[নারী রাবণ। পুরুষ সীতা।]
আরতির মনে পড়ে, শ্রীদাম একবার বলেছিল— ‘বুঝলে আরতি, যোগ কিন্তু দুরকম। সুযোগ আর কুযোগ। একটা মানুষ যুগপৎ সুযোগের তির হয়ে আর কুযোগের চাঁদমারি হয়ে বসে আছে। কখন যে সুযোগের তির ছুঁড়বে আর কখন যে কুযোগের তিরাঘাতে পড়ে যাবে তার সময় নির্ণয় নেই।’
এভাবে শ্রীদামের কতশত দার্শনিকতার কথা মনে পড়ে। রমজান ডাক্তারের কত ধার্ষনিকতার কথাও মনে পড়ে। দার্শনিক শ্রীদামের কথা মনে পড়লে বিষণ্ন হয়ে ওঠে সে। ধার্ষনিক রমজানের কথা মনে পড়লে কুঁকড়ে যায়, রাবণের কথা মনে পড়ে; সীতাদেবীর মতো মাটির তলে চলে যেতে ইচ্ছে করে।
যদিও সে খুব ভালো করে জানে, এরপরেও শ্রীদামের কাছে ফিরে গেলে রামের মতো শ্রীদাম তাকে পাতালবাসী হবার পথে ঠেলে দিত না, গ্রহণ করত। শ্রীদাম রামের চেয়েও ভালো; রাম কি এর চেয়ে ভালো ছিল? রামকে সকলে যুগযুগান্তর ধরে পূজা করছে কিন্তু সে রামের চেয়ে ভালো কাউকে পেয়েও পূজা করা তো দূরের কথা সামান্য কর্তব্যকর্ম তো নয়ই বরং উল্টোটা করেছে সে।
হে জানকী, হে সতীসীতা আমার শ্রীদামের পূণ্যের ফলে হলেও আমাকে তোমার কাছে, তোমার পাতালপুরীতে নিয়ে চল এই রমজানের চিতা থেকে; যেভাবে তুমি চলে গেছ রাবণের চিতা থেকে। তুমি যে জ্বালায় জ্বলছ ওখানে আমি তার বিপরীত জ্বালায় জ্বলব একসাথে বসে বসে; দশরথ রাম তোমাকে বোঝেনি; আমিও বুঝিনি তোমার রামের চেয়ে ভালো শ্রীদামকে। তুমি তো রাবণের তৈরি করা চিতায় পড়োনি রসাতলে গেছ রামের তৈরি করা চিতায়। আমার তৈরি করা চিতায় পুড়েছে আমার স্বামী শ্রীদাম। যদি সীতা সর্বনাশের জন্য রাবণ দায়ী হয় তবে আমি নারী রাবণ আর শ্রীদাম পুরুষ সীতা আর যদি রাম দায়ী হয় তবে, আমি নারী রাম আর শ্রীদাম পুরুষ সীতা।
মানুষ চরমরূপে স্বার্থপর এর বাইরে কোনো সত্য নেই। স্বার্থের রূপের চেয়ে সুন্দর রূপ আর কিছু নেই। এই স্বার্থের রূপেই মজে থাকে মানুষ। নারীর কাছে তার স্বার্থ সবচে সুন্দর নর। নরের কাছে সবচে সুন্দরী নারী তার স্বার্থ। স্বার্থ ছাড়া যাত্রা নেই, স্বার্থ ছাড়া সার্থ নেই। মানুষ দেহে মেরুদণ্ডী প্রাণী, মনে স্বার্থদণ্ডী প্রাণী।
স্বার্থদণ্ডী পুরুষ রমজান ডাক্তারের সুযোগের আগুনে পুড়ে গেল শ্রীদাম, মাধবী আর আরতি। স্বার্থদণ্ডী নারী আরতির সুযোগের তিরে বিদ্ধ হলো শ্রীদাম আর মাধবী। আরতির গলায় পরানো কুযোগের ফাঁস এঁটে গেল। শ্রীদাম কুযোগের ফাঁস খেয়ে বেরিয়ে গেল সকল যোগ বিয়োগ গুণ ভাগের বাইরে।
মাধবী কুযোগে পড়ে গেছে, সুযোগ কি তার আসবে?
এলে সুযোগের তির কি সে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারবে?
আর কোন সুযোগই বা আছে তার জন্য?
শ্রীদাম আর কোনোদিন কৃষ্ণবর্ত্মা থেকে ফিরবে?
না, আর ফিরবে না শ্রীদাম কোনোদিন। প্রতিটা মানুষই অগস্ত্যমুনি, একবার চলে গেলে আর ফেরে না। প্রত্যেকটা মানুষের কপালেই অগস্ত্য যাত্রার ডাকটিকিট আঁটা থাকে।
তার মাধবীর কথা মনে পড়ে— ‘আহা বাছা তুই কেমন আছিস? যৌবনের চাকার তলে পড়ে তোর মা আজ পিষ্ট হয়ে পড়ে আছে ধুলোতে।
মাধবীর বাবার কথা তার মনে পড়ে— ‘আহা মাধবীর বাবা, ওপরে তুমি কেমন আছ? কত কষ্ট দিলাম তোমাকে। যৌবনের করাতে ফেড়ে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে খণ্ড খণ্ড হয়ে গেলাম। যৌবনের জাঁতাতে পড়ে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেলাম। কেউ হিন্দু বলে, কেউ মুসলমান বলে, কেউ খানকি-মাগি বলে। কেউ মানুষ বলে কাছে ডেকে নেয় না।’
[সুযোগের তির। কুযোগের চাঁদমারি।]
আরতি শুয়ে আছে। ঘুম আসে না। মশারা আরতিকে নিয়ে উলসায়, হুল বসায়। মশাদের উল্লাস নির্মম, নির্মম তাদের হুল ফুটানো। সবকিছু নির্মম, মশা, মানুষ, ভগবান, আল্লা।
ইউনিয়ন পরিষদের নতুন বিল্ডিংটা পুরাতন বিল্ডিংয়ের ঠিক পাশেই ঝকঝক করছে, আলো ঠিকরে পড়ছে কিন্তু এক বিন্দু আলো আসছে না এই পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ে। নিকষকালো রাত। মশার গায়ের মতো অন্ধকার। মশার হুলের মতই তার বিষ।
আচ্ছা, অন্ধকার কার গায়ের মতো আল্লার, না ভগবানের?
না, মানুষের ভেতরের মতো?
অন্ধকার কার গায়ের মতো, শয়তানের, না অসুরের?
না মানুষের ভেতরের মতো?
আল্লার অন্তর কেমন?
ভগবানের অন্তর কেমন?
মানুষের অন্তর কেমন?
সব অন্তর তার দেখা হয়ে গেছে। সে তার নিজের অন্তরও দেখে ফেলেছে। নিজের অন্তর দেখে সে আঁতকে উঠেছে। মানুষ তার নিজের অন্তর দেখে না বা দেখতে পায় না বলেই কত রকম অহংকার করে বেড়ায়, যখন অন্তর দেখে নেবে তখন কোথায় তার অহংকার ডুবে যাবে। মানুষ নিজের অন্তরে ডুব দিয়ে দেখে না, শুধু বাহির দেখে আর অহংকারে হুংকার দিয়ে বেড়ায়। শেষে নিজের ভয়ংকর অহংকারের অন্ধকারে নিজেই পথ হারায়।
ভেতরের বিষের বাদলে আরতি ভিজছে। সে কুঁকড়ে আছে বিষে, বেদনায়। সে এখন রাস্তার মানুষ। কত মানুষকে সে পথে ঘাটে বেওয়ারিশ হয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে তাদের মতোই সেও এখন।
আগে ওসব লোককে দেখে তার শুধু মনে হতো— কোথায় লোকগুলোর বাড়ি? কেন তারা এভাবে ঘুরে বেড়ায়?
তাদের মা বাবা, আত্মীয়স্বজন নেই?
আজ সেসব প্রশ্নের উত্তর এসে দাঁড় হয়েছে তার সামনে। কিন্তু উত্তরের দিকে তাকাবার শক্তি নেই আরতির। উত্তরের সামনে দাঁড়ালে তার মাথা ঘুরে ওঠে। সে চোখ বন্ধ করে নেয়। প্রশ্নগুলো, উত্তরগুলো জোর করে তার চোখের পাতা টেনে ধরে তার সামনে নগ্নদেহে দাঁড়ায়। সে ছটফট করে, কেঁচোর গায়ে লবণ ছিটিয়ে দিলে যেমন ছটফট করে। পুরো দেহ কাঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে। কান্নার দমকে তার দেহ দুলছে। তার প্রশ্নের উত্তর সে নিজেই! বহু আগে নিজের মনে ক্ষণিকভাবে উদয় হওয়া একটা প্রশ্নের উত্তর সে পুরোটাই নিজে! সামান্য একটা প্রশ্নের উত্তর তার পুরো জীবন! সে সহস্র বিস্মিতি নিয়ে ব্যথা নিয়ে কাঁদছে।
[ঘরগোশ থেকে খরগোশ। নারীনী থেকে চারিনী।]
সে হতভম্বের একটা কারখানা হয়ে গেছে। সে নিজেকে দেখে নিজেই হতভম্ব হয়। কীভাবে কীভাবে সে এই অবস্থার ভেতর এসে পড়ল। সে তো খুবই লাজুক ছিল— লাজুকস্য লাজুক। সে তো বিবরবাসীর মতো ছিল বিয়ের আগেও এবং পরেও। সে তো নারীস্য নারী ছিল। পুরুষের মধ্যে যেসব পুরুষের পৌরুষ আরো বেশি সুপুরুষ তেমনভাবে নারীদের মধ্যে যেসব নারী আরো নরম কোমল তারাই তো নারীনী; তেমনই সে ছিল নারীদের মধ্যে নারীনী।
শশককে যেমন খরগোশ বলে তেমনভাবে অন্য নারীরা তাকে ঘরগোশ বলত। সে কীভাবে ঘরগোশ থেকে খরগোশ হয়ে গেল। সে কীভাবে ঘরের ঘটাকাশের ভেতর থেকে পৃথিবীর বিরাটাকাশের নিচে পড়ে গেল। সে কীভাবে বিবরকণ্যা থেকে ধীবরকণ্যা হয়ে গেল, সেইসব পুরাকালের ধীবরকণ্যাদের মতো যারা খেয়া পারাপার করত, যারাকে অনেকসময় বারোয়ারি পুরুষযাত্রীদের যৌনডাকে সাড়া দিতে হতো ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়। আরতি নিজেকে নিয়ে যতভাবে ভাবে ততভাবেই হতভম্ব হয়ে যায়, হিসেব মেলে না।
তাকে দেখে অন্যান্য জীবজন্তু, বীজবিচি, গাছ, জড়পাথরের আক্কেলগুড়–ম হয়ে যায়।
কয়েকটা বটবীজ তার মাথায় পড়েছিল। বটবীজ খুব ছোটো; ছোটো উকুনের সমান ছোটো। বটবীজ তার মাথাকে মাটি ভেবে নিয়ে অঙ্কুরিত হতে গিয়ে হতভম্ভ হয়ে গেছিল; মাথা চুলকাতে গিয়ে আরতির নখে ধরা পড়ে গেছিল বটবীজ। তার গায়ে শ্যাওলা জন্মাতে গিয়েও হতভম্ভ হয়ে যায়।
ধুলোবালি তার গায়ে জমতে গিয়ে নড়াচড়াতে গা থেকে পড়ে যাবার সময় হতভম্ভ।
পিঁপড়ারা তাকে কামড়াতে আসে আর যখন সে নড়ে ওঠে তখন পিঁপড়ারা হতভম্ব হয়ে যায়। তার নড়াচড়ার দিকে ইঁদুরেরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। তেলাপোকারা চোখের ভেতর ঢুকতে গিয়ে বাধা পেয়ে হতভম্ব হয়ে যায়। ছুঁচোরা কিচকিচ শব্দ বন্ধ রেখে তার নড়াচড়া দেখে। বিড়াল সতর্ক পায়ে হেঁটে যাবার সময় সহসায় মাথা ঘুরিয়ে তাকে দেখে, ঞ ঞ করে ডেকে চলে যায়।
পিঁপড়া আসে, কুকুর বিড়াল আসে, ব্যাঙ আসে, সাপ আসতে পারে না?
সাপ এসে তাকে পাপ থেকে, শাপ থেকে মুক্তি দিতে পারে না?
চাপ থেকে তাপ থেকে?
[ক্ষুধানট। অশ্রুনটিনি।]
আরতির রূপ রমজান ডাক্তারের মুখস্ত হয়ে গেছে কিন্তু এ অঞ্চলের অন্য সকলের তো মুখস্ত হয়নি। আরতির রূপের মধু এখনো চুয়ে চুয়ে পড়ে। চুয়ে পড়া রূপের মধু সে পা দিয়ে ধুলোতে ঢেকে রাখতে চায় যেমনভাবে কুকুর বিড়াল পায়খানা করার পর ধুলো দিয়ে ঢেকে রাখতে চায় তাদের মলমূত্রকে।
নিজের রূপ কুকুর বিড়ালের গুয়ের মতো হয়ে গেছে তার কাছে। কিন্তু তার কাছে তার রূপকে কুকুর বিড়ালের গু মনে হলেও অনেকের কাছে তা-ই রসমালাই, তা-ই রসমুণ্ডি। বাইরে হেঁটে বেড়ানোর সময় সে মানুষের লোলদৃষ্টি দেখেছে, মানুষের চোখে চোখে লোভদৃষ্টি দেখেছে।
যার যার দৃষ্টি তার তার কাছে তার তার দৃষ্টি ফিসফিস করে বলে— ‘এই যে একটা সুমিষ্ট রসকদম হেঁটে যাচ্ছে বা একটা রসময়ী কমলা বা রাঙা আপেল বা টসটসে টমেটো।’
এসব দৃষ্টি আরতিকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়; এসব চোখের দংশন তাকে দুমড়ে মুচড়ে দেয়।
রাত। সে এসে শুয়ে পড়েছে পুরাতন পরিষদের বারান্দায়। পেটে রাষ্ট্রের ক্ষুধা জমা হয়ে আছে।
সে তার ক্ষুধাকে বলে— ‘ঘুম যা। জেগে থেকে লাভ নেই।’
সে তার পিপাসাকে বলে— ‘একটু দাঁড়া তোর মাথায় জল ঢেলে দিচ্ছি।’
সে পরিষদের টিউবওয়েল থেকে জল খেয়ে আসে। পিপাসা হাসে। তার পেটের ক্ষুধা চাগিয়ে ওঠে। ক্ষুধা তো একটা আলাদা জীব। মানুষের ভেতর থেকে মানুষকে খায়। মানুষেরা খাবার খেয়ে খিদেজীবকে তাড়িয়ে দেয়। সব মানুষের খেদিয়ে দেওয়া এসব খিদেজীব তার পেটে এসে মিছিল শুরু করেছে।
কী রে ক্ষুধাগণ তোদের কিসের দাবিদাওয়া?
এই আরতির কাছে তোদের কী দেনা-পাওনা আছে?
এ প্রাণটা নিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কী ফল ছিঁড়ে নেবার আছে রে ক্ষুধাছুরি? নে, প্রাণটা ছিঁড়ে নে, প্রাণফল ছিঁড়ে নে দেহবৃক্ষ থেকে।
সে বিড়বিড় করে। ক্ষুধারা তাকে ঘিরে ভিড় করে ঘন হয়ে। যেভাবে কুত্তা তাড়ায় সেভাবে সে ক্ষুধাকে তাড়ানোর চেষ্টা করে। যেভাবে ভিখারিকে বড়োলোকদের বাড়ির দিকে পাঠিয়ে দেয় সেভাবে সে ক্ষুধাকে তাড়ায়।
ভিখারি উল্টে বলে— ‘বড়োলোকের বাড়িতে ভিখ মিলে না গো মা, বড়োলোকেরা বড্ড ছোটোলোক।’
ক্ষুধা বলে— ‘বড়োলোকের বাড়িতে আমরা থাকি না রে আরতি, গরীবের পেট আমাদের আসল আর আদি আবাস। সত্য আর নিত্য নিবাস।’
তার পেটের ভেতর ক্ষুধারা নৃত্য করে; খাদ্য আর ক্ষুধাই আদিদেব। তার চোখ দিয়ে জল ঝরে। চোখের জল নাচতে নাচতে গড়িয়ে পড়ে মাটিতে মিশে। অশ্রুনটিনির নাচ, ক্ষুধানটের নাচ থামে না।
সে কতরকমভাবে কতরকম কারণে আরো অপমানিত হবে। যৌবন এক ক্ষুধা, যার জন্য সে অপমানিত হয়ে জাত ছাড়া হয়েছে, পাত ছাড়া হয়েছে, ছাত ছাড়া হয়েছে। যৌবন এক অপমানকারী যার জন্য সে ছাতা ছাড়া হয়েছে স্বামীর, জুতা খাওয়া হয়েছে সমাজের। এখন অপমান করার জন্য পেট হাজির হয়েছে। মনে মনে সে কুঁকড়ে ওঠে কখন তার ক্ষুধা তাকে অপমান করার জন্য শক্তিশেল প্রয়োগ করে ফেলে। ক্ষুধারা গল্পের ঐ একচোখো হরিণের মতো, শুধু একদিক দেখে। একচোখো ক্ষুধারা মান দেখে না, সম্মান দেখে না, শুধু খাবার দেখে। ক্ষুধা মানের পক্ষে নেই, মনের পক্ষে নেই; প্রাণ আর দেহের পক্ষে সবসময়।
পাশেই নতুন পরিষদের খাদ্যগুদাম। এই গুদামে দরিদ্রদের জন্য দারিদ্র্যমোচনের সরকারি চাল জমা থাকে, গম জমা থাকে। সেখান থেকে চাল-গমের বিশাল বিরাট গন্ধের ঢেউ ভেসে আসে নাক বরাবর। তার ক্ষুধা তাকে থাপড়াতে থাকে ভেতর থেকে। তার ঘুম অচেনা কুত্তার মতো তাকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে কিন্তু কাছে আসে না। তার চোখ জুড়ে বসে না। তার ঘুম তাকেই চিনতে পারে না।
ঘুমেরও স্মৃতিবিভ্রম ঘটে?
যার ঘুম তাকেই চিনতে পারে না?
আরতি ভাবে, কত কী দরকার মানুষের! ঘুমের দরকার, চুমের দরকার, দমের দরকার, যমের দরকার, চালগমের দরকার। চুমের দরকার সারতে গিয়ে তার ঘুম বেজার হয়ে গেছে। ঘুম না এলে কীভাবে একটুক্ষণের জন্যে হলেও দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হবার স্বাদ পাবে। কতদিন ঘুমের স্বাদ পায়নি সে।
ধান গম লবণ মাংস; সকল খাদ্যবস্তুর গায়ে সিলমোহর মারা থাকে, কার পেটে যাবে আর কার পেটে যাবে না; কার পেটে কতখানি যাবে; কার পেটে যাবে ভালো খাবার আর কার পেটে যাবে বাসিপচা; খাদ্যপ্রাণযুক্ত খাবার আর খাদ্যমরণযুক্ত খাবার।
মানুষই প্রতিটা চালের গায়ে, গমের গায়ে সিল মেরে রাখে। পরিষদের গুদামের চালেও সিলছাপ্পর মারা আছে। দুস্থ দরিদ্রের জন্য এসব চাল। আরতি জানে না সে কী? পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বাররা তাকে চাল দেয় না। সে হিন্দু। সে মুসলমান। সে হিন্দুও না, সে মুসলমানও না। সে দাগি আসামি। সে মাগি আসামি। সমাজের দাগি আসামি। যৌবনের মাগি আসামি। এখন পেটের আসামি। মানুষ কত কিছুর আসামি। মানুষ তো আসামিই, সে একটু বেশি আসামি। আসামিস্য আসামি। জেলের আসামির থেকেও তার অবস্থা খারাপ। জেলের আসামি তবু নিশ্চিত দুবেলা খাবার পায় কিন্তু সমাজের আসামির কোনোকিছুরই কোনো নিশ্চিতি নেই; এই ত্রিশঙ্কু দশা থেকে মুক্তি নেই।
নিকষ রাত বইছে, নির্বাত রাত বইছে। সাত বা সাতাত্তর বা সাতশ সাতাত্তর রকম ভাবতে ভাবতে আরতি ছটফট করে পুরাতন পরিষদের বারান্দায়। তার ভেতর দ দ করে আগুন জ্বলছে যেন। সকল জ্বলা থেকে, যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে আত্মহত্যার কথা ভাবে। আত্মহত্যা করতে পারলে বেশ হয়। হাঘরে, হাভাতে, হাজাতে জীবন থেকে মুক্তি পাওয়া যেত। কতজনই তো আত্মহত্যা করে। জীবন জীবনের কোন পর্যায়ে গেলে তবে মানুষ আত্মহত্যা করে সেটা সে বুঝতে পারছে এখন।
ছ-সাত বছর আগে পাশের পাড়ার দেবেশদার বউ পৌলোমী বউদি গায়ে আগুন দিয়ে নিজের চিতা জ্বালিয়ে নিয়েছিল নিজেই; রান্নাঘর হয়েছিল তার শ্মশানঘাট; তারই জ্বালানো অগ্নিকুণ্ড তারই দেহমুণ্ডু, হৃৎপিণ্ড, ফুপিণ্ড একেবারে ছাই করে দিয়েছিল।
আত্মবিনাশীকে সব মানুষ ঘৃণা করে; মনে মনে ঘৃণা সে নিজেও করেছিল পৌলোমী বউদিকে; কষ্টও লেগেছিল।
অমরেশ ঠাকুর ধর্মসভাতে বল— ‘সপ্তখুনের মাফ আছে আত্মখুনের মাফ নাই। আত্মবিনাশ মহাপাতক, নরকেও ঠাঁই নাই, আত্মহা মুক্তি পাবে না কখনো; ভূতপ্রেত হয়ে, প্রেতযোনি হয়ে, ভুতযোনি হয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে; প্রেতনদী পার হতে পারবে না এই প্রেতাত্মা।’
কতসব কথা। ঠাকুরের এসব কথা সে বিশ্বাস করত গভীরভাবে। এখন আর বিশ্বাস হচ্ছে না। একটা মানুষ তো নরক থেকে বেরুতেই চায়। জীবন যদি নরক হয়ে ওঠে মানুষের তবে বের হবার জন্য অন্য কোনো পথ না পেলে আত্মহত্যাই তো করবে। তার মনে হয় প্রত্যেক মানুষের জীবনের সামনেই বুঝি ‘আত্মহত্যা’ আসে কোনো না কোনো সময়। কোনো কোনো জীবন আত্মহত্যাকে ধরতে যায় এবং ধরতে পারে। কোনো কোনো জীবন আত্মহত্যাকে ধরতে পারে না, আত্মহত্যা পিছলে পালিয়ে যায় পিচ্ছিল মাছের মতো; মাছির মতো। কিন্তু যে জীবন আত্মহত্যা ধরতে পারে আর যে জীবন আত্মহত্যা ধরতে পারে না তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দুজনেই আত্মহত্যাকারী। একদল শুধু চিতাতে গেছে, আরেকদল হেঁটে বেড়াচ্ছে শুধু। মরলে চিতাকাঠে খায়, বাঁচলে চিতাবাঘে খায় অল্প অল্প করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে। চিতাবাঘ মানুষের জন্য চিতাবাঘ; আবার মানুষও মানুষের জন্য চিতাবাঘ।
সমাজ শুধু বিধান দেয়; ধান দেয় না, সমাধান দেয় না। সমাজ আত্মহত্যার সমস্ত পথ খুলে রেখে ‘আত্মহত্যা মহাপাপ’ বলেই খালাস। তারা জানেও না একজন মানুষ কখন আত্মহত্যা করে; কত তাপ থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য আত্মহত্যা করে; তারা জানেও না নরকটা আসলে কী। নরকের তাপকে মানুষ যতটা কল্পনা করতে পারে তার চেয়েও বেশি তাপে পড়ে যায় বলেই তো আত্মহত্যা করে। যে আত্মহত্যা করেছে সেই শুধু জীবন থাকতেই জানতে পেরেছিল নরক কাকে বলে। তাই তো সেই নরক থেকে সে বেরুনোর কোনো পথ না পেয়ে আত্মহত্যা করে; পুরোহিতদের বর্ণিত নরকে যায়।
আত্মহত্যাই আত্মরক্ষা। আত্মহত্যা একটা সমাধান। আত্মহত্যাসমাধান। যার কাছে চাল পাবার জন্য আর কোনো ধান নেই তার কাছে এ আত্মহত্যাসমাধানের চেয়ে ভালো আর কোনো ধান নেই।
আরতি ভাবতে থাকে— আত্মহত্যাধানের চাল সে রান্না করবে, ভাত খাবে। মরণ থেকে বাঁচার জন্য দমের দরকার, জীবন থেকে বাঁচার জন্য যমের দরকার। যম যদি নাইই আসে, নিজের যম সে নিজে হবে।
নিজে নিজের যম হবে, নিজে নিজের দম হরণ করবে; হাড়ে বাতাস লাগবে খুব। এসব কথা ভাবতে ভাবতে সে ক্ষুধার কথা ভুলে যায়। সে আত্মহত্যাভাবনামৃত নিয়ে মজে যায়। গলায় দড়ি দিয়ে, না বিষ পিয়ে, না গলায় কলস নিয়ে জলে ঝাঁপ দেবে সেটা নিয়ে তারিয়ে তারিয়ে ভাবে।
আত্মহত্যা করার কথা ভাবতে তার একধরনের সুখ হচ্ছে। অদ্ভুত! জীবনে তবে আত্মহত্যা করার কথা ভাবাই প্রকৃত সুখ। জীবন থেকে বেরিয়ে যাবার ভাবনাই তবে জীবনের প্রকৃত সুখ!
আত্মহত্যার কথা ভাবতে তার আরাম লাগছে, আরাম তার শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। জীবন থেকে বেরিয়ে যাবার চিন্তার মাদকতায় তার ছটফটানি শান্ত হয়ে আসে। ঝিমানি আসে তার। নেশাগ্রস্তের মতো ঝিমায়। সে বুঝতেই পারে না সে ঝিমাচ্ছে। ঝিমন্ত আরতিকে ঘিরে ঘিরে ধীরে ধীরে ঘুম নাচে; খুব ধীর ধূম তোলে, চুম দেয়। ঘুমও তো কয়েক ঘণ্টার মরে থাকাই। জগতে থেকেও না থাকার স্বাদ দেয় ঘুম। সে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমন্ত ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে জগতে থেকেও না থাকার স্বাদ নেয়। আরতি বুঝতেই পারেনি তার ঘুম এসেছে। আরতি বুঝতেই পারছে না সে ঘুমুচ্ছে। ঘুমন্ত আরতি ঘুমুচ্ছে। মরন্ত আরতি শান্ত মুরতি নিয়ে ঘুমন্ত। প্রাণের জন্য দরকারি এ ঘুম, জীবনের জন্য মারাত্মক।









