বোর্হেস প্রসঙ্গে রাজু আলাউদ্দিন

Send
.
প্রকাশিত : ০০:০৫, আগস্ট ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৪, আগস্ট ২৪, ২০২০

কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিনের জন্ম ৬ মে ১৯৬৫ সালে শরিয়তপুরে। লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। কর্মজীবনের শুরু থেকেই সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে জড়িত। তিনি ইংরেজি এবং এস্পানিওল ভাষা থেকে বিস্তর অনুবাদের পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি সাহিত্য নিয়ে নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিরিশের অধিক। কাগজ প্রকাশন থেকে শিগ্রই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তার ‘নির্বাচিত বোর্হেস’। হোর্হে লুইস বোর্হেসের জন্মদিন উপলক্ষে তার সঙ্গে ফোনালাপ করেন জাহিদ সোহাগ।

জাহিদ সোহাগ : আপনি কীভাবে বোর্হেসের সন্ধান পেলেন?
রাজু আলাউদ্দিন : এর আগে আপনাকে একবার ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম, মনে আছে কি না…



জাহিদ সোহাগ : হ্যাঁ, হ্যাঁ…
রাজু আলাউদ্দিন : ওখানে এর উত্তর ছিল বোধহয়। তারপরও কি রিপিট করবো?



জাহিদ সোহাগ : হ্যাঁ, কথা বলার সুবিধার্থে একটু শুনি, সংক্ষেপে...
রাজু আলাউদ্দিন : আমার যতদূর মনে পড়ে, রফিক ভাই [কবি রফিক আজাদ] বোর্হেসের একটি কবিতা অনুবাদ করেছিলেন, কবিতাটির ইংরেজি নাম ছিল ‘ডেগার’। তিনি অনুবাদ করেছিলেন 'ছোরা' নামে। ওই কবিতাটি পড়েই আমি বোর্হেসের প্রতি আকৃষ্ট হই।



জাহিদ সোহাগ : সেটা কত সালের দিকে?
রাজু আলাউদ্দিন : এটা আশির দশকের দিকে হবে। হতে পারে এই কবিতাটা আমি পড়েছি ৮০-৮২ সালের দিকে। মানে আশির দশকের প্রথমার্ধে।



জাহিদ সোহাগ : আচ্ছা, আচ্ছা।
রাজু আলাউদ্দিন : কবিতাটি যদি আপনার মনে থাকে, তাহলে দেখবেন যে, কবিতার মধ্যে একটা ছোরার কথা বলা হচ্ছে। যে ছোরাটা ড্রয়ারের মধ্যে ছিল, যখন ছোরাটা স্পর্শ করছেন তখন সেটা জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং কবি বলছেন এই ছোরাটা সিজারকে হত্যা করেছিলো—এভাবে বর্ণনা দিচ্ছেন তিনি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, একটা জড় বস্তুর ভেতর কবি প্রাণ সঞ্চার করছেন এবং আপনাকে তা বিশ্বাস করিয়ে ছাড়ছেন। কবিতাটি একটু অন্যরকম। এভাবেই বোর্হেসের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মে।



জাহিদ সোহাগ : বোর্হেসের মধ্যে এ রকম ব্যাপারে আছে। ‘The Book of Sand' গল্পের কথা মনে পড়ছে। বইটা কীভাবে একটা রহস্যের মধ্যে নিয়ে গেল।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, হ্যাঁ। এসব ব্যাপার তার কবিতার মধ্যে আছে, গল্পের মধ্যে আছে।



জাহিদ সোহাগ : আচ্ছা, ওই সময় বোর্হেস চর্চা হয়তো হতো, তবে আপনার মতো ব্যাপক পরিসরে কেউ বোধহয় করেনি বাংলাদেশে?
রাজু আলাউদ্দিন : না, বাংলাদেশে তো নয়ই, এমনকি সত্যের খাতিরে যদি বলতেই হয়, বোর্হেসকে ব্যাপকভাবে অনুবাদ করা এবং বই প্রকাশ করার উদ্যোগ কিন্তু আমিই প্রথম নিয়েছিলাম। কিন্তু ঘটনা হলো, আমার ওই বই প্রকাশ হওয়ার আগেই মেহেবুব আহমেদ নামে এক ভদ্রমহিলা বোর্হেসের কিছু গল্পের অনুবাদ নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ করেছিলেন 'নদী প্রকাশনী' থেকে। আমার বইটা প্রকাশিত হয়েছে এর পরে, কিন্তু আমার বোর্হেস চর্চা শুরু হয়েছে ওই বইয়ের অনেক আগে থেকেই। এরপর আমি আবার দেশের বাইরে চলে গেলাম, সেখানে আমার দশ বছর প্রায় বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা। সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন বলা যায়, কারণ এমন একটা দেশে ছিলাম যেখানে বাংলাভাষী লোকজন খুব একটা নেই।



জাহিদ সোহাগ : মেহেবুব আহমেদ কি স্প্যানিশ জানতেন?
রাজু আলাউদ্দিন : না, উনি অনুবাদ করেছেন ইংরেজি থেকে…



জাহিদ সোহাগ : ইংরেজি থেকে?
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ ইংরেজি থেকে। তার অনুবাদ নিয়ে আমার আপত্তি আছে। তবু আমি বলবো যে, বইটা যেহেতু প্রকাশিত হয়েছিল, এটা তথ্য হিসেবে স্বীকার করা উচিত। এর আগ পর্যন্ত বোর্হেস নিয়ে তেমন কোনো চর্চা ছিল না। হয়তো ষাটের দশকে বা সত্তরের দশকে বোর্হেসের একটি দুটি কবিতা হয়তো অনুবাদ হয়েছে কিংবা গল্প, যেমন বেলাল ভাই [কবি বেলাল চৌধুরী] একটা গল্প অনুবাদ করেছিলেন। তারপরে জাকারিয়া সিরাজীও একটা গল্প অনুবাদ করেছিলেন। আমি এগুলো দেখেছি বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায়। আর পশ্চিমবঙ্গের কারো অনুবাদ খুব একটা চোখে পড়েনি আমার।



জাহিদ সোহাগ : বোর্হেসের জন্ম সম্ভবত ১৮৯৯ বা ওই সময়ের দিকে।
রাজু আলাউদ্দিন : ১৮৯৯ সালে…



জাহিদ সোহাগ : মানে, আমাদের নজরুল-জীবনানন্দ দাশ সেই সময়ের?
রাজু আলাউদ্দিন : একদম একই বছরের, একই সময়ের।



জাহিদ সোহাগ : মানে ৩০-এর প্রজন্ম।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, সেই অর্থ বলতে পারেন ৩০-এর প্রজন্ম, তবে বোর্হেসের বই বেরিয়েছে কিন্তু ত্রিশের দশকের আগে। ওনার প্রথম বই বেরিয়েছে সম্ভবত ২৩ সালে, সেটা ছিল কবিতার বই।



জাহিদ সোহাগ : উনি তো ছোটবেলা থেকেই লেখক, আর বই প্রকাশের ব্যাপারে তার যথেষ্ট আগ্রহ ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন : ভীষণ, ভীষণ। তার প্রথম লেখাই বেরিয়েছে তার বয়স যখন ৭ বা ৮। সেটা ছিল অস্কার ওয়াইল্ডের হ্যাপি প্রিন্স নামক গল্পের একটা অনুবাদ, ইংরেজি থেকে স্প্যানিশে। উনি ছোটবেলা থেকেই লেখক হওয়ার কথা ভেবেছিলেন।



জাহিদ সোহাগ : ওনার বাবাও তো একটা উপন্যাস লিখেছিলেন, যেটা তার সম্পাদনা করার কথা।
রাজু আলাউদ্দিন : ওনার বাবা একটা উপন্যাস লিখেছেন, কিন্তু সেটা শেষ করতে পারেননি, ওটার নাম ছিল El Caudillo। বোর্হেসের ইচ্ছে ছিল সেটা শেষ করবেন, কিন্তু পরে আদৌ শেষ করতে পেরেছেন কি না আমি সেটা জানি না। এছাড়া ওনার বাবা রুবাই ধরনের কিছু কবিতা লিখেছিলেন, ওমর খৈয়ামের যে রুবাই সেই ধরনের। তার বাবা অসম্ভব পড়ুয়া লোক ছিলেন। একটু-আধটু লেখালেখি তো করতেনই... এবং আপনি জানেন যে, বোর্হেস কোথাও একবার বলেছিলেন যে, আমার বাবার লাইব্রেরিটা আমার জন্য একটা বিরাট প্রাপ্তি ছিল। তার মানে তাদের একটা সমৃদ্ধ পারিবারিক গ্রন্থাগার ছিল। ওনার মা-ও ছিলেন ভীষণ পড়ুয়া।



জাহিদ সোহাগ : হ্যাঁ, বোর্হেসের আত্মজীবনী পড়ে অবাক হয়েছি ওই সময় এমন পড়ুয়া-শিক্ষিত ফ্যামিলি...
রাজু আলাউদ্দিন : ওনার মামা অথবা চাচা এই মুহূর্তে নামটা মনে পড়ছে না, উনি ছিলেন বুয়েনোস আইরেস থেকে প্রকাশিত একটা ইংরেজি পত্রিকা 'দ্য হেরাল্ড'-এর সম্পাদক। ওনার মায়ের দিক থেকেও এবং বাপের দিক থেকেও ওনারা খুব বনেদি পরিবারের মানুষ ছিলেন। বনেদি পরিবার বলতে বোঝাচ্ছি, যেমন সামরিক ঐতিহ্যের। ওনার এক পূর্বপুরুষের নামে আর্জেন্টিনার একটি প্রভিন্সের নাম।


জাহিদ সোহাগ :
তার ফ্যামিলির কেউ একজন তো স্বাধীনতা-ঘোষণা-সভার সভাপতিও ছিলেন। ফলে অনুমান তো করাই যায়।

রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, স্বাধীনতার সঙ্গেও জড়িত তার পূর্বপুরুষেরা। তার মায়ের পরিবারের পূর্বপুরুষ ফ্রান্সিস্কো দে লাপ্রিদা। ১৮১৬ সালে যে-কংগ্রেস আর্হেন্তিনিয় কনফেডারেশনের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলো, তিনি তার সভাপতিত্ব করেছিলেন। অন্যদিকে, তার পিতামহ কর্নেল ইসিদোরো সুয়ারেস ২৪ বছর বয়সে পেরুভিয়ান ও কলোম্বিয়ান অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যা পেরুর হুনিনের যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।



জাহিদ সোহাগ : যার জন্ম নজরুল-জীবনানন্দ দাশের একই সময়কালে, তার লেখা আমরা পড়তে শুরু করলাম, ধরুন আপনি, আশির দশকে আর আমরা প্রায় নব্বই দশকের পর। এই যে দীর্ঘ গ্যাপ, তো আজকের পৃথিবীতে নানা ভাষায় যারা লিখছেন তাদের খবর পেতে আমাদের কি আবার ৫০-৬০ বছর লাগার কথা? আজকের এই যোগাযোগ-সুলভ পৃথিবীতে কেন বাংলাদেশ এতটা পিছিয়ে থাকছে। এ বিষয় নিয়ে আপনার চিন্তা-ভাবনা কী?
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার প্রশ্নের একটা দিক হচ্ছে, আমরা কেনো এত দিন পর বোর্হেস সম্পর্কে জানতে শিখলাম। আমার যেটা মনে হয়, আমাদের এখানে যারা বিদেশি সাহিত্য চর্চা করেন কিংবা যারা বিদেশি সাহিত্য অনুবাদ করেন কিংবা আমাদেরকে যারা বিদেশি সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা দেন তাদের উপর প্রধানত ইংরেজি সাহিত্যের বড় প্রভাব আছে। আমাদের মূল ভরকেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় ইংরেজি সাহিত্য। ফলে বিদেশি সাহিত্য বলতে আমরা বুঝি, ইংরেজি সাহিত্য। আপনি দেখবেন যে আমাদের যারা প্রধান লেখক—সেটা কবিতাই হোক বা উপন্যাসই হোক বা গল্পেই হোক, এমনকি প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও—তাদের আদর্শ যারা তাদের বেশিরভাগই কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যের লেখক। আর ইংরেজি সাহিত্যের বাইরে বুদ্ধদেব বসুর সূত্রে আমরা কখনো ফরাসি লেখকদের, কখনো হয়তো জার্মানভাষী লেখকদের আদর্শ বলে মেনে নিয়েছি। কিন্তু এই তিনটি ভাষার বাইরেও যে বড় বড় লেখক আছেন তাদের নিয়ে তেমন একটা চিন্তাভাবনা নাই। স্প্যানিশ সাহিত্য সম্পর্কে কিন্তু আগ্রহ তৈরি হয়েছে অনেক পরে। আমাদের ত্রিশের লেখকদের মধ্যে কিন্তু স্পানিশ সাহিত্য নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ বা আগ্রহ আপনি দেখতে পাবেন না। ব্যতিক্রমের মধ্যে বিষ্ণু দে-কে আপনি একটু পাবেন এবং বিষ্ণু দে পাবলো নেরুদার কবিতা অনুবাদ করেছেন। তাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎও হয়েছে। এছাড়াও কিছু স্প্যানিশ কবির কবিতাও তিনি অনুবাদ করেছেন, কিন্তু একটি-দুটো ছিটেফোঁটা ছাড়া ত্রিশের দশকের কোনো কবি এদিকে মনোযোগ দেননি।



জাহিদ সোহাগ : এটা কি বলা যায়, ব্যাপকভাবে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ই আমাদের লাতিন এবং আফ্রিকার সাহিত্যের দিকে চোখ ফিরিয়েছেন?
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, অবশ্যই। আমি মনে করি, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় একটা বিশাল ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে আমি বলবো যে, স্পানিশ সাহিত্যকে এককভাবে তিনি যেভাবে পরিচিত করেছেন বাংলা ভাষায়, ওনার তুল্য আর কেউ নেই। আরেকজন আছেন অসিত সরকার, পশ্চিমবঙ্গের। উনি এখনো বেঁচে আছেন কি না জানি না, উনিও বেশ কিছু স্প্যানিশ সাহিত্যের অনুবাদ করেছেন। আরেকটা কথা সেটা কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, সেটা হলো এক সময় শওকত ওসমান একটা অনুবাদ-সংকলন করেছিলেন 'স্পেনের গল্প' শিরোনামে, বইটা বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল, বইটা আমার কাছে আছে, এটা তিনি ষাট বা সত্তরের দশকে অনুবাদ করেছিলেন। শওকত ওসমানের এই বইটির কথা আমাদের মনে রাখা উচিত কৃতজ্ঞতার সাথে। তার এই বইটা কিন্তু মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগে, এই বইটার কোনো রি-প্রিন্টও নাই, তবে এটা আবার প্রকাশিত হওয়া উচিত। এটা আমাদের নলেজে আসা উচিত। আর মানবেন্দ্র যেটা করেছেন সেটা তো সত্যিই অসামান্য কাজ। আমি মনে করি এজন্য বাঙালি পাঠকদের খুবই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত তার কাজের প্রতি।



জাহিদ সোহাগ : আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'খোয়াবনামা' পড়ে মনে হয়েছে যে, ওনারও স্প্যানিশ সাহিত্যের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, খুবই ছিল। ওনার ইন্টারভিউ এবং বিভিন্ন লেখায় এই যোগাযোগের কথা এসেছে। উনি বিশেষ করে সের্ভান্তেসের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। মার্কেস নিয়ে তার একটা লেখা আছে, যদি লেখা নাও থাকে তবে তার সম্পর্কে বা তার লেখা সম্পর্কে অনেক মন্তব্য আছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'খোয়াবনামা' এক অর্থে আমি বলবো, স্প্যানিশ সাহিত্য পড়ে উদ্বুদ্ধ হওয়া, এটা আমি প্রভাব বলবো না, যে কোনো বড় লেখকই তার পরবর্তীকালের লেখকদের নতুন নতুন পথের সন্ধান দেন। সে দিক থেকে আমি বলবো, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাসের পেছনে যে দূরবর্তী উদ্দীপনা কাজ করেছে, সেই উদ্দীপনা স্প্যানিশ সাহিত্য থেকে আসা।



জাহিদ সোহাগ : কার্পেন্তিয়রের 'এই মর্তের রাজত্ব'র সঙ্গে ফর্মের দিক থেকে 'খোয়াবনামার' একটা মিল আছে।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, ইলিয়াস ভাই সাংঘাতিক পড়ুয়া মানুষ ছিলেন, তা আপনারা ভালো করেই জানেন। তার উপন্যাসে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে, কাল্পনিক একটা জায়গা তৈরির মধ্যে আপনি স্প্যানিশ বহু লেখকদের উপন্যাসের মধ্যেই যা আছে, তা পাবেন। একজন লেখকের কথা বলছি, হুয়ান কার্লোস ওনেত্তি, তার একটা উপন্যাসের একটা কাল্পনিক জায়গা আছে সেটা হচ্ছে 'সান্তা মারিয়া'। তারপর 'শত বছরের নিঃসঙ্গতা'য় কাল্পনিক মাকোন্দো, এগুলো কিন্তু ছিল। তবে আমাদের উপন্যাসে এর আগে যে কাল্পনিক দিক ছিল না, তা নয়। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে ময়নাদ্বীপের কথাই আমাদের মনে পড়বে। খোয়াবনামা উপন্যাসেও সে রকম একটা কাল্পনিক জায়গা আছে। কিন্তু তা খুব আলাদা ধরনের।



জাহিদ সোহাগ : ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় তো ‘কঙ্কাবতী’র মধ্যে দিয়ে এমন একটা উদাহরণ হয়ে আছেন। কিন্তু সেটা খুব একটা হালে পানি পায়নি।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, সেটা অবশ্য পায়নি। পায়নি কারণ হয়তো প্রকরণের জায়গাটা খুব দুর্বল ছিল বলে। 'খোয়াবনামা' তো দুর্দান্ত একটা কাজ, তাই না? আপনি এখানে হিউমার বলেন বা শিল্পরীতি বলেন, কল্পনা বলেন—সবদিক থেকেই এটা বেশ অগ্রসর এবং বাংলা ভাষায় নতুন ধরনের উপন্যাস। এই উপন্যাসটা বাংলা ভাষায় দীর্ঘদিন টিকে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।



জাহিদ সোহাগ : কাগজ প্রকাশন থেকে আপনার 'নির্বাচিত বোর্হেস' প্রকাশিত হচ্ছে, এটা আমাদের জন্য একটা ভালো খবর। আপনি এর আগেও বোর্হেসের বহু লেখা নিয়ে অনুবাদ-সংকলন করেছেন এবং ‘ঐতিহ্য’ থেকেও একটা গ্রন্থ-সিরিজ প্রকাশিত হয়েছিল, তো আবার 'নির্বাচিত বোর্হেস' কেন? এতে বিশেষ বা ব্যতিক্রম কী আছে?
রাজু আলাউদ্দিন : ‘ঐতিহ্য’ থেকে পাঁচ খণ্ডে বোর্হেস প্রকাশিত হয়েছিল। আর ‘কাগজ প্রকাশন’ যেটা প্রকাশ করতে যাচ্ছে সেটা হচ্ছে, ওখানকার চারটি খণ্ডেরই সংকলিত রূপ, বা তারচেয়েও বেশি কিছু। তার চেয়েও বেশি কিছু এইজন্য যে, ‘কাগজ প্রকাশন’ থেকে যেটা বেরোবে সেখানে নতুন কিছু যুক্ত হবে। আবার এমন কিছু আছে যেগুলো আমার কাছে দুর্বল মনে হয়েছে সেগুলো বাদও যাবে। কাজেই কাগজ প্রকাশনের এই সংকলনের সাথে আগেরগুলো মেলালে চলবে না।









দ্বিতীয়ত, ‘কাগজ প্রকাশন’ থেকে যেটা বের হতে যাচ্ছে এটার অনুবাদ আরও বেশি পরিমার্জিত, পরিশীলিত এবং সংশোধিত রূপ হিসেবে বের হতে যাচ্ছে। আগে অনেক ভুল-ত্রুটি ছিল, সেগুলো এবার সংশোধন করার সুযোগ পেলাম। ফলে কাগজ প্রকাশনের ‘নির্বাচিত বোর্হেস’কে আমি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি।



জাহিদ সোহাগ : আপনি মনে করেন এই 'নির্বাচিত বোর্হেস'টি আপনার একটি সন্তুষ্টির জায়গায় তৈরি করতে পারবে?
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, কিছুটা, তবে আমি এখনো বোর্হেস নিয়ে তৃপ্ত না এজন্য যে, বোর্হেস নিয়ে আরও কিছু কাজ করার আছে। সেগুলো আমি করবো। বহু পাঠকই আমার সঙ্গে দেখা হলে, বা ফেসবুকে, বা বিভিন্ন সময় ফোনে জানতে চান বইগুলো কবে আসবে, তখন আমার মনে হলো যেহেতু বাংলাদেশের পাঠকদের একটা জাগ্রত কৌতূহল আছে, ফলে লেখাগুলো একত্রিত হয়ে আবার প্রকাশ করা উচিত।



জাহিদ সোহাগ : বোর্হেস তো পাঠক হিসেবে খুবই সুবিদিত। বোর্হেসের কি বাংলা ভাষার কোনো লেখকের সাথে পরিচয় ঘটেছিলো?
রাজু আলাউদ্দিন : শুধু বাংলা ভাষার লেখার সঙ্গে পরিচয় নয়, বাংলা ভাষার একজন বিখ্যাত লেখকদের সঙ্গে তার দেখা এবং কথাও হয়েছিলো, এমনকি কথা-কাটাকাটিও হয়েছিলো। এগুলো বোর্হেস নিজেই বলেছেন। ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বুয়েনোস আইরেসে পা রাখেন তখন তিনি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর অতিথি হিসেবে ওখানে থাকেন মাস দেড়েকের মতো। পারিবারিকভাবে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে তো বোর্হেসের সম্পর্ক ছিল, মানে বোর্হেসের মা ছিলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বান্ধবী। ফলে বোর্হেসের সঙ্গে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর ভালো যোগাযোগ ছিল। রবীন্দ্রনাথ যেহেতু ওখানে ওনার বাড়িতে থেকেছেন, ফলে বোর্হেসের সঙ্গে তার আলাপ হয়েছে। বোর্হেসের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কথা হচ্ছিল বিভিন্ন ইংরেজি লেখকদের নিয়ে, তাদের একজন ছিলেন Rudyard Kipling। রবীন্দ্রনাথ Rudyard Kipling কে অতটা পছন্দ করতেন না তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে। অন্যদিকে বোর্হেস আবার Rudyard Kipling-এর ভীষণ রকমের ভক্ত, তার লেখার খুব অনুরাগী। ফলে এই নিয়ে তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়েছিলো। আরেকজন বাংলা ভাষার লেখক সম্পর্কে বোর্হেস জানতেন, তার লেখাও পড়েছিলেন, তিনি হচ্ছেন অমিয় চক্রবর্তী। অমিয় চক্রবর্তী সম্পর্কে তার মন্তব্যও আছে। আর এর বাইরে কোনো লেখক আছেন কি না আমাকে আরও অনুসন্ধান করে দেখতে হবে।



জাহিদ সোহাগ : ওই সময় তো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়রা অনূদিত হন নাই?
রাজু আলাউদ্দিন : না, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তখনো অনূদিত হননি। যখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে গেছেন ততদিনে বোর্হেস অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তখন তো তার পড়াশোনাও খুব লিমিটেড ছিল। কিন্তু একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, বোর্হেসের সঙ্গে ভারতবর্ষের, এমন কি এই বাংলার বহু সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের একটা সম্পর্ক আছে। বোর্হেসের কোনো এক লেখায় টাইগার অফ বেঙ্গল-এর কথা আছে। বাঘ নিয়ে তার তো একটা অবসেশন ছিল—যেটা ডোরাকাটা বাংলার বাঘ।



জাহিদ সোহাগ : বাঘ নিয়ে তার প্যারাবল আছে।
রাজু আলাউদ্দিন : বাঘ নিয়ে প্যারাবল আছে, কবিতা আছে, প্রবন্ধেও উল্লেখ আছে। তার বহু লেখাতেই এই বাঘের উল্লেখ আছে। তারপর আছে বাংলার গোলাপ। বাংলার গোলাপের কথাও রয়েছে। তারপর, ধরেন কলকাতা বা মুম্বাই, বা ভারতের বহু জায়গার কথা আছে। ভারতের সংস্কৃতি ও সাহিত্য সম্পর্কে, গৌতম বুদ্ধ নিয়ে তার একাধিক লেখা আছে এবং গৌতম বুদ্ধ নিয়ে তার একটা আস্ত বইই আছে। আপনি জানলে খুশি হবেন যে, আমি সর্বশেষ যে সাক্ষাৎকারটা অনুবাদ করলাম মারিও বার্গাস ইয়োসার নেওয়া, সেখানে উনি বলেছিলেন, উনি যে দু’টি দেশ দেখতে চান তার একটি হচ্ছে চীন আরেকটি ভারত। উনি কখনোই এখানে আসতে পারেননি, কিন্তু দেখার খুব ইচ্ছা ছিল।



জাহিদ সোহাগ : এটা আমাদের জন্যই দুর্ভাগ্য আসলে।
রাজু আলাউদ্দিন : দুর্ভাগ্যই বটে। কিন্তু উনি এটাও বলছেন, আমি যদিও সেখানে যাইনি কিন্তু আমি সেখানকার লেখার মধ্য দিয়ে ঠিকই সেখানে ভ্রমণ করেছি এবং এটাই স্বাভাবিক। আর এই হচ্ছে তার ভারতের সাথে, বাংলার সাথে সম্পর্কের খানিকটা নমুনা।



জাহিদ সোহাগ : আমাদের আলাপ এখানেই শেষ করছি। তার আগে জানতে চাই 'নির্বাচিত বোর্হেস'-এর কাজ কতদূর অগ্রসর হলো?
রাজু আলাউদ্দিন : কাজ আগাচ্ছে। এই মহামারি পরিস্থিতে কাজে আমি হয়তো একটু ধীর গতির হয়ে যাচ্ছি।



জাহিদ সোহাগ : এবার কি বইমেলায় আসার সম্ভাবনা আছে?
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে। মেলায় চলে আসবে।



জাহিদ সোহাগ : তাহলে এবার আমরা ‘নির্বাচিত বোর্হেস’ মিস করবো না।
রাজু আলাউদ্দিন : না না, মিস করার প্রশ্নই আসে না।



জাহিদ সোহাগ : সময় দেবার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ, প্রিয় জাহিদ।

 

শ্রুতিলিখন : মুশফিকুর রহমান


//জেডএস//

লাইভ

টপ