অ্যাডলফ হিটলারের ঘোড়া
ধানখেতের আলে কেউ ফেলে গেছে একজোড়া চটি
ঘাস কাটতে আসা অ্যাডলফ হিটলার ভাবছেন; জটিজোড়া হয়ত কোনো খেয়ালি মেঘের
গতকাল ধানখেতে রাত্রি কাটিয়ে খুব ভোরে চটি খুলে আকাশে উড়েছে
আসলে জানে না কবির এই চটিজোড়া
স্বয়ং কবিই খুলে
ওই দূরে ঘাসে শুয়ে আছে
এখন সন্দেহরা কানে কানে তোমাকে বলছে—কবিকে না চিনতে পেরে
ঘাসের সঙ্গে কেটে
অ্যাডলফ হিটলার তার ঘোড়াটিকে খেতে দেন কিনা!
মর্নিং ওয়াক
সকালে হাঁটতে গিয়ে হালকা আলোয় খুব খেয়াল করে দেখেছি—
পাশ কেটে যাবার সময়
একজন আর একজনের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে
একজনকে ভেদ করে আর একজন বেরিয়ে যাচ্ছে
মেঠোপথে বাঁক ঘুরতেই লাউয়ের মাচাটি
দুটো লাউ ঝুলে আছে
আর খুব আশ্চর্য; লাউ দুটো বক্ষবন্ধনীর মতো শিকে বেঁধে
ঝুলিয়ে দিয়েছে কেউ!
আমাদের কৃষি ব্যবস্থাপনায় দিনে দিনে এইভাবে গভীর হচ্ছে আধুনিকতা ও সৃজনশীলতার ছাপ
রাশিয়ান যুবতীর মতো একখণ্ড সাদামেঘ পুব আকাশে
তার পশ্চাৎদেশে
আদরে আদরে থাপ্পড় দিয়ে লাল করে দিয়েছে
নতুন সূর্য
ডাকবাংলো
দোলনাটি দোলে যাচ্ছে। নিঃসঙ্গ।
অদ্ভুত কেয়ারটেকার বিশাল গাছের নিচে
দড়ির খাটিয়া পেতে ঘুমিয়েছে
নিচে ওর কুকুর ভুলুয়া
আচমকা মাথা টেনে উঠে বসে কুকুরটি তাকিয়ে আছে
দূর সড়কের দিকে। কিছু রহস্যের দিকে...
২.
পথের দু’পাশে ঘনগাছপালা। তার পাশ দিয়ে যেতে
মনে হলো—একেই তা হলে বলে
সবুজ ইশারা?
অথবা অরণ্যের জাদু? কিংবা দূরের মায়া!
আরও পরে স্পষ্ট হবে; বনের গভীরে গোপনক্ষত এবং যা অনিরাময়যোগ্য
সেই ডাকবাংলো
আমাদের গাড়ির গতির সঙ্গে উড়তে থাকা ধুলো ও শব্দে
খুলে যাচ্ছে তার প্রতিটি দরজা-জানালা
জেগে উঠছে কেয়ারটেকার ও তার চঞ্চলতা
অভ্যর্থনায় নড়ে উঠছে কুকুরের লেজ
৩.
পাকশালা। উনুনে আগুন জ্বলছে। দুপুরের ভূরিভোজ
মন্দ হবে না
কাটা মুরগির পাশে ইস্পাতের ছুরি; তার রক্তমাখা জিহ্বার দিকে
তাকিয়ে রয়েছে দাঁড়কাক
কাক বলতেই তা ট্রেড হিউজের
হিউজ ও সিলভিয়া প্লাথ তাহাদের মধুচন্দ্রিমায়
এই ডাকবাংলোয় এসেছিল কিনা আজ আমরা জানি না
আমরা জেনেছি; স্টোভের আগুনে যদি কবির শরীরও পোড়ে
কবিতা পোড়ে না
৪.
দুপুরের বনের মধ্যে বিকেলের ছায়া দুলে আছে
অদ্ভুত নির্জনতা
পাখিদের চুপচাপ! নতুন আগন্তুককে সন্দেহ বুঝি?
এখন পাখির গানে ভেসে যাচ্ছে বন
বাংলোর জানালা খুলে সবুজ পাতার ফাঁকে
হাল্কা কুয়াশা মোড়া দূরের গির্জার চূড়া দেখা যায়
শুকনো পাতার ওপরে গিরগিটির ছুটে যাওয়া
দূরে কোথাও যেন পাহাড়ি ঝরনার শব্দ একটানা
কাঠঠোকরার ঠকঠক
একেই বলে কিনা অরণ্যের ডাক!
৫.
মাউথঅর্গান বাজানো পাখি ডাকছে; দূর পৃথিবীতে
হারিয়ে যাওয়া
সন্ধ্যা নামের এক পরশি বোনকে
দিনশেষে এখনও তাই সন্ধ্যা নেমে আসে
গাছের আড়ালে কে? ছায়ামূর্তি!
রহস্য উন্মোচনে নেমেছে কি শার্লক হোমস
কাঁপছে বাতাসে উঁচু ঘাসবন
সাপের জিভের জেরক্স
৬.
অ্যালানপোর কালো বিড়াল অন্ধকারে
লাফ দিলো
দোলক চেয়ার খানা দুলিও না। মোম আনো।
রাইটিং টেবিলের উপর দেয়াশলাই। আগুন জ্বালাতে গিয়ে
গোঁফ পুড়ে গেছে
ডাবল জানালা খোলা। একটানা ঝিঁঝিঁকথা।
পড়ে আছে কবির পাণ্ডুলিপি… চাঁদের গরল
৭.
আপেলকাটাছুরি। আর ডাকবাংলোর ঘরে বিস্তারিত আয়না
জেগে আছো?
ঘুমিয়ে পড়ার পর মেয়েটিকে
নিজহাতে নৃশংস খুন করবো আমি
এবং মৃত্যু’পর নির্জন বাংলো জুড়ে মেয়েটির প্রেত-আত্মা
কীভাবে দাপাবে
অন্ধকারে শোন তার
ফিসফাস...
রিহার্সেল চলছে
টাইম মেশিন
কফিনের মতো এক টাইম মেশিন, ঠিক কফিনের মতো নয়
জীবনের সমস্ত রাগ রিভলবারের মতো কোমরে ঝুলানো
ঠিক রিভলবারের মতো নয়
বিকেলে হেমন্তের রোদ নামছে বাড়ির উঠোনে
পাখি ডাকছে ‘বউ কথা কও’
ঠিক ‘বউ কথা কও’ নয় সুখে উঠে বসি টাইম মেশিনে
তেতাল্লিশ বছর পিছনে... আমি-ই এক আট বছর বয়সি বালক
পালিয়ে এলাম যাকে মুহূর্তেই গুলি করে
ওর লাশ হেমন্তের রোদ মেখে বাড়ির উঠোনে পড়ে আছে
ঠিক বাড়ির উঠোনে নয়
আমাদের বাঙলা কবিতা
তাকিয়ে রয়েছি; কেউ নেই। দূর পথের ওপারে ধুলো উড়ছে
কোনো অশ্বারোহী? –কেবল বিভ্রম
টানানো দরিদ্ররেখা; তার নিচে পাখিরা কাঁদছে। কাঁদছে মানুষ
আমার বাঙলা কবিতা তুমি কি বিশ্বাস করো, প্রান্তরে ছড়ানো
এখনো এতটা ধোঁয়াশা
পড়ে থাকা বিষাদ ও নির্জনতাগুলো
নিচু হয়ে পায়রার ঠোঁটে তুলে তোমাকে দেখাব
২.
পাউরুটির পেট কেটে সবজি ও কাটলেট
পুড়িয়ে
খেতে গিয়ে ভাবি নতুন কবিতা নিয়ে
ভাবি, অপর অথবা পুনরাধুনিক কবিতা কী!
এর মধ্যে একটি গরম চায়ের কেটলি চলে আসে
যা আসলে দুধ ছাড়া
লেবুগাছ গাভীর ভূমিকা রাখে বিধবা চায়ের কাপে
৩.
ডাল সেদ্ধ হচ্ছে কিচেনে। শব্দ-কাছের বারান্দা
হাতের কাজের সঙ্গে
প্রেসারের সিটিগুলো গুনে যাচ্ছে বউ
সমস্ত সকালবেলা লেখা টেবিলে বসে
এই সব শুনে-দেখে ভাবি, আড়ালপ্রিয় কবিতাগুলোর কথা
আপনার রোমান্টিক চোয়াল যা চিবুতে পেল না
কবে যে ঘোষণা হবে
শক্ত কবিতার সঙ্গে প্রেসার-কুকার ফ্রি
ডানা
দুপুরের বারান্দা হতে নেমে দেখি মেঘের ভেতর রেডিওস্টেশন; দুপুরটি গান হয়ে বাজে। পাড়ার
গানের দলে গান হয়ে আমিও ছিলাম। ওরা গেছে বায়নার গান নিয়ে দূরের মেলায়
আমার কোথাও যাওয়া কেন যে হয় না!
অপেক্ষা দীঘিটির ঘাট হয়ে, কংক্রিট হয়ে পড়ে আছে
ঘাটে স্নানের পর রূপসি ফড়িং তার ডানা দুটো ফেলে গেছে, কুড়িয়ে নিয়ে আমি পকেটে রেখেছি
আমার ফড়িংজন্মে ডানা দুটো উড়বার কাজে লাগতে পারে
বনভোজন
জঙ্গলের বাইরে পিকনিকের গাড়ি। গাড়িটিতে কেউ নেই
জঙ্গলের ভিতরে এসে বোঝা গেল—
জঙ্গলে ঢুকে পিকনিকের ছেলেমেয়েগুলো সারি সারি গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে
তাদের কলহাস্য এখন ঝরাপাতা; বাতাসে শব্দ করে
বড় এক গিরগিটির পিছে ছুটে যাওয়া ছোট ছোট দু’তিনটে গিরগিটি
ওরা বুঝি পিকনিকের গাড়িটির স্টাফ
২.
‘টেলকম পাউডারের গন্ধ’! চমকে উঠেছি
নির্জন বনের মধ্যে কোন নারী!
খুঁজি তাকে
দেখি, এক সবুজ ফড়িং
বন্ধুত্ব
ধানগাছের গল্প বলছি উঠোনের কামিনীগাছকে
এ পাড়া। পরে আরও পাড়া। বাজার। বটতলা। ছোট গাঙ
পেরিয়ে ধু ধু মাঠ
কামিনীগাছ সব কথা শোনে
বলে, সে একদিন ধানগাছকে বন্ধুত্বের প্রস্তাব পাঠাবে
কামিনীগাছে খয়েরি রঙের ভাতশালিকগুলো
চেয়ার
‘মুরগি লাফিয়ে উঠলো পোপের চেয়ারে’
শুনে গেদু তাকিয়েছে সন্দেহ চোখে
আমাদের গ্রামের গির্জা; গির্জার মাথায় যিশু
যিশুকে বাধ্য করা হয়েছিল বয়ে নিতে নিজে নিজের ক্রুশকাঠ
গ্রাম পেরুলে মাঠ। ফুলকপি মটর পালং আর বিবিধ সবজিখেত
ঠেলাভ্যান বোঝাই হচ্ছে, চলে যাচ্ছে হাটে...আড়তে
আজ পোপের এত ব্যস্ততা, সামান্য বিশ্রাম নেবে
তারও সময় নেই
ফাঁকা তাই পড়েই র’লো নড়বড়ে বাঁশের চেয়ার
ফ্রান্সিস পোপ, আমাদের গ্রামের সবজিবিক্রেতা
আষাঢ়স্য কবিতা
১৪ আষাঢ়, বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া মেঘ বাড়ি ফিরে এলো। বাড়ি জুড়ে বৃষ্টি ও বজ্রপাত। বাড়ি ভর্তি তুমুল বর্ষাকাল। কাঠের আসবাবগুলো গাছের জীবন পেয়ে ডালপালা মেলছে আবারও
অঝোর রাত্রি। বউ পালঙ্কে ছাতা মেলে ঘুমোচ্ছে
বুক সেলফ জুড়ে ডাকছে ব্যাঙ
মাসুদার রহমানের জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০, জয়পুরহাট। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: হাটের কবিতা, উত্তরবঙ্গ সিরিজ, ডাকবাংলো, হরপ্পা, কামরাঙাগাছ রাজি হচ্ছে না, কবিতা সংগ্রহ-১, নির্বাচিত কবিতা। গদ্যগ্রন্থ: একানব্বই (প্রকাশিতব্য), এবং শিশুসাহিত্য: বাঘটা বলে হালুম, ভূতের লাল হাফ শার্ট, বন্ধু হতে চাই।









