জন্মদিনে

‘নিষিদ্ধ লোবান’ : বীরাঙ্গনা ও কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

হেমায়েত উল্লাহ ইমন
২৭ ডিসেম্বর ২০২২, ১৫:৩১আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২২, ১৫:৩৫

সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’কে বীরাঙ্গনার গল্প যদি বলতে চাই তাহলে উপন্যাসের আরেক নায়ক সিরাজ অর্থাৎ প্রদীপের ভূমিকাকে নিতান্তই তুচ্ছ করা হবে। তাই নির্দিষ্ট করে একজনকে কেন্দ্রীয় চরিত্রের দায়ভার চাপিয়ে না দিয়ে বরং দুইয়ে মিলে গল্পটিকে বীরাঙ্গনা ও এক কিশোরের মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে পারি। আকার-আকৃতি-গঠন ও শৈলীতে নভেলা বললেও আশা করি ভুল হবে না। গল্পের গতিশীলতা, চরিত্র নির্মাণের চেয়ে মনোলগবিহীন গল্পকে একরৈখিকভাবে দ্রুত টেনে নেওয়া, সংলাপের গঠনে যে সার্বিক সংক্ষিপ্ত আবহ দেখি তা ‘নিষিদ্ধ লোবান’কে নভেলার পর্যায়ে ফেলে দেয়।

অস্ত্রবিহীন যুদ্ধের গল্প এই রচনা। এতে মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিকতা উঠে না আসলেও যুদ্ধের ভয়াবহতার খণ্ডচিত্র দেখা যায়। এই যুদ্ধ বিলকিস এবং সিরাজের, তাকে মুক্তির যুদ্ধ না বলে, স্বজনহীন দুটি অসহায় মানুষের দ্রোহ ও যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতায় জড়িয়ে নেওয়ার দৃশ্যপট বলা শ্রেয়। ‘জলেশ্বরী জনপদটি যেন যুদ্ধ আক্রান্ত রণক্ষেত্র, বিলকিস জননী বাংলাদেশ, যে তার মৃত সন্তানকে বুকে টেনে নেবার আয়োজন করে।’ ১৯৭৯ সালের দিকে রচনা বলে এই গল্পগুলো এখন চিরায়িত হয়ে গেছে। তবে এটা বলতে পারি সব্যসাচী লেখক মুক্তিযুদ্ধের শব্দ-দৃশ্যগুলো আমাদের মাথায় কখনো প্রাসঙ্গিকভাবে আবার কখনো অপ্রাসঙ্গিকভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছেন।

২৫ মার্চ অফিসে পেট্রোল বোমা বিস্ফোরণের পর স্বামীর খোঁজ-খবর না পেয়ে মনকে পাষাণ করে, শেষ সম্বল নিজের পরিবারকে খুঁজতে নিজগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয় বিলকিস। আগের স্টেশনে এসে ট্রেন আটকা পড়লে স্টেশনমাস্টারের কাছ থেকে তার গ্রাম জলেশ্বীর ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের কথা শুনেও বনজঙ্গল ঝোঁপঝাড়ে ভরা পাঁচ মাইল পথ একা হেঁটে রওনা দেয় বিলকিস। এই দুর্গম পথে গল্পে আমি যাকে নায়ক বলতে চাচ্ছি অর্থাৎ সিরাজের সান্নিধ্য পায় বিলকিস। আদুরে ছোটভাই যাকে সে ‘খোকা’ বলে ডাকে তার বয়সি সিরাজ, আঠারো উনিশ বছর বয়সি যুবক।

সিরাজের আগমন তার বয়েসের কৌতুহল-বাসনার সাথে তালগোল পাকিয়ে বিচার করা যায়। এর কারণও আছে- লেখক প্রথমেই বিলকিসের ‘শহুরে’ ছাপের জন্য ট্রেনে থাকাকালীন সময়ে তাকে আলাদা করে দেয়। ‘শহুরে’ কোমলতা যে বাসনা তৈরি করে প্রান্তিক মনে, তার সাথে সিরাজের এই আগমন নেতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও- একসময় আবার আমার মনে হয়েছে সিরাজ আসলে বিলকিসের অবচেতন মন। খোকার প্রতি তীব্র ভালোবাসা বা তাকে হারানোর ভয় থেকে অথবা  দুর্গম পথের আতঙ্ক থেকে মনোযোগ সরাতে অবচেতন মনে তাকে সঙ্গী করে নেয়।

