X
বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২
১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
পর্ব—ছয়

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

মুহম্মদ মুহসিন
০৮ অক্টোবর ২০২১, ১০:৪৫আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২১, ২৩:২৫

পূর্বপ্রকাশের পর

নিউ ক্রিটিসিজম

 

‘নতুন সমালোচনা’র শুরুটা হয়েছিল ঠিক প্রথম বিযুদ্ধের পরপর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত সমালোচনা সাহিত্যের বড় দুটো ঐতিহ্য ছিল : একটি ক্লাসিসিজম, আরেকটি রোমান্টিসিজম। ধারা দুটো পরস্পরবিরোধী হলেও, দুই ধারায়ই লেখার রূপরসসংক্রান্ত এযাবৎকালের ঐতিহ্য, লেখক, লেখাজুড়ে লেখকের ‘আমি’ময় উপস্থিতি, লেখকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, লেখকের মানস ও ব্যক্তিত্ব এবং বাস্তবতা ও প্রকৃতির সাথে তাঁর ও তাঁর লেখার সম্পর্ক অনেক গুরুত্বের সাথে আলোচিত হতো। লেখকের সৃষ্টিশীলতায় ও পাঠকের সমঝদারিত্বে উভয়েরই তখন এক দীর্ঘ ঐতিহ্য আর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ছিল। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সেই উত্তরাধিকারকে ভেঙেচুরে তছনছ করে দিলো। মানুষ এককোটি মানুষকে মেরে ফেলল। যারা মারল তারাও শিক্ষিত, লিটারেট; আর যাদেরকে মারল তারাও শিক্ষিত, লিটারেট। জ্ঞান, বিদ্যা, রুচি, সুকুমারবৃত্তি এবং এতকালের অপরাপর শ্রদ্ধাব্যঞ্জক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারগুলো ভেঙেচুরে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। মানুষ অনুভব করল এক নিঃস্ব একাকিত্ব। তার পাশে যারা এখনো বেঁচে আছে তারাও মানুষ কি-না সংশয় দেখা দিলো। এই অবস্থার বর্ণনায় জার্মান দার্শনিক ওয়াল্টার বেনিয়ামিন (Walter Benjamin) তাঁর ‘দি স্টোরিটেলার’ গ্রন্থে লিখলেন—‘মানুষ যুদ্ধ থেকে ফিরল নিস্তব্ধতাকে সাথে নিয়ে—মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের আগের ক্ষমতা তখন আর তার নেই’ (Men returned from the battlefield grown silent—not richer but poorer in communicable experience)। একই গ্রন্থে বেনিয়ামিন যুদ্ধপরবর্তী মানুষের শিকড়চ্যুত অবস্থাটি আরো করুণভাবে বর্ণনা করলেন—‘অতীতের যে অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ দুনিয়ার অন্য মানুষের সাথে যোগাযোগটি রক্ষা করত এবং যে অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ বুঝতে চেষ্টা করত দুনিয়ার অপরাপর জিনিস, সেই অভিজ্ঞতার বুনিয়াদটি ধ্বংস হয়ে গেল। একটি প্রজন্ম যারা ঘোড়ায় টানা গাড়িতে করে স্কুলে যেত যুদ্ধের পরে তারা নিজেদেরকে খুঁজে পেল কোনো এক পাড়াগাঁয়ের খোলা আকাশের তলে যেখানে আগের কিছুই আর আগের মতো নেই, একমাত্র আকাশের মেঘগুলো ছাড়া। সেই মেঘের নিচে জমিনের ধ্বংসযজ্ঞ আর বিস্ফোরণের মাঝে পড়ে থাকল সেই প্রজন্মের মানুষগুলোর বিধ্বস্ত ও শিকড়চ্যুত মনুষ্য শরীরগুলো।’ ‘নতুন সমালোচনা’ ছিল এই বিধ্বস্ত ও শিকড়চ্যুত মানুষগুলোর সাহিত্যের সাথে পুনঃসংযুক্ত হওয়ার এক নতুন সমালোচনাতাত্ত্বিক প্রয়াস।

এই প্রয়াস দুই মহীরুহের চিন্তা ও কর্ম থেকে দুইভাবে সাধিত হয়েছে। দুই মহীরুহের একজন হলেন টি. এস. এলিয়ট এবং অপর জন হলেন আই. এ. রিচার্ডস। টি. এস. এলিয়ট জন্মেছিলেন আমেরিকায় কিন্তু জীবনের বেশিরভাগ অতিবাহিত করেছেন ইংল্যান্ড ও ইউরোপে। বিপরীতে আই. এ. রিচার্ডস জন্মেছিলেন ইংল্যান্ডে কিন্তু জীবন কাটিয়েছেন আমেরিকার হার্ভার্ডে অধ্যাপনায়। ‘নতুন সমালোচনা’র বিকাশে দুজনেরই অপরিহার্য অবদান থাকলেও, সেখানেও একই তত্ত্বের ভেতরে দুজন হেঁটেছেন দুই ভিন্ন পথে। বিধ্বস্ত ও শিকড়চ্যুত মানুষগুলোকে সাহিত্যের সাথে পুনঃসংযুক্ত করার সমালোচনাতাত্ত্বিক প্রয়াসে টি. এস. এলিয়ট ঠিক করেছিলেন যে, তিনি এই লোকগুলোকে আবার তাদের হারানো ঐতিহ্যের সাথে জুড়ে দেবেন। এই চিন্তায় তিনি তাঁর ‘ট্রাডিশন এন্ড ইন্ডিভিজুয়াল ট্যালেন্ট’ নামের বিখ্যাত প্রবন্ধটিতে অনেক জটিল করে ‘ঐতিহ্য’ বা ‘ট্রাডিশন’ সংক্রান্ত ধারণার বয়ান দিলেন। আর এই ঐতিহ্যের ভিত্তি গড়তে বলে দিলেন যে এর মধ্যে লেখকের ‘আমি’ময়তার কোনো অংশ থাকতে পারবে না। আর আই. এ. রিচার্ডস ঠিক করলেন যা হারিয়ে গেছে তার দিকে আর ফিরে যাওয়া নয়, বরং নিবদ্ধ হতে হবে শুধু যা আছে তার মধ্যে। তাই তিনি চাইলেন আমাদেরকে নিবদ্ধ হতে হবে শুধু টেক্সটের মধ্যে। ঐতিহ্য, সমাজ, সংস্কৃতি, লেখকের জীবন, তাঁর অভিজ্ঞতা, তাঁর ‘আমি’ময়তা ইত্যাকার কোনো প্রসঙ্গের অধীন করে টেক্সটকে বোঝার সকল চেষ্টা পরিহার কতে হবে।

