অদেখা
কী বসাও অস্ফুট ডালে
অবিরাম জোনাকি জেনেছে
আলো যত বেশি ভারী হয়
কোটরে মাথা নামিয়ে
নিজেকেই বলি দিতে হয়।
অতএব, ছায়া-ফুল-হাওয়া
ঝুঁকে থেকে ফিরে গেছে
ছুঁয়ে আছে দীর্ঘ শুষ্ক চাওয়া।
কী জাগাও মৃতের শরীরে
বাকলে ওষুধ জেনে,
যারা সব এসেছে হৃদয়ে
অনন্ত ঘুম দিয়ে গেছে।
হাওয়া
মৃত সে ফড়িং
তবু তার কাঁপনের মায়া
বাতাসে ছড়িয়ে গেল রেশ
যে শপথে উড়ছে পালক
অথচ, নিচেই সমাবেশ
পাখিদের শোকসভা যেন।
একটি পালক উড়ে যায়,
ডানাহীন, চ্যুত প্রাণ, তবু অনায়াসে
হয়তো নদীর কাছে যাবে,
হয়তো মৃতের গায়ে লেগে
ফড়িংয়ের আত্মা জুড়বে।
সংকল্প
ভেঙে পড়ো লালাগ্রন্থি,
দেখি তুমি যতটা গড়াও
সাড়া থেকে নামরস
শুনি, স্তব্ধ, মুগ্ধ তমসায়
এ কপালে শিলাস্তর
ছুঁয়ে দিলে দেবীত্ব লাভ
মাথা ঠুকে চলো নদী
ডানদিকে সুপ্ত গহ্বর
হে কালী, হে কালীশ্বর
ঢেলে দাও কৃষিসিক্ত জল
রাত যত গাঢ় হয়, জিভ তত
স্বাধীনতা পায়
এখন এ হাঁ মুখে লেগে আছে
পিশাচিনী শোক
নগ্ন কার্তিক মাসে
প্রেতনদী,
পরি না বসন।
অন্ধ
অযত্ন তোমার চোখ
যেটুকু দ্যাখো, দৃষ্টিহীন থাকো
আমার বেহালায় বাজানো কিসসা
শুধুই দৃশ্যমান ভেবে ছুঁয়ে ফ্যালো
মৃত আসবাব
ভাবো বুঝি পাখি ওড়ে,
গান ছোটে স্নিগ্ধ পূর্ণিমা?
এখানে শহর চাপা ক্রোধ নিয়ে
পড়ে আছে প্রিয়
যেটুকু দ্যাখো না, সেখানে
কান্না জেগে জেগে
দ্রোহের প্রতিমা গড়ে,
এক থেকে অসংখ্য আরেক।
হৃদয়
কী ভীষণ ভাড়া খেটে ফুরিয়েছ যাপিত হৃদয়
এখন মেঘের মতো অবগুণ্ঠনে
প্রেমকে লোপাট করি।
প্রেমিকের ঘ্রাণ জুড়ে বাড়ন্ত লিখি।
এসেছো হাতের ভানে হাত রাখা যত
সেখানে মধুর ধ্বনি, দিব্যি আশাবাদ
পরক্ষণেই নদী, পরক্ষণেই বালিঘড়ি
কতটা সময় হলো, পেরোনো পথের মতো
ছেড়ে আসি পথ।
প্রেমের অদর্শনে শরীরের জাগগান শুনে
হৃদয়, তোমায় দেখি
ফানুসের মতো একা উড়ছো, অযথা।
চেনা সংরাগ
সারারাত বালিকার রাত,
অদূরে সরষে ঘ্রাণ গৃহছাড়া করে,
নিমগ্ন শ্বাপদ হৃদয় ভাঙা হয়
পাথরে পাথরে,
যেভাবে আগুন জ্বলেছিলো—
হোমো হাবিলিস সংরাগে,
মাংসের পুরোনো ভূমিকা, কাঁচা জিভে
শিকড় চেনায়
এভাবে ফিরবে? নাকি
রং করা গুহা থেকে নিজের প্রতিকৃতি
খুঁজে নেবে বালক-বালিকা?
