X
রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪
৮ বৈশাখ ১৪৩১

পেদ্রো পারামো : আনিসুজ জামানের ‘অনুবাদ’ কিংবা পুষ্পবনে মত্ত হাতি

রাজু আলাউদ্দিন
২৫ অক্টোবর ২০২৩, ১১:১৫আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৩, ১৪:৩৫

Hombres necios que acusáis
a la mujer sin razón
sin ver que sois la ocasión
de lo mismo que culpáis
—Sor Juana Inez De la Cruz

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন অনুবাদের আলেকজান্ডার। কয়েক দশক আগে থেকেই বিশ্বসাহিত্যের দিগ্বিজয়ী বীরের মতো অনুবাদের মাধ্যমে আফ্রিকা, ইউরোপ, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের নানা ভাষার সাহিত্যকে আমাদের পাঠের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সেই মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে (বইটির প্রথম প্রকাশকাল ১৯৯০) যখন হুয়ান রুলফোর ‘পেদ্রো পারামো ’ প্রকাশিত হয়, তখন এটি আমরা একরকম গোগ্রাসে গিলেছিলাম। তখন এর মূলানুগতা নিয়ে ভাবিনি। না ভাবার কারণ মানবেন্দ্র এতটাই মান্য ও গণ্য অনুবাদক যে, ও নিয়ে ভাববার কথা কখনো মাথায়ই আসেনি। মানবেন্দ্র নিজেও তা ভাবার সুযোগ রাখেননি : অনুবাদটি ইংরেজি অনুবাদের ভিত্তিতে না-কি সরাসরি স্প্যানিশ থেকে করেছেন তার কোনো উল্লেখ ভূমিকার কোথাও নেই। কিন্তু উপন্যাসের চরিত্রদের নামগুলো স্প্যানিশ উচ্চারণের অনুসারী হওয়ায় এটা ভাবা স্বাভাবিক ছিল যে, তিনি স্প্যানিশ থেকেই করেছেন। কিন্তু ঘটনা হলো, তিনি স্প্যানিশ জানতেন—এমন কোনো বিশ্বস্ত সূত্র কোথাও মেলে না। সুতরাং নিশ্চিতভাবেই ধরে নিয়েছিলাম যে, অনুবাদটি তিনি ইংরেজি থেকেই করেছেন। এরকম ধরে নেয়ার আরেকটি কারণ ছিল এই যে, শুনেছিলাম তার কন্যা স্প্যানিশ জানেন, তিনিই হয়ত নামের উচ্চারণগুলো মূলানুগ হতে সহায়তা করেছেন। কিন্তু স্বীকৃত ভাষ্য হলো অনুবাদটি ইংরেজি অনুবাদেরই বাংলা তর্জমা।

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে হুয়ান রুলফোর ‘পেদ্রো পারামো’ প্রকাশিত হয় যেকোনো গ্রন্থের অনুবাদ একাধিক হাতে হতে পারে একই সময়ে কিংবা কালভেদে। তিরিশ বছরের ব্যবধানে এই গ্রন্থটি এবার অনূদিত হলো সরাসরি স্প্যানিশ থেকে। এটা আমাদের জন্য খুবই আশাব্যঞ্জক হয়েছিল যে, বাঁকবদলকারী এই জটিল ও বিস্ফোরক উপন্যাসটি মূল থেকে আনিসুজ জামান অনুবাদ করেছেন। ফেসবুকে এটি প্রকাশের পদধ্বনি আগেই শুনতে পাচ্ছিলাম। মানবেন্দ্রকৃত অনুবাদটি থাকার পরও কেন তিনি এটি অনুবাদে হাত দিয়েছেন তার কারণও তিনি জানিয়েছিলেন ফেসবুকে, সেই একই কারণ তিনি বইটির ভূমিকাতেও উল্লেখ করেছেন। কী সেই কারণ? একাধিক। আমরা ভূমিকা থেকেই সরাসরি তার কাছ থেকে শুনে নেব। অনুবাদক আনিসুজ জামান বলেছেন : “২০২১ সালে রুলফোর ছেলে চিত্রশিল্পী পাবলো রুলফো আমাকে অনুরোধ করেন বইটি বাংলায় অনুবাদ করার জন্য।” (পৃ-১৪) বাংলা ভাষায় ইতোমধ্যে এর একটি অনুবাদ আছে জানার পরও পাবলোর প্রতিক্রিয়া হচ্ছে : “ইংরেজি অনুবাদটি ভালো হয়নি, ইংরেজি থেকে করলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুল অনুবাদ হবে।” (পৃ-১৪) পাবলো ভুল বলেননি। পাবলোর কথা শুনে অনুবাদক আনিসুজ জামান বলেছেন : “পেদ্রো পারামোর মূল কপি, ইংরেজি অনুবাদ ও মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধায়ের বাংলা অনুবাদ—তিনটি বই একসঙ্গে নিয়ে পড়তে বসলাম। প্রথম প্যারাতেই চমকে উঠি।”(পৃ-১৪) চমকে ওঠার কারণ মানবেন্দ্রর অনুবাদে তিনি বহু অসংগতি লক্ষ্য করেছেন। সেগুলোর একটা তালিকা করলে দাঁড়ায় এরকম:

১. “অনুবাদে প্রায় অংশেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ বাক্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।” (পৃ-১৬)

২. “শুধু তাই নয়, এখানে মূলের প্রাণটাই অনুপস্থিত।” (পৃ-১৬)

৩. “বাক্যবিন্যাস থেকে অর্থ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।” (পৃ-১৬)

৪. “শুধু ছেড়ে যাওয়া বা দুর্বোধ্যতা নয়, ভুল অনুবাদও হয়েছে কোথাও কোথাও।”(পৃ-১৭) 

৫. “মূলের ক্রিয়াপদ ঘটমান বর্তমান থাকলেও মানবেন্দ্র প্রায়শ সেটা অতীত ক্রিয়াপদে নিয়ে গেছেন।”(পৃ-১৭) 

উপর্যুক্ত যে অভিযোগগুলো তিনি মানবেন্দ্রর বিরুদ্ধে করেছেন তার সপক্ষে তিনি মূল, ইংরেজি তর্জমা, মানবেন্দ্রর ভুল অনুবাদ এবং নিজের ভাষান্তরে কিছু নমুনা পরপর বসিয়ে অসঙ্গতিগুলো দেখিয়ে দিয়েছেন। সন্দেহ নেই যে অভিযোগগুলো আমলে নেয়ার মতোই বটে। মূলানুগ অনুবাদের বিপক্ষে এগুলো যে গুরুতর গোস্তাকি, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। বিশেষ করে ‘পেদ্রো পারামো’র মতো উপন্যাসের ক্ষেত্রে। কারণ এটি সেই উপন্যাস যার প্রতিটি পৃষ্ঠা, প্রতিটি বাক্য, মায় প্রতিটি শব্দ শৈল্পিক নৈপুণ্যের কারণে যেমন, তেমনি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কারণেও নির্ভুল প্রয়োগের ইঙ্গিতবাহী। উপরন্তু, এর গদ্য সতত কাব্যবোধ থেকে নিষ্ক্রান্ত। কাব্যগুণের কারণে গোটা উপন্যাসটাই আধুনিক মহাকাব্যের সবচেয়ে নিকটতম অহিংস প্রতিদ্বন্দ্বী। এর বয়ান ও সংলাপ গদ্যে রচিত হলেও তা কাব্যস্পন্দিত। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিয়ে আমরা মূল আলোচনায় ফিরে যাব।

—Que es ese ruido?

—Es el silencio.

আমার তর্জমায় এর পাঠ হচ্ছে এরকম:

—এ কীসের কোলাহল?

—এ হচ্ছে নীরবতা।

‘কোলাহল’কে যিনি ‘নীরবতা’ বলে অভিহিত করতে পারেন, তার কাব্যশক্তি আর ভাষিক পরিমিতিবোধ নিয়ে আমাদের সতর্ক হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। গোটা উপন্যাসটায় তিনি প্রায়শই বর্ণনার ক্ষেত্রে উপমা নামক অলংকার যেমন ব্যবহার করেছেন, তেমনি কখনো কখনো উপমাহীন অলংকার ছাড়াই তিনি সংলাপে পুরে দিয়েছেন কাব্যবোধের তীব্র তীক্ষ্ণ অভিঘাত, যেমন উপরের ওই ছোট্ট সংলাপটি। কী অসামান্য বাচনিক কাব্যশক্তি থাকলে পুরো বিষয়টিকে তিনি উলটে দিতে পারেন, তা সাধারণ পাঠকও সহজেই উপলব্ধি করতে পারেন। বিষ্ণু দে যখন বলেন “ভিড়েও নিঃসঙ্গ আমি”, কথাটাকে বিরোধাভাসের কারণে যতই অবিশ্বাস্য শোনাক না, তা আমাদের কাছে আর অসত্য মনে হয় না। গোটা ‘পেদ্রো পারামো’ই হচ্ছে উল্টো স্রোতের এক কাব্যময় ভাষ্য, যেখানে মৃতেরা জীবিত, নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করে। মৃত্যুপুরী কোমালা জীবনের জঙ্গমতায় মুখর। ফলে এই উপন্যাসের প্রতিটি বাক্য ও শব্দ অনুবাদকের বিশেষ মনোযোগ ও যত্ন প্রার্থনা করে। কিন্তু মানবেন্দ্রর মধ্যে অনুবাদক আনিসুজ জামান এই মনোযোগ ও যত্ন খুঁজে পাননি, বরং অসংখ্য ত্রুটি লক্ষ্য করেছেন।  

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন অনুবাদের আলেকজান্ডার আনিসুজ জামান এইসব ত্রুটি লক্ষ্য করে ‘অনিচ্ছাসত্ত্বেও’ ‘পেদ্রো পারামো ’ মূল থেকে অনুবাদ করতে সম্মত হয়েছেন। উপরন্তু, রুলফোর ছেলের অনুরোধ তো আছেই। স্বাভাবিকভাবেই আমরা আশা করব, আনিসুজ জামানের অনুবাদে এই ত্রুটিগুলো থাকবে না, যেহেতু অনুবাদটি মূল থেকেই হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তিনি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদে সন্তুষ্ট নন। কিন্তু পরিহাস এই যে মানবেন্দ্রকে তিনি যেসব অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন, তার সবগুলো ত্রুটি নিয়েই তার নিজের অনুবাদটি সমৃদ্ধ। ষোড়শ শতকের মেহিকোর কবি সর হুয়ানা ইনেস দে লা ক্রুস-এর সেই বিখ্যাত কবিতার প্রথম অংশটি মনে পড়বে আমাদের যেখানে তিনি অভিযোগকারী পুরুষদের উদ্দেশে বলেছিলেন:

‘গোঁয়ারগোবিন্দ যে-পুরুষগণ

অকারণে নারীকে দোষে

দেখে না নিজেই সেই

অভিন্ন দোষের কারণ।’
(Obras Completas, Sor Juana Inez de La Cruz, Editorial Porrua, 2001, P 109)

আনিসুজ জামানের অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে এবার খানিকটা বিলি কেটে দেখা যাক তার অনুবাদের কালো অক্ষরদামে। আমরা তার অনুবাদে উপন্যাসটির প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই শুরু করব।

আনিসুজ জামান লিখেছেন:

“কোমালা এসেছি কারণ আমাকে বলা হয়েছিল এখানে পেদ্রো পারামো নামে আমার বাবা থাকেন।”(পৃ ২৩)

মানবেন্দ্র লিখেছেন:

“আমি যে কোমালা এসেছি, কারণ আমাকে বলা হয়েছিল যে আমার বাবা, জনৈক পেদ্রো পারামো, এখানে থাকেন।” (পৃ ১১)

মূলে আছে এরকম:

Vine a Comala porque me dijieron que aca vivia mi padre, un tal Pedro Paramo. (Juan Rulfo, Pedro Paramo, Planeta, 1975,P-7)

মার্গারেট সায়ের্স পেডেন-এর ইংরেজি অনুবাদ:

I came to Comala because I had been told that my father, a man named Pedro Paramo, lived there.  (Juan Rulfo, Pedro Raramo, Grove Press, 1994,P-3)

আনিসুজ জামান ৫ নং অভিযোগে ক্রিয়াপদের কালের পরিবর্তনের যে অভিযোগ মানবেন্দ্রর বিরুদ্ধে তুলেছেন, তার প্রথম বাক্যটিতেই তিনি নিজেও সেই বিপর্যয় ঘটিয়েছেন। মূলে বলা হয়েছে পেদ্রো পারামো ‘থাকতেন’ (Vivia বর্তমান কাল বোঝাতে ক্রিয়াপদটির রূপ হচ্ছে Vive, যেমন El Vive—তিনি থাকেন বা তিনি বাস করেন।), ইংরেজি অনুবাদটিতে মূলের অনুসরণে lived  করা হয়েছে। কিন্তু মানবেন্দ্র এবং আনিসুজ অতীতের ক্রিয়াপদকে বর্তমান কালে রূপান্তরিত করেছেন। দোষ কী ছিল যদি বলা হতো ‘পেদ্রো পারামো এখানে থাকতেন’? তাছাড়া, উপন্যাসের কোথাও পারামোকে জীবিত পাওয়ার কথা নেই। পারামো তো বহু আগেই মরে ভূত হয়ে গেছে। আর মরে গেছে বলেই হুয়ান প্রেসিয়াদো তাকে কখনো দেখেনি। তাহলে কী করে বলতে পারে যে তিনি থাকেন? আমাদের এত সব যুক্তিতর্কের অবকাশ না রেখেই রুলফো তো বলেছেনই, ‘থাকতেন’। আনিসুজ জামান স্প্যানিশ জানার পরও কেন এটিকে বর্তমানে রূপান্তরিত করলেন যিনি কি-না মূলানুগ থাকার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর?

পরের বাক্যেও তিনি মূল থেকে সরে গেছেন।

মূলে আছে: 

Mi madre me lo dijo.

তিনি অনুবাদ করেছেন:

“মা বলেছিলেন বলে এসেছি।”( পৃ ২৩)

মূলে কিন্তু ‘বলে এসেছি’—এই অতিরিক্ত কথাগুলো নেই। মূলে স্রেফ বলা হয়েছে ‘মা আমাকে বলেছিল’। রুলফো পরিমিতিবোধের কারণেই এই উপন্যাসে পুনরুক্তি এড়িয়েছেন সর্বত্র। যেহেতু আগের বাক্যেই বলা হয়েছে লোকটি কোমালা ‘এসেছে’ কারণ তাকে আসতে বলা হয়েছে। কিন্তু কে বলেছে? পরের বাক্যেই পাঠকদের কৌতূহল মেটাবার জন্য লেখক স্রেফ জানিয়েছেন, মা তাকে বলেছিল। মূল বইটির পাঠক লক্ষ্য করলেই দেখবেন তার এই বইয়ে দীর্ঘ বাক্য যেমন আছে, তেমনি আছে ছোট ছোট বাক্য। এবং তা বক্তব্য ও বর্ণনার ক্ষেত্রে বাহুল্যবর্জিত। আর বাহুল্য বর্জন এতটাই তুঙ্গে পৌঁছে গিয়েছিল যে প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার পরও নাকি তিনি উপন্যাস থেকে একশ পৃষ্ঠা বাদ দিয়েছিলেন।

“তিনি মূল পেদ্রো পারমো থেকে একশত পৃষ্ঠা বাদ দিয়েছেন, কারণ তিনি লক্ষ্য করলেন যে অনেক অনুচ্ছেদ খুব স্পষ্ট ছিল, অত্যধিক ব্যাখ্যা দিচ্ছে,…”

“Le quito cien paginas al original de Pedro Paramo fue porque se dio cuenta de que  muchas parrafos resultaban demasiado explicitos, daba explicaciones en exceso,…” ( La ficcion de la memoria: Juan Rulfo ante la critica, Federico Campbell, Biblioteca Era, 2010, P 15)

এই যদি হয় লেখকের অভিপ্রায়, সেখানে অনুবাদককে কতটা সতর্ক থাকতে হবে তা নিশ্চয়ই আমরা অনুমান করতে পারি। সুতরাং অনুবাদকের উচিত হবে না যা নেই তা যুক্ত করা এবং যা আছে তা বর্জন করা। কিন্তু আমরা উপরের উদাহরণগুলোতে দেখতে পাচ্ছি মূল লেখকের সঙ্গে এই অনুবাদের দূরত্ব।

এবার আসা যাক পরের বাক্যটিতে।

Y yo lo prometi que vendria a verlo en cuanto ella muriera.( P 7)

ইংরেজি অনুবাদটিও মূলেরই হুবহু প্রতিধ্বনি:

And I had promised her that after she died I would go see him. ( P 3)

মানবেন্দ্র  এই বাক্যটির অনুবাদ কিন্তু ঠিকই করেছেন:

আর আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম যে মা মারা যাবামাত্র আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসবো। (পৃ ১১)

কিন্তু আনিসুজ জামান এর তর্জমা করেছেন অন্যভাবে:

আসবো বলে ওঁর মৃত্যুশয্যায় প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। (পৃ ২৩)

প্রথম কথা হলো মা ‘মৃত্যুশয্যায়’ আছেন এমন কোনো শব্দ মূলে নেই। পুরো বাক্যটিকে তিনি বদলে দিয়েছেন। মারা যাবার পরপরই (হুয়ান প্রেসিয়াদো) তার বাবার সাথে দেখা করতে যাবার প্রতিজ্ঞা করেছে তাকে।

এবার পরের প্যারাগ্রাফের বাক্যটিতে আসা যাক।

মূলে আছে:

No vayas a pedirle nada, Exigele lo nuestro.( P 7)

ইংরেজিতে এই বাক্যদুটি খুব মূলানুগ অনুবাদ করেছেন:

Don’t ask him for anything. Just what’s ours. (P 3)

আনিস এই দুটো বাক্যের অনুবাদ করেছেন এভাবে:

ওঁর কাছে কিছুই চাইবি না। শুধুমাত্র আমাদের যা প্রাপ্য তা ছাড়া কিছুই না। (পৃ ২৩)

