[মৌলিক চাহিদা পাঁচ নয়, সাত নয়, নয় নয়। মৌলিক চাহিদা এক। মৌলিক চাহিদা মৃত্যু।]
একবার দিনেও ফেরে না রাতেও ফেরে না। যেদিন দিনেও ফিরল না রাতেও ফিরল না সেদিন শোনা গেল, আরতি রমজান ডাক্তারকে বিয়ে করে হয়ে গেছে মনসুরা বানু।
এটা একটা খবর শ্রীদাম আর মাধবীর জন্য। খবর মানেই কবর। খবর মানেই কষ্টের, বেদনার, চাপের, তাপের, অবস্থা-খারাপের কবর। নইলে মানুষ রেগে গিয়ে কেন বলে— ‘তোর খবর করব’, ‘তোর খবর আছে।’ নিশ্চয় খবর মানে কবর, খবর মানেই খারাপ কিছু।
আরতি আর রমজান ডাক্তারের খবরের কবরে মাধবী আর শ্রীদাম তলা ফুটা নৌকার মতো ডুবে যায়। একটা খবরের কবরে দুবাপবেটি মুহ্যমান হয়ে থাকে। মাধবী দরজার চৌকাঠ ধরে কাঁদে নিঃশব্দে। শ্রীদাম মনে মনে পিছন ফিরে শুয়ে কাঁদে। অঝোর ধারায় কাঁদে সে। আরতি আর রমজান ডাক্তার বিষয়ে সে সবই বুঝতে পারছিল; এমনটা যে একদিন হবে তাও বুঝতে পারছিল কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি হবে এমনটা ধারণা করেনি।
অদৃষ্টের পরিহাসে দৃষ্টের কান্না। মানবজন্মের প্রতি তার ধিক্কার জাগে। তার পুরাতন ভাবনা মনে পড়ে, শিশ্ন আর যোনির ঘর্ষণে মানুষের জন্ম হয়েছে।
মানুষ পোড়ামাটির ব্যাংক। মাটির ব্যাংকের ভেতর তিলে তিলে পাঁচ পয়সা দশ পয়সার মুদ্রা জমে যেমন তেমন মানুষের ভেতর জমে বেদনামুদ্রা। মৃত্যু ব্যতীত বেদনামুদ্রার সঞ্চয়ন বন্ধ হয় না।
বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের কথা মনে পড়ে, লেখা ছিল— মানুষের মৌলিক চাহিদা পাঁচটি, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা। শ্রীদামের মনে হয় সবই ভুয়া কথা। মানুষের মৌলিক চাহিদা পাঁচটা নয়, দশটা নয়— মাত্র একটা। মানুষের একমাত্র মৌলিক চাহিদা মৃত্যু।
শ্রীদাম দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখে টিকটিকি দুটো নেই। কিছুক্ষণ আগেও সে তাদের দেখতে পাচ্ছিল।
তারা কোথায় গেল?
এ দেয়াল ছেড়ে অন্য দেয়ালে?
যাক। সবই তো চলে যায়। যে যেতে চায় সে যায়, যে যেতে চায় না সেও যায়। যাকে যেতে দিতে চায় না সেও যায়। আরতি চলে গেছে।
এই যে আকাট ঢেঁকির মতো শ্রীদাম শুয়ে আছে তার সুস্থতা চলে গেছে। কই, শ্রীদামের সেই শ্রীছাঁদ কই, চাঁদবদন কই। চলে গেছে। চাঁদবদন এখন বদনাবদন। সব চলে গেছে, সব চলে যাচ্ছে, সব চলে যাবে। যাক।
আটকপালে শ্রীদাম এখন দর্শক হবে তার নিজেরই, দর্শক হয়ে দেখবে তার ওপর দিয়ে ঘটনার চাকা, যন্ত্রণার বাঁকা আরও কেমন আর কত গভীর দাগ ফেলে যায়।
শ্রীদাম দর্শক হয়ে দেখবে, মাধবীর ওপর দিয়ে জন্মযাপনের ঝড়ঝাপটা কত গতিতে যায়, কতটা আছাড় মেরে যায়। সে দেখবে, মাধবীর আহাজারি, আছাড়ি-পিছাড়ি। মাধবীর চিৎকারের শুরুটা দেখা যাবে; শেষ হয়তো দেখতে পাবে না।
শ্রীদাম নিঃশোক হবার চেষ্টা করে। সে চোখ বন্ধ করে কান্নার দরজা বন্ধ করে প্রার্থনা করে— ‘মাধবীকে শক্তি দিও সারদা, জ্ঞান দিও সারদা। যাতে বিপদে উতরে যেতে পারে, করে কর্মে খেতে পায় দুটো দানা।’
তার চোখের জল বাঁধ মানে না, বন্ধ চোখের পাতা ঠেলে বের হয়ে আসে।
সে মাধবীকে বলে— ‘মা রে কাঁদিসনে। কাঁদলে তো আরো অনেককিছু নিয়েই কাঁদা যায়। জগতে কাঁদার বিষয়ের অভাব নেই। দুঃখই একেবারে একমাত্র। এই একমাত্র ছাড়া অন্যকোনো একমাত্র নেই। জগতে যতকিছু নিয়ে কাঁদা যায় ততকিছু নিয়ে কাঁদলে তো এই দুই চোখে কুলোবে না। কাঁদাকাটি থামিয়ে দে মা মাধবী।’
এটা সে মনে মনে বলল, না উচ্চারণে বলল তার সন্দেহ হচ্ছে। সে দেখল মাধবী কান্না থামায়নি, কাঁদতেই আছে। সে আর কিছু বলে না, মনে মনে বা উচ্চারণে। অনেক সময় পার হয়ে যায়, অনেক সময় পর হয়ে যায়। শ্রীদাম চোখ বন্ধ করে জেগে থাকে।
একসময় মাধবীর কান্না আর শুনতে পায় না শ্রীদাম। সে ভেবে নেয়— ‘মা রে কাঁদিসনে’ কথাটি সে উচ্চারণেই বলেছিল। কিন্তু কথাটি তার মতোই রুগ্ন আর দুর্বল হওয়ায় ধীরে ধীরে হেঁটে গেছে মাধবীর কাছে আর মাধবী সেকথা ঘণ্টাখানেক পর শুনতে পেয়ে কান্না থামিয়েছে।
আসলে মানুষের কান্না থামে না। কান্না থামায় চোখ নিজেই, কারণ, জগতে কান্নাকাটির এতো বিষয় আছে যে মাত্র দুটো চোখে কেঁদে কুলানো সম্ভব না, একথা চোখদুটো বোঝে। কান্না থামায় চোখ কারণ, তাকে আরো অনেককিছু দেখতে হবে, এক কান্না নিয়েই পড়ে থাকলে চোখের চলে না।
মন কাঁদতেই থাকে, মনটাই তো মানুষ আর দেহের সাথে লেগে থাকা অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গও আলাদা আলাদা জীব। চোখও জীব, তার নিজস্ব ক্লান্তি আছে, নিজস্ব ভাবনাও আছে, সে মনের আগেই থেমে যায়। চোখের ক্লান্তি আছে, সে থেমে যায় যেমন ঘাম ঝরানো কাজ করতে করতে থেমে যায় শ্রমিক। আবার, চোখের অনেক কাজের মধ্যে তো কান্না একটা, এক কাজ নিয়ে পড়ে থাকলে তার চলে না, অন্যকাজ করতে হয়, এ জন্যই কান্নাকাজ ছেড়ে দেয় চোখ ব্যস্ত মানুষের মতো অন্যকাজ করতে শুরু করে। আবার চোখের গরজ আছে মানুষকে দেখানোর যে, আমি কাঁদছি না, মনের সে গরজ নেই কারণ তাকে এমনিতেই কেউ দেখতে পায় না। ফলে মনের একইসাথে বিভিন্ন কান্না একসাথে কাঁদতে কোনো অসুবিধা নাই। জীবনের প্রথম পাওয়া ব্যথার জন্যও মনের কান্না চালু আছে, জীবনে যে শেষ ব্যথা পাবে তার জন্যেও অগ্রিম কান্না চালু আছে। কোনো কান্নায় থামায় না মন। মন সবই জানে অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ যার যার মন সেই শুধু জানতে পারে না।
আরো কিছুক্ষণ পার হয়ে যায়। সে মাধবীর দিকে তাকায়, মাধবী কাঁদতে কাঁদতে দরজার কাছে মেঝেতে ঘুমিয়ে গেছে।
এই যে মাধবী ঘুমিয়ে আছে, অসহায়। জীবন দ্বারা অপমানিত একজন কিশোরী। এই জীবন, এই জীবনভার একটা মাত্র ঘর্ষণের সৃষ্টি। সামান্য ঘর্ষণে সৃষ্টি। সামান্য এই যোনি আর শিশ্নের ঘর্ষণে অসামান্য ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে, দুর্ভোগ অপমান ভোগ করার জন্য চলে আসছে একটা শিশু— একজন মানুষ।
অপমান পুরুষের সেরা স্ত্রী। অপমান নারীর সেরা স্বামী। অপমান শিশুদের সেরা খেলার সঙ্গী, বাবা, মা। অপমান বৃদ্ধদের সেরা সন্তান। অপমান মানুষের সেরা আত্মীয়। অপমান কখনোই ছেড়ে যায় না। চারদিকে শুধু অপমান, অপমানকারী আর অপমানিত। জগতে সবাই অপমানকারী, সবাই অপমানিত। সবতাতেই অপমান মাখা। যে অপমানিত সেও কোনো কোনো সময় অপমানকারী, যে অপমানকারী সেও কোনো কোনো সময় অপমানিত।
দুঃখ হতে দুঃখে, অপমান হতে অপমানে রেসের ঘোড়ার মতো চলছে মানুষ, এ রেসে সব মানুষ-ঘোড়ায় প্রথম। রেসের পথ বৃত্তাকার; দৌড়ের মাইল-ক্রোশ বাড়ে, এগুনোর মাইল-ক্রোশ বাড়ে না। এখানেও তাই ঘটছে কেউ অপমানকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতে পারছে না, এড়িয়ে যেতে পারছে না, এগিয়ে যেতে পারছে না।
শ্রীদামের ভেতর ধপ করে একটা দীপ জ্বলে ওঠে জোরে, প্রশ্নের দীপ।
অপমানও কি নিজে একটা জীব?
সেই জীব জড়িয়ে ধরে থাকে মানুষকে, তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় মানুষকে? তাহলে অপমান আর অপমানিতের আর অপমানকারীর মধ্যে ঘটা ঘোড়ার রেসে কে আসল রেসুরে?
ধপ করে যেমন প্রশ্নদীপ জ্বলেছিল তেমনই ধপ করে নিভে যায় বা নিভিয়ে দেয় শ্রীদাম নিজেই। বরং আরতির এই চলে যাওয়া পরবর্তী বিপদ নিয়েই চিন্তা করতে হবে এখন বেশি।
ব্যাপার যখন বিপদ তখনের সমীকরণ সাংঘাতিক।
বিপৎকালের জন্য অগ্রীম লোক পাওয়া যায়— আমি তোমার বিপদে পাশে থাকব।
বিপৎপরবর্তী কালের জন্যও লোক পাওয়া যায়— আহারে, আমি একটুমাত্র আগে জানলে তোমাকে এতটুকু আঁচ লাগতে দিতাম না।
কিন্তু বিপদের সময় লোক পাওয়া যায় না। বিপদ যখন ঘটমান তখন অগ্রীমলোকেরা চলে যায়, অতীতলোকেদের টিকিটিও দেখা যায় না।
যেমন আরতিই তো বলেছিল— ‘তোমার সুখের চিরকালে থাকব, তোমার দুঃখের চিরকালেও থাকব।’
অতীত লোক পাওয়া যায়।
যেমন কদিন আগে তার সাথে পড়া করবী দেখতে এসে বলে গেছে— ‘আমি তোমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম তুমি করোনি, আমি যদি তোমার বউ হতাম এ বিপদে থাকতে পারতাম তোমার পাশে। আরতি তো তোমাকে ঠিকমতো দেখছে না, ডাক্তারের কাছে, ওষুধ বেচার নামে নেচে বেড়াচ্ছে।’
আরতি তখনো মনসুরা বানু হয়ে যায়নি। শ্রীদাম দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, বিপৎকালের ‘অগ্রীম লোক’ চলে গেছে, বিপৎকালের ‘অতীত লোক’ থাকতে পারছে না, বিপদবহুল সময়ের ‘বর্তমান লোক’ নেই।
[রতিক্রিয়ার প্রক্রিয়া আর প্রতিক্রিয়া। শিশুকালের খেলা আর যুবককালের খেলা।]
ভোর আর দুপুর, বিকেল আর রাত সব সমান পীড়া পীড়িত শ্রীদামের কাছে। ভোর না হলেও ঘুম ভাঙলে ভোর, রাত না হলেও ঘুম এলে রাত। ঘুম এলে ঘুমায়, ঘুম ভেঙে গেলে ঘুমের প্রতীক্ষা করে। প্রতীক্ষা করতে করতে নিজেকে নিয়ে ভাবে, নিজে একজন মানুষ হয়ে মানুষের মনোভাব নিয়ে জগতের সমস্ত মানুষ নিয়ে ভাবে। অজস্র জীবনের ভেতর, অজস্র মানুষের ভেতর, গোলমাল করতে করতে গোলেমালে মানুষ জন্মে যাচ্ছে, খেয়োখেয়ি করছে, মরে যাচ্ছে। এগুলো সবই বাবা-মার সামান্য সঙ্গমের ফল। সঙ্গমে সুখই বা কতটুকু থাকে, এই সুখের বিপরীতে আস্ত একটা মানুষ জন্মে যায়, জন্মে যাওয়া মানুষ পুরো জীবন ধরে জ্বালাবে আর জ্বলবে জগজ্জাহান্নমে।
নরনারীর রতিকলার আনন্দ আর রতিক্রিয়ার প্রক্রিয়ার আর প্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তার মধ্যে আসাতে তার শৈশবের কথা মনে পড়ে— নদীর ধারের উঁচা বালির পাড়ে ছোটো ছোটো সুড়ঙ্গে পোকা লুকিয়ে থাকত। খুব সরু সরু সুড়ঙ্গ। সেসব সুড়ঙ্গে বা গর্তে তারা কাঠি ঢুকিয়ে খোঁচাত। পোকারা বের হতে চাইত না। যতক্ষণ বের না হতো ততক্ষণ বিপুল আনন্দে খুঁচিয়ে যেত তারা। পোকারা খুব বেশিক্ষণ এসব খোঁচাখুঁচি সহ্য করতে পারত না। একসময় পোকা বের হয়ে আসত টলতে টলতে।
তারপর কোনো পোকার একটা পাখা ছিঁড়ে উড়তে দিত। এক পাখে ভর করে পোকা উড়ে পালানোর চেষ্টা করত। পোকাটা পালাতে পারত না; একটা পাখায় যে ঘূর্ণি তৈরি হতো তাই দেখে সবাই হেসে উঠত। অদ্ভুত সেই একপাখাতে উড়াল দেবার চেষ্টা।
এই এক পাখার খেলা দেখা আর ভালো লাগত না, তখন কোনো এক পোকার দুই পাখাই ছিঁড়ে দিত পাখাছাড়া পোকার হাঁটা দেখার জন্য। পাখাহারা পোকাটা বিষে ব্যথায় কাতর হয়ে উড়তে গিয়ে দেখত পাখা নেই। উড়তে গিয়ে তারা হাঁটতে বাধ্য হতো। ছিঁড়ে ফেলা পাখার ওপর দিয়েই হাঁটত পোকাটা। ঘুরে ঘুরে হাঁটত।
এরপর হয়ত কোনো পোকার দুপাখা আর এক পা ছিঁড়ে ফেলা হতো, পাখা ছেঁড়ার বিষে, পা ছেঁড়ার বিষে কাতর পোকা কিছুক্ষণ পাথর হয়ে পড়ে থাকত, তখন পিছন থেকে সরু শলাকার খোঁচা দিত তারা। পাখা ছেঁড়া, এক পা বা দুই পা ছাড়া পোকা বা সব পা আর পাখা ছাড়া পোকা বুকের ভরেই পালানোর চেষ্টা করত। বুকের ভরে হাঁটন্ত এসব পা আর পাখনাহীন পোকাটাকে দেখে মনে হতো একটা নুড়ি পাথর; নুড়ি পাথর নড়াচড়া করছে; নুড়ি পাথর পালানোর চেষ্টা করছে; একটা পাথরের প্রাণ থাকলে হয়তো এভাবেই নড়াচড়া করত, এভাবেই পালানোর চেষ্টা করত। পাথরপ্রাণীর নড়নচড়ন দেখে শ্রীদাম আর তার সঙ্গীদের হাসাহাসি ফুরোতো না।
কখনো কখনো কোনো পোকার পা ঠিক রেখে পাখা ভেঙে বাবলা বা ফণীমনসার কাঁটা দিয়ে চোখ ফুটিয়ে কানা করে দিত। কানা পোকা একদিকেই ঘুরে ঘুরে হাঁটত। অন্ধ পোকা এলোপাতাড়ি হাঁটত। কানা পোকার, অন্ধ পোকার হাঁটন দেখে, পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা দেখে হাততালি দিত তারা।
এভাবে পোকার পাখা মুচড়ে, পা ছিঁড়ে, কাঁটা দিয়ে চোখ খুঁচিয়ে, পেট বুক ফুটিয়ে চর্বি বের করে বিপুল আনন্দ পেত তারা। ল্যাংড়া পোকা, অন্ধ পোকা যতক্ষণ না মারা যেত ততক্ষণ চলত কাঁটা ফোটানো, খোঁচ দিয়ে খোঁচানো। এভাবে পোকার পর পোকা মরে গেলে; এসব ছিঁড়াখোঁড়া পোকাদের মরদেহ রেখে আবার গর্তে কাঠি ঢুকিয়ে আরো আরো নতুন পোকা বের করে খেলা চলত।
‘কুহর’ মানে যে সুড়ঙ্গ বা গর্ত তা বহুদিন পর, ‘গোপীনাথ মুদ্রণালয়’ এ কাজ করতে গিয়ে জেনেছিল। ছাপাখানাতে যারা বই বা পোস্টার বা নেমন্তন্নের চিঠিচৌপাটি ছাপাইয়ের জন্য আসতো তারা হাতে লিখে নিয়ে আসত। মানুষের হাতের লেখা কত বিচিত্রময় হয় তা এই ছাপাখানাতে কাজ করতে না আসলে সে জানতে পারত না। তবে একটা ব্যাপার সে খেয়াল করেছে যাদের হাতের লেখা সুন্দর তাদের সকলের লেখা প্রায় একই রকম কিন্তু যাদের হাতের লেখা খারাপ তাদের কারো সাথে কারো লেখার মধ্যে ‘এগুলো লেখা’ এই ব্যাপারটা ছাড়া কোনো মিল থাকত না।
হরেকরকম হাতের এসব লেখা দেখে দেখে মুদ্রাক্ষর ব্লকের বুকে সাজাতো শ্রীদাম। এমনই একদিন ব্লকে লোহার অক্ষর সাজাতে গিয়ে ‘কুহর’ শব্দটি দেখতে পেয়েছিল। মুদ্রণপ্রমাদ এড়ানোর জন্য শ্রীদাম প্রধান মুদ্রককে জিজ্ঞাসা করতে গেছিল, এই কাগজে ‘শহর’ লিখতে গিয়ে ‘কুহর’ লিখে ফেলেছে কি না? প্রধান মুদ্রাকর শ্রীধরবাবু হেসে উঠেছিলেন হো হো করে। মুদ্রণযন্ত্রের প্রচণ্ড ঘটরঘটর শব্দের দেয়াল ভেঙেও বেরিয়ে পড়ছিল।
আর ‘রতিকুহর’ মানে যে যোনি তাও জেনেছিল সেদিনই। তাহলে রতিকুহর বা রতিগর্ত যদি যোনি হয় তবে রতিশলাকা বা রতিকাঠি হতে হবে শিশ্নের নাম।
সঙ্গম, সঙ্গমের খোঁচাখুচি, সঙ্গমের ফলে বের হওয়া সন্তানপোকা, এ সন্তানপোকার জগতের যন্ত্রণা পাওয়াকে শিশুকালের সেই পোকা নিয়ে নৃশংস খেলার মতো মনে হয়।
তাহলে কি সঙ্গম এক ধরণের খুন?
খুন হয়ে মানুষ এসে পড়ছে জগতের আগুনে দাহ হবার জন্য, যেমনভাবে গর্তে থাকা পোকা খোঁচা খেয়ে নিমখুন হয়ে টলতে টলতে বাধ্য হতো বের হয়ে আসতে আর মারা পড়তে ঠিক তেমনভাবেই রতিশলাকার খোঁচায় রতিগর্ত থেকে বের হয়ে মর্ত্যলোকে এসে পড়ছে মানবশিশু আর নানারকম নির্দয় খোঁচার মুখোমুখি হচ্ছে। মারাত্মক বেদনাদায়ক এসবকিছু।
মাধবীর জন্য খারাপ লাগে তার।
আহা মেয়েটা! সে কে?
আমার মেয়ে?
আরতির মেয়ে?
উভয়ের মেয়ে?
তাহলে আরতি কেন তাকে ফেলে চলে গেল?
মেয়ে জন্ম দেওয়ার শক্তি যদি আমার আছে তবে মেয়েকে রক্ষা করার, ভালো রাখার শক্তি কেন আমার নেই?
মা রক্ষাকালী, রক্ষা করো মা, মা মাধবীকে।
রক্ষাকালী কি আসলেই রক্ষা করতে পারে, রক্ষা করে, রক্ষাকালী বলে কিছু আছে কি?
ভাবতে ভাবতে শ্রীদাম ক্লান্ত হয়ে ওঠে, ভাবনা থামাতে পারে না। ভাবনার চরকা ভাবনার সুতো কাটতেই থাকে। ভাবনার মাকু তাঁতের টানায় পড়িয়ান দিতেই আছে এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে। ভাবনার সুতা থেকে ভাবনার তাঁতে কাপড় বুনে, ভাবনার কাপড়, ভাবনার চাদর গায়ে জড়িয়ে, বিছানায় ছড়িয়ে শ্রীদাম ভাবনাবন্দী থাকে। ভাবনাবন্দী শ্রীদাম ছটফট করে। মরণান্তিক মানুষ আসলে আজন্ম বন্দিই— লোভবন্দী , ক্ষোভবন্দী, খিদেবন্দী, ক্ষমতাবন্দী, দুর্ভোগবন্দী। ঘুমে কিছুটা মুক্তি মানুষের, পুরো মুক্তি মরণে। রমণে বন্দি মানুষ মরণে মুক্তি পায়।
[নৃপ্রকৃতি। নৃবিকৃতি।]
একজন মুসলমানের হাত ধরে আরতি চলে যাবার পর, ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো গ্রাম গ্রাম্ভারি হয়ে যায়; স্তব্ধ হয়ে যায়। পরে মুসলমান সমাজে খুশি ছড়িয়ে গেলেও এখানকার হিন্দুসমাজে বেশ একটা ঢি ঢি পড়ে যায়; ঢিঢিক্কার পড়ে যায়। ছি ছিটানোর ধুম পড়ে যায়। আরতির দুর্নাম তো আছেই শ্রীদামকেও ছাড়ে না।
—‘অমন ভেড়ামুখো পুরুষ দিয়ে কী বউ শাসন হয়! যতই ব্যামো-ব্যারাম হোক আমাদের বউ করে দেখুক দেখি, চোখের শাসানিতেই বউ মুতে ছরকট করে দিবে।’
—‘আমি তো রমজান ডাক্তারের সাথে দহরম-মহরম দেখে আগেই টের পেয়েছিলাম।’
—‘ঘরের কোণঘেঁষা পুরুষ আর পুরুষের ধোনঘেঁষা নারী সংসারকে শেষ করে দেয়। সামান্য কী একটু হলো তাতেই শ্রীদাম দিনের পর দিন ঘরের কোণে পড়ে থাকল। এমন তো হবেই।’
—‘এরা শুধু কি সংসার? সমাজকেও শেষ করে দেয়।’
—‘নৌযান ভালো করে চালাতে না জানলে যেমন ডুবে যায়, স্রোতে ভেসে চলে যায় তেমনই বৌযান। বৌযান ঠিক মতো চালাতে না জানলে সংসার উচ্ছনে যায়।’
—‘ঘিনঘিনে স্বভাবের ঘরনি পুরুষের ধরনি বিষিয়ে দিতে পারে। তাই-ই হয়েছে; শুধু শ্রীদামের দোষ দিলে হবে না।’
—‘তুমি ঠিকই বলেছে। ছলনাময়ী নারী তার স্বামীর পিঠকেও পরপুরুষের সাথে শোওয়ার জন্য বিছানা বানিয়ে নিতে পারে।’
মাধবীর দুর্নামও করে—
—‘সুস্থ মানুষ যদি সুস্থ হয়ে বসে থাকে তবে সংসার কীভাবে চলবে। অত বড়ো ধাড়ি মেয়ে বসে থাকে খালিখালি। কোনো তাঁতির বাড়ি গিয়ে তো তাঁত বোনার কাজ করে কিছু কিছু টাকা দিতে পারত অসুখে বাপটার হাতে।’
—‘কথা সইত্যি, মাধবী আহ্লাদের পুতুল একটা; কোনো কাজই সে করত না।’
কেউ কেউ আরো রগরগে কাহিনি বানায়। রাগরাগে চেহারা নিয়ে কেউ কেউ গালাগাল দেয়।
অজস্র দুয়োধ্বনি দুয়োরের বাইরের থেকে বানের জলের মতো, বাণের মতো ভেসে আসে বাড়ির ভেতর। শ্রীদাম আর মাধবীর কানের ভেতর সীসার মতো ঢুকে, বুকের ভেতর ঢুকে। শ্রীদাম চুপচাপ সহ্য করে। মাধবী চুপচাপ চোখের জল ঝরায়। একটু সান্ত্বনার রসে রসিয়ে দেবার মতো লোক নেই কোথাও বিষ ঢেলে বিষিয়ে দেবার লোকই পোকামাকড়ের মতো গিজগিজ করছে চারদিকে।
কেউ কেউ তাকে সান্ত্বনা দিতে আসে। তারা আসলে সান্ত্বনা দিতে আসে, না মজা নিতে আসে, না আরো শাস্তি দিতে আসে কে জানে।
শ্রীদামের মনে হয়— শান্তিদাতার বেশে এরা শাস্তিদাতা।
এই যে বেণিমাধব এসে বলল— ‘হায়! শেষে কিনা একটা মুসলমান গোবাঘের মুখেই পড়ল বউটা। ওর নরকেও ঠাঁই হবে না।’
শ্রীদাম বেণির মুখের দিকে তাকায়।
কী বলতে চায় বেণি, হিন্দু গোবাঘের মুখে পড়লেই কি ভালো হতো?
অথবা তার হা-হুতাশ কি এমন বলতে চাইছে, আরতি বেণিমাধবকে দেখতে পেলে না, দেখতে পেলে রমজান ডাক্তারের মতো এক বদমাইশকে?
গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না যেমন কথাতে আছে তেমন কথা যেন বেণীমাধবের বুকের ভেতর দেখতে পাচ্ছে— গেঁয়ো ভোগী ভোগ পায় না।
শ্রীদাম আর কাউকে বিশ্বাস করে না, কেউ বদমাইশ কেউ মদমাইশ; কেউ সদমাইশ। বদমাইশ মানুষ বদমাইশি করছে, মদমাইশ মানুষ মাতলামি করছে, সদমাইশ মানুষ সততার মুখোশে বাটপাড়ি করে চলেছে সবচে বেশি; মুখোশ পরে বেশ খোশ মেজাজে ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সদমানুষ পাওয়ায় দায়। ভূগোল বই পড়ে, বিভিন্ন জায়গা ঘুরে, ভূজড় আর ভূজীব দেখে দেখে ভূপ্রকৃতি জানা হয়ে গেছে। পৃথিবীর নরনারীদের দেখে দেখে নৃপ্রকৃতি জানা হয়ে গেছে। নৃবিকৃতি জানা হয়ে গেছে।
মানবজগতে কে দেবদূত, কে প্রেতভূত চেনা বড়ো দায়। এটাও নৃপ্রকৃতিরই একটা ব্যাপার।
—‘আমাদের এই হিন্দু সমাজে এমন কদাচার ঢুকে গেল বাবাঃ! ঘোরকলি গো ঘোরকলি!’— এমন মুখ বড়ো করে কথা বলে বেড়াচ্ছে যে চিত্রাঙ্গদ চাটুজ্জে সেও তো তার ছেলে-বউয়ের ঘরে ঢুকে গেছিল একদিন।
বউটা ‘কে কে’ বলে চিৎকার করে উঠলে তার মুখ চেপে ধরে বলেছিল— ‘চুপ কর, আমি ভগবান।’
বউটা ভোর হতেই ওই যে চলে গেছিল আর ফেরেনি কখনো। তার ছেলে কী একটা কাজে বাইরে গেছিল ফিরে এসে বউকে দেখতে না পেয়ে বউয়ের বাড়িতেও গেছিল কিন্তু বউ ফিরে আসেনি। বউ সবই বলে দিয়েছিল তাকে।
ছেলে এসে বাপকে জিজ্ঞাসা করলে বলে— ‘তোরা কি ভগবান বিশ্বাস করিস না নাকি? ভগবান তো আসতেও পারে। তোদের কি কোনো ছেলেপুলে হচ্ছে? হচ্ছে না। নিঃসন্তান পিতামাতাকে পুন্নাম নরকে যেতে হয় জানিস? হয়তো ভগবান তোদেরকে সেই নরক থেকে বাঁচানোর জন্যই এসেছিল।’
বাপের প্যাঁচানো কথা শুনে শেষে ছেলে পষ্টাপষ্টিই জানতে চেয়েছিল— ‘তুমিই তার ঘরে গেছিলে কি না?’
চিত্রাঙ্গদ বলেছিল— ‘না আমি যাইনি। তোর বউ এ বাড়িতে থাকবে না বলে এমন নাটক করছে অথবা ভগবান এসেছিল।’
ছেলে বাপের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বের হয়ে গেছিল। এখন তারা কোথাও নাকি বাসা ভাড়া করে থাকে, বউটা আর আসেনি তবে ছেলেটা মাঝে মাঝে তার বাপকে এসে দেখে যায়।
সবকে চেনা আছে তার, সবকিছু জানা হয়ে গেছে তার। জানার যেটুকু খামতি ছিল তার পূর্ণত্ব দিয়ে গেছে আরতি। আর চেনাজানার বাকি নেই। ফলে, এসব ঢিঢিক্কারে, ছিছিক্কারে শ্রীদামের কোনো মনোবিকার আসে না; এসব সান্ত্বনায় কোনো সান্ত্বনা পায় না।
সে পড়ে থাকে তার মতো। নিজের ভেতর একা একা থুথু ফেলে, নিজের থুথু নিজেকে খুব বুঝিয়ে বুঝিয়ে খায়। আরতির ওপর রাগ হয় না। যারা নানান কথা বলে বেড়াচ্ছে, একঘরে করবে বলে বেড়াচ্ছে তাদের কথাতেও কোনোকিছু হয় না তার। জন্মের পর থেকেই তো সব মানুষ একঘরে।
তার চিন্তা শুধু মাধবীকে নিয়ে, বাড়ন্ত এমন মেয়েটাকে কেমন করে রক্ষা করবে সে। পোকময় পৃথিবী, জোঁকময় জগৎ; এখানে অজস্র দৃশ্যমান অদৃশ্যমান বিপদ আপদ ছোঁকছোঁক করে বেড়াচ্ছে শিকার ধরার জন্য।









