কবিতাশিল্প
দ্রাক্ষারসে মিশিয়ো না ঘৃণার কজ্জ্বল
সম্মুখ শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে জীবনশত্রু
তাকে আসন দেবে না? শানকিতে সাদা জুঁই?
টলমল অমৃত মাটির খুরিতে।
চন্দন বৃক্ষের নিচে শুকিয়ে শুঁঠ হয়ে
শুয়ে আছে কবি...
তার পায়ের কাছে লতাসাপ কুট-কুট করে কাটে
লোকসংস্কৃতির শিকড়।
পানিফলের পাতা ছুঁয়ে আসা বাতাসকে বলো
দুদণ্ড বসুক এখানে, ক্ষতি নেই।
যবনিকা
এই মাত্র চলে গেল আলো।
লোডশেডিংয়ের ছায়া
বালিকার কিশোর শরীরে তির-তির করে কাঁপে।
উল্টোডাঙার দিকে বয় নদীর জল,
কে বা কারা ঝোড়ো রাতে বয়ে নিয়ে যায়
কিশোরীর নিষ্পাপ নিশ্বাস।
তুমি ঝড় শেষে
ভণ্ডুল শহরের ধসে যাওয়া
প্রাচীরে না হয় বোসো।
দেখবে তরুণীর পরিচ্ছদ নীল যবনিকায় ঢাকা!
এখানে জীবন নেই। তবু সমাগম পাবে।
এক বেদনাগুচ্ছ আঙুরের বন।
আর কিছু সুতোয় বোনা নক্ষত্র।
কফিনকাব্য/উনত্রিশ
‘ঢোল বাজানোর হাড়’ গুণে গুণে এগিয়ে গেছে ঢুলী। ঢোলের প্রতিটি আঘাতের ভেতরে জেগে থাকে বাণিজ্যের স্বাদ। ঢুলীর জীবন যেন মায়াময়, ক্যামেরাবন্দি সে আয়ুষ্কাল। তবু সমস্ত মাড়িয়ে যাচ্ছে এক ছদ্মবেশী ঋণ, ঢুলীও ক্রমশ দিগন্তরেখা পার হয়ে যায়। ঢোলকের বাজনার ভেতরে দুপুরের বৈবাহিকতা ফিরে পায় শ্মশানের অস্তিত্ব। সকালের বিরল হাওয়া ঢেকে দেয় ঢুলীর পরম্পরা জীবন—সফল বাণিজ্যের অস্থি খেলা করে তার বাদামকাঠের গাঢ় কফিনের কাছে...
কফিনকাব্য/ছত্রিশ
ভিখিরির ঝুলি ভরেছিল বায়ুহীন বাঁশি। কাঁচা, ভাঙা ঘরে ভ্রমর ওড়ার শব্দ—আর কিছু অনৈতিক তন্দ্রা এনেছিল রাবীন্দ্রিক সন্ধ্যা। ভিখিরি সেধেছিল বায়ুহীন বাঁশি আর মন্ত্রগাঢ় ধ্যান দিয়ে গাওয়া কোনো গান। ভিখিরি রাত চেয়েছিল খুব করে। দিনের লজ্জা যেন চুরি হয় আরেক রাতের যামে। ভিখিরির থলে তবু ভরে থাকে সারাটা দুপুর। খুঁদকুটো, কাঁড়া-আকাঁড়া—হিসেব কষে ভিখিরি আড়াল তোলে এই এক ইহ জীবন! তখন কাঁসাইয়ের দূরাগত শ্বাস এসে লাগে কফিনকাঠে। ভিখিরি চেয়ে দেখে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত চাঁদ তুলোর মতো উড়ে উড়ে পড়ে কবরের মাঠে, জেগে ওঠে ওখানেই গোরস্তানের প্লট...
ঝড়
মধ্যদুপুরে ভাগ হয়ে পড়ে আছে দাম্পত্য
একটু বাদেই গোধূলির রঙে নাচবে পৃথিবী
হঠাৎ দ্রাঘিমা রাঙানো বাতাস এসে ভেদ
করে নির্জন আয়নার অতসী কাচ।
তুমি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছ—এখন?
প্রশ্নটাকে জলের কুণ্ডলি বানিয়ে উড়িয়ে
নিলো—অসময়ের ঘূর্ণি হাওয়া—
পশ্চিম আকাশে অস্তরবির লাল চুলোয়
জ্বলছে কিছু বিবাগী চিল—
আমরা কি তবে পথিমধ্যে ভাগ হয়ে যাব?
দ্বিতীয় প্রশ্নের কোনো সুযোগ থাকে না!
মৃত্যুর আনন্দ দেখো, রাখো দীর্ঘশ্বাস,
বৈতরণী পার হয় বোশেখের পূর্ণ বিভাব।
জীবনেশ্বর
তোমার কুয়োর জলে
অমাবস্যার চাঁদ—ভীতি ছড়াচ্ছে,
তুমি বালতি ফেলতে গিয়ে
দেখলে তোমার বলিরেখা-চূর্ণ মুখ।
কৃষ্ণকালো রাতের শরীরে
মদালস গতি; আর কিছু ঘুণপোকা
খেয়ে নিচ্ছে চৌকাঠে বনেদি বউয়ের ছবি,
বাজারের থলি থেকে ইলিশের কানসা
বোয়ালের লেজ চিতলের পেটি তড়পায়
কুয়ো পাড়ে। আবারও কুয়োর জলে
বালতি নামালে—এবার অমাবস্যার চাঁদ
তোমার ক্ষয়ক্লিষ্ট দাম্পত্য গিলে খেলো,
খিড়কি দরোজা খুলে পালায়
একমুঠো জীবনেশ্বর!
পার্লামেন্ট
অশোকস্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে পার্লামেন্ট
আমজনতার মূর্ত প্রতীক,
তাজমহল দেখার মতো দেখে যায়
পরিযায়ী পাখি।
ভেতরে রামায়ণ পাঠ শেষে ডিম পাড়ে নিষ্ফলা শ্রমিক
শিকড় থেকে শিখরে ফুলে ফেঁপে ওঠে উদর
ভুলে যায় বর্ণমালা— ‘ঔ’-তে ঔষধ
বাজায় বিষে ভরা নাগিন
জগৎ ও জীবনজুড়ে নামে অ্যাসিড বৃষ্টি।
বোতাম
একটি বোতাম—মরমিয়া চিকচিক
টিপ দিলেই ভস্ম, পৃথিবীর মূলোৎপাটন।
অণু-পরমাণু কাঁচামাল বোতামের
তুমি তার পাহারাদার।
বাহারি রঙের বোতামে তোমারও অন্তর্বাস
আমি চটজলদি লাগিয়ে নেই জামার বোতাম
লক্ষ্যভেদী বুক জানি তোমার নজর!
ওই রহস্যাবৃত ঘূর্ণি তোমারই আঁচলে
গুম-খুনের নাভিমূলে দেখি ভূতগ্রস্ত বোতাম।
চশমা
আজকাল বাইফোকাল লেন্সে হাতি দেখি না
মশা দেখি—ভন ভন করে উড়ছে।
বাঁকানো চাঁদের গ্রীবা দেখি না
ভৌতিক ছায়া দেখি—
নেমে আসে অদৃশ্য কায়া;
তোমাকে হাতড়ে বেড়াই
তুমি তখন শোঁ শোঁ হাওয়া,
গায়েবি আওয়াজ...
পাপোষে চটি নেই, ছিন্ন পা...
ওঝা
ঘরের মধ্যে সাপ। খোলস ছাড়াচ্ছে।
নিজের মধ্যে ঠান্ডা হচ্ছি, হিম,
সাদা, অরক্ষিত এই বাস...
বিছানা ছেড়ে মাঠ পেরিয়ে দিগন্ত ফুঁড়ে
ক্রমশ অলৌকিক হয়ে উঠছি,
এখন অলীক ওঝা হয়ে পথে পথে বিষ ঝাড়ছি।