টি. এস. এলিয়ট ঐতিহ্যের সাথে সংযুক্ত হওয়ার ব্যাপারটি বললেও, সে ঐতিহ্য যাতে কোনোভাবেই পূর্ববর্তী রোমান্টিকদের ঐতিহ্যকে না বোঝায় সে জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ তিনি করলেন। ঐতিহ্যের সাথে সংযোগের যে উপায় তিনি বললেন তাঁর মাধ্যমে তিনি ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিকধারার সকল ঐতিহ্যকে প্রকারান্তরে অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন যে, এই ঐতিহ্যিক চেতনা অর্জন করতে হলে কবির ‘আমি’কে বিসর্জন দিতে হবে বস্তু ও ঐতিহ্যের কাছে। কবির ‘আমি’ বলে তাঁর লেখার মধ্যে কিছু থাকতে পারবে না। লেখকের বিকাশ ও উন্নয়ন নির্ভর করবে লেখক কতখানি তাঁর ‘আমি’কে হত্যা করতে পারবে সেই যোগ্যতার ওপরে। (The progress of an artist is a continual self-sacrifice, a continual extinction of personality)। তিনি আরো বলেন যে, লেখা বা সাহিত্য লেখকের ‘আমি’কে প্রকাশের কোনো জায়গা নয়, বরং ‘আমি’ থেকে পলায়নের জায়গা। (‘the poet has, not a "personality" to express’; ‘Poetry is not . . . the expression of personality, but an escape from personality’)। টি. এস. এলিয়টের এই সকল কথাই হলো রোমান্টিক ধারার ট্রাডিশন বা ঐতিহ্যের উপরে এক একটি কুঠারাঘাত। রোমান্টিক ট্রাডিশন অনুযায়ী সাহিত্য ও কলা সব সময়ই ‘আমি’ময়। ট্রাডিশনের দিকে ফেরত গিয়ে আবার রোমান্টিক ট্রাডিশনকে এভাবে অস্বীকার করার মধ্যদিয়ে টি. এস. এলিয়টও তাঁদের ‘নতুন সমালোচনা’য় মূলত আই. এ. রিচার্ডসের দিকেই ফিরলেন। ‘ট্রাডিশন এন্ড ইন্ডিভিজুয়াল ট্যালেন্ট’ প্রবন্ধের দ্বিতীয় সেকশনে এসে তিনি সরাসরি বললেন—‘সত্যিকার সমালোচনা এবং বাস্তব মূল্যায়নের লক্ষ্যবস্তু হবে কবিতা, কোনোভাবেই কবি এদের লক্ষ্যবস্তু নয়’ (Honest criticism and sensitive appreciation is directed not upon the poet but upon the poetry)। এভাবেই টি. এস. এলিয়টের হাতে শুরু হওয়া নতুন সমালোচনা ধারা বলতে চাইল যে, কোনো সাহিত্যকর্মের সমালোচনায় ঐ কর্মের লেখকের জীবন, দর্শন ও সময়কে টানার প্রসঙ্গ থাকবে না। সাহিত্যকর্মকে সর্বতোভাবে লেখক থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিবেচনা ও মূল্যায়ন করতে হবে।

আই. এ. রিচার্ডস এই বিচ্ছিন্নকরণে টি. এস. এলিয়টের চেয়েও অগ্রসর একথা আগেই বলা হয়েছে। তিনি তাঁর অধ্যাপনাকর্মের অংশ হিসেবেই এক অভিনব কর্ম করেছিলেন। তিনি তাঁর বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কাছে কবিতা তুলে দিয়েছিলেন সেগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য। এই কবিতাগুলো তিনি দিতেন কবির নাম এবং কবিতার নাম ছাড়া। এছাড়াও কবিতাগুলো তিনি নির্বাচন করতেন এমনভাবে যাতে সেগুলো কোনো জনপ্রিয় কবিতার সংকলনের অন্তর্ভুক্ত না হয়, যাতে সেগুলোতে স্থান ও সময়ের কোনো উল্লেখ না থাকে এবং শিক্ষার্থী যাতে বুঝতে না পারে এগুলো কোন যুগের এবং কার লেখা হতে পারে। তিনি শিক্ষার্থীদেরকে আরো বলে দিতেন যে, তারা তাদের লিখিত সমালোচনার কাগজে তাদের নাম যেন উল্লেখ না করে। এইভাবে প্রাপ্ত আলোচনাগুলোর বিশ্লেষণ দিয়েই তিনি রচনা করলেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘প্রাকটিকাল ক্রিটিসিজম’ এবং এই গ্রন্থটিকেই বলা যেতে পারে ‘নতুন সমালোচনা’ নামক ধারার প্রবর্তক গ্রন্থ।

এই কর্মের মধ্যদিয়ে তিনি যে ফলাফল লাভ করেছিলেন তা ছিল সাংঘাতিক। প্রাপ্ত আলোচনাগুলো নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি লিখলেন—‘অকপটে স্বীকার করছি যে, কবিতা হাতে নিয়ে তার আলোচনায় দশ জনের মধ্যে নয় জন বলে এমন কিছু যা ঐ কবিতার কোনো প্রসঙ্গই নয়; বরং যা বলে তা স্বভাবজ ভদ্রতা থেকে উদ্ভূত, অথবা কোনো অজ্ঞাত রাগ থেকে উদ্ভূত, অথবা সামাজিক চর্চার ধারা থেকে উদ্ভূত। এই সব আলোচনায় যে সমালোচনার পাঁচালি তৈরি হয় সেগুলোকে সমালোচনা নাম না দিয়ে বরং সামাজিক আলাপচারিতা (social gesture) নাম দিলেই ভালো হয়।’ আই. এ. রিচার্ডস সাহিত্যের সমালোচনার নামে এই সামাজিক আলাপচারিতার ধারাকে রুখতেই নেমেছিলেন। এই ধারা রুখে তিনি যে নতুন ধারা প্রবর্তনের প্রয়াস পেলেন ১৯৪১ সালে তাঁর ছাত্র জন ক্রো র‌্যানসম (John Crowe) তার নাম দিলেন ‘নতুন সমালোচনা’ (New Criticism)।

‘নতুন সমালোচনা’ নামের এই ধারা প্রবর্তনে আই. এ. রিচার্ডসের দুটো বই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একটি ‘প্রাকটিকাল ক্রিটিসিজম’, এবং অপরটি ‘দি প্রিন্সিপলস অব লিটারারি ক্রিটিসিজম’। এই দুই বইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী একটি কবিতা বা সাহিত্যকর্ম পাঠ ও সমালোচনার ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হলো ঐ কবিতার কালো অক্ষরগুলোর মধ্যে বিধৃত নেই এমন সবকিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা। এরপর মস্তিষ্কটিকে সম্পূর্ণভাবে ঐ কবিতার শব্দগুলোর মধ্যে নিবদ্ধ করে কবিতাটির এক নিবিড় পাঠ (close reading) নিশ্চিত করা। নিবিড় পাঠের সময় মনে রাখতে হবে যে, কবিতার ভাষা নির্দেশাত্মক (referential) নয়, বরং অন্তর্মুখী ভাবাত্মক (emotive)। কবিতার শব্দের অর্থ বস্তুতে নয়, ভাষার বাইরে নয়; বরং তার অর্থ ভাষার ও চেতনার অভ্যন্তরে। তাই ভাষাকে চেতনায় ও আবেগে অন্তর্বয়ন করে সে অর্থকে খুঁজে পেতে হবে চিন্তারাজ্যে; বস্তু ও তথ্যরাজ্যে নয়। চিন্তারাজ্যে সাহিত্যকর্মটিকে পৌঁছানোর উপায়স্বরূপ ইমোটিভ ল্যাঙ্গুয়েজের সকল কারিগরি সম্বন্ধে ধারণা থাকতে হবে। সেসব কারিগরির মধ্যে রয়েছে সাহিত্যকর্মটির কাঠামোগত ধারণা, রয়েছে ছন্দ ও অলঙ্কারের সকল ধারণা। এইসব কবিতার অন্তর্গত ধারণার সহায়তায় নিবিড় পাঠ পাঠককে পৌঁছে দেবে কবিতাটির অর্থের জায়গায় এবং এর নন্দনের জায়গায়। অল্প কথায় এই হলো এলিয়ট ও রিচার্ডস প্রবর্তিত নতুন সমালোচনার সারকথা।

এই সমালোচনা পদ্ধতির একটি বড় সমালোচনা হলো এই যে, এখানে লেখক কী বলতে চেয়েছেন এটা আমলে নেওয়া হয় না, যেহেতু এই সমালোচনার ধারায় পাঠককে বলা হয় যে, লেখক কে তা তার জানার দরকার নেই। লেখকের পরিচয়, তাঁর মতাদর্শ, তাঁর ধর্ম ও বর্ণ, তাঁর সমাজ ও সংসার কিছুই তাঁর লেখা বিচারের জন্য প্রাসঙ্গিক হওয়া উচিত নয়। এ পদ্ধতির এই আপাতদৃষ্ট দুর্বলতার বিষয়টিকে এ পদ্ধতির একটি বড় সবলতা হিসেবে পরবর্তীতে প্রমাণ করেছেন আই. এ. রিচার্ডসের যোগ্য ছাত্র উইলিয়াম এম্পসন (William Empson) তাঁর ‘দি সেভেন টাইপস অব এ্যাম্বিগুইটি’ নামের বিখ্যাত গ্রন্থে। এ গ্রন্থের আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, সাহিত্য সমালোচনায় লেখকের উদ্দিষ্ট অর্থকে খোঁজার মানে হলো সাহিত্যকর্মটির অর্থের বিশালতা ও বহুত্বকে গলা টিপে হত্যা করা। সাহিত্যকর্মটি পাঠ কালে যত দ্ব্যর্থবোধকতা বা অর্থের কুহক বের হবে ততই টেক্সটটির অর্থের নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। এভাবেই সাহিত্যকর্মটি নতুন অর্থের দ্বার উন্মুক্ত রেখে চিরকালীন একটি আবেদন তৈরি করবে। লেখকের অর্থের নির্দিষ্টতা পাঠকের অন্বেষণের লক্ষ্য হলে সে অর্থ খুঁজে পাওয়ার পরে টেক্সটটির আর নতুন কিছু দেওয়ার থাকবে না। এটা হবে টেক্সটটির একধরনের মৃত্যু। নতুন সমালোচনা এভাবে সাহিত্যকর্মকে অনেক অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবে। উইলিয়াম কে. উইমসাট এই বক্তব্য আরো পাণ্ডিতিকভাবে দাঁড় করিয়েছেন তাঁর বিখ্যাত দুই প্রবন্ধে : একটির নাম The Intentional Fallacy, অপরটির নাম The Affective Fallacy। ‘নতুন সমালোচনা’ তত্ত্ব নামের এই তত্ত্বে রিচার্ডস, এম্পসন, উইমসাট সকলেরই খুব প্রত্যয়দীপ্ত ও প্রমাণিত বক্তব্য হলো সাহিত্যকর্মের মূল্যায়নে ও বিচারে লেখকের ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর ধর্ম, বর্ণ, আদর্শ ইত্যাদিকে টানা হলে তা হবে সাহিত্যকর্মটির জন্য তথা সাহিত্যজগতের জন্য একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিধনযজ্ঞের প্রয়াস। লেখককে না টেনে শুধু লেখাকে উপজীব্য করে সমালোচনার এই ধারা আরো নতুন নতুন চিন্তায় আর ধারণায় ঋদ্ধ হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীকালে তা ফরমালিজম বা আঙ্গিকবাদ নামে অনেকদিন ধরে সমালোচনার রাজ্যে রাজত্ব করে বেড়ায়।

ফরমালিজম বা আঙ্গিকবাদ

ফরমালিজম বা আঙ্গিকবাদ শুরুতে শুধু ফরমালিজম নামে পরিচিত ছিল না। সাথে এক বিশেষণ যোগ করে এর নাম দেওয়া হয়েছিল রাশিয়ান ফরমালিজম। রাশিয়ান ফরমালিজমের সূত্রপাত ঘটেছিল রাশিয়ার দুই শহরের দুই গ্রুপ বুদ্ধিজীবীকে কেন্দ্র করে। একগ্রুপ থাকতেন মস্কোতে, আর এক গ্রুপ থাকতেন পেট্রোগ্রাদে যার বর্তমান নাম সেন্ট পিটার্সবুর্গ। এই দুই গোষ্ঠীর ভাবনাচিন্তার শুরুটা ১৯১৫-১৬ এর দিকে। তাদের ভাবনার মূল কেন্দ্রে ছিল সাহিত্য কোন গুণে সাহিত্য হয় তার অন্বেষণ। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্যের সেই গুণ বা বৈশিষ্ট্যকে খুঁজে বের করা যার দ্বারা সাহিত্যকে অসাহিত্য থেকে আলাদা করা যায়। রোমান ইয়াকবসন বললেন—‘সাহিত্যবিষয়ক সমঝদারিত্ব মানে সাহিত্যের সামগ্রিক জ্ঞান নয়, বরং সাহিত্যের সেই গুণ সম্পর্কিত বোধ বা জ্ঞান যা কোনো লেখাকে সাহিত্য পদবাচ্য করে’। এই বিষয়ে তাঁরা তিনটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট স্পষ্ট করলেন। ক) কোনো লেখার মৌলিক সাহিত্যগুণটির সাথে ঐ লেখার লেখক, লেখার প্রসঙ্গসূত্র বা লেখার বিষয়বস্তু কোনোটিই আবশ্যিকভাবে সম্পৃক্ত নয়। খ) কোনো লেখার মৌলিক সাহিত্যগুণটির উৎস হলো ঐ লেখার ভাষা। গ) কোনো লেখার ভাষার নির্দিষ্ট কাঠামো বলে দেবে যে, লেখাটি সাহিত্যপদভুক্ত না কি অন্যবিধ কিছু; অর্থাৎ সাহিত্য হিসেবে পরিগণিত হতে হলে ভাষাটির কাঠামো হবে এমন যা অসাহিত্যে ব্যবহৃত হয় না। তিন পয়েন্টের বক্তব্য একত্র করে বলা যায়, একটি কবিতা কবিতা নয় একারণে যে, তার লেখক একজন কবি, কিংবা তার প্রসঙ্গ ও বিষয়বস্তুটি কাব্যিক বরং কবিতাটি কবিতা এ কারণে যে, তা একটি বিশেষ ভাষাকাঠামোতে বা ভাষাবিন্যাসে লিখিত। আরো সোজা কথায় কবিতাটি তার শব্দগুলোর বিশেষ বুননের কারণে কবিতা।

শব্দের এই বিশেষ বুনন বা ভাষার এই বিশেষ কাঠামোটি কী যা একটি লেখাকে সাহিত্য করে তোলে সে বিষয়ে দুজন প্রতিনিধিত্বমূলক তাত্ত্বিকের কথা আলোচনা করা যেতে পারে। তাঁরা হলেন ভিক্তর শক্লোভস্কি (Viktor Shklovsky) ও রোমান ইয়াকবসন (Roman Jakobson)। দুঃখজনকভাবে তাঁদের কথাবার্তা তাঁরা যখন বলেছেন তখন সে কথাবার্তা রাশিয়ায় তেমন কোনো গুরুত্ব পায়নি, কারণ তখনকার বিপ্লব-পরবর্তী সরকার তাঁদের এই কথাবার্তা ও চিন্তার বিরোধী ছিল। ফলে তাঁদের কথাবার্তা গুরুত্ব অর্জন করেছে অনেক পরে, ১৯৬০ এর দশকে। এই দুই তাত্ত্বিকের প্রথম জনের অর্থাৎ ভিক্তর শক্লোভস্কির (১৮৯৩-১৯৮৪) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইডিয়া হলো ডিফ্যামিলিয়ারাইজেশন (defamiliarisation)। তাঁর ‘আর্ট অ্যাজ টেকনিক’ প্রবন্ধে তিনি বলেন : ‘আমরা যদি আমাদের অনুভবের সাধারণ নিয়মগুলো নিরীক্ষা করি আমরা দেখব যে, কোনো অনুভব অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেলে তা এতটা স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায় যে, তার মধ্যে আর অনুভব থাকে না’। শক্লোভস্কি বলতে চান যে, অতিপরিচিতির জন্য অনুভবের এই মরে যাওয়াকে সাহিত্য রোধ করে। আর এই মরে যাওয়াকে রোধ করতে সাহিত্য অতিপরিচিত অনুভব বা অভিজ্ঞতাকে অপরিচয়ের নতুনত্ব দান করে। শক্লোভস্কি সাহিত্যের এই আবশ্যিক কাজের নাম দিয়েছেন ডিফ্যামিলিয়ারাইজেশন (defamiliarisation)। তাঁর মতে সাহিত্যের ভাষা অপরিচিতকরণ প্রক্রিয়ায় আমাদেরকে এমন এক অপাপবিদ্ধ অবস্থায় (state of innocence) নিয়ে যায় যেন এর আগে সংশ্লিষ্ট অনুভব বা অভিজ্ঞতাটি আমাদেরকে স্পর্শই করে দেখেনি।

শক্লোভস্কি তাঁর আলোচিত ডিফ্যামিলিয়ারাইজেশন বা অপরিচিতকরণবিষয়ক ধারণাকে ব্যবহার করে ‘কাহিনি’ (story) এবং ‘প্লট’ এর মধ্যকার পার্থক্যকে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘স্টোরি’ হলো কতগুলো ঘটনার ধারাবাহিক বয়ান যা সত্যিকারে সাহিত্য নয়। কাহিনি সাহিত্য হয় প্লটের মধ্যদিয়ে আর এজন্য প্রয়োগ করতে হয় ডিফ্যামিলিয়ারাইজেশন বা অপরিচিতকরণবিষয়ক কারিগরি। এই কারিগরিতে কাহিনিটি ধীরে ধীরে পরিচয়ের আড়ালে চলে যায় এবং প্লট রূপে আবির্ভূত হয়। শক্লোভস্কির এ কথাটা কিছুটা ধোঁয়াশা হলেও কাহিনিকে প্লটে রূপান্তরের মাধ্যমে এর সাহিত্যায়ন এবং সে কর্মে ডিফ্যামিলিয়ারাইজেশনের ব্যবহার শক্লোভস্কির খুব পরিচিত একটি কথা। এর উদাহরণ দেওয়া হয়ে থাকে জোসেফ কনরাডের ‘হার্ট অব ডার্কনেস’ উপন্যাসের মাধ্যমে। এ উপন্যাসে উপনিবেশের চেনা গল্পটি ডিফ্যামিলিয়ারাইজ করা হয়েছে। ইউরোপজুড়ে উপনিবেশের চেনা গল্পটি বলে যে, উপনিবেশের কাজ হলো আফ্রিকা ও এশিয়ার বর্বর ও অন্ধকার জগতে ধর্মের ও সভ্যতার আলো ছড়ানো। ‘হার্ট অব ডার্কনেস’ উপন্যাসটি যখন ধীরে ধীরে দেখায় কীভাবে কঙ্গোতে বেলজিয়ানরা সে আলো ছড়াচ্ছে তখন পাঠক আবিষ্কার করে আলো ছড়ানোর আসল রূপটি। সে আসল রূপের মধ্যদিয়ে দেখা যায় যে, ইউরোপীয়রা সেখানে আলো ছড়াচ্ছে না বরং নিজেরাই নিজেদের সব আলো গিলে ফেলে বর্বরতার জঘন্য রূপে আবির্ভূত হচ্ছে। উপনিবেশের এই নতুন রূপ গল্পে পরিবেশিত হয়েছে ডিফ্যামিলিয়ারাইজেশনের মাধ্যমে এবং ডিফ্যামিলিয়ারাইজেশনের সুবাদেই গল্পটি সাহিত্য পদভুক্ত হতে পেরেছে। আঙ্গিকবাদ যদিও রাজনীতিকে সাহিত্য থেকে সরিয়ে ভাবে, তারপরও দেখা যাচ্ছে ‘হার্ট অব ডার্কনেস’-এর বিশ্লেষণে আঙ্গিকবাদেও সেই রাজনীতি এসেই গেল।

এবার শক্লোভস্কি থেকে চোখ ফেরানো যাক রোমান ইয়াকবসনের (১৮৯৬-১৯৮২) দিকে। তিনি ছিলেন আঙ্গিকবাদের মস্কো গোষ্ঠীর নেতা। রাশিয়ার বিপ্লব-পরবর্তী সরকারের নিপীড়নের যুগে তিনি চেকোশ্লোভাকিয়ার প্রাগে হিজরত করেন। সেখানে তিনি আঙ্গিকবাদের প্রাগ গোষ্ঠী তথা প্রাগ স্কুলের নেতা রূপে আবির্ভূত হন। পরে ইহুদি বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে নাৎসী অত্যাচারের সময় তিনি আমেরিকায় চলে যেতে বাধ্য হন। সেখানে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজ নেন। আঙ্গিকবাদী হিসেবে তাঁর ভাবনারও মূল কথা হলো সাহিত্য কেন সাহিত্য হচ্ছে তা খুঁজতে হবে তার ভাষার মধ্যে। তবে সাহিত্যের ভাষার কাজ ডিফ্যামিলিয়ারাইজেশন না বলে তিনি বলতে চাইলেন সাহিত্যে ভাষার কাজ হলো কাব্যিকীকরণ। এই কাব্যিকীকরণের বিষয়ে ইয়াকবসন ব্যবহার করেছেন ‘সমতার ধারণা’ বা notion of equivalence। ধারণাটি একটু পেঁচানো। আমরা একটু বেশি সোজা করে বলতে চাই। একটা উদাহরণের মাধ্যমে আগানো যাক। ধরা যাক দুটো বাক্য : ক) ফুল ফোটে, ও খ) বাল্ব জ্বলে। এখানে ফুলের ফোটার আর বাল্বের জ্বলার মাঝে একটি সমতার সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে কথাটি যদি বলা হয় বাল্বটি ফুল হয়ে উঠছে কিংবা ফুলটি বাল্ব হয়ে জ্বলছে তাহলে ভাষাটি কাব্যিক হয়ে ওঠে, তার গা থেকে নিত্যদিনের ব্যবহারের ধূলিময়লা ঝরে যায়। ইয়াকবসনের এই ধারণা আর শক্লোভস্কির ডিফ্যামিলিয়ারাইজেশন অনেকটা একই ধারণা। শুধু টার্ম আলাদা। স্বল্প পরিসর এ আলোচনায় আঙ্গিকবাদ সম্পর্কে আমরা এটুকুই বলতে চাচ্ছি যে, সাহিত্যতত্ত্বে আঙ্গিকবাদের একমাত্র বিষয় হলো সাহিত্যকর্মের ভাষার বিশ্লেষণ। সাহিত্য মানে সবটুকুই ভাষার কারিগরি। আমরা এর পরের আলোচনায় আসব বাখতিনকে নিয়ে যিনিও একজন আঙ্গিকবাদী, তবে তিনি অনেক নতুন কথা বলেছেন যা ফরমালিজম বা আঙ্গিকবাদের বাইরে স্বতন্ত্র সাহিত্যতত্ত্ব হিসেবেই অধীত হয়। আমরা এর নাম দিতে চাই বাখতিনিজম।

