বিদায় আলেয়া চৌধুরী

Send
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
প্রকাশিত : ১০:৩৩, আগস্ট ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৪, আগস্ট ১৩, ২০২০

চারদিকে এত মৃত্যু; মনে হচ্ছে অজস্র লাশের ভেতর সাঁতার কাটছি। মৃত্যু এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন কবিবন্ধু আলেয়া চৌধুরী। খবরটা জেনে মন বিষণ্ণ হয়ে গেলো; মনে পড়লো অনেক স্মৃতি। আমি তাঁর ‘হার্লেমের নিগ্রো আমি’ না ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ গ্রন্থের প্রকাশক—এই মুহূর্তে তা মনে করতে পারছি না।

তাঁর সংগ্রামী জীবন নিয়ে আমার একটি শর্ট ফিল্ম নির্মাণের কথা ছিলো। তাঁর নিউ জার্সিস্থ বাড়িতে বসে আলোচনা করেছি। ঢাকার ধানমন্ডির বাসায় আংশিক স্ক্রিপ্ট হয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। যদিও ১৯৯৪ সালে দিনা হোসেন ‘আলেয়া : আ বাংলাদেশি পোয়েট ইন আমেরিকা’ নামে একটি তথ্যচিত্র করে পুরস্কৃত হয়েছিলেন।

আমার কাহিনিটা ছিলো একেবার তাঁর জীবন থেকে নেয়া—গল্পকেও হার মানানো জীবনালেখ্য।

কুমিল্লার অজপাড়া-গাঁ উত্তর চর্থা গ্রামের এক দুরন্ত গ্রাম্য কিশোরী। যার ডাক নাম হীরা। গ্রাম্য শালিশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করে পাটখড়িতে আগুন জ্বালিয়ে ছুঁড়ে মারেন সালিশ তথা ফতোয়াবাজদের দিকে। সেজন্য তাঁকে ঝাঁড়ু পেটা করা হয়। বাবাও শান্তি-স্বরূপ বাড়ির সামনে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখেন। রাতে মা সেই বাঁধন মুক্ত করে ছেড়ে দিলেন। বললেন, যা পালিয়ে যা... ট্রেনে চড়ে এলেন ঢাকায়। শুরু হলো অন্য রকম এক বস্তিজীবন, ফুটপাতের খুঁপড়ি জীবন, কুলি-মজুরের জীবন, না-খেয়ে থাকার জীবন। এক ট্রাক ড্রাইভারের দয়া হলো। তাঁকে গ্রহণ করলেন পালক কন্যা হিসেবে। কিছুদিন না যেতেই এক্সিডেন্টে মারা যান সেই আশ্রয়দাতা পিতা।

আবার অনিশ্চিত ছন্নছাড়া জীবন, এতিমখানার জীবন, বুয়ার জীবন, ইট ভাঙার কাজ! সংগ্রামী জীবন শুরু করেন রিকশাচালক হিসেবে। তারপর হকার-জীবন। তাঁকে ৫ কপি ফ্রি ইত্তেফাক দেয়া হতো। তা টিকাটুলি থেকে হাঁটতে হাঁটতে এবং পত্রিকা বিতরণ করতে করতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে যেতেন বঙ্গবন্ধুর কাছে পত্রিকা দিতে। এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু তাঁকে সেলাই মেশিন দিতে চান। তখন তিনি আবেদন করলেন পাবলিক বাস চালানোর জন্য অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ড্রাইভার হতে চাইলেন। তা সংবাদ শিরোনাম হলো।

এ সবের পাশাপাশি মন খারাপের কথাগুলো, কষ্টগুলো রোলকরা খাতার পাতায় লেখা শুরু করলেন। ছাপা হতে থাকলো কবিতা। ১৯৭০ সালে বেগম পত্রিকায় তাঁর কবিতা ছাপা হয়। ‘জীবনের স্টেশনে’ তাঁর প্রথম কবিতার বই, বেরিয়েছিলো ১৯৭৩ সালে।

এলোমেলো জীবনের তাগিদে হঠাৎ একটা ছোট চাকরি হলো ইরান দূতবাসে। কাপড় ইস্ত্রি করা। সেখান থেকে মাত্র আঠারো বছর বয়সে অনেকটা ‘পাচার’ হওয়া জীবনের মতো চলে যান ইরানে। শুরু হলো আরেক পরবাসী বোহিমিয়ান জীবন। সেখান থেকে জার্মানে। জার্মান থেকে যাযাবরের মতো একদিন চড়ে বসলেন মাছ ধরার ট্রলারে। সেই জাহাজ চলতে থাকে অজানার দিকে। এভাবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে প্রচণ্ড শীত ও বরফের সাথে জীবন-মরণ লড়াই করে পৌঁছলেন বাহামার এক সৈকতে। সেখান থেকে এক লোক উদ্ধার করে স্ত্রীর ভয়ে তাকে গ্যারেজে লুকিয়ে রেখে পরদিন শহরে পৌঁছে দেন। সেখান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, তখন তার বয়স কুড়ি। এসব কাহিনি—ভয়াবহ।

তার লড়াকু জীবনের স্বীকৃতি-স্বরূপ নিউইয়র্কের স্টার ম্যাগাজিন ‘উইমেন অব দ্য ইয়ার’ শীর্ষক প্রচ্ছদ কাহিনি প্রকাশ করেছিলো। স্বশিক্ষিত আলেয়া ধীরে ধীরে দাঁড়ালেন নিজের পায়ে। কিন্তু তখন তিনি কিছুটা ক্লান্ত। সেই সাথে শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ক্যান্সার। ইতোমধ্যে কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আর্থিকভাবেও স্বচ্ছল হন। জিউ জার্সিতে একটি ফ্ল্যাট এবং আরেকটি বাড়ি করেন। ঢাকায় সম্ভবত গোড়ানে জমি কিনেন; ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট কিনে ভাই-বোনদের দেন। সেই কৈশোরে ঢাকায় থাকার সময় বিয়ে করেছিলেন কবি শাহাদাত বুলবুলকে। কিন্তু তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। আলেয়ার আবার স্বপ্ন ছিলো সংসারের। কিন্তু তা আর হলো না।

ইতোমধ্যে প্রকাশ পায় ইংরেজি-বাংলা কবিতা বই। আমি তার একটি বইয়ের প্রকাশক। The Man : Father of Bangladesh’ নামে বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। সব মিলিয়ে তার বইয়ের সংখ্যা ১১টি।

একবার তাকে বিটিভির ‘দৃষ্টি ও সৃষ্টি’তে আমন্ত্রণ জানাই। তিনি অতীতের স্মৃতিচারণ করতে করতে কেঁদে ফেলছিলেন। তিনি বলতেন, অতীত নাকি মধুর হয়; আমার অতীত বিষাক্ত, তেঁতো।

সেদিন তার সম্মানীর ছয়শ টাকার চেকটি এতিমদের দেয়ার জন্য আমাকে ফেরত দিলেন। আমি বললাম, এই চেক তো আপনার একাউন্টে জমা দেয়া ছাড়া ক্যাশ হবে না। তিনি বললেন, তাহলে ৫০০ টাকা একজন গরীবকে দিয়ে দিয়েন।

আমি বললাম, এই চেক স্মৃতি হিসেবে রেখে দিন। আমি যখন নিউ জার্সিতে তার বাসায় যাই; তখন তিনি হাসতে হাসতে বিটিভির সেই চেক বের করে দেখালেন।

অভিমানী আলেয়ার আরেক দিনের কান্নার কথা খুব মনে পড়ে। তিনি ঢাকায় বেড়াতে এলেন। উঠলেন মহাখালীর জাকারিয়া হোটেলে। আর সন্ধ্যায় নির্মলেন্দু গুণ, মাহফুজা শীলু, আলেয়া আর আমি আড্ডা দিতে গেলাম পূরবী বসুর ধানমন্ডিস্থ ফ্ল্যাটে। তখন পূরবী দি বললেন, আলেয়া তুমি এতো টাকা খরচ করে কেনো এসেছো?

সাথে সাথে আলেয়া কেঁদে ফেললেন, বললেন—দিদি? তুমি এ কী বললে? আমার দেশের মাটি। আমার মা, ভাইবোনদের কি আমি দেখতে আসবো না? আমি কারো কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসিনি। আমি এসেছি আমার টাকায়।

সেদিন রাগে-অভিমানে কিছুই মুখে দিলেন না। আমরা চার জন যখন সেই চার তলা থেকে নেমে এলাম, তখনও আলেয়া কাঁদছিলো।

গুণ দা খুব মজা করে বললেন—আলেয়া, আমরা হচ্ছি ডিম। আর পূরবীরা হচ্ছেন পাথর। আণ্ডা যদি পাথরের উপরে পড়ে অথবা পাথরই যদি আণ্ডার উপর পড়ে তাহলে আণ্ডার অবস্থা কাহিল হয়। কেঁদো না। তুমি সংগ্রাম করা মানুষ। বাংলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছে আর তুমি জীবনযুদ্ধ করেছো। তুমি তো আরেক বীর নারী। বীরের কান্না শোভা পায় না!

তখন আলেয়া চোখ মুছে হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে বললেন, গুণ দা তুমি আমাকে এভাবে মূল্যায়ন করে বীর বানিয়ে দিলে? দাঁড়াও তোমাকে সালাম করি।

আজ আমরা আলেয়া চৌধুরীকেই সালাম জানাই, জানাই স্যালুট।

//জেডএস//

লাইভ

টপ