[চুরিবিদ্যা মানুষের প্রকৃত অভিভাবক। চোর দুরকম ধরা পড়া চোর আর ধরা না পড়া চোর।]
হঠাৎ একদিন শ্রীদাম খেয়াল করে তার পায়ে একটা ছোটো ক্ষত। কেন ক্ষত, কীভাবে ক্ষত, সে বুঝতে পারে না। রসভর্তি ক্ষত রসে সুড়সুড় করে। সেখানটা চুলকাতে ইচ্ছা করে তার। চুলকাতে পারে না। উঠে চুলকানো তার জন্য কঠিন। সুতরাং সে উঠে চুলকানোর বদলে বরং যেখানটা চুলকাচ্ছে সেখানটা না চুলকালে শেষ পর্যন্ত কী হয় তা বুঝে নেবার চেষ্টা করে।
চুলকানি থাকবেই না কি এমনি এমনি একসময় চলে যাবে, চুলকানোর আর দরকার থাকবে না?
এই বুঝে নিতে নিতেই কখন ভুলে যায় এই বুঝে নেবার কথা।
সে মাধবীকে বলে— ‘পায়ে কেন ক্ষত রে মা?’
মাধবী শুনতে পায়নি বা উত্তর করল না বা শ্রীদামই হয়তো মনে মনে ডাক দিয়েছে মাধবীকে। যদি শুনতে না পেয়ে থাকে, তবেও ভালো, কী আছে এতো তাড়াহুড়ো করে সামান্য এ ক্ষত সম্পর্কে জানানোর যখন নিজেই সে বিরাট বিপুল এক ক্ষত হয়ে পড়ে আছে। যদি শুনেও উত্তর না করে থাকে তবেও ভালো, ক্ষত কীভাবে কেন হয়েছে সেইবা কেমন করে জানবে, জেনে কিইবা বলবে। আর যদি মনে মনে বলে থাকে তবেও ভালো হয়েছে; শরীরটা নিজেই একটা ক্ষত, জীবনের ক্ষত।
শ্রীদামের চোখে মুখে ক্ষুধার কুত্তা ঘেউ ঘেউ করে ডাকছে। পেটের নাড়িভুঁড়িও যেন হজম হয়ে, গু হয়ে গুহ্যদ্বার দিয়ে বের হয়ে যাবে।
আবার মনে হচ্ছে, একটা শেয়াল যেন দাঁতে চেপে পেটের নাড়ি টেনে ছিঁড়ে নিয়ে আসতে চাইছে। বুক পার হয়ে শেয়ালটা মুখ দিয়ে বের হতে চায়। এ শেয়ালটা যদি পেটের পুরো নাড়ির কুণ্ডলীটা মুখে নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে তবে বড়ো ভালো হয়, আর ক্ষুধা লাগবে না। কিন্তু নাড়ির শিকড়ও বেশ শক্ত। টেনে ছিঁড়ে ফেলতে পারে না এ শেয়াল। শেয়ালের নাড়ি ধরে টানাহ্যাঁচড়াতে শুধু কষ্ট পায়। ক্ষুধা বড্ড ঝগড়াটে, ঝগড়া করতেই থাকে। বড্ড বাগড়াটে বাগড়া দিতেই থাকে।
মানুষ চোর। সব মানুষই চোর। ‘ধরা-পড়া-চোর’ আর ‘ধরা-না-পড়া-চোর’। চোর ধরা পড়লে, ধরা-পড়া-চোরকে ধরা-না-পড়া-চোরেরা নাড়ির মতো দড়ি দিয়ে বাঁধে, বেঁধে মারে। চুরি করতে না গেলে চোর-মানুষকে তার নিজের পেটের নাড়ি দড়ির মতো বেঁধে রেখে মারে। একদিকে দড়ির বাঁধনের ভয় আর নাড়ির বাঁধনের ভয় চোর মানুষের।
যে যতদিন টিকে আছে চুরি করেই টিকে আছে। ‘চুরিত্ব’ ছাড়া কেইবা আছে মানুষের অভিভাবক। এই যে, রমজান ডাক্তার চুরি করলো তার কোনো এক ক্ষুধার ধান; এ ধান আরতি। এই যে আরতি চুরি করছিল তার দুইরকম ক্ষুধার ধান একসাথে। আর এই যে শ্রীদাম, সবই বুঝতে পারছিল, বুঝতে পারছিল রমজান ডাক্তারের চুরি, আরতির চুরি তবু কিছু বলছিল না। সে ভান করে ছিল যেন সে কিছুই জানে না। সে চুরি করে ছিল তার জানাটাকেই। চুরি করেছিল তার ভেতরের ভেতরটাকেই।
‘পায়ে ক্ষত কেন রে মা?’ এ প্রশ্নের যে উত্তর দেয়নি মাধবী তা আর মনে নেই শ্রীদামের। সে সম্পর্কে কোনো অভিমানও নেই।
সে এবার বলে— ‘মা রে কিছু খেতে দিতে পারবি নে?’