এখানে প্রথম বাক্যটি তিনি অনুবাদ করেছেন নির্ভুলভাবেই। কিন্তু পরের বাক্যে তিনি তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। সেটা বোঝাবার আগে আমি পাঠকদেরকে মূল বা ইংরেজি বাক্য দুটোর প্রতি একটু নজর দিতে বলবো। প্রথম বাক্যটি নেতিবাচক হলেও, দ্বিতীয় বাক্যটিতে রুলফো নেতিবাচক নন। কিন্তু আনিস দুটো বাক্যকেই নেতিবাচক করেছেন। শুধু নেতিবাচকই করেননি, বাক্যটিকে বিশ্লেষণাত্মক (Interpretative) ভঙ্গিতে অনুবাদ করেছেন। তিনি পুরো বইটিকে যদি বিশ্লেষণাত্মক ভঙ্গিতে অনুবাদ করতেন তাহলে আমার বলার কিছু ছিল না। দেখা যাচ্ছে, কোথাও কোথাও তিনি হুবহু মূলের কাছে থাকার পদ্ধতি অবলম্বন করছেন, কোথাওবা এই বিশ্লেষণাত্মক ভঙ্গি অবলম্বন করছেন। অর্থাৎ তার অনুবাদের ক্ষেত্রে কোনো ইউনিফর্মিটি নেই, আছে এক বিশৃঙ্খলা। আমরা এই বিষয়টা পরে আরও কিছু উদাহরণেও দেখতে পাবো। এবার তার তর্জমায় দ্বিতীয় বাক্যটিতে ফিরে আসি। সোজা বাংলায় বললে বাক্যটির তর্জমা হওয়া উচিত ছিল “স্রেফ আমাদের যা সেটুকুই।” আনিস এই কথাটাকে ‘প্রাপ্য’ এবং ‘কিছুই না’ বলে অতিরিক্ত শব্দতো যুক্ত করেছেনই, উপরন্তু বাক্যটিকে নেতিবাচক করে নিয়েছেন। অথচ রুলফো পরপর দুটো বাক্যকে নেতিবাচক করার পুনরুক্তি শুধু এড়াতেই চাননি; অধিকন্তু সংক্ষিপ্ততা,পরিমিতি ও যথাযথতাকেও স্পষ্ট করে রেখেছেন তার বাক্যে। কিন্তু আনিসুজ মূল লেখকের এই উদ্দেশ্যকে কাঁচকলা দেখিয়ে নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে অনুবাদ করেছেন যেখানে মূল ভাষার সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি বিনষ্ট হয়েছে।

যতিচিহ্নের ক্ষতিসাধন
স্প্যানিশে আরেকটি উদ্ধৃতি চিহ্ন আছে যা দেখতে « » এরকম অনুবাদের যথাযথতা সম্পর্কে আমরা আরও কিছু উদাহরণ তলব করব। তবে আর আগে আমরা এই অনুবাদকের যতিচিহ্ন ব্যবহার নিয়ে একটু আলাপ তুলতে চাই। স্প্যানিশে যে-সব যতিচিহ্ন আছে তার সঙ্গে মোটামুটি আমাদের সবগুলো যতিচিহ্নেরই মিল রয়েছে, দুএকটি বাদে। যেমন, ওদের comillas বা ইংরেজিতে আমরা যাকে Quotation marks বলতে পারি,বাংলায় বলা যেতে পারে উদ্ধৃতিচিহ্ন। ইংরেজি বা বাংলায় দুটো উদ্ধৃতি চিহ্ন আমরা দেখতে পাই যেমন ‘ ’ –এটি একক উদ্ধৃতিচিহ্ন হিসেবে পরিচিতি। অন্য আরেকটি হচ্ছে “ ”—এটিকে বলা হয় যুগল উদ্ধৃতিচিহ্ন। কিন্তু স্প্যানিশে আরেকটি উদ্ধৃতি চিহ্ন আছে যা দেখতে « » এরকম। জীবনানন্দ দাশের মতো রুলফোরও বহু রকমের উদ্ধৃতিচিহ্ন ব্যবহারের একটা স্বতন্ত্র প্রবণতা আছে। আর এই প্রবণতা তার বৈশিষ্ট্যকে কেবল ভিন্নতাই দেয়নি, একই সঙ্গে তা হয়ে উঠেছে তার শৈলী ও ব্ক্তব্যের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু জামান তার অনুবাদে রুলফোর যতিচিহ্নের ব্যবহারকে কেবল অবজ্ঞাই করেননি, কখনো কখনো উল্টেপাল্টে দিয়েছেন। বাংলা ও ইংরেজিতে উদ্ধৃতিচিহ্ন হিসেবে গণ্য হওয়া স্প্যানিশ এই চিহ্নটিকে আনিসুজ জামানের অনুবাদে কোথাও কোথাও উদ্ধৃতিচিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করলেও, অনেক জায়গায় উপেক্ষাও করেছেন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপেক্ষাও এখানে উল্লেখ করা উচিত, সেটা হলো মূলে ইটালিক চিহ্নিত কোনো বাক্যকেই তিনি ইটালিক তথা বাঁকা হরফ রাখেননি। কোথাও কোথাও উদ্ধৃতিচিহ্নের বাক্যকে তিনি প্রথম বন্ধনী (())দিয়ে আবদ্ধ করেছেন। কখনো কখনো প্যারাগ্রাফের ভিন্নতাকেও তিনি উচ্ছেদ করে একাকার করে দিয়েছেন। যতিচিহ্নের ক্ষেত্রে তার এই স্বেচ্ছাচারের কিছু নমুনা এখানে তুলে দিচ্ছি।

El camino sube y baja: « Sube y baja segun se va o se viene.Para el que va, sube; para el que viene, baja. » (P 7)

রাস্তা উঠছিল ও নামছিল : সেটা নির্ভর করে আসা বা যাওয়ার উপর। যে যায় তার জন্য চড়াই আর যে আসে তার জন্য উৎরাই। (পৃ ২৩)

মূলের লেখাটি দেখলেই বোঝা যায় বাক্যের কোলন-এর আগে Normal Letter, এর পরে যুগল উদ্ধৃতিচিহ্নের মধ্যে ইটালিক-এ রয়েছে পরবর্তী বাক্যাংশ। অনুবাদক উদ্ধৃতিচিহ্নও দেননি, এমনকি ইটালিকও করেননি।

Traigo los ojos con que ella miro estas cosas, porque me dio sus ojos par aver: « Hay alli, pasando el puerto de Los Colimotes, la vista muy Hermosa de una llanura verde, algo amarillo por el maiz maduro. Desde ese lugar se ve Comala, blanqueando la tierrra. Iluminandola durante la noche.» Y su voz era secreta, casi apagada, como si hablara consigo mismo…mi madre.( P 8)

আনিসুজ জামানকৃত উপরের এই অংশটুকুর অনুবাদে কোথাও উদ্ধৃতি চিহ্ন তো নেই-ই, এমনকি ইটালিকও করা হয়নি:

যে দৃষ্টি দিয়ে উনি গ্রামটাকে দেখেছিলেন এসেছি সেই একই দৃষ্টি নিয়ে, কারণ উনিই সেই চোখ আমাকে দিয়েছেন : কোলিমোতেসের তোরণ পার হয়ে চমৎকার সবুজ সমভূমি দেখতে পাবি, পেকে যাওয়া ভুট্টাগুলোর জন্য মাঝে মাঝে হলুদের ছোপ থাকবে। ওখান থেকেই সাদা জমিনের কোমালা দেখা যাবে, রাত্তিরে আলোয় ঝলমল করবে, মা বলতেন। (পৃ ২৪)

স্প্যানিশ না-জানলেও কারোরই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে মূলে দুটি বাক্য কেবল উদ্ধৃতিচিহ্নের মধ্যেই নয়, এমনকি তা ইটালিকও করা হয়েছে। এটা করার যে একটা বিশেষ উদ্দেশ্য আছে তা আমরা উদ্ধৃত বাক্যগুলোর আগের ও পরের বাক্যগুলো দেখলে বা পড়লেই বুঝতে পারবো। উদ্ধৃতির আগে কাহিনীর কথক জানাচ্ছেন যে তার মায়ের চোখ দিয়ে গ্রামটা দেখছেন। তার মা কী দেখতেন? লেখক এখানে তার মায়ের কথারই উদ্ধৃতি দিয়েছেন ইটালিক-এ চিহ্নিত বাক্যগুলোর মাধ্যমে। সুতরাং কথাটা যে তার মায়ের সেটা বোঝাতে হলে, হয় উদ্ধৃতিচিহ্ন নয়তো নিদেনপক্ষে ইটালিক-এ সেই কথাগুলো তর্জমায় চিহ্নিত করা উচিত। কিন্তু অনুবাদক সেই ঔচিত্যের ধার ধারেননি। ফলে, কথাগুলো মায়ের না হয়ে, হয়ে পড়েছে কথকের। যতিচিহ্নের এই বিপর্যয়ের কারণে গোটা বাক্যটি অর্থহীন ও তালগোল পাকানো হয়ে পড়েছে। এরকম নজির অনুবাদের সর্বত্র।

এবার দেখা যাক, মূলে শুধু উদ্ধৃতিচিহ্নের বাক্যগুলোকে অনুবাদক কী করেছেন।

«Pensaba en ti Susana…. » —এটি দীর্ঘ এক প্যারাগ্রাফের সূচনা অংশ। আমি উহ্যচিহ্ন দিয়ে কেবল বাক্যের শুরুর আগে উদ্ধৃতিচিহ্নটি দেখাবার চেষ্টা করছি অনুবাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার স্বার্থে।

মূলে একই পৃষ্ঠায় এরকম আরেকটি বাক্য হচ্ছে:

«Tus labios estaban mojados como si los hubiera besado el rocio. » (P 14)

অনুবাদক জামান এই উদ্ধৃতিচিহ্নগুলো নিয়ে কী করেছেন এবার তার লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাক।

(সুসানা, তোমার কথা ভাবছিলাম।…) পৃ-৩১

দ্বিতীয় বাক্যটির ক্ষেত্রেও তিনি একই কাণ্ড করেছেন।

(তোমার ঠোঁট ভিজে থাকতো যেন শিশির চুমু খেয়েছে।) পৃ-৩১

দেখতেই পাচ্ছেন উদ্ধৃতিচিহ্নের পরিবর্তে তিনি বাক্যগুলোকে প্রথম বন্ধনীতে আবদ্ধ করেছেন। এবার আমরা তার অনুবাদের অন্য আরেকটি পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃতি দেব এটা দেখাতে যে তিনি প্রায় সর্বত্রই এরকম করেছেন এই উদ্ধৃতিচিহ্নের ক্ষেত্রে। প্রথমে মূল আর পরে তর্জমা তুলে দিচ্ছি।

«Fulgor Sedano, hombre de 54 años …» (P 30)

(ফুলগোর সেদানো, ৫৪ বছর বয়স…) পৃ ৫০

প্রথম কথা হলো যুগল উদ্ধৃতিচিহ্নের বিকল্প কোনোভাবেই প্রথম বন্ধনী হতে পারে না। সেরকম করলে রচনার অর্থই বদলে যায়। প্রথম বা বক্রবন্ধনীর মধ্যে সাধারণত বাক্যের বিশেষ ব্যাখ্যামূলক অংশ কিংবা আনুষঙ্গিক উপাদান ব্যবহৃত হয়। পাঠক সেটা আমলে নিতেও পারেন কিংবা বিষয়টিকে আরও ভালোভাবে বুঝবার জন্য অনুসরণও করতে পারেন। তার মানে উদ্ধৃতির অর্থ আর প্রথম বা বক্রবন্ধনীর অর্থ অভিন্ন নয়। অনুবাদক এই যতিচিহ্নের এমন ব্যবহার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকলে এমনটা ঘটাতেন না। তাছাড়া, মূল লেখকের উদ্দেশ্য, বা বলা যেতে পারে রচনার উদ্দেশ্য বা অর্থকে তা বদলে দেয় বলে এই ধরনের পরিবর্তন এড়ানো উচিত। কিন্তু অনুবাদক তা করেননি। এমনকি, মূলে কোনো কোনো বাক্যে ব্যবহৃত Ellipses বা  উহ্যচিহ্নের ব্যবহার তিনি পুরোপুরি উপেক্ষা করেছেন।

শুধু প্রথম বন্ধনীই নয়, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বন্ধনীও তিনি ব্যবহার করেছেন তার অনুবাদে যা মূল বইয়ের কোথাও নেই। মূল বইয়ের ৫০ নং পৃষ্ঠার ইটালিক অংশটিকে তিনি নিজের বইয়ে (দেখুন পৃ ৭৩) দ্বিতীয় ({ } ) বন্ধনীভুক্ত করেছেন। মূল বইয়ের একই পৃষ্ঠায় মূলে উদ্ধৃতিচিহ্নিত অংশকে তিনি তৃতীয় বন্ধনীর ([ ]) আওতায় এনেছেন। অনুবাদের জগতে যতিচিহ্ন বুঝবার ক্ষেত্রে এমন অজ্ঞতা ও ব্যবহারের এত স্বেচ্ছাচারিতার নজির আর কেউ দেখিয়েছেন কি-না সন্দেহ। একটি দুটি নয়,এই বইয়ের বহু পৃষ্ঠায় এরকম বহু নজির খুঁজে পাওয়া যাবে।

আরও  কিছু ভুল
হুয়ান রুলফো এবার ফেরা যাক, তার অনুবাদের আরও কিছু নমুনার দিকে। এই ফাঁকে স্বীকার করে নিচ্ছি যে, পুরো বই থেকে আমি যদি তার ভুল অনুবাদের নমুনা দেখাতে যাই তাহলে অনূদিত বইটির মতোই প্রায় দেড় শ পৃষ্ঠার এক বই হয়ে যাবে। সুতরাং আমার পর্যবেক্ষণ আমি সীমিত রাখব আনিসুজ জামান কর্তৃক অনূদিত উপন্যাসের মাত্র ১০টি পৃষ্ঠায়। চলুন, তার অনুবাদে উপন্যাসটির আরও কিছু অংশ ঘুরে দেখা যাক।

মূলে বলা হচ্ছে:

Bonita fiesta le va a armar—volvia oirla voz del que iba alli a mi lado—.Se pondra content de ver a alguien despues de tantos anos que nadie viene por aqui. (P 8)

অনুবাদক কথাটা বলছেন অন্যভাবে:

—দারুণ উৎসব হবে—লোকটির গলা শুনতে পাই। সচরাচর এদিকে কেউ আসে না, তাই সকলে ভীষণ আনন্দিত হবে।( পৃ ২৪)

কোন লোকটির গলা শুনতে পাই? মূলে কিন্তু সেই লোকটির একটা পরিচয় দেয়া আছে—que iba alli a mi lado—অর্থাৎ, আমার পাশ দিয়ে যিনি যাচ্ছিলেন—এরকম একটা পরিচয় দেয়া হয়েছে লোকটির, কিন্তু অনুবাদক এই কথাটা উল্লেখ করেননি। মানবেন্দ্রর অনুবাদে কিন্তু আছে, আছে ইংরেজি অনুবাদেও। কিন্তু এই অনুবাদক তা বর্জন করেছেন। আর পরের বাক্যে কথাটা তিনি যেভাবে বলেছেন, রুলফো কিন্তু ওভাবে বলতে চাননি। ‘সচরাচর’ আর ‘বহু বছর পর’ (despues de tantos años) এক কথা নয়। বরং পরস্পর বিপরীত অর্থ বহন করে। ফলে সচরাচর বললে মূল লেখকের বক্তব্যের বিপরীতে অবস্থান নেয়া হয়। মানবেন্দ্র বা ইংরেজি অনুবাদকও এখানে ভুল করেননি। মানবেন্দ্রর অনুবাদটা এখানে বরং যথাযথ:  

‘আবার কাউকে দেখতে পেয়ে ওরা বেজায় খুশী হবে। সে যে কত বছর পর আবার কেউ এখানে এল।’( পৃ ১২)

মানবেন্দ্র এখানেও মূলের একটি বাক্যকে তিনি দুটো বাক্যে প্রকাশ করেছেন বাংলা ভাষার রীতি ও বোধগম্যতার স্বার্থে এবং এতে করে বাক্যটির সাহিত্যিক সৌন্দর্য যেমন প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি রক্ষিত হয়েছে মূলের অভিঘাত।

আনিসুজ জামানের আরেকটি ভুল অনুবাদের নজির এই একই পৃষ্ঠায় আমরা দেখতে পাবো।

মূলে বলা হচ্ছে:

Y mas alla una linea de montañas. Y todavia mas alla, la mas remota lejania.(P 8)

তিনি অনুবাদ করেছেন এভাবে:

তারও ওপারে এক সারি পাহাড়। তারও ওপারে যত দূরকল্পনা করা যায় শুধুই পাহাড়।( পৃ ২৪)

স্প্যানিশে যা বলা হয়েছে তা যেন পাঠক বুঝতে পারেন তাই আমি এখানে ইংরেজি অনুবাদ থেকে এই অংশটি উদ্ধৃত করব:

And farther in the distance, a range of mountains. And farther still, faint remoteness. ( P 5)

‘যত দূরকল্পনা করা যায়’—মূলে এমন কোনো অভিব্যক্তিই নেই। কিন্তু তিনি কল্পনা করে নিয়েছেন। এমনকি, ‘শুধুই পাহাড়’ কথাটাও নেই। এই অংশটা বরং মানবেন্দ্র খুবই সুন্দর এবং যথাযথভাবে করেছেন:

উপত্যকা ছাড়িয়ে ওপাশে পাহাড়ের সার, তার ওপাশে দূর ছাড়া আর কিছু নেই। ( পৃ ১২ )

রুলফোর বর্ণনাশৈলীর বৈশিষ্ট্য আমরা একটু আগেই লক্ষ্য করেছি তিনি পুনরুক্তি এড়াতে পছন্দ করেন, সারা জীবন সাধনা করেছেন বাহুল্য বর্জনের। সুতরাং পরপর দুটি বাক্যে পাহাড়ের উল্লেখ আর ‘কল্পনা’ করার আতিশয্য পুরোপুরি রুলফোবিরোধী।

এবার আসা যাক অনুবাদক পরের পৃষ্ঠায় কী করেছেন।

মূলে ছিল:

Me atrevi a hacerlo porque vi en sus ojos una gota de confianza. (P 9)

তিনি অনুবাদ করেছেন এভাবে:

তার চোখে তাকিয়ে একটু আস্থার আভাস দেখে প্রশ্নটি করার সাহস পাই। (পৃ ২৫)

আসলে বলতে চেয়েছে “তার চোখে তাকিয়ে এক ফোঁটা আস্থা দেখতে পেয়ে আমি প্রশ্ন করার সাহস পাই।”

জানি, এটি হয়তো বড় কোনো ভুল নয় সাধারণ কোনো উপন্যাসের ক্ষেত্রে, কিন্তু রুলফোর এই উপন্যাসে প্রতিটি শব্দের যাতে আলাদা স্বাদ পাওয়া যায় সেজন্যই তো তিনি ‘এক ফোঁটা আস্থার’ (una gota de confianza) কথা বলেছেন যা প্রচলিত অভিব্যক্তি ও ব্যবহারকে এড়িয়ে তৈরি হয়েছে। তাছাড়া, ‘এক ফোঁটা আস্থার’ বলার মধ্যে নতুনত্ব যেমন আছে, তেমনি আছে এর কাব্যিক ব্যঞ্জনা।

Y que si yo escuchaba solamente el silencio, era porque aun no estaba acostumbrado al silencion;( P 11)

জামান-এর অনুবাদে এটি দাঁড়িয়েছে এরকম:

আর আমি স্তব্ধতা ছাড়া কিছুই শুনছিলাম না, কারণ এখনও আমি নীরবতায় অভ্যস্ততা পাইনি, ( পৃ ২৮)

তিনি এর যে তর্জমা করেছেন তা বাংলা বাক্য হিসেবে যেমন দুর্বল, তেমনি তা মূল বাক্যের গঠনগত যথাযথতার প্রতিনিধিত্ব করছে না। এর আগেও বলেছি রুলফো সাধারণত পরপর বাক্যে বা বাক্যাংশে Affirmative এবং Negative অভিব্যক্ত ব্যবহার করেন। মূলে যা বলতে চেয়েছেন তার তর্জমা করলে দাঁড়ায় : “আর আমি কেবল নীরবতাই শুনছিলাম, কারণ আমি নীরবতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি।” অর্থাৎ এখানে প্রথম বাক্যাংশটি Affirmative হলেও, পরের বাক্যাংশে তিনি Negative অভিব্যক্তি নিয়ে এসেছেন। গদ্য রচনায় তার এই সতর্ক ও সচেতন নির্মাণকৌশল যদি আমরা অনুসরণ না করি তাহলে শুধু ঔপন্যাসিক হিসেবেই নয়, গদ্যশৈলীর ক্ষেত্রে রুলফোর নতুনত্ব আমরা কিছুই বুঝতে পারব না। তাছাড়া, অনুবাদক কেন প্রথম Affirmative বাক্যাংশটিকে Negative (‘আর আমি স্তব্ধতা ছাড়া কিছুই শুনছিলাম না’) করলেন? এবং দ্বিতীয় বাক্যটিতে শব্দের অপপ্রয়োগ ও আড়ষ্টতাও লক্ষণীয় : “আমি নীরবতায় অভ্যস্ততা পাইনি,”। এটি অত্যন্ত দুর্বল ও ব্যবহারবিরল। নীরবতায় অভ্যস্ততা পাইনি—আমরা এভাবে বলি কি? অথচ ভূমিকায় তিনি বলেছেন : “তবে আমি চেয়েছি মূলের ব্যঞ্জনা ও ক্রিয়াপদের ব্যবহার অক্ষুণ্ন রেখে অনুবাদ করার।”(পৃ ১৭) তার এই উক্তি তিনি নিজেই পদে পদে লঙ্ঘন করেছেন।

আরেকটি নজির দেখুন:

Pero en fin, ya no tiene remedio.

তিনি এর অনুবাদ করেছেন:

 কী আর করার!

আসলে এই বাক্যটি বলতে চেয়েছে, “কিন্তু শেষ পর্যন্ত, এর কোনো প্রতিকার নেই।” স্প্যানিশ remedio শব্দটা ইংরেজি remedy শব্দটির নিকটতম রূপ  ও অর্থ, ফলে স্প্যানিশে অনভিজ্ঞ যে-কেউ অনুবাদকের ভ্রান্তিটি সহজেই বুঝতে পারবেন। প্রস্তাবিত এই অনুবাদের সাথে আনিসুজ জামানের অনুবাদের আকাশ পাতাল তফাত। এত বেশি ভুলে ভরা যে এই অনুবাদ পড়তে গিয়ে ক্লান্তি যেমন আসে, তেমনি বিরক্ত হতে হয় অব্যাহত ভুলের পীড়নে। কিছু শব্দের তিনি ভুল অনুবাদ করেছেন। যেমন Quejando (এর অর্থ ‘অভিযোগ’) শব্দের অর্থ করেছেন ‘আফসোস’। Abandonado (এর অর্থ ‘পরিত্যক্ত’) শব্দটির কোনো এক জায়গায় অর্থ করেছেন ‘পোড়ো’। প্রতিটি পৃষ্ঠায় নানান ধরনের কোনো না কোনো ভুল গুচ্ছগ্রামের মতো গড়ে উঠেছে।

দুরধিগম্য দুর্বোধ্যতা
মানবেন্দ্রর অনুবাদে কিন্তু আছে, আছে ইংরেজি অনুবাদেও। কিন্তু এই অনুবাদক তা বর্জন করেছেন মানবেন্দ্র সম্পর্কে ৩ নম্বর যে অভিযোগটির কথা তিনি বলেছিলেন, এবার আমরা সেই দিকে একটু পায়চারি করি। ভূমিকায় তিনি মানবেন্দ্রর বিরুদ্ধে নানান অভিযোগের মধ্যে এই অভিযোগটি করেছেন যে, তিনি এমন সব বাক্য লিখেছেন যা দুর্বোধ্য। তিনি মানবেন্দ্রর কোনো একটি লেখা থেকে উদ্ধৃতিও দিয়েছেন, যদিও তিনি উল্লেখ করেননি, কোন বইয়ের কোন পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত করছেন। কিন্তু ঘটনা হলো, তিনি যেই অভিযোগে মানবেন্দ্রকে অভিযুক্ত করছেন, তিনি নিজেও সেই ভুল করেছেন।

নিচে তিনটি উদাহরণ লক্ষ্য করুন:

১. লা কাপিতান সেঞর, দখল করার জন্য প্লেগের মতো এই আগাছা লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকে। ( পৃ ২৭)

২. যতক্ষণ পর্যন্ত না ছোট্ট এক টানে সুতো ছিঁড়ে যেত যেন কোনো এক পাখির ডানায় লেগে কেটেছে ততক্ষণ বাতাসের পেছনে পেছনে আঙুলের ফাঁক দিয়ে সুতো বেরিয়ে যাবার সময় আমাদের দৃষ্টি এক হয়ে লেগে থাকত। (পৃ ৩১)

৩. কিন্তু তোর দাদার সৎকারে ও গির্জার দশমাংশ দিয়ে হাতে আর কিছুই নেই।( পৃ ৩২)

উপরের তিনটি বাক্যই বাংলা বাক্যরীতির অনুবর্তী তো নয়ই, এমনকি তা বোধগম্যও নয়। মূল বাক্যগুলোর যান্ত্রিক অনুবাদের ফলে এমনটা ঘটেছে। মূলে তা না বোঝার কারণেও হতে পারে। পাশাপাশি বাংলা ভাষায় যথেষ্ট ব্যুৎপত্তির অভাবেও এমনটা ঘটা সম্ভব। শেষ উদাহরণটি তিনি ‘গির্জার দশমাংশ’ বলে যে শব্দযুগল ব্যবহার করেছেন তা আক্ষরিক এবং অজ্ঞতাপ্রসূত। স্প্যানিশে শব্দটি হচ্ছে Diezmos যার ইংরেজি পরিভাষা Tithe, আক্ষরিক অর্থে দশমাংশই বটে। কিন্তু দশমাংশ বললে আমাদের কাছে এর কোনোই অর্থ দাঁড়ায় না। মানবেন্দ্র এটা ভালো বুঝতেন বলে তিনি লিখেছেন : “কিন্তু তোর দাদুর সৎকারে এত খরচ হয়ে গেল, তারপর চার্চে এত সব প্রণামী দিতে হলো, মনে হয় না বাড়িতে আর কানাকড়িও আছে।” (পৃ ১৮) ‘প্রণামী’ না বলে ‘দশমাংশ’ বললে বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে এর অর্থ তৈরি হবে না।
বইটির ভূমিকায় তিনি কোনো কোনো বাক্য এমনভাবে গঠন করেছেন বা বাক্যে এমন শব্দ ব্যবহার করেছেন যা মোটেই যথাযথ নয়, এমনকি ব্যাকরণসম্মতও নয়। বোর্হেসের একটি বাক্য অনুবাদ করতে গিয়ে লিখেছেন : নিঃসঙ্গে লেখার প্রতি নিবেদিত রুলফো পাণ্ডুলিপি লিখতেন, বারবার পড়তেন, ঠিকঠাক করে পরে ধ্বংস করে ফেলতেন,” (পৃ ১৮) এই বাক্যে ‘নিঃসঙ্গে’ শব্দটির ব্যবহার মোটেই ব্যাকরণসম্মত নয়। শব্দটি হতে পারতো ‘নিভৃতে’। অনুবাদ হিসেবে যেমন এটি দুর্বল, তেমনি অতিশয় শ্রুতিকটু।

বাদ দিয়ে যাওয়া
এবার মানবেন্দ্রর বিরুদ্ধে তার প্রথম অভিযোগটির দিকে নজর দেয়া যাক। তিনি বলেছেন “অনুবাদে প্রায় অংশেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ বাক্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।” তার এই অভিযোগ কিছুটা সত্যি। তবে এও সত্যি যে তিনি নিজেও ওই একই কাজ করেছেন। তিনি উপন্যাসটির দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় গিয়ে প্রথমে একটি পুরো বাক্য, পরে একটি বাক্যাংশ বাদ দিয়েছেন।

Traigo los ojos con que ella miro estas cosas, porque me dio sus ojos par aver: « Hay alli, pasando el puerto de Los Colimotes, la vista muy Hermosa de una llanura verde, algo amarillo por el maiz maduro. Desde ese lugar se ve Comala, blanqueando la tierrra. Iluminandola durante la noche.» Y su voz era secreta, casi apagada, como si hablara consigo mismo…mi madre.( P 8)

উপরে ‍উদ্ধৃতির ইটালিক অংশটুকুর পরে শেষ বাক্যটি তিনি বাদ দিয়ে গেছেন। দেখুন তার অনুবাদ:

যে দৃষ্টি দিয়ে উনি গ্রামটাকে দেখেছিলেন এসেছি সেই একই দৃষ্টি নিয়ে, কারণ উনিই সেই চোখ আমাকে দিয়েছেন : কোলিমোতেসের তোরণ পার হয়ে চমৎকার সবুজ সমভূমি দেখতে পাবি, পেকে যাওয়া ভুট্টাগুলোর জন্য মাঝে মাঝে হলুদের ছোপ থাকবে। ওখান থেকেই সাদা জমিনের কোমালা দেখা যাবে, রাত্তিরে আলোয় ঝলমল করবে, মা বলতেন। (পৃ ২৪)

মূলে ইটালিক চিহ্নিত অংশটুকুর পরে যা বলা হয়েছে তা আনিসের তর্জমায় নেই। তিনি যা বাদ দিয়েছেন তার তর্জমা হতে পারতো এরকম:

“তার কণ্ঠস্বর ছিল প্রচ্ছন্ন, প্রায় নির্বাপিত, যেন নিজেরই সঙ্গে কথা বলছে… মা আমার।” এই অংশটুকু না বললে বোঝাই যাবে না যে, এটি তার মায়ের উক্তি। দ্বিতীয়ত, লেখক এই বাক্যের মাধ্যমে মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের শারীরিক অবস্থাটিও বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন, অর্থাৎ কথা বলার মতো শারীরিক সক্ষমতা তার নেই। কিন্তু অনুবাদক পাঠককে এই জানা থেকে বঞ্চিত করেছেন।

মূলে একই পৃষ্ঠায় পরে একটি বাক্য ছিল এরকম:

—Y a que va usted a Comala, si se puede saber?—Oi que me preguntaban.

“কোমালায় যাচ্ছেন কেন, জানতে পারি?”—অনুবাদক কেবল এই প্রশ্নবোধক অংশটুকুই করে ছেড়ে দিয়েছেন। “শুনলাম তারা আমায় জিজ্ঞেস করছেন। (Oi que me preguntaban)”—এই কথাটা কেন তিনি বাদ দিলেন? অথচ তিনিই কি-না মানবেন্দ্রকে অভিযুক্ত করছেন কোনো কোনো অংশ ছেড়ে দেয়ার অপরাধে! এরকম ছেড়ে যাওয়া আরও আছে তার তর্জমায়।

বেইমান তর্জমা
আনিসুজ জামান অনুবাদে এমন কিছু শব্দবন্ধ বা সমাসবদ্ধ শব্দ ব্যবহার করেছেন যা সরাসরি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে নেয়া হয়েছে। এমনকি, মানবেন্দ্রর ব্যবহৃত কোনো কোনো শব্দ দ্বারা তিনি এতটাই আক্রান্ত যে দুএক জায়গায় এর ভুল প্রয়োগও করেছেন। যেমন ‘পোড়ো গাঁ’ (মানবেন্দ্র, পৃ ১৩)। আনিসুজ জামান তার একটি বাক্যে লিখেছেন:

এত জনহীন, যেন পোড়ো গাঁ। যদিও দুজনই মূল শব্দটির ভুল প্রয়োগ করেছেন। মূল শব্দটি ছিল Abandonado, ঠিক যেমন ইংরেজিতে Abandoned বলা হয়ে থাকে। সুতরাং বাক্যটি হওয়া উচিত: “এত জনহীন, যেন পরিত্যক্ত।” কিন্তু আনিসুজ, মূলের দিকে না তাকিয়ে, মানবেন্দ্রর ভুলটিই অনুসরণ করেছেন। মানবেন্দ্র কর্তৃক নির্মিত আরেকটি শব্দ হচ্ছে ‘কুকুরখ্যাপানো’ (পৃ ১১), জামান এই শব্দবন্ধকে ইষৎ বদলে নিয়ে করেছেন ‘কুত্তাখ্যাপানো’(পৃ ২৩, ২৪)। শব্দবন্ধের চরিত্র অভিন্ন, শুধু কুকুরকে তিনি কুত্তায় রূপান্তরিত করে নিয়েছেন। স্প্যানিশে যদিও ‘কুকুরখ্যাপানো’ধর্মী কোনো অভিব্যক্তিই নেই। মূল শব্দটি Canicula, এই শব্দ দিয়ে গ্রীষ্ম মৌসুমের শুষ্ক এবং ‍বৃষ্টিহীন সময়টিকে বোঝানো হয়। মানবেন্দ্র অর্থটা বুঝে ‘কুকুরখ্যাপানো’ শব্দটি তৈরি করে আবহাওয়াটিকে বোঝাতে চেয়েছেন। সুতরাং মূলে যদি কুকুরের কোনো অনুষঙ্গ নাও থাকে, তারপরও এই শব্দবন্ধটি উপযুক্ত। কিন্তু আনিসুজ জামান তো স্প্যানিশ জানেন, আর তিনি যেহেতু মানবেন্দ্র পড়েছেন, তখন তিনি ইচ্ছে করলেই কি ভিন্ন কিন্তু মূলের অর্থ বহন করে—এমন একটা শব্দ ব্যবহার করতে পারতেন না? মনে হয় না তিনি তা পারতেন। মানবেন্দ্রর মুগ্ধ করার মতো দখল ছিল দুটো ভাষাতেই। ওই দখল না থাকলে এই ‘কুকুরখ্যাপানো’ শব্দটা তার পক্ষে বানানো সম্ভব ছিল না। ইংরেজিতে dog days কথাটা ছিল বটে। কিন্তু সেটাকে যে কুকুরখ্যাপানো করা যেতে পারে তা মানবেন্দ্রর উদ্ভাবনীশক্তির কারণেই সম্ভব। মানবেন্দ্র-উদ্ভাবিত আরেকটা শব্দকেও আনিসুজ জামান কিঞ্চিৎ বদলে নিয়েছেন যদিও তা মোটেই শ্রুতিমধুর হয়নি। শব্দটি হচ্ছে Aguamarina, সবজে নীল এক রং যা সাগরের জলের রঙের সাথে মিল আছে বলে মানবেন্দ্র ওটার বাংলা করেছেন ‘সিন্ধুসবুজ’। খুবই শ্রুতিমধুর এবং আদ্যানুপ্রাস-শোভন একটি শব্দ। জামান আগের মতোই Prefix বা Suffix ইষৎ বদলে মানবেন্দ্র উদ্ভাবিত শব্দটিকে ‘সিন্ধুশ্যাম’ করেছেন। কিন্তু এই বদল মানবেন্দ্র থেকে তার অনুবাদের কোনো দূরত্ব তৈরি করেনি, বরং এটি হয়ে উঠেছে এক চোরাগোপ্তা আত্মসাৎ। আর এই আত্মসাৎ আখেরে অপাঠ্য হয়ে উঠেছে। আরও কিছু শব্দ আছে যেগুলো আত্মসাৎ নয়, বরং ডাকাতি বলা যায়। যেমন এক জায়গায় আনিসুজ বলেছেন : “অভ্যর্থনার ত্রুটি হবে না।” (পৃ ২৮) মানবেন্দ্র হুবহু এই বাক্যাংশই ব্যবহার করেছেন। অথচ মূলে কথাটা ছিল, Sera bienvenido. (P 11)। সোজাসাপ্টা এবং মূলানুগ অনুবাদ করলে দাঁড়ায় :“স্বাগত জানানো হবে।” কিন্তু মানবেন্দ্র এই কথাটাকে সামান্য একটু ঘুরিয়ে বলেছেন, যদিও তাতে অর্থের খুব একটা ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি। কিন্তু আনিসুজ ভিন্নভাবে ভাববার পরিশ্রমটুকু না করে হুবহু মানবেন্দ্রর কথাটাই গিলেছেন। আরও আছে। অন্য এক জায়গায় তিনি অনুবাদ করেছেন : “দাদি আধাহলুদ আধাধূসর চোখে ওঁর দিকে তাকায় যেন ভেতর পর্যন্ত পড়তে পারে।”( পৃ ৩২)

মানবেন্দ্র লিখেছেন : “তার দিদা তার দিকে তাঁর ঐ আধাহলুদ আধাধূসর চোখে তাকালেন—তাঁর চোখদুটো মনে হয় মানুষের একেবারে ভেতরে গিয়ে দ্যাখে, ভেতরের সব কথা পড়ে ফ্যালে।”(পৃ ১৮)।আমরা দেখতে পাচ্ছি দীর্ঘ একটি বাক্যাংশ তিনি মানবেন্দ্র থেকে নিয়েছেন। স্প্যানিশে এই কথাটুকু এরকম : La abuela lo miro con aquellos ojos medio grises, medio amarillos,( P 15) সন্দেহ নেই যে Medio মানে আধা বা অর্ধেক, কিন্তু কথাটিকে হুবহু ‘আধা’ শব্দ ছাড়াও প্রকাশ করার উপায় ছিল। যদি বলা যেত “কিছুটা ধূসর ও হলুদ দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন” কিংবা “খানিকটা ধূসর ও হলুদে মেশানো চোখে তাকালেন”—তাহলে অর্থের কোনো ব্যত্যয় হতো বলে মনে হয় না। কিন্তু তিনি মানবীয় আকর্ষণ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে না পেরে মানবীয় অভিব্যক্তিটাই নিয়েছেন।

আমি ভুলে যাচ্ছি না যে, অনুবাদ এমন এক শিল্পকর্ম যার পক্ষে শতভাগ নিখুঁত হওয়া অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, কোনো বই যদি আগেই কেউ করে থাকেন তাহলে পরের অনুবাদটি আরও উত্তম হওয়া উচিত। তা না হলে সেটি পুনরায় অনুবাদ করা অর্থহীন এবং সময়ের অপচয় মাত্র। তৃতীয়ত, পূর্বসূরির অনুবাদের ভুলত্রুটি নিয়েও কথা বলতে কোনো আপত্তি থাকা উচিত নয়। আনিসুজ জামান পূর্বসূরির ভুল নিয়ে কথা বলেছেন, এটা তারিফযোগ্য অবশ্যই। কিন্তু যেসব ভুলের অভিযোগ তিনি মানবেন্দ্রর বিরুদ্ধে তুলেছেন, নিজের ক্ষেত্রে সেই ভুলগুলোর যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে—সেই ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত ছিল। মানবেন্দ্রর অনুবাদে অবশ্যই ভুল আছে, সেটা স্বীকার করব অবশ্যই, তবে তা খুব বেশি নয়। তিনি কোথাও কোথাও স্বাধীনতা নিয়েছেন, এ কথাও সত্য। তবে এও সত্য যে ওই ভুল ও স্বাধীনতাকে তিনি এত দূর বিস্তৃত করেননি যাতে করে অনুবাদটি অপাঠ্য হয়ে যায়। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আনিসুজ জামানের অনুবাদটি মানবেন্দ্রর চেয়ে ভালো তো হয়ইনি, বরং বহু দোষে তা দুষ্ট। অথচ মূল থেকে করার যে সুবিধা তার হাতে ছিল, তার সদ্ব্যবহার করে অনুবাদটিকে ভালো করতে পারতেন।

ভূমিহীন ভূমিকা
ভূমিকাটি নিয়েও একটু কথা বলা উচিত। তিনি উপন্যাসটির পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে লাতিন আমেরিকান বা ইস্পানোআমেরিকান সাহিত্য না বলে শুধুই ‘লাতিন’ সাহিত্য বলেন। লাতিন ভাষায় রচিত সাহিত্যকেই লাতিন সাহিত্য বলা হয় বলে জানি। বিভ্রান্তি এড়াবার জন্য লাতিন সাহিত্য না বলে লাতিন আমেরিকান বা স্প্যানিশ সাহিত্যও বলা যেতে পারতো।  

ভূমিকার শুরুতেই তিনি রুলফোর গুরুত্ব ও প্রভাব বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, “তবে বুম সাহিত্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে হুয়ান রুলফোর পেদ্রো পারামো উপন্যাসটি।” (পৃ ৭) সন্দেহ নেই যে ‘পেদ্রো পারামো’  প্রভাববিস্তারী এক উপন্যাস। পরবর্তী প্রজন্মের অনেকের উপরই এর প্রভাব আছে। মার্কেস তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। এমনকি মেহিকোর বিপ্লব নিয়ে পরবর্তীকালে যারাই লিখেছেন, তাদের অনেকেই এই উপন্যাসটির কাছে ঋণ স্বীকার করেন। তবে অনুবাদকের আবেগ ও প্রীতির আতিশয্য থেকে এমন দাবি করাটা সাহিত্যের ইতিহাসের সাথে খুব একটা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। রুলফোর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি যে মেহিকানো লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেসের উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন, সেই ফুয়েন্তেসকেই যদি মান্য ধরা হয় তাহলে এও স্বীকার করতে হবে যে “Without his prose, there would be no modern novel in South America today.”(Norman Thomas Di Giovanni, Borges on Wtiting, E. P. Duttos, 1973, P 9) ফুয়েন্তেস কার কথা বলছেন এখানে? আক্কেলমান্দ পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, তিনি বোর্হেস, হোর্হে লুইস বোর্হেস। কে বলছেন এই কথা? তিনি বুম নামক সাহিত্য-আন্দোলনের নায়কদের একজন। এই আন্দোলনের আরেক নায়ক গিয়্যের্মো কাব্রেরা ইনফান্তে আরেক ধাপ উঠে বোর্হেস সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন তা অস্বীকার করার উপায় নেই : “There is not a single Hispano-American writing today who can set aside the influence of Borges and his work.” (Rita Guibert, Seven Voices, Alfred K. Knopf, 1972, P 426)  এরকম আরও বহু অভিমত এক্ষুনি সমবেত হতে পারে। কিন্তু সাহিত্যের সত্যিকারের সমঝদারদের কাছে এতকিছুর দরকার হয় না। কথা হলো বোর্হেসের প্রভাবের বিশালতা প্রমাণের ফলে রুলফোর গুরুত্ব ও প্রভাব তাতে খাটো হয়ে যায় না। আমাদের শুধু খেয়াল রাখা উচিত ইতিহাসের সত্যকে মান্য করা। রুলফো এক উপন্যাসে স্প্যানিশ সাহিত্যকে যে-উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তার তুলনা বিশ্বসাহিত্যে বিরল ঘটনা।

সন্দেহ নেই যে ‘পেদ্রো পারামো’ কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, অন্য ভাষার সাহিত্যেও বিপুল প্রভাববিস্তারী। কিন্তু অনুবাদক তার ভূমিকায় এই কথা কোথাও বলেননি। জানাননি ‘পেদ্রো পারামো’র পূর্বসূরি কারা। এই উপন্যাসের অর্জন জানতে হলে তার পূর্বসূরি-রচনাগুলোও জানাটা জরুরি। এই প্রসঙ্গে আমাদের মনে পড়বে  ফুয়েন্তেসের সেই সহায়ক উক্তি : “Every great writer, every great critic, every great reader knows that no book is an orphan: there is no text that does not descend from  other texts.” (Carlos Fuentes, Great Latin American Novel, Dalkey Archive Press, 2016, P 112)

পেদ্রো পারামো রুলফো পূর্বসূরিদের প্রভাবকে কীভাবে কাজে লাগিয়ে নিজের বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছেন তার তুল্যমূল্য রূপটি চোখের সামনে হাজির না থাকলে সাধারণ পাঠকের পক্ষে রুলফোর গুরুত্ব ও অর্জন বুঝে ওঠা একটু কঠিন। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এই দিকটি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বিপ্লবের সূত্রে তার পূর্বসূরি কারো কারোর নাম উল্লেখ করলেও, আনিসুজ জামান এই ব্যাপারে একদমই নীরব। আনিসুজ জামানের ভূমিকাটি মহাজনদের উদ্ধৃতি আর মানবেন্দ্র সম্পর্কে অভিযোগেই পূর্ণ হয়ে আছে। আর তার নিজের যেটুকু কথা আছে তা হামাগুড়ি দেয়া শিশুতোষ ভাষ্য। মানবেন্দ্রর ভূমিকাটির গুরুত্ব এইখানে যে তিনি মেহিকো এবং লাতিন আমেরিকার ইতিহাস ও বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে রেখে রুলফোর বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। আনিসুজ জামান সেই চেষ্টা থেকে এতটাই বিরত রয়েছেন যে, মনে হবে এটি বুঝিবা পূর্বাপরহীন এক ভুঁইফোঁড় রচনা। একটু আগেই ফুয়েন্তেস জানিয়েছেন, কোনো রচনাই পিতৃমাতৃহীন এতিম নয়। ফুয়েন্তেসের এই কথাটি আমলে নিয়ে যদি ‘পেদ্রো পারামো’র পেছনের দিকে তাকানো যায় তাহলে একাধিক সূত্র রুলফোর হাতের নানান আঙুলে জড়ানো অবস্থায় দেখতে পাবো। একটা তো অবশ্যই দান্তের ‘কম্মেদিয়া দিভিনা’, যার প্রত্যক্ষ প্ররোচনা আমাদের চোখে পড়বে। অক্তাবিও পাস আমাদের এই দেখাকে নিশ্চিত করে জানিয়ে দেন যে “Pedro Paramo’s journey home is a new version of the wanderings of a soul in Purgatory.” (Five Works by Octavio Paz, Arcade Classics, 2012,  P 15) । দান্তে মৃত্যুপুরীতে গিয়ে ইতিহাসের যেসব আত্মাদের দেখার বর্ণনা দিয়েছেন, পেদ্রো পারামোর কোমালা সেরকমই এক পুর্গাতরিও। কিন্তু শৈলী, শিল্পকৌশল আর ইতিহাস ও জীবনদৃষ্টির ভিন্নতার কারণে পুর্গাতরিও থেকে রুলফো অন্যদিকে যাত্রা করেছেন। এই উপন্যাস পশ্চিমের উনিশ শতকের লেখকদের কাছ থেকে যেমন শিল্পকৌশল গ্রহণ করেছে, তেমনি সমসাময়িক মার্কিন লেখক উইলিয়াম ফকনারও তাকে পথ দেখিয়েছে। বিশেষ করে সময়ের জটিল গ্রন্থি নির্মাণে তিনি ফকনারকে অনুসরণ করেছেন। কিন্তু  সময়ের নানা স্রোতকে রুলফো যে-বিন্যাসে উপন্যাসে উপস্থাপন করেছেন তা ফকনারের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। কাহিনি বুনন এবং চরিত্র নির্মাণে রুলফোর শৈল্পিক দক্ষতা কেবল উচ্চ পর্যায়েরই নয়, তা অভিনবও বটে। উপন্যাসের জটিল কাঠামোকে তিনি ডেডালাসের মতো এমন এক দক্ষতায় নির্মাণ করেছেন যা প্রায় গোলকধাঁধার মতো মনে হবে। কেবল কাঠামোগতভাবেই নয়, এই উপন্যাসের এক প্রচ্ছন্ন মৈত্রীসম্পর্ক আছে গ্রিক পুরাণের কয়েকটি চরিত্রের সাথেও।