সিরাজ এবং বিলকিসের চিন্তা-চেতনা-উদ্দেশ এক অর্থাৎ তাদের দ্বৈতসত্তা হিসেবে ভাবা যায় না। প্রতিটা সিদ্ধান্ত আবেগ-ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে বিলকিস প্রতিনিধিত্ব করে তেমনি উদ্যম-সাহসী-বুদ্ধিদ্বীপ্ততার প্রতীক হিসেবে পাওয়া যায় সিরাজকে। বাস্তব জীবনে আমরা যেমন মন ও মগজ কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি- উপন্যাসেও মন ও মগজ যথাক্রমে বিলকিস ও সিরাজ। সিরাজের ‘আপা, দিদি’-তে প্যাঁচ লেগে গেলে বিলকিস তবুও তার আসল পরিচয় জানতে চায়নি, সিরাজ যখন নিজেকে প্রদীপ বলে পরিচয় করায় তখন বিলকিসকে খুব যে বিস্মিত হতে দেখি না। এও হতে পারে তার কাছে খোকাকে খুঁজে বের করাটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

সিরাজ যখন তার আসল পরিচয় জানায় তখন ‘মনসুর ভাই’-এর অস্তিত্ব আদৌ আছে কিনা তা নিয়েও সংশয় জাগে। কীভাবে একজন তাগড়া যুবককে বিলকিস এতো সহজে বিশ্বাস করে? কেন বা সিরাজ বিলকিসকে ছেড়ে যায়নি। এসব প্রশ্ন অবান্তর লাগতে পারে কিন্তু সৈয়দ হকের সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমাকে প্রতিটি লাইনে এরকম ভাবুক করে তোলে।

সিরাজ যদি বাস্তবেই উপন্যাসে না থাকে, তাহলে গল্পটাকে খুব বেশি পরিবর্তন করা লাগবে না এই একই পরিণতির সাথে মিলিয়ে নিতে। সিরাজ যদি বিলকিসের অবচেতন মন হয় তাহলে আমরা এও বলতে পারি উপন্যাসের নায়ক বিলকিসের সত্তা ‘সিরাজ’। আবার যদি বলি বাস্তবেই সিরাজ আসলে প্রতিশোধের স্পৃহা-লালিত এক কিশোর গেরিলা যোদ্ধা, যে কি না বিলকিসের সারথি, উপন্যাসের নায়ক- তাও বলা ভুল হবে না।

উপন্যাস জুড়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি খুবই গুরুত্ব পেয়েছে। তৎকালীন সমাজে বিশেষ করে এখনকার প্রান্তিক সমাজে আমরা যে লোকধর্ম দেখি, সেখানে ভেদাভেদের চেয়ে পরস্পরের মিথস্ক্রিয়ায় বেশি। গ্রামগুলোতে ধর্ম ও দলমত নির্বিশেষে আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা প্রায় একই ধরনের হয় এবং খুব কম জায়গাতেই এসব আলাদা হয়ে থাকে, যেমন পূজা, ঈদ। তবুও পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি, পারস্পরিকতার ইত্যাদির কাছে ধর্মীয় বিশ্বাস কোথাও কালচারে, কোথাও উৎসবে পরিণত হয়। বিলকিস এবং সিরাজে চরিত্র দুটি আমাদের এই পরম্পরকে ইঙ্গিত করে। সিরাজ মাঝেমধ্যে দিদি বা আপা বলে ফেললে, বা তার ধর্ম পরিচয় জেনেও যে খুব বিস্মিত হয় এমন না। ঘটনাক্রমে সিরাজ অর্থাৎ প্রদীপের আসল পরিচয় জানতে পেরে মিলিটারি বিলকিসকেও যখন হিন্দু ভাবতে শুরু করে, বিলকিসের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখি না। এখানেই আমরা প্রকৃত প্রান্তিক সমাজ বাস্তবতা দেখি। ভেদাভেদের জায়গাটা রাজনৈতিক, ধর্ম অনুষঙ্গ মাত্র।

পাকিস্তানি হানাদারদের প্রধান সাহায্যকারী হিসেবে বিহারিদের ভূমিকা গল্পে অনেক জায়গায় দেখা যায়। মানুষজন মিলিটারি থেকেও হানাদারদের সাহায্যকারী এই বিহারিদের বেশি ভয় পায়। ‘বিহারি ভয়ে’, ‘দুজন বিহারি লোক পাহারা দিচ্ছে’, ‘বিহারিরা লুট করে নিয়ে যায়’- এভাবে উপন্যাসে দেখা যায় পাকিস্তানি মিলিটারিদের চেয়েও বিহারিদের নিয়ে মানুষজন বেশি আতঙ্কগ্রস্থ। সৈয়দ শামসুল হক সরলরৈখিকভাবে যুদ্ধের সামগ্রিক চিত্রের প্রধান কুশীলবদের সারিবদ্ধ করে আমাদের দেখাতে চেয়েছেন, এতে বিলকিস, সিরাজের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটা আমরা দেখতে পেলেও, বিহারিদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারি না। এই দায় হয়তো সৈয়দ হকের নেই কিন্তু উনি এমন সব জায়গায় মোড় নিয়েছে বা তার চরিত্রগুলো এঁকেছেন তা আমাদের হাজারো প্রশ্নের মধ্যে  ঘুরপাক করায়। মুসলিম লীগের নেতা বৃদ্ধ লোকটিকে কেন বাঁচিয়ে রাখেন? তাকে দিয়ে খোকার মুখে কেন প্রস্রাব করায়? ‘মুসলিম লীগ’ ‘দিদি’ ‘আপা’ ‘বিহারি’- এই শব্দগুলো ইতিহাস-সচেতন পাঠককে তাড়িত করবেই। এখানেই হয়তো সৈয়দ হকের নভেলা বলি আর উপন্যাস বলি তার ভাষাটি সার্থক হয়ে ওঠে। 

বিহারিদের এই উগ্র আচরণ কি একতরফা বাঙালি চোখের দৃষ্টিভঙ্গির জন্য বাজেভাবে প্রতিফলিত হয়েছে? না, আসলে আমাদের গল্পটাকে বাস্তবতার নিরীখে বর্তমানের সাথে মিলিয়ে দেখলে বরং এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। বিহারিদের এই অংশগ্রহণ কি শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে? নাকি ভাষাগত জায়গা থেকে তাদের এই অবস্থান?

‘আমি তোমায় সন্তান দিতে পারব। উত্তম বীজ উত্তম ফসল। তোমার সন্তান খাঁটি মুসলমান হবে, খোদার ওপর ঈমান রাখবে, আন্তরিক পাকিস্তানী হবে, চাও না সেই সন্তান? আমরা সেই সন্তান তোমাদের দেব, তোমাকে দেব, তোমার বোনকে দেব, তোমার মাকে দেব, যারা হিন্দু নয়, বিশ্বাসঘাতক নয়, অবাধ্য নয়, আন্দোলন করে না, শ্লোগান দেয় না, কমিউনিস্ট হয় না। জাতির এই খেদমত আমরা করতে এসেছি। তোমাদের রক্ত শুদ্ধ করে দিয়ে যাব, তোমাদের গর্ভে খাঁটি পাকিস্তানি রেখে যাব, ইসলামের নিশানা উড়িয়ে যাব। তোমরা কৃতজ্ঞ থাকবে, তোমরা আমাদের পথের দিকে তাকিয়ে থাকবে, তোমরা আমাদের সুললিত গান শোনাবে।’ (মেজর)

গল্পের শেষ অংশ কি মেজরের পরাজয় নাকি বিলকিসের আত্মসমর্পণ অথবা বিজয়? নাকি এও বলতে পারি বিলকিসের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রদীপের মৃত্যু আসলে তাকে এই পথ বাছাই করতে বাধ্য করে?  দুটি কারণ মোটামুটি বিবেচনা করা যায়- বিলকিসের ‘সম্মানহানির ভয়’, এবং তার সারথি ‘সিরাজের মৃত্যু’ এই দুইয়ে বিলকিসকে চিতায় নিয়ে যায়। 

মেজর কেন জোর-জবরদস্তি করলেন না? যৌন দুর্বলতা কি তার ভিতরের আসল পুরুষটাকে আগেই চিতায় শুয়ে দিয়েছে?  বিলকিস উপলক্ষ মাত্র নাকি পরাজয়ের নিশান?  বিলকিসের জার্নি কি জলেশ্বরীর ট্রেনের মতোই স্টেশনে পৌঁছাতে পারিনি? একে বিলকিসের আপোষহীনতা বলতে পারি না। সমাজ বাস্তবতায় যেভাবে নারীদের ঘরবন্দি করে রেখেছিলো, ধর্মীয় নিয়ম-নীতি যেভাবে নারীদের মনস্তাত্ত্বিক অবদমন করে রাখে তা নিরূপণে বিলকিস সত্যি একজন বীরযোদ্ধা। শেষপর্যন্ত লড়াই করেছে। তবুও চারিত্রিক অবধম্যতার কাছে কি বিলকিস হেরে গিয়েছে?  যুদ্ধ স্পৃহা এবং চরিত্রহরণ কি একে অপরকে বাইনারী অপজিশনে রেখে বিলকিসকে বাছাই করতে বলেছিল?  কেননা আমরা দেখি বিহারি প্রহরী তার ‘শরীরের কোমলতা অনুভব’ করার বিষয়টি খেয়াল করে বিলকিস প্রতিক্রিয়ার চেয়েও পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলো ?’ এখানেই কি বিলকিসের পরাজয়? এটাই কি বীরাঙ্গনা বা বাঙালি সমাজ বাস্তবতা? 

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সব দলকে রাজনীতি করতে দিতে চায় বিএনপি, এর মধ্যে আ.লীগ কি আছে?
সব দলকে রাজনীতি করতে দিতে চায় বিএনপি, এর মধ্যে আ.লীগ কি আছে?
ইকরার মৃত্যু: জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভীর মা
ইকরার মৃত্যু: জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভীর মা
কৃষিকে আধুনিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি: প্রধানমন্ত্রী
কৃষিকে আধুনিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি: প্রধানমন্ত্রী
শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদায়ন, ৩১ শিক্ষককে বদলি
শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদায়ন, ৩১ শিক্ষককে বদলি
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী