরিচয় কেউ জানে না, সে তার কবরে এপিটাফ লিখেছিলো—

Debt is a debt,

To nature due,

I have paid by own,

Now you pay yours.

Debt মানে ঋণ সম্প্রতিকালে এই এফিটাফটা অনেকের চোখে পড়ছে, কারণ এর মধ্যে একটা বড় সত্য লুকিয়ে আছেএই কথাটা বলা নোভেল করোনার প্রেক্ষিতেএটা হঠাৎ কোনো ব্যাপার তো নাসংক্রমণ চলছে, চলে এসছে এবং চলবেএই করোনা গিয়ে কোথায় থামবে তা আমরা জানি না

 

মুশফিক : একদম তাই, স্যার

মোহাম্মদ রফিক : এখন তুমি আমাকে বলো যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কয়টা?

 

মুশফিক : হ্যাঁ, একটাই!

মোহাম্মদ রফিক : পৃথিবী একটাই। হিউমিনিটি কয়টা? একটাই। প্রকৃতি কয়টা! সেটাও একটাই। মানে সবটাই একটা।

কিন্তু তার মধ্যে এই যে বিভাজন প্রক্রিয়া পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ…এই যে বিভাজন। কেন? কারা করেছে?

 

মুশফিক : মানুষ।

মোহাম্মদ রফিক : মানুষ কি সব মানুষ করেছে? কারা করেছে? কাদের সঙ্গে করেছে? কেন করেছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অত্যন্ত জরুরি।

 

মুশফিক : জি, স্যার।

মোহাম্মদ রফিক : যেমন, আমি তোমাকে একটা উদাহরণ দেই। পৃথিবীতে আর্য বলে কোনো জাতি নেই, পৃথিবীতে দ্রাবিড় বলে কোনো জাতি নেই। তাহলে কারা আর্য এবং দ্রাবিড় পৃথিবীর ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছে?

 

মুশফিক : হ্যাঁ, এটা একটা প্রশ্ন বটে।

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ, পৃথিবীতে এক জায়গার মানুষ সবাই ছিল না, তাদেরও রঙের বিভিন্ন পরিবর্তন হয়েছে।প্রকৃতির কারণে, ভূ-প্রকৃতির কারণে, আবহাওয়ার কারণে। আবার আফ্রিকার সব মানুষই কালো ছিল না, আবার আফ্রিকার সব মানুষই এখন আবার কালো নয়। যেমন মিশরের মানুষ কালো নয়, মরক্কোর মানুষ কালো নয়, লিবিয়ার মানুষ কালো নয়, অনেক জায়গার মানুষই কালো নয়। কিন্তু রঙের ভিত্তিতে মানুষকে বিভাজিত করা—এটা কারা করেছে? কেন করেছে?

এখন আসো দ্বিতীয় জায়গায়। সেটা হচ্ছে, মানুষের আশ্রয়—আশ্রয় বলতে কী বোঝে সেটা মানুষকে তুমি জিজ্ঞেস করো। সব মানুষই প্রায় বলবে, হয় ধর্ম অথবা বিজ্ঞান। এই দুটোর উপর মানুষের আস্থা।

এখন মুশকিল হচ্ছে যে, ধর্মের নিজস্ব কোনো ক্ষমতার বলয় নেই, ধর্মের নৈতিকতা আছে, অধ্যাত্মবাদ আছে। ধর্মকে প্রচারিত হতে তাকে অন্য কারো উপরে ভর করতে হয়। এবং তখনই ধর্মকে নিয়ে নানা রকম খেলা হতে থাকে, হয়েছে এবং পৃথিবীব্যাপী হচ্ছে।

 

মুশফিক : কিন্তু এই প্রসঙ্গ দিয়ে আমরা করোনা পরিস্থিতি কীভাবে ব্যাখ্যা করবো?

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ, সেটা তো প্রথমেই বলে দিয়েছি। ওই যে, 'Debt is a debt, To nature due' আর অপেক্ষা করো, সেখানেই আসছি।

 

মুশফিক : হ্যাঁ স্যার।

মোহাম্মদ রফিক : এখন একই সমস্যা বিজ্ঞানেরও। কিন্তু বিজ্ঞানের কোনো নিজস্ব নৈতিকতা নেই। ধর্মের এথিকস আছে কিন্তু বিজ্ঞানের কোনো এথিক্স নেই। মানে নির্দিষ্ট নৈতিকতা নেই যে, সে এই নৈতিকতা সেই নৈতিকতা ধারণ করে। তারও নিজস্ব কোনো শক্তিশালী বাহুবল নেই। তাকেও কারো না কারো উপরে ভর দিতে হয়।

 

মুশফিক : আচ্ছা, তবে এখানে ধর্ম ও বিজ্ঞানের একটা মিল আছে।

মোহাম্মদ রফিক : একদমই তাই। দুটোকেই বিভিন্নভাবে, স্বার্থন্বেষী মহল আমি বলবো, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করছে।

যেমন, আমাদের ধর্মের কথাই বলি। আমাদের নবীজি সবচেয়ে যে শব্দটার উপর বেশি জোর দিয়েছেন সেটা হচ্ছে 'ঐক্য'। কোরআন শরীফেসবচেয়ে বেশিবার যেটা এসেছে সেটা হচ্ছে 'ঐক্য'। কিন্তু আজকে কী অবস্থা? কত রকমের মুসলমান পৃথিবীতে বিরাজ করছে। ক্রিশ্চিয়ান চার্চ না হলেও প্রায় ১৪-১৫ রকমের এখন পৃথিবীতে।আমি যতটুকু জানি এদের মধ্যেও তিন ভাগ বিশ্বাসী, সেক্যুলার আর একটা আমাদের সুফিদের মতো একটা স্পিরিচুয়াল গ্রুপ একটা আছে। এই যে বিভাজনের প্রক্রিয়া এটা কেন হয়েছে? কীভাবে হয়েছে? এবং এই বিভাজন সমস্ত কিছুতে এবং প্রকৃতিতে গোলযোগ সৃষ্টি করেছে।

আচ্ছা, তারপরে হচ্ছে যে, মানুষ—মানুষ নিয়ন্ত্রক, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষ কী?

মানুষ কী করেছে পৃথিবীতে? যদি ধর্মের উদাহরণ দেই তবে বলতে হয়, মানুষ প্রথমে এসেই, যে তাকে পাঠিয়েছে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তিনি যা করতে নিষেধ করেছে মানুষ তার অগোচরে তাই করেছে। বুঝতে পারছো তো? তারপর কী হল, ভাই ভাইকে হত্যা করেছে। অ্যাবেলকেইন, আমরা বলি হাবিল-কাবিল, একই ঘটনা। আর এই যে কাহিনিগুলো এগুলোর অনেক জন্ম-জন্মান্তর আছে। সে যাই হোক, সেখানে আমি যাব না। আমি জাস্ট বলতে চাই যে, ধর্মকে যদি আমরা মানি তবে এই দুটো জিনিস খুবই স্পষ্ট, মানুষ প্রথমে যে তাকে পাঠিয়েছে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এবং দ্বিতীয়ত, ভাই ভাইকে হত্যা করেছে।

এই ধর্মটা তো এসেছে বহুকাল আগে, হযরত মুসা আঃ সালাম-এর সময় থেকেই ধরি। যখন মুসা নবী এসেছেন তখন আর একজন মানুষ কিন্তু তৈরি হয়েছে, তার নাম ইডিপাস বা অডিপাউচ। তো সে কী করলো, স্ট্রিংস-এর মুখোমুখি দাঁড়ালো। স্ট্রিংস তাকে একটি ধাঁ ধাঁ ছুড়ে দিয়েছে। যারা ধাঁ ধাঁ’র উত্তর দিতে পারছে না, স্ট্রিংস তাদের জীবন নিয়ে নিচ্ছে বা তাদেরকে উধাও করে দিচ্ছে। ইডিপাস উত্তরটা ঠিক দিয়েছে। ইডিপাস বলেছে 'মানুষ', ইডিপাস কিন্তু মানুষ, সে মানুষের প্রতিনিধি। তবে ইডিপাস এই উত্তর দেওয়ার আগে কী করেছে? অগোচরে হোক, অবচেতনে হোক সে তার পিতাকে হত্যা করেছে এবং আর কী করেছে, তার মাকে বিয়ে করে সন্তান উৎপাদন করেছে, যার ফলে কাহিনিক্রমে যে নগরীতে ছিল সেটাই ধ্বংস হয়ে গেলো। গেল তো?

কিন্তু আমরা এভাবে দেখি না, আমরা সহজ-সহজ ব্যাখ্যা যেটা বইয়ে দেখি, সেগুলো পড়ি।

তৃতীয়ত, এবার আসোরোম বা রোমান সভ্যতায়, খুব বড় সভ্যতা। রোমান সভ্যতা কীভাবে তৈরি হয়েছে? ‘রমুলাস’ এবং ‘রেমাস’ জমজ ভাই। রমুলাস রেমাসকে হত্যা করে রাজা হয়েছে এবং সেই এলাকার গোত্রপতি হয়েছে। হওয়ার পরে প্রথমে সে করেছে কী? পুরো জাতিকে সে একটা মার্শাল জাতিতে পরিণত করেছিলো, মানে তারা সব সময় যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিলো। এবং তাদের দুই পাশে আরও দুটো গোত্র ছিল। এক পাশে ছিল ট্রাবাইন বলে একটা গোত্র, আরেক পাশে ছিল ইনসেপ্টানবা ইউসেপ্টান নামে আরেকটা গোত্র। তারা দেখল যে ট্রাবাইন মেয়েরা বেশ সুন্দরী, দেখতে-শুনতে ভালো। তারা করেছে কী—একদিন ধর্মীয় উৎসবের নাম দিয়ে ট্রাবাইনদের দাওয়াত দিয়েছে। তো ট্রাবাইনরা তাদের বিশ্বাস করে বউ-বাচ্চা নিয়ে সেই অনুষ্ঠানে গিয়েছে। তারপর রাত্রিবেলা সমস্ত পুরুষ মেরে মেয়েদের দখল করেছে। এই গেল প্রথম পদক্ষেপ। দ্বিতীয় পদক্ষেপ হচ্ছে এই যে, ইনসেপ্টান বা ইউসেপ্টান যারা ছিলো, তারা একটু অগ্রসর জাতি ছিল। তাদের ইঞ্জিনিয়ারিংও ব্যবসা বাণিজ্যের একটা পরিচ্ছন্ন সোসাইটি ছিল। তাদের খুব উন্নত বলবো না, তাদের সমাজব্যবস্থা বেশ গোছানো ছিল এবং ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তারা বেশ দক্ষ ছিল। তারা লোহা-তামা ইত্যাদির কাজ জানতো, সেগুলো দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতো এবং তাতে বেশ সচ্ছল অবস্থা তৈরি হয়। তাদের সমাজ সুশৃঙ্খল ছিল। তো করলো কী, এদের সাথে প্রথমে ভাব করলো এবং তাদের কাছ থেকে তাদের যে বিদ্যা, সেগুলো নিলো। কী করে নাগরিকত্ব দিতে হয়, কী করে কনস্টিটিউশন তৈরি করতে হয়, কী করে সমাজের শৃঙ্খলা আনতে হয় ইত্যাদি। তো এখন বোঝা যাচ্ছে যে, ইনসেপ্টান বা ইউসেপ্টান ছিল সুমেরীয়মেসোপটেমিয়ান সভ্যতার লোক। সুতরাং এদের আগে থেকেই এসব সম্পর্কে ধারণা ছিল। এরা গ্রিস হয়ে এখানে এসেছিলো। ইনসেপ্টানবা ইউসেপ্টান মেয়েরা খুব খোলামেলা ছিল, তারা ঘোড়ায় চড়তে, গান গাইতো। তাদের দেখে রোমানরা খুব ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়লো। একদিন ইনসেপ্টানবা ইউসেপ্টান যুবক এক রোমান মেয়েকে রাতে একা পেয়ে রেপ করলো। আর এর বদলা হিসেবে রোমানরা সকল ইনসেপ্টানবা ইউসেপ্টান পুরুষদের মেরে মেয়েগুলোকে দখল করে নিয়ে চলে আসলো।

 

মুশফিক : যৌনদাসী হিসেবে তাদের অধিগ্রহণ করা হলো?

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ, সে রকমই। শুধু যৌনদাসী নয়, কেউ কেউ বিয়ে করলো।

তবে এখানে মূল ব্যাপারটা হচ্ছে রোমান ইতিহাস যেটা, সেটা শুরু হয়েছে খুন-ধর্ষণও বর্বরতা ইত্যাদি দিয়ে।

 

মুশফিক : সেটা তো স্যার সকল সভ্যতা বা ইতিহাসেই দেখতে পাই

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ সে তো আছেই। তবে রোমানদের আসল চেহারা কী সেটা তুমি বুঝতে পারবে এই যে, পম্পেই নগরী আছে, সেখানে খননকার্য চলছে। সেখানে বীভৎস যৌনাচারের ছবি এবং প্রতিটি হাড়ে সিফিলিসের দাগ পাওয়া যাচ্ছে।

 

মুশফিক : মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, পম্পেই নগরী একটা ব্যাভিচারের নগরীই ছিল?

মোহাম্মদ রফিক : মূলত রোমানদের সভ্যতাটাই হচ্ছে ভোগবাদী সভ্যতা। ভোগবাদের দুটি দিক আছে, একটা হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিকতা এবং নারী ভোগ, এই হলো ভোগবাদ। এইতো গেল রোমানদের চেহারা। এখন গ্রিকদের চেহারা কী?

গ্রিকরা কী করেছে? গ্রীক বলতে তো শুধু এথেন্স না।স্পর্টা, ইথাকা, ম্যাসিডোনা সহ আরও বহু জায়গা আছে। গ্রিক যে ভাষা এই ভাষা তো তারা ‘ফাইনোশিয়ালদের’ কাছে পাওয়া, লেখাটাও তাদের কাছে পেয়েছে। এখন যারা লেবাননের অধিবাসী তাদের ডিএনএ-র সাথে তাদের মিল পাওয়া যায়। এবং গ্রিস দুই ভাগে ভাগ ছিল, একটা হচ্ছে এথেন্স আরেকটা স্পার্টা। এরা পরস্পরের সাথে ২০ বছর যুদ্ধ করেছে। এখন রোমান এবং গ্রিসের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে—গ্রিসরা গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে, আসলে যেটা হচ্ছে অভিজাত-তন্ত্র…

 

মুশফিক : রাজতন্ত্রের একটা রূপ?

মোহাম্মদ রফিক : অন্য একটা রূপ। কখনো রাজতন্ত্র হতো কখনো অভিজাত-তন্ত্র হতো। কিন্তু সাধারণ মানুষ কখনোই সেই গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। সুতরাং ওটাকে তো আর গণতন্ত্র বলার কোনো কারণ নেই। তখন তাদের অর্থনীতি কী ছিল? তখন তো সকল ব্যবসা-বাণিজ্য চলতো ভূমধ্যসাগর দিয়ে। তাদের প্রধান অর্থনীতি ছিল ভূমধ্যসাগরে ডাকাতি। আর যেসব জায়গা তারা দখল করত সেখানে লুটপাট করা এবং সেই একই পদ্ধতিতে পুরুষদের মেরে মহিলাদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করতো এথেন্সে। কখনো কখনো অভিজাত্যের ভেট দিতো সেই নারীদের। বাদ-বাকিদের পতিতা বানাতো এবং পতিতা বানিয়ে তাদের কাছ থেকে উচ্চ হারে কর আদায় করতো। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, যাদের আমরা মহামানব বলি সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টোটল এরাও এসব মেয়েদের উপভোগ করেছে। কিন্তু এদের উপরে যে অত্যাচার হয়েছে তা নিয়ে একটা কথাও বলেনি। কোথাও তুমি এসম্পর্কে তাদের একটা লাইনও বের করতে পারবে না।

 

মুশফিক : আমিও এই কথাটা নতুন শুনছি।

মোহাম্মদ রফিক : এদের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র একজনে প্রস্টেট করেছে, তার নাম ভাস্কর প্রিক্সিটেলি। তার প্রেমিকার নাম ছিল ফাইরিনে। এই যে আজকে যে Venus de Milo-এর মূর্তি দেখো, হাত কাটা, এই হচ্ছে সেই ফাইরিনে। তো এগুলোর প্রটেস্ট হিসেবে প্রিক্সিটেলি মূর্তিটা প্রধান সড়কে দাঁড় করিয়ে দেয়। তারপর কেস-ফেস হয় সেই ইতিহাসে আমি যাব না। পরে অবশ্য সেই কেসে শাসকদের বিরুদ্ধে প্রিক্সিটেলি জিতে আসে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই যে, প্রিক্সিটেলির পক্ষে এরা কিন্তু কেউ দাঁড়ায়নি।

আরেকজন অবশ্য প্রস্টেট করেছে সে হচ্ছে নাট্যকার ইউরিপিডিস। সে করলো কী, এথেন্স এবং স্পার্টার মধ্যে যখন যুদ্ধ হচ্ছে, তখন সেখানে মাইনোস বলে একটা ছোট্ট দ্বীপ ছিল। তো এথেনিয়েনরা তাদের খবর পাঠাল এই বলে যে, তোমরা আমাদের সাথে যুদ্ধ করো। মাইনোস বললো, তারা অনেক ছোট এজন্য তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না, কোনো দলে যাবে না। ফলস্বরূপ এথেন্স মাইনোস দখল করে নিলো, একই কায়দায় পুরুষদের হত্যা করে মহিলাদের নিয়ে আসা হলো। যেটা দেখে ইউরিপিডিস তার উপর একটা নাটক লিখলো। সে তো এই ঘটনা লিখতে পারে না, তাহলে তো তাকে হত্যা করা হবে। তাই সে করলো কী ‘The Trojan Women' নামে একটি নাটক লিখলো, ওই যে ট্রয় নগরী ধ্বংস করে যে গল্পটা সেটা উপজীব্য করে সে এই নাটকটা লিখলো। পরবর্তীকালে এটা হলিউডে বেশ বিখ্যাত একটা মুভিও হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইউরিপিডিস রক্ষা পায়নি, ইউরিপিডিস প্রথম লেখক যে নির্বাসিত হয়েছিল এবং ম্যাডিসনে মারা গেছে।

আচ্ছা, এখন সক্রেটিসের এত জনপ্রিয়তা কেন? এটাও জানতে হবে। সক্রেটিসের একটা কথা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়, সেটাকে অনেকটা স্লোগানের মতো ব্যবহার করা হয়। সেটা হচ্ছে 'know thyself' বা 'নিজেকে জানো'। তো এইটা এতো জনপ্রিয় কারা করেছে? ইতিহাসে আগে তো এটা এতো জনপ্রিয় ছিল না। এটি জনপ্রিয় করেছে পুঁজিবাদ। কারণ মানুষ যদি ইন্ডিভিজুয়াল হয়ে যায় তাহলে তাকে তো শোষণ করা সহজ। সুতরাং পুঁজিবাদ তার এই বাক্যকে জনপ্রিয় করে একে বেদবাক্য হিসাবে চালাতে শুরু করল এবং শোষণ করতে শুরু করলো। যদি গ্রিসের মূল কাউকে বলতে হয় সে ছিল সোলো। স্পার্টা যে তৈরি করেছে তার নাম হচ্ছে লাইকারগ্যার। আরে এথেন্স হচ্ছে সবসময়ের জন্য যুদ্ধবাদী।

 

মুশফিক : মানে বাহুবলে বিশ্বাসী

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ, তো তারা এই যুদ্ধ প্রথা রাখতে গিয়ে করলো কী, সমকামিতার  দিকে ঝুঁকে পড়লো। সমকামিতাকে তারা বাধ্যতামূলক করলো। সেটা কীভাবে? কোনো বাচ্চা হলে তারা মায়ের কোল থেকে তাকে নিয়ে পাহাড় থেকে ফেলে দিতো। যারা মারা যেত তো যেতোই, আর যারা বেঁচে থাকতো তাদের সাত বছর বয়সে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হতো। তারপর তাদের যখন বারো বছর বয়স হতো, তখন একজন অগ্রজ বীরের কাছে প্রশিক্ষণের জন্য যেতে হতো এবং তার মানে হচ্ছে সে তখন বীরের যৌনসঙ্গী। তো সেই বীরের দায়িত্ব ছিল তাকে যুদ্ধবিদ্যা শেখানো এবং যৌনতা উপভোগ করা।

 

মুশফিক : তার মানে সেখানে গুরু-শিষ্য নয়, অন্য বিনিময়ের একটা ব্যাপার ছিল।

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ একদম বিনিময়। তাতে করে মেয়েরা এক ধরনের স্বাধীনতা উপভোগ করতো।তো আমরা দেখেছি এসেন্সে ঘরের মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়া ছিল কিন্তু এখানে তারা এক ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করতো। অনেক সময় দেখা গেছে তারা পূর্ণিমা রাতে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে উলঙ্গ হয়ে উৎসব করতো। মানে এরা এক ধরনের স্বাধীনতা উপভোগ করতো। কারণ এখানে ছেলেদের মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ থাকছে না। কিন্তু তাদের তো সন্তান দরকার, তা না হলে শুনবো বাহিনী কীভাবে গঠিত হবে! সুতরাং বিবাহ তো করতে হবে। এখন আমাদের দেশে নববধূকে যেভাবে বিয়ের আগে সাজানো হয়, কিন্তু ওদের ক্ষেত্রে সেটা ছিল উল্টো।সেখানে নববধূকে পুরুষ রূপে সাজানো হতো। পুরুষটি গিয়ে শুধু যৌনকর্ম সেরে আবার বেরিয়ে আসতো।

 

মুশফিক : তার মানে দাঁড়াচ্ছে সেখানে কনসিভ করাটাই মুখ্য ব্যাপার, বিয়ে নয়।

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ কনসিভ করাটাই মুখ্য ব্যাপার এবং হতো কী, সে মেয়েরা স্বামী থাকা সত্ত্বেও অন্য পুরুষের সাথে ব্যভিচারে জড়াতে পারতো বা সম্পর্কে যেতে পারতো। এবং এরকম ইতিহাস হচ্ছে যে তাদের রানীও এথেন্সের এক নেতার সাথে সম্পর্কে যুক্ত ছিলেন এবং এটা তার স্বামীর অনুমতি নিয়েই এবং তার গর্ভে তার সন্তান এসেছিলো। আবার এই যে হেলেন, সে যে প্যারিসের সাথে প্রথম পালিয়ে এসেছে তা কিন্তু নয়। এর আগেও সে পালিয়ে ছিল তার ১৪ বছর বয়সে এবং যার সঙ্গে পালিয়ে ছিল তার বয়স ছিল প্রায় ৭০ বছর।সেখানে হেলেন ভালোই ছিল, পরে তার স্বামী তাকে ফিরে যেতে বললো কারণ সে বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে মরে যাবে এই জন্য। এবং সিসিইউজ বেশ ক্ষমতাশালী ছিল, মূলত সে-ই এথেন্সের প্রতিষ্ঠাতা। তো এই কাহিনি তো অন্য কিন্তু যুদ্ধটা হয়েছে অন্য কারণে যে ভূমধ্যসাগরের যে পথ সেটা কারা দখল করবে এইদিকে লোকেরা নাকি ঐদিকের। এখন লোকদের জিজ্ঞেস করবা, মানবসভ্যতা? বলবে এ তো গ্রিক সভ্যতা। আসলে তো তা না। মানব সভ্যতা রোমান সভ্যতা তাও তো নয়। মানব সভ্যতা অনেক আদি সভ্যতা। ১১ হাজার বছর আগে চীনে কবিতা লেখা হয়েছে, গান লেখা হয়েছে, কৃষি কাজ হয়েছে। ভারতে হয়েছে।

 

মুশফিক : সিন্ধু সভ্যতাটাও তো বেশ পুরনোবা সুমেরীয় সভ্যতা?

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ, সিন্ধু সভ্যতা যে কত আগের তা তো এখনো বের হয়নি, বেরোবে।

 

মুশফিক : হ্যাঁ, এটাতো রোমান এবং গ্রীক সভ্যতার ও অনেক আগের

মোহাম্মদ রফিক : আরে গ্রীক এবং রোমান সভ্যতা ছাও। শোনো, আমাদের এখানে ২৮ হাজার বছর আগে অলংকার এবং মুদ্রা পাওয়া গেছে সেগুলো তো অপ্রকাশিত, সে তথ্য বিশ্ব মোড়লরা রেখেছে। যাই হোক, সেগুলো যদিও আরও অনেক প্রমান সাপেক্ষ। আসলে যে কথাটা আমি তোমাকে বলতে চাচ্ছি, এই যে মানব সভ্যতার যে ইতিহাস এবং মানুষের যে ইতিহাস তা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার ও বিকৃতিতে ভর্তি।ওই যে বললাম মানুষের ঐক্য এটা কোনদিন তৈরি হবে না এবং যারা এ বিভাজন প্রক্রিয়ার আদিগুরু তারা এটাকে একের পর এক সুচারুভাবে করে যাচ্ছে।

এখন আসো বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের কি অবস্থা। আমি শেষ করবো এই বিজ্ঞানের ব্যাপারটা দিয়ে। হ্যাঁ তুমি গ্যালিলিও সম্পর্কে পড়েছো।

 

মুশফিক : জি স্যার কিছু কিছু দেখেছি।

মোহাম্মদ রফিক : গ্যালিলিও তে মূল প্রতিপাদ্য বিষয় যেটা সেটা হচ্ছে বৈজ্ঞানিক এর দায়, বৈজ্ঞানিকের কর্তব্য এবং বৈজ্ঞানিক অপরাধবোধ। গ্যালিলিও কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপরাধবোধেও ভুগেছে। ব্যাস!

আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আর একজন নাট্যকার তার নাম হচ্ছে, ফ্রেডরিশ ডুরেনমার্থ, একটা দুই অঙ্কের ছোট নাটক লিখেছিলেন। সেই নাটকের অনুবাদ নাম হচ্ছে 'পদার্থবিদগণ'।নাটকের বিষয়বস্তুটা কি সেটা বেশ ইন্টারেস্টিং।তো সেখানে যে বিজ্ঞানী সে এমন একটা জিনিস আবিষ্কার করেছে যে সেটা যদি ব্যবহার করা হয় তাহলে মানব-দানব সব ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং সে করেছে কী নিজেকে পাগল সাজিয়ে সে পাগলা গারদে গিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। তো পাগলা গারদে যারা দেখাশোনা করে বা ওদের এসাইলাম বলতে পারো, তো যে দেখাশোনা করে সে এক বামন বুড়ি।তো সে সেখানে গিয়ে আবিষ্কার করে আরও দু'জন বিজ্ঞানী আছে যারা তাদের পাগল বলে পাগলা গারদে আছে, আসলে তারা বিজ্ঞানী বটে কিন্তু তারা অন্যদলের।এবং তারা এখানে এসেছে সেই বিজ্ঞানীর আবিষ্কার এর খবর পেয়ে এবং তার কাছ থেকে ফর্মুলা কোনোভাবে বের করে নিয়ে যায় কিনা এই ধান্দায় তারা সেখানে এসেছে। মোরবিয়া সেই দুই বিজ্ঞানীদের বোঝাচ্ছিল যে, 'শোনো আমরা বরং এখানে থেকে যাই। কারণ আমরা যদি বের হই, তাহলে আমাদের জ্ঞান দিয়ে যে জিনিস তৈরি হবে তাতে করে এমন ধ্বংস হবে যে সমস্ত মানুষ আবার এক হয়ে যাবে। অর্থাৎ ধ্বংসের বিরুদ্ধে মানুষ আবার এক হয়ে যাবে এক হাতে দেয়া যাবে না তার চেয়ে বরং আমরা এখানেই থাকি'। তো তারা সেখানেই থেকে গেল এবং এর মধ্যে একজন মনোবিজ্ঞানী মহিলা, সে হচ্ছে আসল পাগল, এরা তো সব নকল পাগল।তো আসল পাগল এসে করেছে কী, এদের সাথে ভাব করে এদের আসল মতলবটা জেনে নিয়েছে। যে ওই লোকটা কি এমন তৈরি করতে চেয়েছিল যা দিয়ে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এখন মোরবিয়াস টের পেয়েছে যে ওই মহিলা তো সব জেনে গেছে। সুতরাং যে কোনোভাবেই কোনো না কোনো ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এবং সে ঘুমালেই স্বপ্নে দেখে যে পৃথিবী নামক গ্রহটা দূরে একটা হলুদ নক্ষত্রের চারিদিকে রেডিয়াক্টিভ গ্রহ হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে আর ঘুরপাক খাচ্ছে। অর্থাৎ সে এখন দূষিত। এখন আমরা কি রেডিয়াক্টিভ গ্রহের অবস্থায় আছি-না? আমরা কি সেই পাগলাগারোদে বসবাস করছি না?

আমি শেষে তোমাকে যেটা বলতে চাই, সেটা হচ্ছে, আমরা হুইটম্যানের কবিতা পড়ি কিন্তু আমাদেরকে জানানো হয় না যে হুইটম্যান কবিতার চেয়েও গদ্য চতুর্গুণ বেশি লিখেছেন, সে গদ্য কিন্তু আমরা দেখি না, পাই না কেন? হুইটম্যানের একটা লেখায় আছে হুইটম্যান বলছেন, 'আমেরিকা, তুমি এই যে বাড়ি-ঘর সুরম্য-অট্টালিকা তৈরি করছ এগুলো না করে তুমি সমস্ত আমেরিকাকে একটি পাগলা গারদে রূপান্তরিত করো, অতি দ্রুত একটি পাগলা গারদে রূপান্তরিত করো'। তো আমরা কি আজ সেই সত্যে উপনীত হইনি?

তো এই যখন রেডিয়াক্টিভ একটি পৃথিবী এই যখন অবস্থা, তুমি খেয়াল করে দেখো, এই করোনাভাইরাস পৃথিবীর প্রায় সমস্ত মানুষকে মূর্তিতে রূপান্তরিত করেছে।এখন কোন মানুষ গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র বিপ্লব দিয়ে কথা বলছে?

 

মুশফিক : এখন কেউই না প্রায়

মোহাম্মদ রফিক : আর ও বললেই কি এসে-যায়! ওতো বর্গীয়। ওর পক্ষে তো আর কিছুই করা সম্ভব না। ও শুধু একটা মোবাইলে মেসেজ দিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভুগবে যে আমার কথা তো আমি বলেই দিয়েছি, আমার দায় শেষ। ও আর কিছু করবে না। সুতরাং এসব কথা এখন ব্যর্থ পরিহাস। এখন যে অবস্থা এখন পৃথিবীতে যারা মোড়ল তারাই বারবার আসবে, এই অক্ষম রাজনীতিবিদেরা এবং দুর্বৃত্তরাই ক্ষমতায় আসবে।

আবার অনেকে ভাবছে করোনাভাইরাস এর পর মানুষের একটা পরিবর্তন আসবে।একটা কথা আছে, 'সব কিছুরই পরিবর্তন হয় কিন্তু মানুষের পরিবর্তন হয় না'।এবং মানুষ এমনই একটি জীব সে যা, তাইই থাকবে। এবং আমার ধারণা, মানুষ তাই থাকবে এবং আরও বাজেভাবে ধাবিত হবে। এবং তার সেন্ট্রোমও তো দেখাই যাচ্ছে। এবং আমি দেখলাম এক লোক বিলেতের একজন সে নাকি ঐতিহাসিক কেউ তার নাম জানে কিনা জানি না, তবে আমি তার নাম জানি। তার নাম হচ্ছে Douglas Murray। সে একটা বই লিখেছে বইটার নাম হচ্ছে ‘The Strange Death of Europe'। এখন আমার প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, এখন তো করোনাভাইরাস, এখন কি করে বইটা পাবলিস্ট হলো বা কারা পাবলিশ করলো? কেন পাবলিশ করলো? এবং এরা বেশ ক'বার বলেছে এটা নাকি বিলেতে এখন বেস্টসেলার। বেস্টসেলার কীভাবে হয় এটা আমি জানি, যে এটা কারা কিনেছে কোথায় best-selling!

 

মুশফিক : আচ্ছা

মোহাম্মদ রফিক : আর হঠাৎ করে সে যে টপিক ইউরোপ, এটা তো Paul Gaugui বলেছে তার ‘Intimate Journal' যে ইউরোপ মানেই হচ্ছে সিফিলিস আর অ্যালকোহল। এই যে স্পেনের বিখ্যাত ফিলোসোফার কবি Miguel de Unamuno বলেছে তার 'The Tragic Sense of Life in Men and Nations' বহু আগেই বলে গেছেন ১৯২১ সালে, 'এখন পৃথিবীর মঞ্চ হচ্ছে ট্র্যাজিক-কমেডির মঞ্চ, যার প্রধান নায়ক হচ্ছে একটি উম্মাদ, জন কুহাতিক[অস্পষ্ট]। যে অরণ্যের ভিতর গিয়ে চিৎকার করে কাঁদছে কিন্তু কেউ তার কথা শুনছে না।' ইউরোপে প্রতিবিম্ব হচ্ছে ফাউস্ট, তারে তো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ ইউরোপ মৃত। ও হঠাৎ আজকে কেন আবিষ্কার করলো? কেন এই বই আসছে উদ্দেশ্যটা বুঝতে হবে।

 

মুশফিক : আপনার কী মনে হয়?

মোহাম্মদ রফিক : ওই বইয়ের বিষয়বস্তুটা কী! সে বলতে চাচ্ছে যে ইউরোপ মরে গেছে ইউরোপে এখন একটা আইডিয়া দিয়ে ডি-জেনারেশন করাতে হবে। আইডিয়াটা কী? ক্রিশ্চিয়ানিটি এবং যুদের মিলন তার উত্থান ঘটাতে হবে। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে ৩০০ বছর ধরে ওরা ক্রিশ্চিয়ানদের সাথে এক হতে চেষ্টা করেছে। তারা তাদের ধর্ম পাল্টিয়েছে। আমি তোমাকে কিছু কুখ্যাত নাম বলতে পারি : ম্যান্ডেলসার, হ্যানরিসাইনে [নাম অস্পষ্ট]। এরা সবাই কিন্তু খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল। এমনকি যারা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেনি তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ জার্মান ভাষায় অনূদিত করেছে। তারা কি রক্ষা পেয়েছে?

 

মুশফিক : না তা পায়নি!

মোহাম্মদ রফিক : আজকে তুমি এসে তাদের উদ্বোধন চাচ্ছো, তাহলে অন্যরা কোথায়! আরও তো আছে, পৃথিবীতে ইসলাম আছে, হিন্দুইজম আছে, বুদ্ধিজম আছে, পৃথিবীতে তারা আছে, তারা কোথায়! তো এই বই যেটা করবে, তাহলে এই বই যদি বেস্টসেলার হয়ে থাকে আমি তোমাকে বলি, করোনা পরিস্থিতি চলে গেলে ইউরোপে একটা দারুণ দাঙ্গা দেখবে। এবং সেটাও সে বলে দিছে এখন ইউরোপকে বাঁচাতে হলে প্রথম যে রাজনীতিক স্টেপ নিতে হবে সেটা হচ্ছে বিদেশিদের আসা বন্ধ করতে হবে। এখন বিদেশি মারে কারা? এশিয়ান, আফ্রিকান, মিডিলিস্ট এরাই তো! অর্থাৎ এখন খুব গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে।

 

মুশফিক : মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, করোনা পরিস্থিতির মধ্যই একটা রাজনৈতিক পরিবর্তন আসতে চলেছে?

মোহাম্মদ রফিক : অলরেডি সেটা শুরু হয়ে গেছে। খেয়াল করলে দেখবে ভ্যাকসিন নিয়ে একটা ব্যাপার শুরু হয়ে গেছে। এখন তো ক্ষমতায় রয়েছে ইতরেরা, ৭-৮টা লোক মাত্র। তারাই সারা পৃথিবীর ৯০ ভাগ সম্পদ দখল করে আছে। আমি তো এখন তোমাকে সব বলতে পারছি না, তবে সময় পেলে তোমাকে ডাটা দিয়ে দেখিয়ে দিতাম।

 

মুশফিক : আশা রাখি, নিশ্চয়ই পরবর্তীতে খুব শিগগিরই আমাদের দেখা হবে এবং এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

মোহাম্মদ রফিক : তুমি খেয়াল করে দেখো হিটলারের লোকজন এখন কোথায়? কাদের আশ্রয় আছে? হিটলারের গ্যাস চেম্বারে যারা গ্যাস তৈরি করেছিলো।

যাইহোক, আমি শেষে তোমাকে যেটা বলতে চাই, অনেকে ভাবছে যে মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যে এই মানুষ আরও নেতিবাচক হয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। আর ধর্ষণ-খুন বাড়বে, রাহাজানি বাড়বে, দুর্বৃত্তায়ন বাড়বে। এই যে দেখো যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, এরকম শূন্যতায় ফ্যাসিজমের সৃষ্টি হয়। তাহলে আজকে পৃথিবীতে কাদের ফ্যাসিজম হবে? তাদের হবে যারা এখন পুঁজিবাদী চক্রের সাথে আছে। আমরা এখন পুঁজিবাদী চক্রের ফ্যাসিজমের মুখোমুখি, কিন্তু দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে এটা থেকে যে কেউ রুখে দাঁড়াবে এমন মানুষ হয়তো আর পৃথিবীতে নেই। ওই যে, সেই হলুদ নক্ষত্রের পাশে রেডিওক্টিভ পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছে।

যাহোক, এখানেই আমার শেষ। আমি বোধহয় বিষয়টা বোঝাতে পেরেছি, আমার আর কিছু বলার নেই।

 

মুশফিক : স্যার, আমার এখনো দুটো প্রশ্ন রয়েছে।

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ,বলো।

 

মুশফিক : স্যার, আপনি যে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের কথা বললেন, সেটা কি অন্যান্য মহামারির সময় ঘটেছিলো?

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ, একদম হয়েছিলো। প্লেগের পরে তো ইউরোপে একটা দারুণ পরিবর্তন এসেছিলো। তারপর সেই স্প্যানিশ ফ্লুর সময়ও একই ব্যাপার ঘটেছিলো।

 

মুশফিক : আমার আরেকটা প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে স্প্যানিশ ফ্লু বা প্লেগ মহামারি বিবরণ, সেটা মার্কেজ বা কামুসহ অনেক বড় লেখকের লেখায় পেয়ে থাকি। তেমনি আপনারও কি কোনো পরিকল্পনা আছে, লেখায় এই সময়টাকে ধরে রাখার?

মোহাম্মদ রফিক : আসলে না। আবার যা যা বলার ছিল তোমাকে বললাম। আমিতো এখন চোখে খুব ভালো দেখি না এবং হাত তেমন চলে না।

শোনো, সাহিত্যের কথা আমি এখানে বলব না। আমরা আসলে একটা জেনারেল আলাপ করলাম, সাহিত্যের আলাপ করলে অনেক কিছু বলতে হবে। আসলে জানি না, আসলে পৃথিবীর যদি না বাঁচে তাহলে তো কেউই বাঁচবে না।

আমি তোমাকে আরেকটা গল্প করি, গ্রিসে একজন দার্শনিক বিজ্ঞানী ছিলেন তার নাম হচ্ছে সেনপ্রিডোক্লিস(অস্পষ্ট), সে থেলিসের পরপরই এসেছিলো প্রথমদিকে, সক্রেটিসেরও অনেক আগে। তো সে হঠাৎ একদিন স্বপ্ন দেখল যে তাকে পৃথিবী ডাকছে আর বলছে যে—'আমি দূষিত হয়ে গিয়েছি তুমি তোমার আত্মত্যাগের ভেতর দিয়ে তোমার স্প্রিট(আত্মা) দিয়ে আমাকে পবিত্র করো!' তো সে করল কি, পৃথিবীতে তার আত্মা দিয়ে বিশুদ্ধ করার জন্য একটা অগ্নিগিরির মধ্যে নিজেকে আত্মবিসর্জন দিলো। এটা নিয়ে জার্মান কবি ফ্রিডরিশ হ্যোলডার্লিন (Friedrich Hölderlin)-এর কবিতা আছে। এখন আমি তো ধরনের তেমন কোন আহ্বান শুনি নাই। এজন্য আমি আর আত্মবিসর্জন দিবো না।আমি যতদিন আছি বেঁচে থাকবো, টিকে থাকার চেষ্টা করবো, গান শুনবো আর কী! আর দেখবো কী ঘটে।

 

মুশফিক : তার মানে আপনি একরকম নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকবেন?

মোহাম্মদ রফিক : আমি এখন জৈন দর্শনে বিশ্বাসী, জৈন বুদ্ধিজম।

 

মুশফিক : কিন্তু একসময় তো এই করোনা-পরিস্থিতি কেটে যাবে স্যার। মহামারিও কেটে যাবে

মোহাম্মদ রফিক : কে বলেছে তোমাকে? Who has told you?

এখন যে আশার কথাগুলো শুনছো সেগুলো হচ্ছে আত্মবাক্য। এগুলো হচ্ছে আশার কথা। এগুলো তো আমাদের একটা দুর্ভাগ্য যে আমরা সবসময় আশার কথা শুনতে চাই। আমরা তো শেষের কবিতায়ও একটা আশার বাণী শুনতে চাই। কিন্তু কেন এটা হবে?

