রিলকের কবিতা : এই সময়ের শব্দ-ভাষায়

হামীম কামরুল হক
২০ জুলাই ২০২৬, ১৭:০০আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ১৭:০০

‘‘কেন্দ্রের ভেতরেও কেন্দ্র থাকে, শাঁসের ভেতরে শাঁস
দেখো কাজুবাদমের কৌশল: নিজের গভীরে ডুবে থাকে;
ক্রমে বাড়ে সুমিষ্টতায়।’’

—‘দ্য বুক অব ইমেজেস’(১৯০২)-এর ‘বুদ্ধা ইন গ্লোরি’ কবিতাটির অনুবাদ এভাবে পাওয়া গেল; পাওয়া গেল রিলকের কাব্য সাধনার একদম মূল বিষয়টিকে। এমন ৪৯টি কবিতার নতুন স্বাদ পাওয়া যাবে তরুণ কবি রায়হান শরীফের অনুবাদে।

তিনি বইটির নাম রেখেছেন ‘কাজুবাদামের কৌশল: রিলকের নির্বাচিত কবিতা’—এই নাম দেওয়াটাও যেমন চমকপ্রদ, ততটাই যথাযথ। অনুবাদক বইটির মুখবন্ধে লিখেছেন, ‘‘বিশ শতকের জার্মান ভাষার এই কবির মূল সাধনা হলো: হিরণ্ময় নিঃসঙ্গতাকে নিজের মধ্যে ধারণ ও উদ্‌যাপন। নিজের কাছে ফেরার পথে যা কিছু বাধা—নারী কিংবা প্রকৃতি—সবকিছুর আকর্ষণ বা উন্মাদনার ঊর্ধ্বে উঠতে তাগিদ দিয়েছেন অন্যকে, নিজেকেও।”—এমন মূল্যায়ন আমাদের এই কবিতার বইটির প্রতি আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দেয়।

এ বইয়ের ছোট্ট একটি ভূমিকায় ইরাজ আহমেদও লিখেছেন, ‘‘কবিতা চিরকালই রহস্যময় এক সাহিত্য মাধ্যম, যার গভীরে নিঃসঙ্গতা আর বিষাদ দুটো বড় উপাদান হিসেবে কাজ করে। রাইনার মারিয়া রিলকের কাছে সেই নিঃসঙ্গতা অভিশাপ ছিল না, বরং তা ছিল সৃষ্টির আদিম উৎস।’’ ভাস্কর রদ্যাঁর সংস্পর্শে রিলকে একটি নতুন ধারার জন্ম দেন, যে কবিতার ধরনকে বলা যায় ‘বস্তু কবিতা’। ‘‘পাথরে প্রাণ প্রতিষ্ঠার” উপমাকে মনে রাখলেই—সেটি সবচেয়ে সহজভাবে বোঝা যাবে।

রায়হান শরীফ বইয়ের শুরুটা করেছেন ‘দুইনো এলিজি’র প্রথম শোক গীতি দিয়ে। যেমন এতে একটি স্তবক আছে :

‘‘ছুঁড়ে ফ্যালো
তোমার হৃদয়ের শূন্যতা!
মিশিয়ে দাও বাতাসে—
যে বাতাসে শ্বাস নিই আমরা।’’

শব্দ ব্যবহারে স্বচ্ছতা, সহজ ও প্রাঞ্জলতা রক্ষা করে রিলকের মতো কবির কবিতা অনুবাদ করতে গিয়ে তা কতটা তিনি ধারণ করতে পেরেছেন, অনূদিত বইয়ের কবিতাগুলির ছত্রে ছত্রে তার দৃষ্টান্ত মিলবে। বাংলা-অনুবাদের মূল বিষয় তো অন্য ভাষার কোনো রচনা—বাংলায় কীভাবে লেখা হতে পারে—সেটি হাজির করা। রায়হান শরীফের এই অনুবাদ আবারও তা মনে করালো। কারণ বুদ্ধদেব বসু, অলোকরঞ্জন দাশ গুপ্তের মতো যুগন্ধর কবিরা রিলকে অনুবাদ করেছেন, সে বিষয়টি কেমনে রাখলেও, রায়হান শরীফ অনুবাদের বর্তমান দশায়, হাল আমলের বাংলা শব্দের ব্যবহারের এই অনুবাদে যে সফল হয়েছেন—তাও টের পাওয়া যায়:

“আমরা হৃদয়
কী করে গুছিয়ে রাখি
যেন তা না ছোঁয়
তোমার হৃদয়?’’ (প্রণয়গীতি)

বা 

“সময়ের তোড়ে
কী বিস্ময় দ্যাখো
তোমাকে চেনার চেষ্টা
আমাকে ছাড়তে হয়েছে।”
(যে তুমি কখনো আসোনি)

—এভাবে নিবিড় এক সহজতায় এই বইয়ের কবিতাগুলি অভিষিক্ত। এটা রিলকের পুরানো কিংবা নতুন পাঠকের জন্যও একটি বিশেষ প্রাপ্তি।

রিলকের আবহ তৈরির বিষয়গুলিও দারুণভাবে সামাল দিয়েছেন অনুবাদক :

“দূরের কাল ল্যান্ডস্কেপ
সার সার ঝাপসা লণ্ঠনের ফাঁক গলে
হানা দিলো
কোনো এক সিদ্ধান্তহীন শহরে।”
(শরতের সন্ধ্যায়)

কিন্তু কোথাও কোথাও বাংলা পুরোনো শব্দের ভেতর দিয়ে দারুণ নস্টালজিক করে তোলেন:

‘‘যারে রাখি যতনে—গহনে
খুঁজি তারে কী করে ভুবনে?’’
(তুমি সেই নামহীন শহরগুলো)

রিলকের অমোঘ উচ্চারণ:  

‘‘একটা সুড়ঙ্গ খুঁড়ছি
ভারী পাথরের চাই
স্তরে স্তরে শিলা,
একাকী আকরিক।”
(খুঁড়ছি)

রিকলের কবিতার সাবলাইমগুলি, যা আমাদের ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে ফের নির্মাণ করে বা নতুন গড়ন-গঠন দেয়, সেইসব পঙ্‌ক্তি পঙ্‌ক্তিতে এই বইটি পরিপূর্ণ। ‘আমাদের আমরা’ বা ‘একাকী’ এমন কবিতায় রায়হান রিলকের কবি-সত্তার সারবত্তাটিই আদতে বাঙালি পাঠকের কাছে নতুন করে এনে দিয়েছেন:

‘‘আমাদের অক্ষমতা একটাই: কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারি না।”
(আমাদের আমরা)

বা

“ভাগ্যের চাকা
যে ছন্দে ঘোরে
তার মাপজোখ হয় না।”
(অপার দূরত্ব)

জীবনযাপনের তথা বেঁচে থাকার চিত্র-বিচিত্র অনুভবকে রিলকে জীবন্ত করে তোলেন। বইটির যে কাবিতা দিয়ে ইতি টানা হলো ‘শেষ বস্তু’ নাম দেওয়া হলো যে কবিতাটির, তাতে দুটো স্তবক দারুণ মোহনীয়:

“এখন জেনেছি—এই হৃদয়ের শান্তির বিনিময়ে
কিছুই ক্রয় করা যায় না। তার সমস্ত শিক্ষা আজ নিঃশব্দ।”

এবং একদম শেষ কথা:

“আমি অগ্নিময়।
কেউ আমাকে চেনে না।”

নিজে দীর্ঘদিন কবিতাচর্চা করেছেন বলেই অন্য কবিকে অনুবাদ করতে রায়হান শরীফ নিজের কবিসত্তার কাছেই দারুণ সহায়তা পেয়েছেন, নইলে রিলকের মতো কবিকে এই সময়ের ভাষায় অনুবাদ করা হয়তো হতো না। বাংলা কবিতা যে যে কবির কাছে ঋণী, রিলকে হলেন তেমনই একজন—যার কাছে আমরা বার বার ফিরতে চাই; আর ভালো অনুবাদের মাধ্যমে সেই ফেরাটা আরো জোরদার হয়। রায়হান শরীফের অনূদিত রিলকের নির্বাচিত কবিতা সুন্দর প্রাঞ্জল অনুবাদের দারুণ এক নমুনাই বলতে হবে। দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারি, বাংলাভাষী পাঠক ও কবিতাচর্চাকারীদের জন্য এ এক অনবদ্য উপহার।

প্রকাশক: অনুপ্রাণন 
প্রচ্ছদ: তৌহিন হাসান 
মূল্য: ২৪০ টাকা

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ছাত্রাবাসে নারীকে ৪ দিন আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ
ছাত্রাবাসে নারীকে ৪ দিন আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানালেন তারেক রহমান 
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানালেন তারেক রহমান 
মেজবানের স্বাদ এবার আপনার রান্নাঘরে
মেজবানের স্বাদ এবার আপনার রান্নাঘরে
ব্যাংকে টাকা রাখার আগে যেসব তথ্য জানা জরুরি
ব্যাংকে টাকা রাখার আগে যেসব তথ্য জানা জরুরি
সর্বাধিক পঠিত
পরবর্তী ২০৩০ ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক কারা, জেনে নিন সূচি ও নতুন ফরম্যাট
পরবর্তী ২০৩০ ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক কারা, জেনে নিন সূচি ও নতুন ফরম্যাট
কোচের পাঁচ ভুলেই বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরাজয়
কোচের পাঁচ ভুলেই বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরাজয়
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার
সাবান-আইসক্রিমসহ চার প্রতিষ্ঠানের ৮ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ 
সাবান-আইসক্রিমসহ চার প্রতিষ্ঠানের ৮ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ 
চল্লিশে বুড়িয়ে যাওয়ার দিন শেষ, এখন ‘প্রাইম টাইম’
চল্লিশে বুড়িয়ে যাওয়ার দিন শেষ, এখন ‘প্রাইম টাইম’