সংক্রমণ
এভাবে অশ্বত্থ গাছ হয়ে যাব ক্রমে
ছায়ায় পা ছড়িয়ে বিড়ি খাবে ব্যর্থ দিনেরা
এঁটো হাতে উঠে যাবে ভূতে পাওয়া ডিগ্রিগুলো, আর
অশ্বত্থের অন্ধকারে বোঁ বোঁ সব স্বপ্নগুলো কামড়ে ধরবে গাছের আকাল
গুঁড়িতে ধ্যানস্থ কোনো নদীপথ নুড়ি-পাথরের খোঁজে জাগবে না রাত
মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে থাকা আমি, রুজি, ভাড়াটের টাকা, প্রবাল, গোমেদ আর হারানো প্রেমিক,
ক্রমাগত শিকড়ের লোভে লোভে খুঁড়ে ফেলছে চারাটাকে,
জল ঢালছে, রাগ করছে রোজ।
অশ্বত্থের ছায়ায় ছায়ায়, রোজ অসংখ্য অশ্বত্থ হয়ে ওঠা...
আশাফুল
বিবর্ণ অপেক্ষায় ঝুলতে ঝুলতে দেখি
ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে ঋতু,
তুমি তবে গ্রীষ্ম ভেবে নিও আমাকে
এই পাতা, এই গাছ অসহ্য যন্ত্রণা ঠেলে
দামি ফুল হয়ে উঠবে, স্থির।
ঠোঁটে তা দিতে দিতে বাঁশি
বেজে ওঠে যখন,
তখনই স্টেশন ছেড়ো না।
দুপুর অস্বীকার করলে
'আমি গ্রীষ্ম', ভুলে যাবে তুমি।
ভুলে যাবে ঝুলে থাকা তুমুল আশাবাদ,
প্রতিটি খয়েরী মাটিতে একটি ফুল।
নদীগাছ
এ প্রলাপে নদী নেই কোনো
শূন্য আকুতি জুড়ে কবেকার মেঘ জমে আছে
ভাঙা ডালে বিষণ্ণ দেবতা, উবু হয়ে বসে থাকে,
অভিশাপে আত্মমুখ খোঁজে।
সে ধারণা ভুল ভেবে পাখিদের কলতান
অভ্যাসে ঠোঁটে জোর দেয়,
যে গানে মানবজন্ম, আশ লেগে থাকে,
কবেকার আবেগতাড়িত, সংকেতলিপি সব,
অবশেষে ডানা থেমে যায় উড়ানের ঠিক
মুখে এসে।
আসলে কেউ কখনো পাখি বা মানুষ
হতে পারে না পুরোপুরি।
শুধু মেঘ আকাশে আকাশে, বিড়বিড় করে—
অতীতের জলজন্ম এঁকে দিতে চায়।
অশ্রু
তুমি শীত।
সঙ্গসূত্রে হিম।
ছুঁলেই কপাট খুলে দাও।
এলো হাওয়া সারাদিন ওড়ে।
বাতিল দালানে থমকায়।
মাঠ নয়, মাঠের নীরবতা।
কুয়াশা আসলে গতপ্রেম।
চেয়ে থাকি, ক্রমশ জড়তা,
আমাকে করছে অশরীরী।
ছিলো, আছে, না থাকার নদী।
মরা পাড়, অসমাপ্ত, চুপ।
মুখের আদল ফেলে আসি।
চলায় শোকের গতি কার?
হাওয়ায় দুলতে থাকা হাত,
এ ডানা দারুণ নির্ভার।
পালকে শিশির দাও মেঘ,
বিরহে সামান্য জল থাক।
সুদেষ্ণা মৈত্রর জন্ম ২৮ জুন ১৯৯০, বারাসাতে। বর্তমানে মালদা কলেজে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, পিএইচডি করেছেন নর্থবেঙ্গল ইউনিভার্সিটি থেকে।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: ‘চোখ রেখেছি চোখে’ (২০১৬), ‘একরোখা চিরুনি তল্লাশি’ (২০২১) এবং ‘নক্ষত্রে গাঁথা শরীর’ (২০২৪)।
‘একরোখা চিরুনি তল্লাশি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি জাতীয় সাহিত্য আকাদেমি যুব পুরস্কার পেয়েছেন।









