জব্দ করো নোবেল

বিভূতিভূষণ মণ্ডল
০২ অক্টোবর ২০২১, ১৭:৩৭আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২১, ২১:২৬

ইয়াসির আজিজের বাংলা অনুবাদে রেজা সাত্তারের ‘জব্দ করো নোবেল ফাউন্ডেশন’ বইটির শিরোনাম দেখেই যেকোনো চিন্তাশীল পাঠক চমকে উঠবেন, মনোজগতে ধাক্কা খাবেন। বিশ্ববিখ্যাত একটি ফাউন্ডেশনকে অস্বীকার কিংবা বাতিল করার আহ্বান জানাচ্ছেন লেখক। এই আহ্বানের পেছনে লেখকের কী কী অকাট্য যুক্তি আছে সে বিষয়ে স্বভাবতই একজন পাঠক কৌতূহল বোধ করবেন। এবং এই কৌতূহলই পাঠককে বইটি আগাগোড়া পড়তে উদ্বুদ্ধ করবে।

ঢাকার কবি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘জব্দ করো নোবেল ফাউন্ডেশন’ (২০২১) বইটি মূলত একটি প্রবন্ধ-সংকলন। ১১২ পৃষ্ঠার এই বইয়ে ৩২টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলো নাতিদীর্ঘ। অধিকাংশ প্রবন্ধই চিত্রসম্বলিত। কোনো কোনো প্রবন্ধে গবেষণামূলক তথ্য-উপাত্ত সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলোর মধ্যে ৮টি প্রবন্ধই রয়েছে আলফ্রেড নোবেল, নোবেল পুরস্কার এবং নোবেল ফাউন্ডেশন সম্পর্কে। তবে চূড়ান্ত বিচারে সংকলিত প্রবন্ধগুলোর দিকে তাকালে এবং পাঠ করলে দেখা যায় সকল প্রবন্ধই কোনো না কোনোভাবে নোবেল ফাউন্ডেশনের সাথে সম্পর্কযুক্ত। বইটির নাম দেখেই সহজে অনুমেয় যে, নোবেল ফাউন্ডেশন সম্পর্কে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি মোটেই ইতিবাচক বা শ্রদ্ধাপূর্ণ নয়। ৮টি প্রবন্ধের শিরোনাম থেকেও তা প্রমাণিত হয়। প্রবন্ধগুলো যথাক্রমে : ১. নোবেল পুরস্কার হলো একটি প্রতারণা, ২. কেন তারা লেখক ও কবিদের পুরস্কার দেয়, ৩. নোবেল পুরস্কারের অন্ধকার দিক, ৪. আলফ্রেড নোবেল—এক শয়তান, ৫. এক শয়তান লেখক—‘আলফ্রেড খোকন’, ৬. নোবেল ফাউন্ডেশনের বাস্তবতা সম্পর্কে জানা যাক চলুক, ৭. নোবেল পুরস্কার বিতর্ক, ৮. নোবেল সম্পত্তি হুকুম দখল করো। প্রবন্ধের শিরোনামে ভাষার প্রয়োগে লেখকের চরম ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করার মতো। বইয়ের অন্যান্য প্রবন্ধের বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে—ক্ষুদ্রঋণের নানান দিক, দারিদ্র্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন, এনজিওর কর্মকাণ্ড প্রভৃতির পাশাপাশি মাদার তেরেসা, অমর্ত্য সেন, মুহম্মদ ইউনূস, হেনরি কিসিঞ্জার, ম্যানুয়েল স্যান্ডোস, মিখাইল গর্বাচেভ, অং সান সুচি প্রমুখ নোবেলবিজয়ী ব্যক্তির জীবন ও কর্মপ্রণালি। বলাবাহুল্য, এখানেও লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি পূর্ববৎ নেতিবাচক। তবে লেখকের হাতে নিশ্চয়ই জোরালো তথ্য প্রমাণ রয়েছে বলেই তিনি তার বক্তব্য এইভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। হয়তো সব তথ্য পাঠকের জানা নেই, থাকবারও কথা নয়।

‘জব্দ করো নোবেল ফাউন্ডেশন’ বইয়ে সংকলিত প্রবন্ধগুলোর বক্তব্য পরপর সাজালে যা পাওয়া যায় তা হলো এরকম যে, ব্রিটিশ শাসনামলে নীল, পাট ও চা উৎপাদনের আড়ালে ইংরেজরা ব্যাপকভাবে আফিম উৎপাদন করত। এবং অন্যসব ফসলের আড়ালে তারা নিরাপদে আফিমের ব্যবসা করত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের পরাজয়ের কারণেই মূলত ইংরেজদের কলোনিগুলো স্বাধীন দেশের ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছিল। সেই একই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ ঘটেছিল। পৃথিবীর সকল দেশের মাদক ব্যবসার অবৈধ টাকাকে পরিশোধন করার একটি প্রকল্প হলো ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প। লেখক নোবেল ফাউন্ডেশনকেও মাদক-টাকা পরিশোধিত করার প্রকল্প হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। নোবেল ফাউন্ডেশন, লেখকের ভাষায়, আমেরিকার একটি অস্ত্র। এর মাধ্যমে অস্ত্র তৈরির প্যাটেন্ট বিক্রির টাকা আসে, সেই সব অস্ত্র যা দিয়ে হত্যা করা হয় নিরীহ জনসাধারণকে। সেই কারণেই লেখক আলফ্রেড নোবেলকে একজন হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন এমন অনেকেরই যোগ্যতা এবং কর্মের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন লেখক। আবার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পাননি—মহাত্মা গান্ধি, সত্যেন্দ্রনাথ বোস, আরহান পামুক, আলবার্ট আইনস্টাইন প্রমুখের প্রসঙ্গেও কথা বলেছে তিনি। নোবেল পুরস্কার সম্পর্কে লেখকের তিনটি উদ্ধৃতি দেখে নেওয়া যেতে পারে—

১. আপনাকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, পুরস্কার পেতে হলে কাউকে কাউকে অবশ্যই তার মাতৃভূমির প্রতি সত্যিকারের বিশ্বাসঘাতক হতে হবে, অথবা হতে হবে মানবজাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকত (পৃ. ৭৩)।

২. নোবেল পুরস্কার বাস্তবসম্মতভাবে দেয়া হয় দরিদ্র দেশগুলোর কোনো একজন এক নম্বরের সুতো বাঁধা নাচের পুতুলকে যিনি কঠিন পরিশ্রম করা বিশ্বের সম্পদসমূহ যেমন বিজ্ঞান, সামাজিক জীবন, কৃষি ইত্যাদি ধনী দেশগুলোতে অন্যায়ভাবে প্রেরণের জন্য শান বাঁধানো রাস্তা তৈরি করে দিতে পারেন (পৃ. ৮৭)।

৩. ...মহাত্মা গান্ধির মতো নেতা কেন নোবেল পুরস্কার পাননি? কিন্তু খ্রিষ্টান মিশনারি মাদার তেরেসা পেয়েছেন, যাকে দেখা গেছে দরিদ্র হিন্দু ও মুসলমানদের খ্রিষ্টানে রূপান্তরিত করতে। হেনরি কিসিঞ্জারের মতো লোক ও নোবেল পুরস্কার জিতেছেন, তিনি পুরস্কার পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এবং আরও অনেককে যেমন চে গুয়েভারাসহ ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, ল্যাতিন আমেরিকা ও সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করার জন্য (পৃ. ৮৭)।

লেখক রেজা সাত্তারের এই সকল বক্তব্য প্রচলিত বিশ্বাস ও ধারণার ব্যত্যয় ঘটিয়ে পাঠকের মনে ভিন্নতর কৌতূহল ও জিজ্ঞাসাবোধের জন্ম দিতে পারে।

/জেডএস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম