X
বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২
২ ভাদ্র ১৪২৯

যা মন চায়, যেভাবে চায়—সেভাবেই লিখি : হারুকি মুরাকামি

অনুবাদ : আলভী আহমেদ
০৭ জানুয়ারি ২০২২, ০২:৩৯আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২২, ১০:৪৪

[২০০৮ সালে দ্য নিউইয়র্কার ফেস্টিভ্যালে হারুকি মুরাকামি আসবেন—এই ঘোষণা দেওয়ার সাথে সাথেই প্রায় সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। জাপান, কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়া থেকে তার অসংখ্য ভক্ত উড়ে আসে তাকে সামনাসামনি একনজর দেখার জন্য। সাধারণত মুরাকামি কোনো পাবলিক ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেন না। এ ব্যাপারে তার বিতৃষ্ণা কখনো লুকোনোরও চেষ্টা করেননি। তাই তিনি যখন ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ করতে রাজি হয়েছিলেন, তখন তার ভক্তরা এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি। 

২০০৮-এর ঠিক ১০ বছর পর ২০১৮-তে মুরাকামি আবার নিউইয়র্কার ফেস্টিভ্যালে যোগ দিয়েছিলেন। দুবারই ওই পত্রিকায় কর্মরত ব্রিটিশ ফিকশন এডিটর ডেবোরাহ ট্রিজম্যানের অসংখ্য প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। নিজে থেকেই বলেছেন অনেক কথা, দিয়েছেন স্পর্শকাতর অনেক প্রশ্নের উত্তর, স্বভাবসুলভ সহজ ভঙ্গিতে।]

 

 

ট্রিজমান : আপনি বলেছিলেন, প্রথম বই লেখা আপনার জন্য খুব সহজ ছিল। এরপর এই জিনিসটা আস্তে আস্তে কঠিন হতে শুরু করে। কেন হলো এটা?

মুরাকামি : আমার প্রথম দুটি বই হলো ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’ এবং ‘পিনবল, ১৯৭৩’। এ দুটো বই লেখা আসলেই আমার জন্য খুব সহজ ছিল। কিন্তু কখনো এগুলো নিয়ে তৃপ্ত হতে পারিনি। আমি এখনো তৃপ্ত না। ওই দুটো বই লেখার পর আমার অ্যাম্বিশন বেড়ে গেল। লিখে ফেললাম, ‘আ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’। ওটাই ছিল আমার প্রথম ফুল লেন্থ নভেল। এর আগেরগুলোকে আপনি বড়জোর নভেলা বলতে পারেন। যত দূর মনে পড়ে, তৃতীয় উপন্যাসটা লিখতে আমার তিন অথবা চার বছর লেগেছিল। ভীষণ পরিশ্রম করতে হয়েছিল তখন। আমার ক্যারিয়ারের স্টার্টিং পয়েন্টের কথা যদি জিজ্ঞেস করেন আমি বলব, ‘আ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’।

এর আগে প্রথম দুটো বই লেখার সময় আমি ছিলাম জ্যাজ ক্লাবের মালিক। সারা দিন গাধার খাটনি খেটে অনেক রাতে বাড়ি ফিরে কিচেন টেবিলে কাগজ-কলম নিয়ে বসেছি। সত্যিই খুব কষ্ট হতো তখন। তারপর একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম, ক্লাবটা বেচে দেবো। কিন্তু সেটাও সহজ ছিল না। ব্যবসাটা খুব ভালো চলছিল। শুভাকাঙ্ক্ষীরা বিক্রি না করার পরামর্শ দিলো। কিন্তু আমি একটা বড় উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম। ক্লাবটা বেচে দিয়ে লিখলাম, ‘আ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’।

 

ট্রিজমান : বড় বই লেখাটা কি আপনার জন্য সহজ ছিল? এটাকে কি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন? 

মুরাকামি : যখন লিখেছিলাম তখন আসলে খুবই উপভোগ করেছিলাম। কারণ, কোনো লাইন লেখার সময় আমি জানতাম না পরের লাইনে কী হতে যাচ্ছে। পুরো ব্যাপারটা অসম্ভব এক্সাইটিং। ধরুন, একটা বই আপনি পড়তে শুরু করেছেন। পড়তে পড়তে পরবর্তী পৃষ্ঠায় কী আছে দেখার জন্য পৃষ্ঠা উল্টালেন। কিন্তু দেখলেন, পৃষ্ঠাটা ফাঁকা। রাতে ঘুমোনোর আগে আমি নিজেই জানতাম না, পরদিন ভোরে আমি কী লিখতে যাচ্ছি। সেই পৃষ্ঠায় কী আছে, তা দেখার জন্য আমাকে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। কারণ, ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমি নিজেই ওটা লিখব। 

 

ট্রিজমান : এমন কি কখনো হয়েছে, আপনি লিখতে শুরু করেছেন... কিন্তু খুঁজে পাচ্ছেন না কী লিখবেন, পরবর্তী ঘটনা কী হতে পারে, আপনি বসেই আছেন... কিন্তু কিছু লিখতে পারছেন না?

মুরাকামি : রাইটার্স ব্লক ব্যাপারটা আমি কখনো ফেস করিনি। আমি যখন আমার ডেস্কে বসি, খুব স্বাভাবিকভাবেই জেনে যাই কী ঘটতে যাচ্ছে। যদি কখনো না জানি, বা আমার যদি লিখতে ইচ্ছা না করে, আমি লিখি না। সিম্পল। পত্রপত্রিকা থেকে প্রায়ই অনুরোধ আসে যেন আমি তাদের জন্য কিছু একটা লিখি। সব সময়ই এর উত্তরে বলি, না। আমি লিখি তখনই, যখন আমার লিখতে ইচ্ছা করে। এবং যা মন চায়, যেভাবে চায়—সেভাবেই লিখি।

 

ট্রিজমান : আপনি কি ঘুমের মধ্যে গল্পের প্লট নিয়ে কাজ করেন?

মুরাকামি : না। সেরকম কিছু মনে হয় না করেছি। আমি স্বপ্ন দেখি না। গল্প আমার কাছে কেবল গল্প। আর স্বপ্ন ব্যাপারটা আলাদা। আর আলাদা করে স্বপ্ন দেখার তো কিছু নেই। লেখালিখি করাটাই একটা স্বপ্নের মতো ব্যাপার। আমি যখন লিখি, তখন তো ক্রমাগত স্বপ্ন দেখি। এবং সেটা ইচ্ছে করেই দেখি। সে স্বপ্ন আমার ইচ্ছেমতো শুরু হয়, আমার ইচ্ছেতে শেষ হয় এবং পরদিন ওই স্বপ্নটা ধারাবাহিকভাবে টানতে পারি। ধরেন, আপনি ঘুমিয়ে আছেন। ঘুমের মধ্যে দারুণ একটা স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নে আপনার সামনে একটা বড় হ্যামবার্গার স্টেক, বিয়ার আর সুন্দরী এক মেয়ে আছে। তারপর আপনার ঘুম ভেঙে গেল। ওগুলো নেই হয়ে গেল। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে স্বপ্নগুলো হারিয়ে যায় না। যেখানে রেখে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে পরদিন আবার নতুন করে শুরু হয়।

 

ট্রিজমান : বেশ কয়েক বছর আগে আমি দেখেছিলাম, বিভিন্ন শব্দ এবং ফ্রেজের একটা লিস্ট বানিয়ে আপনি সেটা নিজের কাছে রেখেছিলেন। যেমন, একটা কথা বলা বানর, সিঁড়িতে হারিয়ে যাওয়া লোক... ইত্যাদি। আপনি আমাকে বলেছিলেন, ‘প্রতিটা গল্পে ওই লিস্ট থেকে অন্তত দুটো জিনিস থাকতে হবে।’ আপনি কি প্রায়ই এভাবে কাজ করেন?

মুরাকামি : যে সময়ের কথা বলছেন, সে সময়ে আমি একসাথে ছয়টা গল্প নিয়ে কাজ করছিলাম। তাই এ ধরনের কিছু কিওয়ার্ড সাথে রেখেছিলাম সাহায্যের জন্য। উপন্যাসে আমার এ ধরনের সাহায্যের কোনো দরকার হয় না। তখন একটামাত্র ব্যাপারই আমার মধ্যে কাজ করে। তা হলো এবার নতুন কিছু একটা করব। আমার প্রায় সব উপন্যাসই আমি উত্তমপুরুষে লিখেছি। এরপর লিখতে বসলাম—‘ওয়ান কিউ এইট ফোর’। সেখানে আমি লিখলাম থার্ড পারসন ন্যারেটিভে। পুরো ব্যাপারটাই ছিল আমার জন্য একধরনের চ্যালেঞ্জ।

প্রায় সময়ই দেখা যায়, আমার উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মানে যার বয়ানে গল্পটা বলছি সে হলো এমন এক লোক যে ঠিক আমি নই, কিন্তু আমি ওই লোক হলেও হতে পারতাম। আরও পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে ওই মানুষটা আমারই একজন অলটারনেটিভ। আমার ব্যক্তিজীবনে, আমি হলাম কেবল ‘আমি’ এবং এই আমি চাইলেও অন্য কেউ হতে পারব না। কিন্তু ফিকশনে সে সুযোগ আমার আছে। চাইলেই আমি অন্য একজনের জুতোয় পা গলিয়ে আরেকজন মানুষ হয়ে যেতে পারি। ব্যাপারটা অনেকটা থেরাপির মতো। আপনি যদি লিখতে পারেন, কোনো নির্দিষ্ট মানুষের মধ্যে আটকে থাকতে হবে সে রকম কোনো বাধ্যবাধকতা আপনার নেই। যে কেউ হয়ে যেতে পারবেন—সে ক্ষমতা আপনার আছে।

 

ট্রিজমান : আমরা জানি, আপনি ম্যারাথন দৌড়ে থাকেন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটা সময়ে দৌড়াতে আপনার ভালো লাগে। আপনি যে বয়সে লিখতে শুরু করেছেন প্রায় একই সময়েই দৌড়াতে শুরু করেছেন। এর আগে দৌড়াতেন না। এই দুটোর মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক আছে? আমি কিছু মানুষের কথা জানি, যাঁরা হাঁটতে হাঁটতে মনের মধ্যে লিখতে থাকেন। আপনি কি দৌড়ের মধ্যে লেখেন?

মুরাকামি : মোটেই না। আমি যখন দৌড়াই, তখন কেবল দৌড়াই। আর কিছু করি না। মনটাকে একেবারে ফাঁকা করে দৌড়াতে থাকি। তবে একটা ব্যাপার আপনাকে বলি। লেখালিখি ব্যাপারটা আসলে খুব একটা সহজ নয়। দীর্ঘদিন ধরে লেখালিখি চালাতে হলে আপনাকে যথেষ্ট শক্তিশালী হতে হবে। একটা বই লিখে ফেলা খুব কঠিন নয়। কিন্তু বছরের পর বছর লেখা চালিয়ে যাওয়া মোটামুটি অসম্ভব একটা ব্যাপার। আপনার তীব্র মনোসংযোগক্ষমতা থাকতে হবে।

আমি মাঝেমধ্যে খুব আনহেলদি ব্যাপারস্যাপার নিয়ে লিখি। কখনো উইয়ার্ড এবং টুয়েস্টেড বিষয় আমার লেখায় এসে হাজির হয়। আমার মনে হয়, আপনাকে যদি অসুস্থ ব্যাপার নিয়ে লিখতে হয় তো আপনাকে অতিমাত্রায় সুস্থ হতে হবে। সোজা কথায় স্বাস্থ্যবান হতে হবে। এটা একটা প্যারাডক্সের মতো। কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি। কিছু লেখক অস্বাস্থ্যকর জীবন কাটিয়েও লিখতে পেরেছেন। যেমন বোদলেয়ার। কিন্তু আমার মনে হয়, সেদিন আর নেই। বর্তমানের পৃথিবীটা খুবই জটিল। এবং এখানে প্রচুর গন্ডগোল। টিকে থাকতে হলে তাই আপনাকে শক্তিশালী হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

৩০ বছর বয়সে আমি লেখক হই। এবং আমি দৌড়াতে শুরু করি যখন আমার বয়স ৩২। আমি প্রতিদিন দৌড়াতাম, দেখতে চাইতাম দৌড়ালে কী ঘটে। জীবনটা আসলে একটা পরীক্ষাগারের মতো যেখানে অনেক কিছুই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায়। বলা যায়, আমার পরীক্ষাগুলো সফল। এখন আমি বেশ শক্তপোক্ত একজন মানুষ।

 

ট্রিজমান : লেখালিখি এবং দৌড়ানো দুটোই বেশ নিঃসঙ্গ কাজ। আপনি আগে একটা জ্যাজ ক্লাব চালাতেন। মানুষজনের সাথে সেখানে আড্ডা হতো, সোশ্যাল লাইফ লিড করতেন। আর এখন লেখার সময় আপনাকে স্টাডিরুমে একা বসে থাকতে হয়। কোনটাতে আপনি কমফোর্টেবল?

মুরাকামি : আমি কখনোই সামাজিক মানুষ নই। হতেও চাইনি। কোনো একটা নির্জন জায়গায় আমি নিজের মতো করে থাকতে চাই। আমার সাথে থাকতে পারে অনেকগুলো রেকর্ড এবং সম্ভব হলে কিছু বিড়াল। হ্যাঁ, টেলিভিশনও থাকতে হবে। কারণ, আমি বেসবল খেলা দেখি। এতেই আমার চলে যাবে। আর কিছু চাই না।

 

ট্রিজমান : আপনি একবার বলেছিলেন আপনার জীবনের স্বপ্ন হচ্ছে একটা কুয়ার নিচে একা একা বসে থাকা। আপনার গল্প-উপন্যাসে অনেক চরিত্র আছে, যারা ঠিক এই কাজটাই করে। ‘কিলিং কমেন্ডেটর’ উপন্যাসে একটা চরিত্র আছে, মেনশিকি—যে কুয়ার মধ্যে বসে থাকে। কেন?

মুরাকামি : কুয়া আমার খুব ভালো লাগে। রেফ্রিজারেটরও আমার পছন্দ। হাতি পছন্দ। এ রকম আরো অনেক জিনিস আছে যেগুলো আমার পছন্দের তালিকায় আছে। এগুলো সম্পর্কে যখন লিখি, আমার ভালো লাগে। আমি যখন খুব ছোট আমাদের বাড়িতে একটা কুয়া ছিল। সেই কুয়ার গভীরে তাকিয়ে থাকতাম। এভাবেই আমার কল্পনাশক্তি বেড়ে উঠেছে। রেমন্ড কারভারের একটা ছোটগল্প আছে, আপনি পড়েছেন কি না জানি না। সে গল্পে প্রটাগনিস্ট কুয়ার মধ্যে পড়ে যায়। ওটা আমার খুব পছন্দের গল্প।

 

ট্রিজমান : আপনি কখনো কুয়ার নিচে নেমে দেখেছেন?

মুরাকামি : না, না। কখনো না। এটা খুব ভয়ংকর ব্যাপার। হ্যাঁ, মনে মনে নেমেছি। বাস্তবে এটা কখনো ট্রাই করিনি। তবে হ্যাঁ, গুহা আমার খুব পছন্দ। আমি যখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরি, গুহা চোখে পড়লেই সেই গুহার ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করি। আরেকটা ব্যাপার আপনাকে জানিয়ে রাখি, উঁচু জায়গা আমার পছন্দ নয়।

 

ট্রিজমান : এর মানে কী দাঁড়াচ্ছে—আপনি প্রয়োজনে নিচে নামবেন, ওপরে উঠবেন না, এই তো?

মুরাকামি : কেউ কেউ বলে, এটা অবচেতন মনের একটা খেলা। মেটাফোরও বলা যেতে পারে। কিন্তু আমি সত্যিই মাটির নিচে যে পৃথিবী, সে পৃথিবীর ব্যাপারে তীব্র আগ্রহ বোধ করি।

 

ট্রিজমান : কয়েক বছর আগে ‘প্যারিস রিভিউ’-এর এক ইন্টারভিউতে আপনি বলেছিলেন, আপনার গল্পের চালিকাশক্তি হচ্ছে, ‘কোনো জিনিস হারিয়ে যাওয়া, সেটাকে খোঁজার চেষ্টা, তারপর সেটা খুঁজে পাওয়া।’ তখন যে কথাটা বলেছিলেন এখনো কি সেটা সত্য মনে হয়?

মুরাকামি : হ্যাঁ। আমার ফিকশনের এটা একটা বড় থিম। কেউ একজন হারিয়ে যাবে। তারপর তাকে খোঁজা হবে। অবশেষে খুঁজে পাওয়া যাবে। আমার চরিত্রগুলো হারিয়ে যাওয়া জিনিস খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে। সেই হারানো জিনিসটা কোনো মেয়ে হতে পারে বা কোনো উদ্দেশ্য। আমার প্রটাগনিস্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কিছু খুঁজে বেড়ায় এবং যখন খুঁজে পায়, তখন কিছুটা হতাশ হয়। জানি না কেন তারা হতাশায় ভোগে? কিন্তু আমার ফিকশনে এটা একটা মোটিফ—কিছু একটা খোঁজা এবং সেটা পেয়ে যাওয়া। কিন্তু পাওয়ার পর হ্যাপি এন্ডিং নেই সেখানে। 

 

ট্রিজমান : প্রায়ই দেখা যায় আপনার সৃষ্টি করা পুরুষ চরিত্রগুলো কোনো না কোনোভাবে লস্ট অবস্থায় আছে। মনে হয়, তারা এই পৃথিবীর সাথে তাল মেলাতে পারছে না, হারিয়ে গেছে। সেটা আবেগগত জায়গা থেকেই হোক বা অস্তিত্বের দিক থেকেই হোক। এই পৃথিবীতে তাদের চালচলন খুব একটা স্বচ্ছন্দ মনে হয় না।

মুরাকামি : একটা ব্যাপার আপনাকে বলি। প্রটাগনিস্ট যদি সুখে থাকে, তাহলে জেনে রাখবেন, সেখানে কোনো গল্প নেই। যখন আমার কোনো উপন্যাস বের হয়, কোনো কোনো বন্ধু আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘এর পরে কী হলো?’ 

আমি বলি, ‘কিছুই হলো না। এখানেই শেষ।’

 কখনো কখনো মানুষ কোনো গল্পের সিক্যুয়েল আশা করে। আমার ‘ওয়ান কিউ এইট ফোর’ উপন্যাস যেখানে শেষ হয়েছে, এর পর কী হয়েছে, তা আমি জানি। প্রতিটি চরিত্র বর্তমানে কোথায় আছে, কেমন আছে, কী করছে—আমি বলে দিতে পারব। চাইলে আমি একটা সিক্যুয়েল লিখে ফেলতে পারতাম। কিন্তু লিখিনি। আমার মনে হয়েছিল, সে রকম কিছু করলে ‘জুরাসিক পার্ক ফোর’ অথবা ‘ডাই হার্ড এইট’-এর মতো কোনো ব্যাপার ঘটবে। তাই ওই গল্পটুকু আমি আমার মনের মধ্যে রেখে দিয়েছি। এবং সেটা আমি উপভোগ করি।

 

ট্রিজমান : আপনার কি কখনো মনে হয়, সেটা আপনি ভবিষ্যতে লেখার চেষ্টা করবেন?

মুরাকামি : না। সম্ভবত ওটা আমার মনের মধ্যেই থেকে যাবে। ‘ওয়ান কিউ এইট ফোর’-এর প্রটাগনিস্ট টেংগোর ১৬ বছর বয়সী মেয়ে হলো সিক্যুয়েলের প্রধান চরিত্র। কিন্তু সে সিক্যুয়েল আমি লিখব না। যদিও খুব মজার গল্প সেটা।

 

ট্রিজমান : তাহলে ‘ডাই হার্ড এইট’ আসছে না?

মুরাকামি :  শুধু সিক্যুয়েল না, এই গল্পের প্রিকুয়েলও আছে। 

 

ট্রিজমান : কোথায় আছে? আপনার মাথায়?

মুরাকামি : হ্যাঁ।

 

ট্রিজমান : কিছু লেখক আছেন, যাঁরা প্রতিটা উপন্যাসেই নিজেদের ভেঙে একদম ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করেন। আর কিছু লেখক আছে তাঁরা যে বিষয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, সেটাই আঁকড়ে ধরে থাকেন। আপনি কোনটা করেন?

মুরাকামি : আমি কাজুয়ো ইশিগুরোর লেখা খুব পছন্দ করি। সে আমার খুব ভালো বন্ধু। তার প্রতিটা বই যখন বের হয়, সেটা আগের বইয়ের থেকে একদম আলাদা হয়। খুবই ইন্টারেস্টিং। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এ রকম হয় না। কারণ, আমার মোটিফ আর থিম বদলায় না। আমি কখনো কোনো গল্পের সিক্যুয়াল লিখি না। কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন আমার বইয়ে যে পরিবেশ থাকে, তা একটার থেকে আরেকটা খুব বেশি আলাদা নয়। কারণ, আমি অনেকগুলো মানুষ নই। একজন মাত্র মানুষ এবং আমি কেবল আমার নিজস্ব উপায়েই ভাবতে পারি। এটা পরিবর্তন করতে পারি না। কিন্তু আমি কখনোই চাই না একই জিনিস বারবার লিখতে। 

 

ট্রিজমান : আপনার লেখার মধ্যে কখনো খুব গভীর বা জটিল কোনো আইডিয়া থাকে। কিন্তু লেখাটা একেবারেই জটিল নয়। বাক্যগুলো খুব সহজ ও হালকা। বিষয়বস্তুর সাথে ভাষার এই যে কনট্রাস্ট আপনি তৈরি করেন, সেটা কি ইচ্ছাকৃত?

মুরাকামি : অনেক লেখকই আছেন, যাঁরা খুব ছোট ও হালকা বিষয়কেও জটিল করে লেখেন। আমার ক্ষেত্রে তা হয় না। আমি একটা সিরিয়াস এবং জটিল বিষয়কে খুব সহজে পানির মতো করে বলতে চাই যেন লেখাটা সহজে পড়া যায়। কোনো জটিল বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে আপনাকে গভীরে যেতে হবে, অনেক... অনেক গভীরে। আমি এর জন্য একটা টেকনিক বের করেছি। কোনো ইন্টেলেকচুয়াল টেকনিক না। আমার ধারণা, আপনি যদি ফিকশন লিখতে বসেন এবং খুব বুদ্ধিমান হন, লিখতে পারবেন না। তার মানে এই নয়, লিখতে গেলে আপনাকে স্টুপিড হতে হবে। সেটাও সম্ভব না। দুটোর মাঝামাঝি একটা জায়গায় এসে আপনাকে দাঁড়াতে হবে। এই কাজটা খুব কঠিন।

 

ডেবোরাহ ট্রিজম্যান : আপনার কি মনে হয়, আপনার লেখার যে স্টাইল তা অন্য ভাষায় অনুবাদের পর ঠিক থাকে?

 হারুকি মুরাকামি : হ্যাঁ। জানি না এটা কী কারণে হয়, কিন্তু যখন আমি ইংরেজিতে আমার বই পড়ি তখন মনে হয়, আরে... এটা তো আমারই লেখা। গদ্যের রিদম এবং স্টাইলে কোনো পার্থক্য পাই না।

 

 ট্রিজম্যান : আপনি নিজেই একজন অনুবাদক। এফ স্কট ফিটজেরাল্ড, ট্রুমান ক্যাপোটি, রেমন্ড কার্ভার এবং আরো অনেকের লেখাই জাপানিজে অনুবাদ করেছেন। যতদূর জানি, বর্তমানে আপনি অনুবাদ করছেন করছেন জন চিভার। এই কাজে আপনি ঠিক কী কারণে উৎসাহ বোধ করলেন? 

মুরাকামি : করলাম, কারণ কাজটা আমার কাছে সহজ মনে হয়। আমি কেবল সেই সব বই অনুবাদ করি যেগুলো আমার নিজের পড়তে ভালো লাগে। আমি রেমন্ড চ্যান্ডলারের প্রায় সব উপন্যাস অনুবাদ করে ফেলেছি। তাঁর লেখার ধরন আমার খুব পছন্দ। ‘দ্য লং গুডবাই’ আমি পাঁচ থেকে ছয় বার পড়েছি।

 

 ট্রিজম্যান : যখন আপনি অনুবাদ করেন, তখন আপনি অন্য আরেকজন লেখকের কণ্ঠে কথা বলেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, তখন আর আপনি হারুকি মুরাকামি থাকেন না, হয়ে যান ফিটজেরাল্ড, চ্যান্ডলার, অথবা চিভার। নিজের কণ্ঠ বাদ দিয়ে অন্য আরেকজনের কণ্ঠে একটা গল্প বলা একটু জটিল বিষয় নয় কি?

মুরাকামি : স্কট ফিটজেরাল্ড আমার খুব পছন্দের একজন লেখক। তাঁর অনেক বই আমি অনুবাদ করেছি। কিন্তু তাঁর লেখার স্টাইল আমার থেকে একেবারেই আলাদা। খুবই সুন্দর এবং কমপ্লেক্স তাঁর লেখা। তারপরও বলব, আমি তাঁর থেকে অনেক কিছু শিখেছি। তাঁর অ্যাটিটিউড, দুনিয়াকে তিনি কীভাবে দেখেন—এই জিনিসগুলো আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। একই কথা প্রযোজ্য রেমন্ড কার্ভারের বেলায়ও।

 

 ট্রিজম্যান : আপনি বর্তমানে অনুবাদ করছেন জন চিভারের লেখা। এত লেখক থাকতে চিভারকে বেছে নিলেন কেন?

 মুরাকামি : তাঁর ছোটগল্পগুলো আমি বেশ উপভোগ করি। কিন্তু তিনি জাপানে একেবারেই জনপ্রিয় নন। খুব কম মানুষই আছে, যারা তাঁর লেখা পড়েছে। এর একটা প্রধান কারণ হচ্ছে, চিভারের লেখা অনেক বেশি আমেরিকান। পঞ্চাশের দশকের ওই মধ্যবিত্ত ঘরানার লেখা জাপানি পাঠক খুব একটা পছন্দ করে না। কিন্তু আমি করি। তাই এটাকে আমি একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পারমাণবিক সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালালো যুক্তরাষ্ট্র
পারমাণবিক সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালালো যুক্তরাষ্ট্র
অনেক মামলা ঝুলে আছে নিম্ন আদালতে
অনেক মামলা ঝুলে আছে নিম্ন আদালতে
ইউক্রেন সফরে আসছেন এরদোয়ান ও গুতেরেস
ইউক্রেন সফরে আসছেন এরদোয়ান ও গুতেরেস
গ্রিস-তুরস্ক সীমান্তের নির্জন দ্বীপে ৩৮ অভিবাসী উদ্ধার
গ্রিস-তুরস্ক সীমান্তের নির্জন দ্বীপে ৩৮ অভিবাসী উদ্ধার
এ বিভাগের সর্বশেষ
প্রান্তরে জীবনের বীজ
শামসুর রাহমানপ্রান্তরে জীবনের বীজ
দুলে ওঠে ঘর না কারবালা
দুলে ওঠে ঘর না কারবালা
কফিনের পোস্টার
কফিনের পোস্টার
লেফট রাইট লেফট
লেফট রাইট লেফট
একটাই তর্জনী
একটাই তর্জনী