 

মুশফিক : যেটা বলতে চাচ্ছিলাম যে, স্প্যানিশ ফ্লু বা প্লেগ এগুলো তো মহামারি আকারে এসে আমাদের সমাজের সঙ্গে একেবারে মিশে গেছে

মোহাম্মদ রফিক : সে সময়গুলো পার হয়েছে কিন্তু পৃথিবীর তো কোনো উন্নতি হয়নি

 

মুশফিক : আচ্ছা তবে আপনি বলতে চাচ্ছেন পৃথিবীর উন্নয়নটা দরকার ছিল, যেটা আসলে আসেনি তাইতো

মোহাম্মদ রফিক : পৃথিবীর জাগরণ, সমস্ত মানুষের ভেতর থেকে উঠে আসা। প্রতিটা মানুষ যদি না জাগে তাহলে মানুষের কোনো মুক্তি নেই, কোনো মুক্তি হবে না। এবং সেটা কখনো হয়নি এবং হবেও না।

মুশফিক : তবে দাঁড়াচ্ছে এই যে, মানুষের মহামারি থেকে মুক্তি নেই, সেটা হোক মানসিকভাবে বা শারীরিকভাবে মুক্তি নেই

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ এবং এটা ঘুরে ঘুরে আসবে আসলে মনভোলানো কথা বা আত্মবাক্যে কোন লাভ নেই ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড এগুলো তো অনেক আগেই এই পৃথিবীর অবস্থার কথা প্রেডিক্ট করেছিলো ওদের ল্যাবের রিসার্চ সোর্স থেকে পাওয়া যাওয়ার কথা

 

মুশফিক : মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, তারা এই ব্যাপারগুলো আগেই জানতো বা বুঝতে পেরেছিল কিন্তু আমরা এখন প্র্যাকটিক্যালি দেখতে পাচ্ছি। করোনা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে একটা আইওয়াশ চলছে আর মূল ব্যাপারটা হচ্ছে একটা বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, তাই কি? উপরে আপনি যে তথ্য দিলেন তার প্রেক্ষিতে যা দাঁড়াচ্ছে।

মোহাম্মদ রফিক : সেই তো আসল অপরাধী, কারণ সেই তো আসলে প্রকৃতির ধ্বংস করেছে।

মুশফিক : মানুষ?

মোহাম্মদ রফিক : মানুষের পুঁজিবাদ।

 

মুশফিক :মানে প্রকৃতির ধ্বংসের পেছনে একটা পুঁজিবাদের ব্যাপার আছে।

মোহাম্মদ রফিক : পুঁজিবাদটা অনেক কিছু ধ্বংস করেছে আগেই। এবং সামনেও করবে। এইতো সেদিনও করলো আমাজান ধ্বংস।

 

মুশফিক : তাহলে এটা কি প্রকৃতির এক ধরনের প্রতিশোধ মানব সভ্যতার প্রতি?

মোহাম্মদ রফিক : সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে আজকে আমি এটাও জানি যে পুঁজিবাদের পরিবর্তে অন্য কিছু আসার কোনো সুযোগ নেই।

 

মুশফিক : তাহলে পুঁজিবাদ যেহেতু চলবেই, প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেবেই এবং থেকে মানুষের কোন প্রতিকার নেই বা উদ্ধার নেই।

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ, ঠিক তাই। ওই যে আমি তোমাকে প্রথমেই বলে দিয়েছি, 'তোমাকে তোমার ঋণ পরিশোধ করতে হবে'।

 

মুশফিক : এখন মনে করুন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে যাদের দায় কম, তাদেরও কিন্তু সাফার করতে হচ্ছে কিন্তু তারা কিন্তু ততটা দায়ী নয় যেমনটা উন্নত বিশ্ব দায়ী সে ক্ষেত্রে আপনি কী বলবেন?

মোহাম্মদ রফিক : এখন তো এসব কথা বলে আর লাভ নেই। এখন প্রত্যেকটা মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হবে। তুমি যদি দেখো তবে, বাংলাদেশ কেন বাংলাদেশের চেয়েও কম ইকো ফ্রেন্ডলি সোসাইটি তাদের ওখানে কি করোনা নেই? কারো ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে এবং হবে। পৃথিবী যদি না থাকে তবে তো আর কেউ থাকছে না (ব্যাপারটা এমন যে, দেশ পুড়লে দেবালয় এড়ায় না)।

আবার লক্ষ্য করো, যেসব দেশ অর্থনৈতিকভাবে তেমন সুবিধায় নেই তেমন অনেক দেশ আছে যেখানে করোনার প্রকোপ নেই। কেন নেই? কারণ ওরা এখনো কমিউনিজমের কাছে যেটা শিখেছিল যে সমাজবদ্ধ হয়ে থাকা, পরস্পরের সাথে লগ্ন হয়ে থাকা এগুলো তারা এখনো পালন করে যাচ্ছে। সেজন্য তারা ভালো আছে।

 

মুশফিক : স্যার, ছোট্ট একটা প্রশ্ন দিয়ে এবার শেষ করবো, সেটা হচ্ছে আপনার অবস্থানটা এবার যদি বলতেন?

মোহাম্মদ রফিক : সে তো আমি বলেই দিয়েছি

 

মুশফিক : শুধুমাত্র দেখা এবং নিজের ভেতর বিশ্লেষণ করা?

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ, ওই যে বললাম আমি তো আর এপিডোমোক্লিস হতে পারব না কারণ আমি তো আর পৃথিবীর ডাক শুনি না পৃথিবীর আমাকে সহ্য করে যেতে হবে

That is I have to pay,

I have to bear.

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে লক্ষ মানুষের লাশ বুকে নিয়ে আমার উঠতে হবে

 

মুশফিক : এই আপনি মেনে নিয়েছেন

মোহাম্মদ রফিক : উপায় নেই তো ওই যে একটা লাইন আছে, 'life is a flow…কখনও পাহাড়ের কাছে ধাক্কা খাবা, কখনো গাছের সাথে ধাক্কা খাবা কিন্তু তুমি চলবেতোমাকে চলতে হবে

মুশফিক : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ রফিক : তোমাকেও। ভালো থেকো।

//জেডএস//

লাইভ

টপ