মাধবীরও দারুণ ক্ষুধা। বাবার খেতে চাওয়া শুনে মাধবীর চোখ মুখ থেকে ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে থাকা ক্ষুধাটা বেরিয়ে শ্রীদামের ক্ষতযুক্ত পা-টা কামড়ে কামড়ে হাঁটু থেকে ছিঁড়ে ফেলে। রাগান্বিত চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে মাধবী দ্রুত বেরিয়ে যায়। আঙিনায় বসে বসে নিঃশব্দে চোখের জল ঝরায়। চাল নেই, তরিতরকারি নেই, নুন নেই, উনুন জ্বালানোর কিছু নেই।
এক সময় শান্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়, জঙ্গলে যদি খাবার মতো কিছু লতাপাতা পাওয়া যায় তাই আনতে হবে।
অশান্ত মানুষের সবচে বড়ো আর গভীর দুঃখ একটাই— যে কারণে সে অশান্ত সে কারণের উপশম কখনো হয় না, সেই কারণকে সহ্য করেই শান্ত হতে হয়। দুঃখ সহ্য হয়ে গেলে তখন মনে করে উপশম হয়েছে। দুঃখ সহ্য হওয়াকে মানুষের মনে হয় দুঃখ চলে গেছে।
[মানুষকে নিয়ে খাদ্যের হাসি-মজা]
মাধবী বাইরের ঝোপে লতানে লাউগাছ দেখতে পায় কয়েকটা। লাউ বা জালি-লাউও নেই একটা; শুধু লকলকে লতা। সে লাউগাছের ডগা পাতা তুলে। একটা সবুজ সাপ তার হাতে ছোবল দিতে আসে, মাধবী ছিটকে দূরে সরে যায়। মাধবীর লতানিয়া দেহ ভয়ে কাঁপতে থাকে হিহি করে। তার ভয় পাওয়া দেখে লাউডগা হাসতে থাকে হিহি করে। মাধবী দেখে সাপ নয়। তবু বুকের ধকধকানো সামলাতে আরও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
[প্রশ্ন জীব না ঈশ্বর? উত্তর জীব না ঈশ্বর?]
লাউলতা সিদ্ধ করে নিজে খায়, বাপকে খেতে দেয়।
তার মা বলত— ‘একটু লং লংকা না হলে কি আর তরকারি হয়? মসলা হলো তরকারির আত্মা।’
এই যে লাউলতা সিদ্ধ করেছে মাধবী তাতে লবণ ছাড়া আর তেমন কোনো মসলা নেই তবু তার বাবা কী তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে।
‘তুই আমার লক্ষ্মীরে মা; আঁধার ঘরের মানিক’— শ্রীদামের বুকের ভেতর একটা আবেগের মুরগি হ্যাঁচড়প্যাঁচড় করে। বুকে মুরগির হ্যাঁচড়প্যাঁচড়ে অন্তর কাটা রক্ত বেরিয়ে আসে শ্রীদামের চোখ দিয়ে।
মাধবী বলে— ‘বাবা কেঁদ না।’
সে তার বাবার পায়ের ক্ষতটুকু দেখে মমতামাখা কণ্ঠে বলে— ‘তাই তো বাবা, এখানে আবার কী হলো?!’
সকালে করা প্রশ্নের সাড়া বিকেলে করল মাধবী। তাও কোনো উত্তর নয়, আবার প্রশ্ন। প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করল মাধবী। প্রশ্নের উত্তরে বিস্ময় প্রকাশ করল মাধবী।
প্রশ্নের আসলে কি উত্তর আছে?
উত্তরের কোনো প্রশ্ন আছে?
প্রশ্ন উত্তরের কে?
উত্তর প্রশ্নের কে?
প্রশ্ন ঈশ্বর আর উত্তর জীব?
না কি প্রশ্ন জীব আর উত্তর ঈশ্বর?
[সংগমসমগ্র]
নিঃশব্দ-নীল শরীর নিয়ে শ্রীদাম শুয়ে থাকে। তার ভেতর কখনো হ-য-ব-র-ল কখনো অ-হ-য-ব-র-ল ভাবনা খেলা করে; ভাবনার রেলগাড়ি ছুটে। ভাবনার ভেতর এই বিরামহীন ছুটাছুটি তাকে ক্লান্ত করে তোলে। ওরে ভাবনারা থাম রে, ভাবজল আর খাব না, ডাবজল খাব। বড্ড তেষ্টা বুকে।
সে একটা প্রশ্নের কারখানা হয়ে গেছে। হাজার হাজার লাখ লাখ প্রশ্নপাখি তার চোখ ঠুকরে খাচ্ছে, কান ঠুকরে খাচ্ছে, হৃদয় ঠুকরে খাচ্ছে। শ্রীদাম ছটফট করে, ওরে প্রশ্নপাখিরা, ওরে প্রশ্নবিচ্ছুরা, ওরে প্রশ্নবিছুটিরা আর জ্বালাসনে। তার চোখ ভরে জল আসে।
এখনো জল আসে কোথা থেকে?
এ মরার মতো লিকলিকে শরীরে এখনো জল অবশিষ্ট আছে?
অতীত দৃশ্য থেকে জল আসে। বর্তমান দৃশ্য থেকে জল আসে। ভবিষ্যৎ দৃশ্য থেকেও জল আসে। জলে জলে ভেসে যাচ্ছে শ্রীদাম।
তার পুরাতন দৃশ্য মনে আসে; একরাতে বিছানায় একা একা শুয়েছিল সে, কাজ সেরে আরতি দরজায় হুড়কা মেরে এসে পাশে শোয়। সোজা শুয়ে আছে শ্রীদাম, সোজা শুয়ে আছে আরতি। পাশাপাশি। ভাসাভাসি। যেন বিছানা একটা নদী, তারা দুজন ভাসছে। শ্রীদাম একটু একটু করে এগিয়ে গিয়ে জাপটে ধরে আরতিকে।
আরতি কপট রাগ করে, সরতে গিয়ে আরো কাছিয়ে আসে— ‘আরে আরে কী করো, ছাড়ো খুব সকালে উঠতে হবে।’
শ্রীদাম ছাড়ে না। আরতির কপট রাগ তার ভালো লাগে। চুমোয় চুমোয় ভরে দেয় আরতির শরীর। চুমাচুমি চলে। আরতি তার দেহদরজার খিল খুলে খিলখিল করে হাসে। একসময় হাসি থামে। শ্বাসপ্রশ্বাস ঘন আর গাঢ় হয়ে যায়। পরে শিশ্ন সেঁধিয়ে দিয়ে আরামে স্থির থাকে শ্রীদাম। আরতি চোখ বন্ধ করে আবেশে। স্থিরই থাকে শ্রীদাম।
আরতি ফিসফিস করে বলে— ‘থেমে আছো কেন?’
শ্রীদাম ফিসফিস করে বলে— ‘নরনারী আসলে একটাই শরীর, এ ব্যাপারটাকে অনুভব করে নাও আরতি। রাতের বেলা মানুষ পুরো একটা হয়ে থাকে দিনের বেলা অর্ধেক অর্ধেক হয়ে যায়; অর্ধকৃত মানুষের এক অর্ধ-নারী হয়ে আরেক অর্ধ-পুরুষ হয়ে ঘুরে বেড়ায়।’
শিশ্নকে আরো একটু চাপ দিয়ে শ্রীদাম বলে— ‘এই যে দেখ, তোমার রতিগৃহে আমার রতিগৃহী কীভাবে আশ্রয় নিচ্ছে; অন্যসব আনন্দ পেতে নারী একাই একশ, পুরুষ একাই একশ; কিন্তু এই সংগমের আনন্দের সাথে তুলনা করা চলে এমন কোনো আনন্দ পৃথিবীতে নেই; এই আনন্দ নারী ছাড়া পুরুষ কোনোদিন পাবে না, পুরুষ ছাড়া নারী কোনোদিন পাবে না।’
আবার কিছুটা চাপ দিয়ে শ্রীদাম বলে— ‘দেখ, তোমার আমার দেহ কীভাবে এক হয়ে এঁটে আছে। মানে পৃথিবীতে মানুষ আছে আটশকোটি একথা ভুল আসলে মানুষ চারশকোটি। চারশকোটি মানুষ দিনের বেলা নারী আর পুরুষে আলাদা হয়ে আটশকোটি হয়। তুমি বলতে পারো, যারা শিশু বা যাদের বিয়ে হয়নি তাদের ক্ষেত্রে কী? তাদের ক্ষেত্রেও তাই, বিয়ে হবে তো; তারাও মিলবে তো; তাদের হিসাবটা একটু অগ্রিম হয়ে গেল এই আর কী।’
এ মুহূর্তে আরতির এসব শুনতে ভালো লাগে না। সমগ্র পৃথিবীর সংগম-ইতিহাসে এমন হয়েছে কি যে সংগমের মধ্যে এতো ভারি ভারি কথা বলে কেউ। সে বিরক্ত হয়। শ্রীদামকে তাড়া দেয়।
শ্রীদাম আর কথা বলে না। রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। দুজনের সংগমীয় গোঙানি দেয়ালে দেয়ালে লেগে তাদের কানেই ফিরে আসে, সংগীতের মতো বাজে। শরীরের সংগীত শেষ হয় একসময়। শিশ্নের মুখ দিয়ে সবকিছু গলে যেন যোনির ভেতর ঢুকে গেল। পুরো শ্রীদাম যেন গলে তরল হয়ে শিশ্নপথে বেরিয়ে গেল। শ্রীদাম থামে। হাঁপাতে থাকে।
তার হাঁপানি থামলে বলে— ‘শিশ্ন মানে সরলরেখা অথবা একটা তীর, যোনি মানে বক্ররেখা—বৃত্ত অথবা চাঁদমারি।’
আরতি উচ্চারণ করে— ‘উঁ।’
শ্রীদাম বলে— ‘বুঝলে আরতি যখন একা শুয়ে ছিলাম তখন নিজেকে একটা বিয়োগচিহ্নের মতো লাগছিল; একটা সরলরেখার মতো লাগছিল আর তুমি যখন আমার পাশে এসে শুলে তখন দুজনকে মনে হচ্ছিল সমান-চিহ্নের মতো; সমান্তরাল চিহ্নের মতো।’
আরতি বলে— ‘উঁ’।
তার ঘুম আসছিল হয়তো। আরতিকে আর কিছু বলেনি শ্রীদাম।
আরতির সংগমপরবর্তী ক্লান্তি আর ঘুম দেখে তার ভাবনা আরেকদিকে মোড় নিয়েছিল। সংগম শেষ হলেই মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দুজন দুদিকে নেতিয়ে পড়ে থাকে। কেউ যেন কারো নয়। কেউ যেন কাউকে চেনে না। এ ব্যাপারটা এতদিন খেয়াল করেনি।
শ্রীদাম ভাবে, সংগমের ফলে একজন পুরুষ ঠিক যেমনটা আনন্দ পায় একজন নারীও কি একই আনন্দ পায়?
এই আনন্দ একই হতে পারে না, কারণ একজন অন্যের ভেতর ঢুকছে একজন ঢুকতে দিচ্ছে। আনন্দের উৎস একটাই— সংগম; অথচ নারী জানে না পুরুষটি তার কাছে থেকে কী আনন্দ নিচ্ছে; পুরুষ জানে না নারীটি তার কাছে থেকে কী আনন্দ নিচ্ছে।
সংগম— আনন্দের একটা উৎস। একই উৎস থেকে তারা আনন্দ নিচ্ছে কিন্তু সংগমরত পুরুষটি বুঝতে পারছে না নারীটিকে সে কী আনন্দ দিচ্ছে; নারীটি বুঝতে পারছে না পুরুষটিকে সে কী আনন্দ দিচ্ছে।
নারীর স্তন দুহাতে মন্থন করে কী সুখ পুরুষের?
পুরুষের হাতে মন্থিত হয়ে নারীর কী সুখ?
সংগমানন্দ কী?
কেউ কি সংজ্ঞার মতো করে বলতে পারে?
সংগমের স্বাদ কেমন কেউ বলতে পারে; যেমনভাবে আম বা আঙুর বা করলা ভাজি খেয়ে বলতে পারে তেমনভাবে?
পুরুষেরটা নারী জানে না, নারীরটা পুরুষ জানে না। এ এক আজব।
সংগমের স্বাদ পাবার জন্য পৃথিবীর অজস্র বাধাবিপত্তি ডিঙে, ভেঙে নারী পুরুষ এক হয় কোনো একসময়। হাজার হাজার বাধা নারী পুরুষের মিলনে। এসব বাধার মধ্যে আছে নিজেদের প্রচণ্ড মিলনেচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভেতরের লাজলজ্জা বেশ বড়ো হয়ে মনকে দখল করে থাকে। এই লাজলজ্জা জয় করার পর আসে সমাজের চোখরাঙানি, শাসন, গালাগাল, মার।
নারীপুরুষের এই মিলনের মাঝখানে আছে অজস্র বৈধাবৈধের আইনের আড়াল। বৈধ হলেও অজস্র লুকোচুরি, অজস্র গোপনীয়তা নিশ্চিত করার পরও বাধা থেকে যায় পোশাক। পোশাক থেকে বের হয়ে সংগমের স্বাদ পেতে হয় মানুষকে। দুটি মানুষের এতো এতো চাওয়ার ফল, এত এত সংগ্রামের ফল এই সংগম।
রতিক্রিয়া নরনারীর যৌথক্রিয়া; এ ক্রিয়া একা কোনোভাবেই সম্ভব না, হয়তো হিমগিরিকে একাই কেউ সরিয়ে ফেলতে পারে কিন্তু একলা একা কেউ যৌনসংগমের স্বাদ পাবে না। অথচ এই দুইজনের যৌথক্রিয়ার যূথের একজন আরেকজনের সুখ-সফলতা, মত্ততা উত্তালতা বুঝতে পারছে না। তাহলে পৃথিবীর অজস্র মানুষ যে যূথবদ্ধভাবে অফিস আদালত কারখানা খামারে বহুবিধ কাজ করে বেড়াচ্ছে তারাও তো কেউই কারো উদ্দেশ্য বিধেয় কিছুই বুঝতে পারছে না।
তাহলে এসব মিলমিশ আর মিলমিলাও আর যূথবদ্ধতার আসলে কাজটা কী?
শ্রীদামের ভাবনা আবার মোড় নেয়, ভাবনার ঘোড়দৌড় যেন চলছে তার ভেতর।
সংগম কি আসলেই সুখের?
তবে সেই সময় মানুষ হাসে না কেন?
কাঁপে কেন?
হাঁপে কেন?
গোঙায় কেন?
এই হাঁপানোর শব্দ, গোঙানোর শব্দ বাইরে থেকে যদি শোনা যায় তবে কি বাইরের কোনো মানুষ হঠাৎ করেই মনে করবে না কোনো রোগার্ত হাঁপাচ্ছে বুঝি, গোঙাচ্ছে বুঝি?
আবার উল্টোটাও হতে পারে, কোনো রোগার্ত মানুষ যদি অনুরূপ শব্দ করে তবে বাইরে দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ মনেও করতে পারে তুমুল সংগম চলছে।
মানুষ তো আনন্দে বা সুখে হাসে তবে সংগম যদি সুখেরই হবে তবে মানুষ গোঙায় বা হাঁপায় বা কাঁপে কেন?
তবে কি নিম্নমার্গের আনন্দে সুখে হাসে আর উচ্চমার্গের আনন্দে সুখে গোঙায়?
তবে কি নিম্নমার্গের দুঃখে কাঁদে আর উচ্চমার্গের দুঃখে হা হা করে হাসে বা পাথর হয়ে যায়?
তাহলে মৃত্যু কী সংগম তুল্য?
মৃত্যুর অভিজ্ঞতা যেমন কেউ বলে যেতে পারে না তেমনভাবে সংগমের স্বাদের কেউ বর্ণনা দিতে পারে না?
এসব ভাবতে ভাবতেই সে আরতির সুন্দর শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছিল বহুক্ষণ। কপালে পড়া চুল আদর করে সরিয়ে দিয়েছিল। আরো আরো আদরের, চাদরের স্মৃতি তার মনে পড়ে; সংগমসমগ্রের পাতা উল্টেপাল্টে আসে তার চোখের সামনে ছবির মতো।
এখন শ্রীদাম দীর্ঘশ্বাস নয়, হ্রস্বশ্বাস নয়, স্বাভাবিক শ্বাস নয় শুধু একটা শ্বাস ফেলল— প্রাণ বাঁচানিয়া শ্বাস। সে ভাবে, সেসব দিন চিরকালের মতো অতীতাগারে বন্দি হয়ে গেছে। অতীতে যা বন্দি হয়ে গেছে সেগুলোর মুক্তি কোনোদিন হবে না। তবু অতীতের হাত থেকে কেউ মুক্তি পায় কি?
এবার আরো একটি অতীত তার মনের ভেতর উঠে এলো যেমনভাবে জলের তলা থেকে হঠাৎ করে শিশুক ভেসে উঠে; বা পুরাতনকালের শুকিয়ে যাওয়া নদীগর্ভ থেকে গাঁইতির কোপে উঠে আসে পাথর বা তামারপাতে লেখা শিলালিপি বা তাম্রলিপি।
শ্রীদামের মনে পড়ে— এক রাত। ঘুমাচ্ছিল আরতি।
ঘুমের ঘোরে আরতি বলে উঠেছিল— ‘মরার দুঃখ খালি ঘুরে ঘুরে আসে।’
বিস্ময় নিয়ে শ্রীদাম ঘুমন্ত আরতির দিকে তাকিয়েছিল। শ্রীদাম ভাবছিল, ঘুমন্ত মানুষের কথার দাম আছে। ঘুমন্ত মানুষ খাঁটি কথা বলে। জাগন্ত মানুষ খাঁটি কথা বলে না; সুবিধামতো কথা বলে; খাঁটি কথাকে মাটি করে দেয়। ঘুমন্ত আরতির কথাই ঠিক; অতীতের সুখ কখনো অতীতঝাঁপি থেকে বের হতে পারে না, কিন্তু দুঃখ কষ্ট বেরিয়ে এসে বর্তমানের ওপর বাঘ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, বর্তমানকে নিহত করতে পারে, ভবিষ্যৎকে ক্ষতবিক্ষত করে দিতে পারে; ভবিষ্যতের দুঃখও উঁকিঝুঁকি দিয়ে বেদনা দিতে পারে মানুষের চেতনে অচেতনে যেমনভাবে সিনেমার ট্রেইলার দেখায় সিনেমা মুক্তি পাবার আগেই। দুঃখদুর্দশা অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ পরিভ্রমণ করতে পারে ইচ্ছে মতো। সুখ পারে না। সুখ যখনকার তখনকারই। ঘুমন্ত মানুষ পৃথিবীর সকল কথা জানে, সকল দর্শন জানে। শ্রীদামের সেদিন ইচ্ছে হয়েছিল ঘুমন্ত আরতিকে আরোকিছু প্রশ্ন করে জেনে নিতে।
সে জিজ্ঞাসাও করেছিল— ‘দুঃখ খালি ঘুরে ঘুরে আসে কেন আরতি?’
কিন্তু ঘুমন্ত মানুষ নিজে থেকে যেটুকু বলবে ততটুকুই তার বেশি বলবে না। জাগ্রত মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেবে না ঘুমন্ত মানুষ। বেশি জোর করলে সে জেগে যাবে। ঘুমন্ত মানুষকে ঘুমিয়েই প্রশ্ন করতে হয়।
যেহেতু ঘুমন্ত আরতিকে জাগ্রত শ্রীদাম প্রশ্ন করেছিল সেহেতু ঘুমন্ত আরতি জেগে গিয়ে বলে উঠেছিল— ‘এই শ্রীদাম ঘুমের ভেতর এসব কী বলছ?’
হা হা করে হেসে উঠেছিল শ্রীদাম— ‘আমি ঘুমাইনি প্রিয়সখী, তুমিই ঘুমিয়ে গেছিলে।’
আরতি লাজুক হাসি হেসেছিল কিছু বুঝতে না পেরে। আরতি বুঝতে পারছিল না, আসলে কে জেগে ছিল আর কে ঘুমিয়েছিল? শ্রীদাম আরতিকে বুকের ভেতর টেনে নিয়েছিল।
এখন ভাবছে— আচ্ছা, সেদিন আরতিই কি ঠিক বলছিল?
তার প্রশ্নই কি ঠিক ছিল— ‘এই শ্রীদাম, ঘুমের ভেতর এসব কী বলছ?’