 

বাখতিনিজম

 মিখাইল বাখতিনের জন্ম হয়েছিল ১৮৯৫ সালের ৪ নভেম্বর রাশিয়ার ওরিয়ল এলাকায়। তবে তিনি বড় হন ভিলনিয়াস ও ওডেসা শহরে। এই দুই শহরই ছিল বহু ভাষার শহর। ভিলনিয়াস শহরে রাশিয়ান ভাষা ছিল সরকারি ভাষা। কিন্তু এখানকার মানুষেরা লিথুয়ানি ও পোলিশ ভাষায় অহরহ কথা বলত। একইভাবে বন্দরনগরী ওডেসাতে জার্মান, পোলিশ, রাশিয়ান ইত্যাদি বহু ভাষার ব্যবহার ছিল। এই বহু ভাষার মাঝে বাখতিনের বেড়ে ওঠা পরবর্তী জীবনে তাঁর মাঝে ‘বহুভাষিকতা’র তাত্ত্বিক চিন্তা জাগ্রত করেছিল বলে বাখতিন বিশেষজ্ঞ মাইকেল হলকুইস্ট দাবি করেছেন। বাখতিনের লেখাপড়া নিয়ে অনেক কথা চালু আছে। তবে এখন একথাই মানুষ জোরেশোরে বলছে যে, তিনি স্কুল পেরিয়ে আর খুব একটা পড়াশোনা চালাননি। যে সার্টিফিকেটগুলো বাখতিনের লেখাপড়াবিষয়ক প্রমাণ হিসেবে চালানো হয় সেগুলো মূলত তাঁর নয়, বরং তাঁর বড় ভাইয়ের। উচ্চতর লেখাপড়া না থাকলেও বলশেভিক বিপ্লবের পরে একটা বুদ্ধিজীবী শ্রেণির কেন্দ্রে তিনি জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন ভ্যালেন্তিন ভোলোশিনোভ (Valentin Voloshinov) ও পাভেল মেদভেদেভ (Pavel Medvedev) এর মতো বিখ্যাত পণ্ডিতেরা। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় বাখতিনের বিখ্যাত প্রবন্ধ Problems of Dostoivsky’s Poetics। এই বছরই বাখতিন গ্রেফতার হন এবং তাঁকে কাজাখস্তানের এক দূরবর্তী অঞ্চলে নির্বাসন দেওয়া হয়। এই নির্বাসনকলীন সময়টা বাখতিনের জীবনের খুব ফলপ্রসূ একটা সময়। এসময় তিনি বেশ কয়েকটি উপন্যাসের ওপর সমালোচনাতাত্ত্বিক কাজ করেন। এই লেখাগুলো নিয়ে পরবর্তীতে তৈরি হয় তাঁর বই The Dialogic Imagination। ১৯৩০ এর দশকের শেষে আর চল্লিশের দশকের শুরুতে তিনি সম্পন্ন করেন আরো দুটো কাজ—A Study on Bildungsroman এবং Rabelais and His World। প্রথম বইটি যে প্রকাশককে ছাপতে দেওয়া হয়েছিল তাদের ছাপাখানায় পাণ্ডুলিপিটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোম্বিংয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল আর তাঁর নিজের কাছে যে কপিটি ছিল তা তিনি সিগারেট পেপারের অভাবে সিগারেটের তামাক মোড়ানোর কাজে প্রায় পুরোটা ব্যবহার করে ফেলেন। Rabelais and His World মূলত তাঁর থিসিস যেটি তিনি ম্যাক্সিম গোর্কি ইনস্টিটিউটে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য সাবমিট করেছিলেন। এটিই বাখতিনের সমালোচনা তত্ত্বে একটি বড় কাজ হিসেবে পরে পরিগণিত হয়েছে। বাখতিনের এসব কাজের কিছুই ১৯৬০ এর দশকের আগে খুব একটা কারো চোখে পড়েনি। ৬০ এর দশকেই দুনিয়ার মানুষ সত্যিকারে বাখতিনকে প্রথম আবিষ্কার করে। ততদিনে এক জাতীয় হাড়ের ক্ষয় রোগে তিনি একটি পা হারিয়েছেন। এই পা-হারানো মানুষটি যিনি ছিলেন এক মফস্বল শহরের গরিব জার্মাান শিক্ষক তিনি হঠাৎ ১৯৬০ এর দশকে রাশিয়ায় বুদ্ধিজীবী ও তাত্ত্বিক মহলে এক গুরু হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি মস্কো এসে বাস করতে শুরু করেন। তাঁর পুরনো লেখাগুলো নতুন প্রাণ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে একাডেমিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে। ১৯৭৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পরে এই লেখাগুলোর বেশিরভাগ বই আকারে প্রকাশিত হতে শুরু করে। আশির দশকে সারা দুনিয়ায় বাখতিন এক কিংবদন্তিতে পরিণত হন।  

বাখতিন তাঁর সাহিত্যতত্ত্বে দুনিয়াকে কয়েকটি নতুন ও মৌলিক ধারণা দান করে গেছেন। আমরা এখানে তাঁর সাহিত্যতত্ত্ব আলোচনায় মূলত ঐ ধারণাকটির সাথেই শুধু পরিচিত হতে চেষ্টা করবো। প্রথমেই বলব তাঁর প্রদত্ত Polyphony (বহুস্বর) নামক ধারণাটির কথা। পলিফোনি মূলত সঙ্গীততত্ত্বের একটি শব্দ। বিভিন্ন স্বরের ঐকতানিক সুরকে সঙ্গীতে পলিফোনি বলা হয়। বাখতিন তাঁর Problems of Dostoivsky’s Poetics প্রবন্ধে এই শব্দটিকে ধার করলেন সঙ্গীতের জগৎ থেকে এবং বললেন যে, দস্তয়েভস্কির উপন্যাসের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর পলিফোনি বা বহুস্বর (We consider Dostoevsky one of the greatest innovators in the realm of artistic form. He created, in our opinion, a completely new type of artistic thinking, which we have provisionally called polyphonic)। পলিফোনি বলতে বাখতিন কী বুঝিয়েছেন তা তিনি ঐ প্রবন্ধেই কিছুক্ষণ পরে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যামতে পলিফোনি হলো পারস্পরিকভাবে অন্তর্লীন নয় এমন স্বাধীন স্বর ও চেতনার বহুত্ব (A plurality of independent and unmerged voices and consciousnesses)। পলিফোনি তখন অর্জিত হবে যখন চরিত্রসমূহ লেখকের চেতনার ভিতর দিয়ে প্রকাশিত না হয়ে বরং তারা নিজ নিজ চেতনার সমগ্রতাকে ধারণ করে আখ্যানের অপরাপর চরিত্রের সাথে মিশে যেতে পারবে। যে লেখায় লেখকের একক চেতনা বিভিন্ন চরিত্রে প্রতিফলিত হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে অর্থাৎ যে লেখায় লেখকের সিঙ্গেল অথরিয়াল কনশাসনেস রয়েছে সেটিতে পলিফোনি অর্জিত হয়নি। পলিফোনি অর্জিত হয়েছে এমন সাহিত্যে চরিত্ররা লেখকের ডিসকোর্সের বিষয়বস্তু (object of discourse) হলেও, একই সাথে ডিসকোর্সটিতে ঐ চরিত্ররাই বিষয়ী (subject of discourse)। 

বাখতিনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী কোনো একটি সাহিত্যকর্মে অনেক চরিত্র এবং তাদের অনেক স্বর থাকাই সাহিত্যকর্মটিকে পলিফোনিক করে তোলে না। চরিত্র অনেক থাকলেও এবং তাদের অনেক রকম স্বর থাকলেও তা কোনো না কোনো ভাবে লেখকের একক স্বরের ও একক চেতনার বিভিন্ন মাউথপিসরূপ অর্থাৎ মুখপাত্ররূপ প্রকাশ হতে পারে। সেরকম ক্ষেত্রে বহু চরিত্র ও বহুস্বরের মধ্যেও যার প্রকাশ ঘটবে তা মূলত একক স্বর ও একক চেতনা। বহুর মধ্যদিয়ে লেখকের একক স্বর ও একক চেতনার এমন প্রকাশকে বাখতিন বলেছেন মনোলজিজম (monologism)। সত্যিকারের পলিফোনি অর্জিত হলে সাহিত্যকর্মটিতে মনোলজিজমের স্থান থাকবে না। দস্তয়ভস্কির আলোচনায় বাখতিন দেখিয়েছেন দস্তয়ভস্কি কঠিনভাবে এই মনোলজিজম থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পেরেছেন। বাখতিন স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ‘দস্তয়ভস্কির চরিত্রগুলো লেখকের ডিসকোর্সের বিষয় (object) হওয়া সত্বেও তারা একই সাথে তাদের নিজেদের ডিসকোর্সের বিষয়ীও (subject)’। এই চরিত্ররা লেখক থেকে স্বাধীন। দুনিয়া সম্পর্কে তাদের স্বাধীন বোধ ও স্বাধীন ব্যাখ্যা রয়েছে এবং দুনিয়ার সাথে তাদের একান্ত নিজস্ব সম্পর্ক রয়েছে। এমন বহুস্বরের সহাবস্থান যখন লেখায় সন্নিবিষ্ট হতে পারে তখন সত্যিকার পলিফোনি অর্জিত হয় এবং সত্যিকার পলিফোনি অর্জিত হওয়ার গুণকে বাখতিন নাম দিয়েছেন ডায়ালজিজম (dialogism)। সুতরাং বাখতিনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী যাহাই পলিফোনিক তাহাই ডায়ালজিক। ডায়ালজিক হওয়া মানে এই নয় যে, সাহিত্যকর্মটিতে বহু চরিত্রের মাঝে ডায়লগ থাকবে। বহু চরিত্রের মাঝে ডায়লগ অধিকাংশ মনোলজিক সাহিত্যকর্মেই থাকে। বরং ডায়লজিক হওয়া মানে হলো সাহিত্যকর্মটিতে লেখকের চেতনা ও স্বর থেকে স্বাধীন বহুস্বরের সহাবস্থান থাকা ও তাদের ডায়লগের মধ্যদিয়ে প্লটের অগ্রসর হওয়া।

বাখতিন তাঁর ডায়ালজিজমবিষয়ক কথাবার্তা দস্তয়ভস্কির বড়ত্ব বোঝানোর অভিপ্রায়ে শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে তিনি এ নিয়ে তাঁর ‘ডিসকোর্স ইন দ্য নভেল’ প্রবন্ধে আরো কিছু কথাবার্তা বলেছেন যা অনেকটা দস্তয়ভস্কি সম্পর্কে বলা ডায়ালজিজমসংক্রান্ত ধারণা থেকে আলাদা, এবং শুধু আলাদাই নয়, কিছুটা পরস্পরবিরোধীও। শেষোক্ত প্রবন্ধে বাখতিন বলেছেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সব কথাবার্তা, মেলামেশা আর আচারআচরণই ডায়ালজিক। যুক্তি হিসেবে তিনি বলছেন যে, মানুষের কোনা কথাবার্তাই একক ও স্বাধীন নয়। মানুষের সকল কথাবার্তা আর সকল আচারআচরণ অর্থ দেয় ইতোপূর্বে সেসকল কথাবার্তা হাজার হাজার বার ব্যবহার হয়ে যে অর্থভিত তৈরি করেছে সেই ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। একইভাবে মানুষের আচারআচরণও সমাজে অর্থ সৃষ্টি করে ঐ আচারআচরণের হাজার হাজার পূর্বতন দৃষ্টান্তের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অর্থকাঠামোর অনুশাসন মেনে চলে। ফলে যে কোনো কথাই উচ্চারিত হবার সাথে সাথে তা পূর্বতন হাজার হাজার উক্তরূপ কথার সাথে অদৃশ্য ডায়লগ তৈরি করে এবং সেই ডায়লগের ভিত্তিতে ও সেই ডায়লগের পরোক্ষ অনুশাসনে বর্তমান উদ্দিষ্ট অর্থটি নিষ্পাদন করে। ফলে দুনিয়ার সকল ডিসকোর্সই ডায়লজিক। ডায়ালজিজম সম্পর্কে বাখতিনের এই ব্যাখ্যা উপন্যাসের পলিফোনি অর্জনের বিষয়ের সংশ্লেষে আমলে নেয়ার নয়। পলিফোনি অর্জিত হওয়া আর না-হওয়ার ভিত্তিতে যে মনোলজিজম ও ডায়ালজিজম তা অবশ্যই উপরে বর্ণিত ‘প্রবলেমস অব দস্তয়ভস্কি’স পোয়েটিকস’ প্রবন্ধে বিবৃত ধারণা অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। ‘ডিসকোর্স ইন দ্য নভেল’ প্রবন্ধে ডায়লজিজম সম্পর্কে যে উদারপন্থি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে তাকে পালিফোনির সাথে মিলিয়ে কোনোভাবেই দেখা যাবে না। ‘ডিসকোর্স ইন দ্য নভেল’ প্রবন্ধে বিধৃত ডায়ালজিজমের উদারপন্থি ব্যাখ্যাকে বরং ভাষার অন্তস্থ দুর্বলতার এক দার্শনিক প্রকাশরূপে দেখতে হবে।

বাখতিনিজমের অংশ হিসেবে আরো তিনটি বিশেষ ধারণা স্পষ্ট হওয়া দরকার : ক) হিটারোগ্লোসিয়া (heteroglossia), খ) কার্নিভালেস্ক (carnivalesque) ও গ) ক্রোনোটোপ (chronotope)। বাখতিন তাঁর হিটারোগ্লোসিয়া নামক ধারণাটি স্পষ্ট করেছেন তাঁর দুটি প্রবন্ধে। প্রবন্ধ দুটো হলো ‘Discourse in the Novel’ ও ‘From the Prehistory of Novelistic Discourse’। হিটারোগ্লোসিয়া হচ্ছে পলিফোনিরই এক ব্যাপক রূপ। পলিফোনির ক্ষেত্র হলো একটি নির্দিষ্ট সাহিত্যকর্ম। আর হিটারোগ্লোসিয়া হলো একটি ভাষার সার্বিক ব্যবহার জুড়ে বিস্তৃত পলিফোনি বা স্বরের বহুত্ব। এর সাথে সম্পর্কিত আরো একটি শব্দ হলো পলিগ্লোসিয়া (polyglossia)। শব্দটি পলিগ্লট থেকে এসেছে। পলিগ্লট হলো এমন ব্যক্তি যে বিভিন্ন ভাষা লিখতে, বলতে ও পড়তে জানে। তার মানে পলিগ্লোসিয়া হলো বহুভাষাভাষিকতা। বাখতিনের মতানুসারে পলিগ্লোসিয়া কোনো জাতিগত বা জাতীয় ভাষার স্বাধীন সত্তার বিষয়টিকে নাকচ করে এবং আরো বলে যে, কোনো জাতিগত একক ভাষায় কোনো সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব নয়। পৃথিবীর সকল ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন একক কোনো ভাষা হয় না এবং তেমনি পৃথিবীর সকল ভাষার সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন একক কোনো সাহিত্যও হয় না। সাহিত্য মানেই ভাষার বহুত্ব। সে বহুত্ব অর্জিত হবে এক ভাষার সাথে আরেক ভাষার ডায়লজিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে। মনে রাখতে হবে পলিগ্লোসিয়ার সাথে সম্পর্কিত ডায়লজিজমের এই ধারণা উপন্যাসে স্বরের বহুত্ব অর্জন বিষয়ক ডায়লজিজমের ধারণা থেকে ভিন্ন। একটি পলিগ্লোসিয়া বিষয়ক ডায়লজিজম, অপরটি পলিফোনি বিষয়ক ডায়লজিজম। ভাষার মধ্যকার ডায়লজিক এই সম্পর্কের কারণেই কোনো ব্যক্তি যে কোনো ভাষাতে কথা বলার ক্ষেত্রেই ঐ ভাষার মাঝে অঙ্গিভূত অন্যান্য ভাষার চেতনা ও স্বরকে বর্জন করে কথা বলতে পারেন না। বাখতিনের এই পলিফোনি ও ডায়লজিজম সংক্রান্ত ধারণার মূল আক্রমণটি ছিল তৎকালে সার্বজনীনভাবে প্রচলিত সাহিত্য ও ভাষার অনন্যতা ও সমসাত্ত্বিকতা বিষয়ক ধারণার ওপর। তিনি কঠিনভাবে প্রতিষ্ঠা করলেন এই ধারণা যে, সুসাহিত্যে লেখকের স্বরের ও চেতনার কোনো অনন্যতার স্থান নেই এবং একইভাবে ভাষায় জাতীয়তার স্বরের ও চেতনার কোনো অনন্যতার স্থান নেই।

হিটারোগ্লোসিয়া দেখায় কীভাবে একটি ভাষা তার অভ্যন্তর থেকে ডায়লজিক হয়ে ওঠে (heteroglossia signifies how a language is dialogized internally)। বাখতিন তাঁর ‘ডিসকোর্স ইন দি নভেল’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কীভাবে একই ভাষা বহুস্বরা ও বহুরূপী হয় তার ব্যাবহারিক ক্ষেত্রভেদে। বন্ধুবান্ধবের সাথে কথা বলায় ভাষার স্বর এক রকম। দপ্তর সংস্থায় কথা বলার ভাষার স্বর অন্যরকম। আবার শিল্পকলা বা বিজ্ঞানের ভাষার স্বর আরেক রকম। এমন বহু স্বর একই ভাষায় সমান্তরালে বিদ্যমান। এটিই ভাষার অন্তর্গত হিটারোগ্লোসিয়ার কাজ। পলিগ্লোসিয়া ভাষাকে অপরাপর ভাষার সাথে ডায়লজিক সম্পর্কে অন্বিত করে তোলে আর হিটরোগ্লোসিয়া একই ভাষার মাঝে বহুস্বরের ডায়লজিজম সম্ভব করে তোলে। অন্যভাবে বলা যায়, পলিগ্লোসিয়া ভাষার বহিরাঙ্গিক (from without) ডায়লজিজম নিশ্চিত করে আর হিটারোগ্লোসিয়া ভাষার অন্তরাঙ্গিক (from within) ডায়লজিজম সম্ভব করে তোলে।

বাখতিনিজম বলতে যে-সকল ধারণাকে বোঝায় তাদের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কার্নিভালেস্ক (carnivalesque)। কার্নিভাল হলো জাঁকালো কোনো উৎসব। বাখতিন বলেছেন বছরের বিভিন্ন পর্বে উৎসবের এমন জমক মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় জীবনযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। এ জাতীয় উৎসবে শরীরের এমন সব অঙ্গভঙ্গি চর্চিত ও কাঙ্ক্ষিত ছিল যা নিত্যদিনের সমাজমূল্যবোধের সাথে যায় না। ফলে এসব উৎসবে খুব জমকের সাথে ও স্বাধীনতার সাথে ভেঙে ফেলা হতো সমাজের সেই সকল নিয়মকানুন ও আদবকায়দা যা ভাঙা দৈনন্দিন জীবনবাস্তবতায় কল্পনারও অতীত। রাজাবাদশাহ, সাধুসন্তদের নিয়ে পর্যন্ত এমন উৎসবে হাসিতামাশার সঙ সাজানো হতো। বাখতিন বলতে চান যে, এই উৎসবগুলো ছিল আদতে সামাজিক আদবকানুনের নিষ্পেষণমুখী নিগড় বা শৃঙ্খল ভাঙার এক পরোক্ষ প্রয়াস। পরোক্ষে এসকল উৎসব ছিল প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুনের প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ এবং প্রাতিষ্ঠানিক অধিকারের প্রতি বিদ্রূপস্বরূপ। বাখতিন তাঁর Rabelais and His World গ্রন্থে লিখেছেন Carnival celebrated temporary liberation from the prevailing truth and from the established order; it marked the suspension of all hierarchical rank, privileges, norms and prohibitions. এর মধ্যদিয়ে ক্ষণকালের জন্য হলেও প্রাতিষ্ঠানিক তথা সমাজ-অনুশাসনের সত্য ও বিধিনিষেধের বিপরীতে দাঁড় করানো হতো সামাজিক বাস্তবতার ও সমাজের আকাক্সক্ষার সম্ভব অন্য বিবিধ রূপ। বাখতিন দেখিয়েছেন যে, রেনেসাঁসের আগমনের পর ধীরে ধীরে সমাজ থেকে এই কার্নিভাল চর্চা প্রশাসনিক কর্তৃত্বে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাখতিনের মতে সামাজিকভাবে কার্নিভাল চর্চার পথ এভাবে রুদ্ধ করে দেয়ার পর কার্নিভালের এই স্পিরিট তার আত্মপ্রকাশের পথ করে নেয় সাহিত্যের মধ্যদিয়ে। প্যারোডি, স্যাটায়ার ইত্যাদির মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে এবং উপন্যাস ও কবিতার অন্যান্য ফর্মে পরোক্ষভাবে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিধিনেষেধকে সাহিত্য রেনেসাঁসের পর থেকে সেভাবে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছে যেমনটা মধ্যযুগে চ্যালেঞ্জ করেছিল রাস্তায় ও পাবলিক চত্বরে চর্চিত জনতার কার্নিভাল। সাহিত্যকে এভাবে জনতার কার্নিভাল হিসেবে দেখাতে বাখতিন বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন ষোড়শ শতকীয় ফরাসি লেখক ফ্রাসোয়া র‌্যাবলের (Fracois Rabelais) নাম। ফ্রাসোয়া র‌্যাবলের ‘দি লাইফ অব গারগান্তুয়া ও পান্তাগ্রুয়েল’ এই কার্নিভালের উদাহরণ হলেও বাখতিন এই গ্রন্থের আলোচনায়ই বলতে চেয়েছেন যে, উপন্যাস হলো সাহিত্যের এমনই একটি ধারা যেখানে মহাকাব্যের ধারায় সমাজের কাঠামোবদ্ধ সত্য ও অনুশাসনিক রূপের প্রকাশও সম্ভব, আবার স্যাটায়ার বা প্যারোডির ধারায় এই সত্য ও অনুশাসনকে চ্যালেঞ্জ করার কার্নিভালেস্ক প্রকাশও সম্ভব। এই দ্বৈত প্রকাশের সম্ভাব্যতাও উপন্যাসের ডায়লজিক যোগ্যতাকে বাড়িয়ে তোলে।

বাখতিনিজম সম্পর্কে আমাদের শেষ আলোচনার বিষয় হলো ক্রোনোটোপ (chronotope)। ক্রোনোটোপ শব্দটির ‘ক্রোনো’ (chrono) অর্থ হলো সময়, এবং ‘টোপ’ (tope) অর্থ হলো স্থান। দুয়ের মিলিত অর্থে বাখতিনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ক্রোনোটোপ মানে হলো সাহিত্যের কোনো ফর্মে সময় ও স্থানের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক সাহিত্যের এক এক ফর্মে এক এক রকম। রোমান্সে এই সম্পর্ক বা ক্রোনোটোপ বেশ মজার ধরণের। রোমান্সের ক্রোনোটোপে সময়ও শূন্য এবং স্থানও শূন্য। সময় শূন্য কারণ আমরা দেখি রোমান্সে হিরো, ভিলেইন বা অন্যান্য চরিত্ররা যার যে ধরনের ভূমিকা সেই ধরনের ভূমিকাই রোমান্সের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পালন করে যায়। সময়ের পরিবর্তন অনুযায়ী চরিত্রদের নিজ নিজ চিন্তা ও কর্ম বদলায় না। অর্থাৎ পুরো রোমান্সের আগাগোড়া জুড়ে সময়টা স্থির থাকে। সময়ের এই অনড় অবস্থা মাতিয়ো বোয়ার্দোর ‘অরলান্ডো ইনামোরাতো’, কিংবা স্পেন্সারের ‘ফেয়ারি কুইন’, কিংবা ম্যালোরির ‘লে মোর্তে দ’আর্থার’ ইত্যাকার যে কোনো রোমান্সে দেখা যেতে পারে। এটাকেই বলা যায় রোমান্সের সময়-শূন্যতা বা সময়হীনতা। একইভাবে রোমান্সে স্থানও ঘটনায় বা কাহিনিতে কোনো পরিবর্তন আনে না। অরলান্ডোর রোমান্সের ফরেস্ট অব আর্ডেন ইংল্যান্ডের ওয়ারউইকশায়ারে হলেও যা ঘটবে, ইতালিতে হলেও তাই ঘটবে। ফলে অরলান্ডোর কাহিনির মতো রোমান্সের জন্য সব স্থান এক হয়ে যাওয়া মানে হলো রোমান্সের কাহিনির সংঘটন স্থান শূন্য হয়ে যাওয়া। রোমান্সের জন্য ক্রোনোটোপ এমন হলেও উপন্যাসের জন্য এমন নয়। বিভিন্ন উপন্যাসে ক্রোনোটোপের ধরন এক এক রকম। বলা যায় ক্রোনোটোপের ধরনের ওপর উপন্যাসের ধরন নির্ভর করে।

বিশেষ করে উপন্যাসের সাহিত্যতত্ত্ব বিষয়ে, আমরা দেখলাম, বাখতিন অনেক ধারণার প্রবর্তক। তন্মধ্যে মনোলজিজম, ডায়লজিজম, পলিফোনি, পলিগ্লোসিয়া, হিটারোগ্লোসিয়া, কার্নিভালেস্ক, ক্রোনোটোপ ইত্যাদি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধারণা আমরা এখানে অতি সংক্ষেপে আলোচনা করলাম। এযাবৎ আমরা সাহিত্যতত্ত্বের যে ধারণাগুলো আলোচনা করেছি সেগুলোর মাঝে মোটামুটিভাবে সময়ানুক্রমিক পরম্পরা রয়েছে। এরপর থেকে বিংশ শতকে যে ধারণাগুলো উদ্ভূত হয়েছে সেগুলোর বেশিরভাগই যুগপৎ উদ্ভূত এবং সমান্তরাল সময়ে চলমান ধারণা। তাই আমাদের পরবর্তী আলোচনায় তত্ত্বসমূহের মধ্যে পারস্পরিক পরম্পরা আর রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। চলবে

/জেডএস/
লাইভ স্ট্রিমিংয়ে দ. কোরিয়ার ইউটিউবারকে হয়রানি, গ্রেফতার ২ (ভিডিও)
লাইভ স্ট্রিমিংয়ে দ. কোরিয়ার ইউটিউবারকে হয়রানি, গ্রেফতার ২ (ভিডিও)
‘উন্নত জীবনের লক্ষ্যে’ উত্তরণ প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠান
‘উন্নত জীবনের লক্ষ্যে’ উত্তরণ প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠান
আইজিপির সঙ্গে দেখা করতে গেলেন বিএনপি নেতারা
আইজিপির সঙ্গে দেখা করতে গেলেন বিএনপি নেতারা
এইডসের কথা গোপন রাখেন অনেকে, নেন না চিকিৎসা
এইডসের কথা গোপন রাখেন অনেকে, নেন না চিকিৎসা
সর্বাধিক পঠিত
আর্জেন্টিনার সঙ্গে হেরেও ম্যাচ শেষে হাসলো পোল্যান্ড
আর্জেন্টিনার সঙ্গে হেরেও ম্যাচ শেষে হাসলো পোল্যান্ড
তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের নেতা
তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের নেতা
রিট করার পরামর্শ দিয়েছেন হাইকোর্ট
ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণরিট করার পরামর্শ দিয়েছেন হাইকোর্ট
জাপা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না জিএম কাদের
জাপা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না জিএম কাদের
ফ্রান্সকে  হারিয়ে দিলো তিউনেশিয়া
ফ্রান্সকে হারিয়ে দিলো তিউনেশিয়া