আমরা উপন্যাসের শুরুতেই দেখতে পাব গ্রিক পুরাণের টেলেমেকাসের মতোই হুয়ান প্রেসিয়াদো কোমালায় প্রবেশ করে পিতার সন্ধানে। তাকে কে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়? সেও পুরাণের সেই চার‌্যান (Charon) মতোই এক চরিত্র, উপন্যাসে যে আবুন্দিও হিসেবে পরিচিত; হুয়ান প্রেসিয়াদোকে সে স্টিক্স-এর মতোই ধুলোর নদী পার করে নিয়ে যায়। আবুন্দিও নিজেকে পেদ্রো পারামোর ছেলে পরিচয় দিয়ে হুয়ান প্রেসিয়াদোকে সে নরকের দরজায় রেখে চলে যায়। উপন্যাসের এই নরকের নাম কোমালা। এরপর হুয়ান প্রেসিয়াদো সেই পৌরাণিক আখ্যানটিকে হাতে নেয় যে, আখ্যানে আমরা দেখবো অর্ফিউসের মতোই সে ছন্দোময় ভাষায় ও বর্ণনায় গল্প বলতে থাকবে নরকে প্রবেশ করতে করতে, আর প্রবেশ করবে এই শর্তে যেন সে পেছনে তাকাতে না পারে। হুয়ান প্রেসিয়াদো আর পেছনে তাকায়নি, সে কেবল নরকের দিকেই এগিয়ে গেছে। আবুন্দিও ছেড়ে যাওয়ার পর তাকে পথ দেখায় তার মা দলোরিতার কণ্ঠ যে কি-না পেনেলোপির মতোই অপমানিতা। কিন্তু পেদ্রো পারামো কেবল পশ্চিমের পুরাণকেই আত্মীকৃত করেনি, নিজের জাতিগোষ্ঠীর পুরাণকেও আখ্যানের প্রচ্ছন্ন স্তরে অঙ্গীভূত করে নিয়েছে। পেদ্রো পারামো তার কাঙ্ক্ষিত সবকিছুকে অধিকার করেই অভ্যস্ত। সে এমন এক ভাষিক আধিপত্য তৈরি করে যা আজটেক সম্রাট মক্তেসুমার মতো, যে মক্তেসুমার উপাধি হচ্ছে ত্লাতোয়ানি, যিনি ‘মহাস্বরের প্রভু’ (Lord of the Great Voice)। দেবতা ত্লাতোয়ানির সাহিত্যিক আদল প্রতিফলিত হয়েছে পেদ্রো পারামো চরিত্রে। কিন্তু পেদ্রো পারামো কেবল গ্রিক পুরাণের সর্বশক্তিমান দেবতা জিউস বা আজটেক পুরাণের ত্লাতোয়ানি রূপেই সীমিত নয়, তার যাতায়াত কালের প্রাচীর পেরিয়ে কখনো কনকিস্তাদোর কর্তেস, আবার রাষ্ট্রনায়কের রূপকার ম্যাকিয়াভেলি পর্যন্ত। পাঠকদের বিশ্বস্ত ভার্জিল, কথাসাহিত্যিক ফুয়েন্তেস পাঠক নামক দান্তেকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যান সেই প্রচ্ছন্ন পাঠের দিকে যেখানে, তার ভাষ্যমতে, “In the amusing segments in which Rulfo narrates Pedro Paramo’s dealing with the revolutionary forces, the tyrant of Comala follows Machiavelli’s advice and Cortes’ example, unite the less powerful enemies of your powerful  enemy; then destroy them all, then usurp the places of all, friends and enemies, and  never loosen your grip on them. ” (Carlos Fuentes, Great Latin American Novel, Dalkey Archive, 2016, P 110)

আনিসুজ জামান অর্থাৎ এই পেদ্রো পারামোকে রুলফো নানা জাতির পুরাণ, ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন সময়কালের একাধিক চরিত্র থেকে এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যে, একইসাথে অতীতের, মধ্যযুগের আবার তা সমকালেরও। প্রিন্স অব ম্যাকিয়াভেলির মতোই ধূর্ত, হিংস্র, নিষ্ঠুর নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য। পারামো যা চায়, সবই সে অধিকার করে স্বেচ্ছাচারীর মতো, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের সার্বিক বৈশিষ্ট্যই খুঁজে পাওয়া যাবে পেদ্রো পারামোতে যখন সে ফুলহোর সেদানোকে বলে : “এখন থেকে আমরাই আইন করব।”

‘পেদ্রো পারামো’ কেন অসাধারণ একটি উপন্যাস তা এই পাঠের মধ্যদিয়ে না গেলে এটিকে নেহায়েতই একটি কঙ্কাল বলে মনে হবে। মনে হবে এ বুঝিবা শুধুই একটি কাহিনি। এটি যে বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতির অসংখ্য উদ্যান থেকে মৌমাছির মতো আহরণ করা এক মৌচাক তার সূত্রগুলো ধরিয়ে না দিলে এই উপন্যাসের মহত্ত্ব বুঝে ওঠা কঠিন। তা না করতে পারলে ক্লাস রুমে কঙ্কাল দিয়ে মানবদেহের ব্যাখ্যা দেয়ার মতো হয়ে যাবে। অনুবাদক হিসেবে দায়িত্ব হচ্ছে পাঠককে কঙ্কাল নয়, রক্তমাংসের একটি জীবন্ত বই হাতে তুলে দেয়া। প্রকাশক হিসেবে ‘পাঠক সমাবেশ’রও দায় ছিল এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ চিরায়ত গ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশের আগে বিশেষজ্ঞ কাউকে দিয়ে পাণ্ডুলিপি যাচাই বাছাই বা সম্পাদনা করানো। প্রকাশক হিসেবে ‘পাঠক সমাবেশ’  চরম দায়িত্বহীনতার নজির তৈরি করেছে। পাঠক এবং ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে হলে এই দায়িত্বটা পালন করা খুবই জরুরি। এমন একটি নেতৃস্থানীয় বইয়ের অবিশ্বস্ত, স্বেচ্ছাচারদুষ্ট ও দুর্বল অনুবাদ প্রকাশ করে পাঠক-ক্রেতাকে ঠকানো উচিত হয়নি তাদের।

উল্লেখপঞ্জি
১. Juan Rulfo, Pedro Paramo y El Llano en Llamas, Planeta, 1975
২. Carlos Fuentes,Great Lanin American Novel, Dalkey Archive Press, 2016
২. Juan Rulfo, Pedro Paramo, Tran: Margaret Sayers Pedan, Gorves Press, 1994
৪. মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘হুয়ান রুলফোর কথাসমগ্র’, প্রমা প্রকাশনী, ২০০৯
৫. হুয়ার রুলফো, ‘পেদ্রো পারামো’, অনুবাদ: আনিসুজ জামান, পাঠক সমাবেশ, ২০২৩

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
জাবির ডিন নির্বাচন ১৫ মে
জাবির ডিন নির্বাচন ১৫ মে
সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ সবসময় প্রস্তুত: প্রধানমন্ত্রী
সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ সবসময় প্রস্তুত: প্রধানমন্ত্রী
হাইকোর্টে ফের মিন্নির জামিন আবেদন
হাইকোর্টে ফের মিন্নির জামিন আবেদন
আগের চেয়েও অনেক বেশি ফিট আমির
আগের চেয়েও অনেক বেশি ফিট আমির
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট, হিন্দু মহাজোট ‘নেতা’ পুলিশ হেফাজতে
ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট, হিন্দু মহাজোট ‘নেতা’ পুলিশ হেফাজতে
জানা গেলো বেইলি রোডে আগুনের ‘আসল কারণ’
জানা গেলো বেইলি রোডে আগুনের ‘আসল কারণ’
চট্টগ্রামে ভূমিকম্প, মাত্রা ৩ দশমিক ৭
চট্টগ্রামে ভূমিকম্প, মাত্রা ৩ দশমিক ৭
কেএনএফের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত, কেঁদে কেঁদে স্ত্রী বললেন আমার ৩ সন্তানকে কে দেখবে?
কেএনএফের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত, কেঁদে কেঁদে স্ত্রী বললেন আমার ৩ সন্তানকে কে দেখবে?
আজকের আবহাওয়া: ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস
আজকের আবহাওয়া: ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস