তর্জমায় শেষ বলে কিছু নেই : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৭:০৯, আগস্ট ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১২, আগস্ট ১০, ২০২০

বন্ধু, অধ্যাপক ও কবি শামীম রেজা রাতে যখন কুখবরটা দিল তার ঠিক দুই ঘণ্টা আগে আমি তর্জমাশাস্ত্র বিষয়ক একটি প্রবন্ধের কিছু ভুলত্রুটি সংশোধন করছিলাম যার মধ্যে অবধারিতভাবে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ ও তর্জমা নিয়ে বিশ্লেষণ আছে। তাঁকে বাদ দিয়ে তর্জমাকথা হয়ই না, আর যদি বিষয়টা হয় গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস! তিনি চলেই গেলেন শেষ পর্যন্ত। পিঞ্চে* করোনাভাইরাস।

আমি দুইবার তাঁর বাড়িতে গিয়েছি শ্রদ্ধা জানাতে আর আলাপচারিতার জন্য। শেষবার গেলাম বাংলা ১৪১৯ সালের চৈত্র সংক্রান্তির দিন সকালে। আগে থেকেই ফোনে কথা বলে রেখেছিলাম। ধর্মতলা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতার তিলজলা পুলিশ ফাঁড়ির কাছে অবস্থিত তাঁর ফ্ল্যাটবাড়িতে পৌঁছতে বেশ খানিকটা সময় লাগল। তখন বেলা প্রায় ১১টা। কলিংবেল বাজাতেই এক মহিলা দরজা খুলে দিয়ে আমাকে বসতে দিল ছোট বৈঠকখানাটায়। সামনে-পিছনে বইয়ের তাক। লেখকের ঘর যেমন হয়। দেয়ালে ছবি-পেইন্টিং-পোস্টার। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই এসে উপস্থিত হলেন আমাদের কালের বাংলা তর্জমা সাহিত্যের দিশারী মানুষটি। সাটামাটা ভাব। পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি আর পাজামা। অল্প কয়দিন আগে চোখের ছানির অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। দেখলেই বোঝা যায় শরীরটা আস্তে আস্তে ভেঙে পড়ছে। তাঁর বন্ধু আমার বড় চাচার খোঁজ-খবর নিলেন। বললেন বহুদিন দেখা হয় না। ছোটখাটো একজন মানুষ। কিন্তু কাজ করেছেন মস্ত মস্ত। কথা বললেন আস্তে আস্তে। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ-মুখ আর জবানে তীক্ষ্ম রসিকতা। তাঁর শরীরের অবস্থা জানতে চাইলাম শুরুতে। খানিকক্ষণ পরই শুরু হল সাহিত্য ও তর্জমাচর্চা বিষয়ক আমাদের কথাবার্তা। একটি পুরোনো সনি মাইক্রো ক্যাসেট রেকর্ডারে ধারণ করা সেই সাক্ষাৎকারটি আজ তাঁকে স্মরণ করে নিবেদন করছি।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : সূচনাতেই আপনাকে আমাদের অনেকের পক্ষ থেকে জানাই ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা। তর্জমাকার তো অনেকই আছেন বা ছিলেন। কিন্তু আপনি আলাদা। কারণ আপনি এমন সব সাহিত্য ও সাহিত্যিককে বাংলা ভাষার মধ্যে নিয়ে আসলেন যাদেরকে কেউ চিনতই না বা ওদিকে নজর দেয়নি। এ-প্রসঙ্গে পোর্তুগিয মহাকবি কাময়েঁশ-এর মহাকাব্য ওজ লুজিয়াদাশ্-এর প্রথম খণ্ডের বিখ্যাত চরণটি মনে পড়ছে : পোর মারেস্ নুনকা দান্তেস্ নাভেগাদোস্ (আগে না-যাওয়া সাগরপথে)

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : খুব সুন্দর করে বললেন। আপনাকে ধন্যবাদ।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : তর্জমার ভুবনে কেমন করে এলেন?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : আমি ছেলেবেলা থেকেই খুব বইটই পড়তাম। প্রেসিডেন্সি কলেজে যখন বিএ-তে ভর্তি হলাম, তখন কলেজ স্ট্রিটের এক প্রকাশক বললেন, ‘তুমি এত যখন বই পড়, তাহলে নিশ্চয় লিখতেও জানো। একটা কাজ করো, তোমাকে দুটো বই দিচ্ছি, জুল ভার্নের। ঠিক তর্জমা নয়, তবে ডিটেইল ধরে দেড়শ পাতার মধ্যে শেষ করতে হবে।’

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : কোন সালের কথা?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : ১৯৫৪ সাল। ওই প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগ বই পড়তে গিয়ে। ডাকযোগে বই আনতাম তাঁর কাছ থেকে। জুল ভার্নের সঙ্গে হান্স এন্দারসনের একটি বড় গল্প দিয়ে বললেন, ‘এটাও করে নিয়ে এসো।’ আমি এন্দারসনের গল্পটি তর্জমা করলাম, অনুবাদ বলেই ওগুলি ছাপা হল। আর জুল ভার্নের রচনা দুটি রিটোল্ড বলে ছাপা হল। দুশো পাতার লেখাকে দেড়শ পাতায় নিয়ে আসা তো রিটেলিং। ওই দুটি কাজের পর জুল ভার্নের অন্য লেখাগুলির বেলায় আমি চেষ্টা করলাম অ্যাব্রিজড্ করতে, যেন কোনো কোনো জায়গায় মূলের সাথে মিল থাকে। আমি ওগুলোকে বলি অবলম্বিত রচনা।  

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : তর্জমা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : তর্জমা তো এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা নিজেদের ঘরের মধ্যে আটকে না থেকে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই। নজরটাকে আটকে রাখব কেন? বাইরের পৃথিবীই শুধু নয়, আমাদের নিজেদের ভারতবর্ষের কথাই ধরি। এতগুলি ভাষা, এত বড় দেশ। আমরা যদি তাদেরও না জানি তাহলে কী করে হবে? অসমিয়াতে কী লেখা হচ্ছে, উর্দুতে কী লেখা হয়, হিন্দিতে কী লেখা হচ্ছে? সেইজন্য আমি ‘আধুনিক ভারতীয় গল্প’ বলে পাঁচ খণ্ডের একটি বই করেছিলাম। ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষার গল্পের সংকলন। দুইটি বাংলা গল্প ছিল, সময়টাকে ধরবার জন্য। সেই সঙ্গে অন্য নানা ভাষার গল্প।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : কোন সালে সেটা করেছিলেন?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : ইংরেজি ছয়ের দশকের শেষে হবে। সেই সময় আমাদের যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে ইন্ডিয়ান লিটারেচার—আর্লি এইজ পড়ানো হত। আমরাই বলে-কয়ে আধুনিক কালে নিয়ে এলাম। ম্যাটেরিয়াল কোথায় পাবো? সেটাও একটা কারণ সংকলনটা করার। বিভিন্ন লোককে যোগাড় করে তাদের দিয়ে অনুবাদ করিয়েছি। রাজস্থানী গল্প, মারাঠি গল্প আরও নানান ভাষার গল্প। কিছু অনুবাদ আমি করেছিলাম, বাকিগুলি অন্যরা। সম্পাদনা আর গল্পগুলি বাছাই করার কাজটা ছিল আমার। মূল ভাষা থেকে অনুবাদ ছিল। যেমন বিজয়দান দেতা-র গল্পটি যে করল সে শিলিগুড়িতে থাকত, ছেলেটি রাজস্থানী। সে বাংলাও জানত। গল্পগুলির অনুবাদে আমার অবশ্য কিছুটা ঘষামাজা করতে হয়েছে। এ-সংকলনের কাজ করতে গিয়ে অনেক লেখকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। আমি ভাবলাম প্রেমচাঁদ যখন লিখতেন, তখন আমাদের এখানে বিখ্যাত হয়েছেন শরৎচন্দ্র। কিন্তু প্রেমচাঁদের গল্প তো আমাদের পড়া উচিত। অনেক মহিলাদের গল্পও ছিল। যেমন কুররুতুলান হায়দার, আমার খুব প্রিয় লেখিকা। তাঁর ইচ্ছে ছিল তাঁর একটা উপন্যাস যেন আমি বাংলা করি। কিন্তু ওটা এত বড় যে আমি আর হাত দেইনি।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : উর্দু থেকে?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : না, উনি টাইপস্ক্রিপ্ট করে নিজেই ইংরেজি অনুবাদ করে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ইংরেজি বই হওয়ার আগে। কিন্তু অত বড় কাজ আমার তখন সাহসে কুলোয়নি। একটা খেদ রয়ে গেছে। উনি আমাকে এত পছন্দ করতেন যে অন্য কাউকে না দিয়ে আমাকে দিয়েছিলেন। 

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : তর্জমার কাজ কি ক্লান্তিকর না, আনন্দদায়ক?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : ক্লান্তি আর আনন্দ পাশাপাশি থাকে। একঘেয়ে লাগছে, তারপর আবার একটা অনুচ্ছেদ দাঁড় করাবার পর ঠিক মতো করতে পারলে মনে হয় বেশ। বারবার দেখতে হয় যে কতটা মূলের কাছাকাছি থাকা গেল অথচ বাংলাও হল। এমন নয় যে আমি বাংলা ভাষাটাকে বাদ দিলাম।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : বাংলায় পাঠ করলে ওটা একটা টেক্সট্ হিসেবে দাঁড়াচ্ছে কিনা তা দেখা দরকার?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : হ্যাঁ, সেটাও দেখতে হবে আবার এটাও দেখতে হবে যে, এটা যেন মূল থেকে বেশি দূরে সরে না যায়। আমি যখন ভৈকম মুহম্মদ বশীর তর্জমা করি তিনি আমাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন। অনেকগুলি গল্পের ব্যাকগ্রাউন্ড আমাকে বলেছিলেন। তিনি প্রথম এখানে এসেছিলেন অনেকদিন আগে। নাখোদা মসজিদের কাছে একটা চারতলা বাড়ির চিলেকোঠায় থাকতেন। লেখা শুরু করেন ইংরেজিতে কিন্তু তারপর ছিঁড়ে ফেলে দেন। কেরালায় ফিরে গিয়ে (তখন কেরালা ভাগ করা ছিল) কয়েকদিন কেটে যাওয়ার পর তিনি নিজের ভাষা মালায়ালামে লিখতে শুরু করেন। লিখেছেন কিন্তু ছাপাননি কিছু। তাঁর মনে হল ‘ইংরেজিতে লিখে কী করব? আমার লোকেরা তো পড়তে পারবে না!’ আমার খুবই প্রিয় লেখক। যোগাযোগও ছিল তাঁর সঙ্গে। আর তাঁর গল্পের তর্জমার জন্য সাহিত্য আকাদেমি আমাকে পুরস্কৃতও করে।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : তার মানে মূল লেখকের সাহায্য নিয়ে আপনার কাজ করার অভিজ্ঞতা হল তাঁর সঙ্গে?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : পুরোপুরি না, খানিকটা। আর এক জনের সাহায্যের কথা বলতে হয়। মাতৃভূমি বলে একটা মালায়ালাম কাগজ বেরুতো। ওটাতে কাজ করত এক সাংবাদিক। ওনার পোস্টিং ছিল কলকাতায়। তিনি আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন বশীরের গল্পগুলির ব্যাপারে। বশীর বলেছিলেন কোনো রয়্যালটি চাই না। তবে কী চাই? ‘পঙ্কজ মল্লিক আর এ এল সায়গল—এই দুই জনের কিছু এলপি রেকর্ড পাঠিও।’ খুব অদ্ভুত। আমি অনেক কষ্ট করে দুই-তিনটি রেকর্ড পাঠিয়েছিলাম। মল্লিকের দুইটি আর সায়গলের তিনটি, মোট পাঁচটি। বশীর রবীন্দ্রসঙ্গীত খুব ভালোবাসতেন।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : আপনাদের এখানে, কলকাতায়, অনুবাদের কাজের ক্ষেত্রে রয়্যালটির ব্যাপারটি কীভাবে নির্ধারিত হয়?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : মূল লেখক যদি চান তবে রয়্যালটি দিতেই হবে। না হলে অনুমতি দেবেন না। বিষ্ণু দে যখন এলিয়ট করেছিলেন, তখন এলিয়ট একটা ভয়ঙ্কর অঙ্কের টাকা চেয়েছিলেন। তিনি তো ফেবার অ্যান্ড ফেবার প্রকাশনার কর্তাব্যক্তি ছিলেন। তারপর সিগনেট প্রেসের প্রকাশক ডি কে গুপ্ত জানালেন একটা শিলিংয়ের দাম যখন বাংলা টাকায় যা হবে (বইটার দাম দুই টাকা ধরে) সেটা অসম্ভব একটা অঙ্ক তার জন্য। ‘আমরা এগারো শত কপি ছাপব, এক হাজার বিক্রির জন্য। কিন্তু সব কবে বিক্রি হবে কে জানে!’ এসব জানিয়ে তিনি এলিয়টকে একটা চিঠি লেখেন। কিন্তু এলিয়ট সাহেব অনড়। তখন ডি কে যা করলেন তা আশ্চর্য! তিনি এলিয়টকে বললেন, ‘আমি আপনাকে একটা জিনিস পাঠাচ্ছি।’ তিনি খুব দামী একটা বেনারসী শাড়ি, নকশা করা, এলিয়টকে পাঠালেন। সেটা পেয়ে তিনি বেজায় খুশী। তাঁর ড্রয়িংরুমের দেয়ালে ওটা টাঙ্গিয়ে রেখেছিলেন। অনুমতিও মিলেছিল।

বাংলাদেশে লেখক-অনুবাদকরা রয়্যালটি পায়?

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : সবাই পায়, পায় না কেবল লেখক বা অনুবাদক, যার শ্রমে বইটির জন্ম। অল্প কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা ৮%-১০% থেকে ১৫% হারে রয়্যালটি দেয়।

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : তোমরা কাগজ কেনায় টাকা খরচ কর, ছাপাখানাকে টাকা দাও, দপ্তরিকে টাকা দাও। আর লেখক? তাকে তো কাগজ কিনে লিখতে হয়। কালি কিনতে হয়। কলম কিনতে হয়। তাকে টাকা দেবে না কেন? তোমাকে তো বুঝতে হবে সে টাকা দিয়ে কাগজ, কলম কিনেছে। তার মূল্যবান সময়ের কথা না হয় ছেড়ে দিলাম। কিন্তু এগুলির জন্য তো দেবে?

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : বড় পাবলিশার্স, যেমন দে’জ বা প্যাপিরাস?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : হ্যাঁ, ওরা টাকা-পয়সা দেয়।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : জানতে চাইব লাতিন আমেরিকান সাহিত্য তর্জমায় ব্রতী হলেন কেন?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : আমি বিদেশে যখন পড়তে গেলাম তখন লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের কোর্স নিলাম। কানাডার টরন্টো আর ভ্যাঙ্কুভারের ব্রিটিশ কলম্বিয়ায়। সেগুলো পড়তে পড়তে মনে হল যে ওগুলো নিয়ে কাজ করা যায়। এরপর মেহিকো গেলাম। ওখানে গিয়ে ট্রটস্কি, এম এন রায়-এর বাড়ি দেখলাম। গত শতকের সাতের দশকের শুরুতে। মেহিকো দুইবার গিয়েছিলাম। একবার সাত দিন ছিলাম, আর পরের বার দশ দিন ছিলাম। মেহিকো সিটির বাইরে যাইনি। ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়েছিলাম। বিখ্যাত ম্যুরালগুলি দেখলাম। আওয়ার লেডি অফ গুয়াদালুপে নামের ছোট একটা চার্চে ব্ল্যাক মরিয়ম, ব্ল্যাক জেসাস্ দেখেছিলাম। খোলা জায়গায়, পার্কে অনেকে জড় হয়ে নাচ-গান করে। কিছু ভিডিও করেছিলাম। কিন্তু কোথায় হারিয়ে গেছে সেসব!

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : কোর্সে এস্পানিয়োল ছিল?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : খানিকটা। মেহিকোর বিপ্লবী পাঞ্চো বিইয়া সম্পর্কে আমার কৌতূহল ছিল, কারণ অ্যামব্রোস বিয়ার্স তাঁর সাথে যোগ দিয়েছিলেন। পাঞ্চো বিইয়ার একজন ডাক্তার ছিলেন, নাম মারিয়ানো আসুয়েলা। তিনি লোস্ দেল আবাহো নামের বিখ্যাত উপন্যাসটা লিখেছিলেন। হুয়ান রুলফো তো রাষ্ট্রীয় প্রকাশনা সংস্থার প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন। রুলফোকে দিয়েই আমার লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের তর্জমার কাজ শুরু, পাশাপাশি কিছু কবিতা করেছিলাম।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : আপনি কি সেই সিনেমাটি দেখেছেন—হোর্হে ইসাক-এর করা, যেখানে গার্সিয়া মার্কেস এক বেশ্যাপাড়ার টিকেটম্যান, বুনুয়েল পাদ্রী আর রুলফো কী একটা ভূমিকায় যেন অভিনয় করেছিলেন। সিনেমাটির নাম এন এস্তে পুয়োবলো নো হাই লাদ্রোনেস্, গার্সিয়া মার্কেসের কাহিনি।

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : না, দেখিনি। কিন্তু খুব ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। পেদ্রো পারামো-র কাহিনি নিয়ে তিনটি সিনেমা হয়েছিল। একটার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন ফুয়েন্তেস। দ্বিতীয়টি গার্সিয়া মার্কেসের করা চিত্রনাট্য। তিনটি ছবি কীভাবে হয়েছিল জানি না, কপিরাইটের সমস্যাও হয়নি কেন তাও জানি না। যেটা খুব ইন্টারেস্টিং তা হল একটা ছিল দেড় ঘণ্টার, দ্বিতীয়টি দুই ঘণ্টার এবং তৃতীয়টি ভিন্ন দৈর্ঘ্যের।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : তিনটি সিনেমাই যদি যোগাড় করা যায় তাহলে একটা তুলনামূলক পাঠ দাঁড় করানো যায়।

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : হ্যাঁ, ঠিক তাই। রুলফোর গল্প ‘মাকারিও’ অবলম্বনে করা সিনেমাটি ভালো লেগেছিল।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : আপনার তর্জমা করা এই গল্পটি আমি আমার সম্পাদনার ‘আধুনিক লাতিন আমেরিকান গল্প’ সংকলনে রেখেছি, আপনাকে জানিয়েছিলাম। গল্পটি এস্পানিয়োল ভাষা ও সাহিত্যের স্নাতকস্তরে আমার পাঠ্যতালিকায় ছিল। ছয় ফুট উচ্চতার কাতালান কবি ও অধ্যাপক হুয়ান আন্তোনিয়ো মাসোলিভের আমাদেরকে পড়িয়েছিলেন।

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : রুলফোর গল্পগুলো সত্যই ভালো। পরে আবিষ্কার করা গেল ওনার এরকম আরও ৫/৬টি গল্প আছে। আমি অবশ্য একটি যোগাড় করতে পেরেছি। অনেকদিন তো বিদেশে যাই না। তাই বাকিগুলো যোগাড় করতে পারিনি।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : লাতিন আমেরিকান সাহিত্যকে বাংলায় হাজির করার পেছনে আপনার যে ভূমিকা তাকে কীভাবে বিশেষায়িত করব জানি না। আপনার নিজস্ব মতামত কী এ ব্যাপারে?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : আমার কোনো মতামত নেই।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : তরুণ প্রজন্মের তর্জমাকারদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবার যদি থাকে।

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : কমার্শিয়াল বই না করাই ভালো। হ্যারি পটার বা হরি গাঁজাখোর জাতীয় বইয়ের দিকে না ঝোঁকাই উত্তম। তর্জমায় উৎস ভাষা ও লক্ষ্য ভাষার মধ্যে নানা রকম ব্যবধান থাকতে পারে। আর একটা ব্যাপার খেয়াল রাখা দরকার—উৎস ও সময়। আমি কোন সময়ের টেক্সট তর্জমা করছি। সেটা কি ভাষার পুরোনো রূপে করব নাকি এখনকার মানুষের ভাষায় করব। একই বইয়ের— ক্ল্যাসিকের, বারে বারে তর্জমা হতে পারে। বিভিন্ন যুগে পড়বার ধরন বদলায়। যে কোনো তর্জমার কাজ কঠিন। বারংবার সংশোধন করা যায়। রবীন্দ্রনাথ বারংবার নিজের কবিতায় কাটাকুটি করেছেন। তর্জমায় শেষ বলে কিছু নেই। অনুবাদ মানেই নিরন্তর ঘষামাজা।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : আপনার কর্মজীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে যদি একটু বলেন।

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : প্রথম চাকরি করতে গেলাম রেঙ্গুনে। শায়িত বুদ্ধমূর্তি, বাহাদুর শাহ জাফরের শেষ ঠিকানা ইত্যাদি ঘিরে স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল। ইংরেজি ও বাংলার শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছি। ১৯৫৬ সালের দিকে বুদ্ধদেব বসুর ঐকান্তিক চেষ্টায় শুরু হওয়া যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে পড়তে শুরু করলাম। যাদের লেখা পড়তাম তাদের লেখা পাঠ্য হিসেবে পড়ব এই আকর্ষণে ভর্তি হয়েছিলাম। পরে ওই বিভাগে শিক্ষক হিসেবেও যোগ দেই। কিন্তু বছর তিনেক পর বুদ্ধদেব বাবুর সাথে মতভেদ শুরু হয়। বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গিটা শেষ পর্যন্ত পশ্চিম ইউরোপকে ঘিরেই ছিল।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচ্যুড তর্জমা করলেন না কেন? বাংলায় সোলেদাদ কি ‘নিঃসঙ্গতা’ না-কি ‘নির্জনতা’?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : দিল্লির সাহিত্য আকাদেমি যোগাযোগ করল। বলল গার্সিয়া মার্কেসের উপন্যাসটি ১৮টি ভারতীয় ভাষায় তর্জমা হবে, আমি যেন বাংলাটা করি। শুরু করলাম কাজ। গোটা পঞ্চাশ পাতা করেও ফেললাম। তখন সাহিত্য আকাদেমি বলল এজেন্ট এত টাকা হেঁকেছে যে তা বলবার নয়। থেমে গেল কাজ। আবার দুই বছর পর যোগাযোগ করে একই কথা। আবারও ত্রিশ পাতার মতো করলাম। কিন্তু আবারও সেই একই অবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত আর হল না। এর মধ্যে গার্সিয়া মার্কেস দিল্লিও এসেছিলেন। মাদ্রিদের কাসা দে লাস আমেরিকাস্ প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারে আমার তর্জমার বই আছে।

‘নিঃসঙ্গতা’ ও ‘নির্জনতা’ দুটোই হয়।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : গার্সিয়া মার্কেসের ভাষা কি জটিল? তাঁর রচনার বাংলা তর্জমায় ভাষার শৈলীর ক্ষেত্রে কী পন্থা নিয়েছেন?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : নির্ভর করে। তাঁর এক একটা রচনা এক এক রকম। মূলের কাছাকাছি থেকে যতটা সহজবোধ্য করা যায় সেই পন্থায় তর্জমা করবার চেষ্টা করেছি।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : ভালোবাসার অক্ষমতা থেকেই হতাশা আর একাকিত্বের জন্ম হয় যা কালক্রমে বুয়েন্দিয়া পরিবারের করুণ পরিণতি ডেকে আনে। হাজারটা চেষ্টার পরও ইতিহাসের গতিকে রোধ করা যায় না। লাতিন আমেরিকার ইতিহাস বহু অর্থহীন প্রয়াস আর মহতী নাটক দ্বারা গঠিত। বুয়েন্দিয়া পরিবারের কাহিনিকে কি সমগ্র লাতিন আমেরিকার ইতিহাস বলা যাবে?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : ইতিহাসটা চুম্বকাকারে বর্ণিত। ড্রাগ, সহিংসতা সব মিলিয়ে কোলোম্বিয়ার অবস্থা তো খারাপ। ‘পেদ্রো পারামো’ অনেক বেশি মেহিকো। বেঁচে থেকেও মরার মতন পড়ে থাকা। যেন সব ভূত। আমরাও তো মরে গেছি পেদ্রো পারামোর ভূতগুলোর মতো। না হলে আর সমাজটাকে পাল্টাচ্ছি না কেন?

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : পাঠক ও তর্জমাকার হিসাবে গার্সিয়া মার্কেসের ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : প্রথম যখন ওঁকে পড়ি, ১৯৭০-১৯৭১ সালে, ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচ্যুড পড়ে রীতিমত মুগ্ধতা গ্রাস করেছিল। পরে একটা একটা করে আরও পড়লাম। দেখলাম নিজেকে নতুনভাবে হাজির করছেন, বিশেষ করে ক্রোনিকল অফ এ ডেথ ফোরটোল্ড-এর কথা বলব। বেলাল দারুণ অনুবাদ করেছে। কিন্তু ‘মৃত্যুর কড়ানাড়া’ নামটা আমার মনে ধরেনি, এ-কথা ওকে বলেওছি আমি। নানা সংস্কৃতির উপাদান ও মানুষকে যেভাবে দারুণ সব গল্পে ধরেন গার্সিয়া মার্কেস তা এক কথায় অতুলনীয়। 

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : মানুষ কি তার মুক্তির সন্ধান পেয়েছে যে আরাধ্য মুক্তির কথা বলেছেন গার্সিয়া মার্কেসসহ অন্যান্য লাতিন আমেরিকান লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা?

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, ঐতিহাসিক অবস্থা, পুঁজিবাদ কাউকে মুক্তি দিতে পারবে না।

 

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : আমাকে সময় দেবার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : আপনাকেও।

এটি একটি মেহিকান মন্দার্থক শব্দ। মেহিকোর এস্পানিয়োলে এর অর্থ শালা (গালি অর্থে), খাতারনাক বা হতচ্ছাড়া।

//জেডএস//

লাইভ

টপ